মোবাইল বেড়েছে, যোগাযোগ কমেছে! মুছে গিয়েছে ফোনবুথের অপেক্ষারা...

PCO Booth Nostalgia: ২০০৯-এ চিরদিনই-র সাফল্যের পর যে শীতঘুমে গেছিলাম সেই সুযোগে মানবসভ্যতা মুছে দিয়েছে আমার পুরনো বন্ধু ফোনবুথকে।

Rahul Arunodoy Banerjee
৩ মিনিট
মোবাইল বেড়েছে, যোগাযোগ কমেছে! মুছে গিয়েছে ফোনবুথের অপেক্ষারা...

অপেক্ষাদের কেমন দেখতে বলুন তো? আমাদের প্রজন্মের অনেকেই এক নিঃশ্বাসে বলবে ল্যান্ডলাইন ফোনের মতো। আর ল্যান্ডফোন আমাদের বেশিরভাগেরই ছিল না, সব সময় টাকার জন্য নয়। লাইন পাওয়ার জন্য করতে হতো অনন্ত অপেক্ষা। ধরুন, ছেলের অন্নপ্রাশনের সময় দরখাস্ত করলেন, এল ছেলের পৈতেতে। পৈতেতে দরখাস্ত করলেন, এল বিয়েতে- এরম আর কী! তাই আমাদের যাদের ল্যান্ডফোন ছিল না তাদের ইনকামিং ছিল প্রতিবেশীর ভরসা, এসটিডি বুথ ছিল আউটগোইংয়ের আশ্রয়। লোকাল ক্লাবে ফোন থাকলে তাতে লক থাকাও বাধ্যতামূলক ছিল। প্রতিবেশীদের বাড়িতে ফোন তুলতে গেলে স্বাভাবিকভাবেই তাদের মন-মাথার কথা ভাবতে হতো। ধরুন, তাদের বাড়িতে আত্মীয়বিয়োগ হয়েছে, তা সত্ত্বেও তারা আপনাকে ডেকে দিয়েছে। অথচ আপনি গিয়ে ফোনে দুর্গাপুরের দাদার বিয়ের খবর পেয়ে ও বাড়ির বৃদ্ধা দিদাকে জড়িয়ে ধরে একপাক নেচে দিলেন, এ তো হয় না! কিন্তু মুশকিল হয় যখন ফোনে সদ্য প্রেমের প্রস্তাব পাওয়া স্লোমো হয়ে যাওয়া কিশোরকে ফোনের বাড়ির জেঠু কোমরে হওয়া পাঁচড়া দেখাতে বদ্ধপরিকর হয়ে ওঠেন। সে কিশোর কী করে বোঝাবে প্রেম ও পাঁচড়ার ঐতিহাসিকভাবেই সহাবস্থান সম্ভব নয়। কিন্তু যার নেই ফোন তার আবার কীসের মন? অগত্যা মনে প্রেমিকার মুখ আর হাতে বোরিক তুলো নিয়ে জেঠুর কোমরের দিকে তাকাতে হয়।

এসব তো ফোন ধরার ঝঞ্ঝাট, কিন্তু খেলা জমত এসটিডি বুথে। নাহ, বলা ভালো এসটিডি বুথ আর লোকাল টেলিফোনের দোকানে। আচ্ছা, এই প্রজন্মের জন্য ফারাকটা বুঝিয়ে বলি। এসটিডি বুথ থেকে এসটিডি করা যায় অর্থাৎ বাইরে ফোন করা যায়। আর তখন এমনকী শিলিগুড়িও এসটিডির আওতায়।এসটিডি বুথ একটু খরচাসাপেক্ষ, তার জন্য আলাদা কাচের বুথ লাগে, ডিসপ্লে লাগে, যাতে কতক্ষণ কথা বলে কত খরচ হয়েছে তা জানতে পারেন খদ্দের। লোকাল ফোন বুথের সে দায় নেই, চিলতে ঘরে একটা ফোন লাগিয়ে দিলেই হল। দুটোর রেটও আলাদা ছিল। এসটিডি বুথে পাঁচ মিনিটে ২ টাকা, লোকাল বুথে ৩ মিনিটে দেড় টাকা। ডিসপ্লে না থাকার দরুণ খদ্দেরের সঙ্গে দর কষাকষিও হতো বিস্তর লোকাল ফোন বুথে! "কী বলছ? ৩ মিনিট হয়ে গেল? কই খুট করে যে আওয়াজ হয় তা তো পেলাম না?” এ আমাদের প্রজন্মের সবাই কম বেশি শুনেছে বা বলেছে। আর একটা জিনিস আজ ভাবতে বসে মনে পড়ল, লোকাল ফোন বুথের মালিকানা পেতে গেলে শারীরিক প্রতিবন্ধী হলে কিছু সুবিধে মিলত বোধহয়, কারণ আমাদের পাড়ার এবং বাইরের পাড়ারও লোকাল ফোনের দোকানে অধিকাংশ সময় শারীরিক প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষদেরই বসতে দেখতাম। আমি যখন বড় হচ্ছি, ততদিনে শহর কলকাতায় টেলিগ্রাম আসা বিরল হয়ে গেছে, মুদির দোকানের খামখেয়ালি টাকা চাওয়া ফোনের জায়গায় বাজারের প্রয়োজনে জন্ম হচ্ছে ফোনবুথের। ফোন হয়ে উঠছে আমাদের মূল যোগাযোগ মাধ্যম।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
জামা ছিঁড়ে খালি গায়ে রঙ খেলার কাছে হাজার গোলে হেরে যায় তিন আঙুলের আবিরের দোল

Holi 2023: এই কয়েকদিন আগেও দোলের শেষে সবার জামা একসঙ্গে ছিঁড়ে পরপর বেঁধে রাস্তায় উঁচু তারে ঝুলিয়ে খালি গায়ে বাড়ি ফিরতাম!

আজ যখন ফিরে ভাবতে বসি, ওই ক'টা বছর ফোনবুথ আসলে কী জরুরি হয়ে উঠেছিল জীবনে, ভাবতে অবাক লাগে। আমার ক্লাস এইট, লাইব্রেরি থেকে সন্ধ্যেবেলা বই নিয়ে ফিরছি, হঠাৎ দেখি আমার দিদার বোন গীতাদি এসটিডি বুথের সামনে বসে কাঁপছে। দৌড়ে কাছে যেতে খবর পেলাম, হাসপাতাল থেকে ফোন করতে বলেছিল, দাদু ভর্তি আছেন। এখন ফোন করেছে গীতাদি, ওরা কী বলছে গীতাদি কিছুই বুঝতে পারছে না! হাসপাতাল নাকি বলছে আমার দাদু আর নেই! নেই মানে নেই? গতকাল যার বেডের পাশে বসে, হাসপাতাল থেকে দেওয়া তাঁর ভাগের ছানা তাঁর হাসিমুখের সামনে বসে খেয়ে এলাম সে আর নেই? আমার জীবনে কাছ থেকে দেখা প্রথম মৃত্যু সেটা, গীতাদির মতোই আমিও কিছু বুঝতে পারছিলাম না। শুধু টের পাচ্ছিলাম আমার শৈশবের একটা অধ্যায় শেষ হচ্ছে, ফোনবুথের সামনে।

অভিনয় করতে পারায় একটা বয়সে বন্ধুদের মধ্যে আমার আকাশ ছোঁওয়া চাহিদা হয়েছিল। আসলে আমাদে দু' দেড় টাকা খুব দামি ছিল, তা সুযোগের হাতে ছাড়ার সুযোগ আমাদের ছিল না। কে ফোন তুলবে, কে তা বলবে? তাই আমাকে মেয়ের গলা করে বন্ধুর প্রেমিকার বান্ধবী সেজে বন্ধুকে উদ্ধার করতে হতো।নিজেকেও উদ্ধার করতাম একই উপায়ে। একটা ফোনবুথেই জীবনে প্রথমবার টের পেয়ে ছিলাম আমি যথেষ্ট ভালো নই প্রেমিক হিসেবে। আবার এই ফোনবুথই স্রোতে ভালোবাসা ফিরিয়ে দিয়েছে এই বলে যে, আমি অভিনেতা হিসেবে নেহাত খারাপ নই। আমার প্রথম অডিশন ক্র্যাক করা থেকে দাদার চাকরি, বাবার একটা সিনেমায় রোলের চেষ্টা থেকে মায়ের নালিশ- কী না শুনেছে ফোনবুথ।

২০১৫-১৬ হবে, হায়দরাবাদ শহরে ফোন হারিয়ে গেল। অচেনা শহর, তায় হাতের মোবাইল খোওয়া গেছে। মা চিন্তা করছে, একান্তই জানানো দরকার যে পৌঁছে গেছি। গোটা শহর ঘুরে টের পেলাম ২০০৯-এ চিরদিনই-র সাফল্যের পর যে শীতঘুমে গেছিলাম সেই সুযোগে মানবসভ্যতা মুছে দিয়েছে আমার পুরনো বন্ধু ফোনবুথকে। অগত্যা নতুন মোবাইল কিনতে হলো। পাসওয়ার্ড দিলাম, "একদিন তুমিও থাকবে না”।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কীভাবে বিশ্ব উষ্ণায়নের দাম দিচ্ছে ভারতের নবজাতকরা?

Heatwave effect on Newborn babies: জিরো কার্বন অ্যানালিটিক্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের এপ্রিলের তাপপ্রবাহে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভারতে ৮,৮৩০টি শিশুর নির্ধারিত সময়ের আগে অকাল জন্ম হয়েছে। বিহার, উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ডে এই সংখ্যা সর্বাধিক। গবেষকদের আশঙ্কা, কিছু বছরের মধ্যে ভারতে এই পরিস্থিতি, আরও বাড়বে।

ট্রাম্পের হারের ৫ কারণ: কেন মুখ ফিরিয়ে নিলেন মার্কিন ভোটাররা?

US Midterm Elections: আমেরিকার মিডটার্ম নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেল ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি।জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি থেকে শুরু করে ট্রাম্পের নীতি—রিপাবলিকানদের ভরাডুবির পাঁচটি মূল কারণ কী কী?

পিস বন্ড কী, কেন দিতে হয়? নেহা বোরার আপত্তিতে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ঔপনিবেশিক আমলের আইন

Peace Bond: শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করলেই কি দিতে হবে পিস বন্ড? AISA-র জাতীয় সভাপতি নেহা বোরার আপত্তিতে নতুন করে বিতর্কে ঔপনিবেশিক আমলের প্রতিরোধমূলক আইন। ব্রিটিশ আমল থেকে স্বাধীন ভারত, CrPC থেকে BNSS—কীভাবে বদলেছে এই আইনি ব্যবস্থা? কেন কাউকে ১০ হাজার টাকার মুচলেকা দিতে বলা হয়? কী বলছে আইন?

রামলীলা ময়দানের সভায় ভিড় দেখাতে এআই ছবি? কতটা সত্যি?

Ramlila Maidan AI image controversy: দিল্লির রামলীলা ময়দানে ১ নভেম্বরের ‘ইন্ডিয়া’ জোটের সমাবেশে ভিড় ও এআই ছবি ব্যবহার নিয়ে বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে বিতর্ক তুঙ্গে। ভাইরাল ছবিগুলোর সত্যতা কী?

সাত দিনের ব্যবধানে দুটো ঘূর্ণিঝড়: জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন বাস্তবতা কি এটাই?

Climate change impact on cyclone: ২৮ অক্টোবরে অন্ধ্র উপকূলে আছড়ে পড়ে অতি তীব্র ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’, ঠিক সাত দিন পর ৩ নভেম্বরে ল্যান্ডফল করে ‘মুরাসু’। আবহাওয়াবিদদের ভাষায়, এই পিঠোপিঠি ঝড়ের ঘটনাকে বলা হয় ‘ক্লাইমেটোলজিক্যাল অ্যানোমালি'। বঙ্গোপসাগরের এই ‘ওভার-এনার্জাইজড’ অবস্থাই, এখন জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন বাস্তবতা।

আবের কাওয়াস: প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান মুসলিম মহিলা নিউ ইয়র্কের সিনেটে

Aber Kawas: নিউ ইয়র্কের ১২ নম্বর সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়লেন আবের কাওয়াস। নিউ ইয়র্ক স্টেট আইনসভায় তিনি প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান এবং প্রথম হিজাব পরিহিত মুসলিম মহিলা প্রতিনিধি।

প্রতিবেশীর ধর্ম দেখব না! গির্জায় হামলায় যা বলছে বাসন্তী

Basanti church: গির্জার সদস্য প্রদীপ মণ্ডল ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ চার্চ অফ নর্থ ইন্ডিয়ার (CNI) বিশপ সুব্রত চক্রবর্তী পার্শ্ববর্তী এলাকার কয়েকটি গির্জার যাজকদের নিয়ে শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা করে নারায়ণতলার নবনির্মিত গির্জায় পৌঁছন। তাঁদের স্বাগত জানাতে গির্জার ভিতরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রার্থনা শুরুর ঠিক আগে ৩০-৩৫ জনের একটি দল জোর করে গির্জায় ঢুকে পড়ে বলে দাবি তাঁর।

পাঁচ খুনের 'বদলা'? এবার গুয়াহাটিতে এনকাউন্টার পুলিশের

Guwahati Encounter: গুয়াহাটিতে হোটেলে ঢুকে পাঁচ জনকে খুনের অভিযোগে ধৃত ঘনকান্ত গগৈ পুলিশের গুলিতে নিহত। পুলিশের দাবি, হেফাজত থেকে পালিয়ে সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল সে। একই সময়ে মধ্যপ্রদেশের দেওয়াস ও ভোপালে পৃথক এনকাউন্টারে তিন অভিযুক্ত গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কয়েক দিন আগেই বাংলায় গাইঘাটা ও সামশেরগঞ্জে দুই অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছিল।