অদিতি যে ক'টি ভাষায় কথা বলে : অলোকপর্ণা

Bengali Short Story: সুপরিচিত ট্যাটুশিল্পী অদিতিকে জিজ্ঞেস করে, “Who is B? And who is S?” অদিতি মুখ টিপে হাসে।

Alokparna
৪ মিনিট
অদিতি যে ক'টি ভাষায় কথা বলে : অলোকপর্ণা

অদিতিকে অনুবাদ করতে পারে এরকম দু' তিনজন এখনও টিকে আছে শহরে। মাঝে মাঝে অবুঝ হলে অদিতি তাদের কাছে যায়, অনুদিত হয় কয়েক ঘণ্টা এবং সফল অনুবাদ শেষে ফিরে আসে। তখন তার গা-হাত-পা ভরে থাকে ডোরা ডোরা অক্ষরে। অদিতির সারা শরীর জুড়ে শব্দরা ঘুরঘুর করে, কচুরিপানার মতো অদিতির চামড়ায় এদিক ওদিক ভেসে বেরায়। অদিতির সুড়সুড়ি লাগে ঘাড়ে, গলায়, কানের পিছনের নরম ত্বকে। টুঁটি কামড়ে ধরে থাকা শব্দদের যাতনা সহ্য করে জন্মদিনের আগে সে সারাটা রাত, ঘুমের মধ্যে। আর অদিতির বর শোনে ঘুমন্ত অদিতি স্বপ্নের ভিতর কথা বলে চলেছে নিজের সঙ্গে,

• “কেউ যদি বলে কখনও সমুদ্র দেখেনি, আমার মন খারাপ করে তার জন্য।”

• “কত মন খারাপ? খুউব মন খারাপ।”

লোকটা পাশ ফিরে শোয়। অদিতি শূন্যে হাত বাড়ায়। অদিতির হাত কোথাও পৌঁছতে পারে না ঘুমের ঘোরে।

অনুবাদক ১ পুরুষটি অদিতির সঙ্গে আকণ্ঠ মদ পান করে শ্যামবাজার থেকে টলতে টলতে কাশীপুর অবধি গিয়েছিল গত শনিবার রাত আটটার পর। পথে কালীপ্রসন্ন সিংহ রোডের কাছে এসে পুরুষ অনুবাদক সুলভ শৌচালয়ে হালকা হতে ঢুকেছিল। অদিতিও হালকা হতে যায় স্ত্রী শৌচালয়ে এবং দেখতে পায় হলুদ দেওয়ালে লাল দিয়ে লেখা b+s। ভারী ভালো লাগে তার, হলদে দেওয়ালে রাঙা অক্ষরদুটো। হালকা হতে হতে সে দু' চোখ ভরে লেখাটা দেখে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কবিতা ও তার মাকড়সা: অলোকপর্ণা

Bengali Short Story: অন্ধকারে মাকড়সা কবি তাঁর জালে আটকা পড়া কবিতার দিকে জুলজুল করে চেয়ে থাকেন, শব্দগুলো মাথার ভিতর ফাটে, যেভাবে ঠোঁট বা বোমা।

হালকা হয়ে বেরিয়ে এলে খেয়াল হয়, একে অপরকে তাদের ছোঁয়া হয়নি সেই সন্ধায় একবারও, অতঃপর অন্ধকারে ফুটপাথের একপাশে বোগেনভিলিয়া গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে অদিতিকে অনুবাদক পুরুষটি একটি খোলতাই চুম্বন উপহার দেয়। অদিতিরা এরপর ফের টলতে টলতে কাশীপুরের দিকে এগিয়ে চলে এবং তারা কাশীপুরের অস্ত্র কারখানা সম্পর্কে গভীর আলোচনায় মগ্ন হয়। এই সময় অদিতি অনুবাদকের ব্যক্তিগত অস্ত্রের প্রতি আগ্রহ দেখালে তারা স্থির করে রাতটি একসঙ্গে কাটাবে। কিছু পরে অনুবাদকের বিছানায় অনুদিত হতে হতে অদিতি খেয়াল করে দেওয়াল থেকে ঝুলে থাকা ছবিতে অনুবাদকের মৃত মায়ের মুখটি তার ভীষণ পরিচিত। কিন্তু আজকাল স্মৃতি বেইমানি করছে বলে অদিতির আক্ষেপ হয় সেই মুহূর্তে। অদিতি প্রাণপণ চেষ্টা করে, তবু স্মৃতি ফসকে যায়।

সকাল হলে অনুবাদক আগত জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে অদিতিকে রিকশায় তুলে দিয়ে বলে, “সাবধানে যাস।”

অদিতি সাবধানে যায় দ্বিতীয় অনুবাদকের কাছে।

রবিবার দুপুর দুপুর অদিতি আর অনুবাদক ২ মেয়েটি পাশাপাশি হাঁটে অনেকক্ষণ। মেয়েটি তাকে একটি শূন্য, রিক্ত মাঠে নিয়ে গিয়ে বলে বসে, “শুভ জন্মদিন”। ঘেয়ো কুকুরের মতো রিক্ত মাঠ, তবু তাকে ঋণী করে সোনালি বৃষ্টি পড়ে অকস্মাৎ। অদিতি হাত তুলে মেয়েটিকে সেই বৃষ্টি দেখায়। তারা বৃষ্টি দেখে একত্রে। মেয়েটি সাহস করে অদিতির দিকে হাত বাড়ায় আর ধরে ফেলে অদিতির হাত। তারা অনেক অন্ধকার অবধি হাত ধরে হাঁটে, যোধপুর পার্ক থেকে যাদবপুর এইট বি অবধি। মাঝ রাস্তায় সিগারেটের দোকান দেখে অনুবাদক থামে, আগুন খোঁজে অনুবাদক, অদিতি আগুনের সন্ধান দেয়। এই প্রসঙ্গে কথা এগোলে অদিতিকে আলিঙ্গন করে অনুবাদক, অদিতির থেকে কিছুটা আঁচ নেয় সে পথের আঁধারে মশাল হবে বলে। তারা হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে একে অপরকে দখিনা চাঁদ দেখায়। তারা পাহাড়ের কথা, জঙ্গলের কথা, সমুদ্রের কথা বলে।

অনুবাদক ২ বলে, “কেউ যদি বলে কখনও সমুদ্র দেখেনি, আমার মন খারাপ করে তার জন্য।”

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বড়দিন : অলোকপর্ণা

Bengali Short Story: আমরা খিদে পেলে একে অপরের খাদ্য হব। তেষ্টা পেলে গলা ভেজাব আগুনে। নেশা জমাট বাঁধলে আমরা মেলায় যাব আর প্রচণ্ড বুদবুদ ওড়াব।

অদিতি- “কত মন খারাপ?”

অনুবাদক ২- “খুউব মন খারাপ।”

অদিতি ট্যাক্সি ডাকে সোচ্চারে, ট্যাক্সিতে উঠে ঘন হয়ে বসে অনুবাদক মেয়েটির হাত নিজের হাতে নিয়ে খুব করে কচলাতে থাকে, মেয়েটির গলায় মুখ গুঁজে দেয়। অনুবাদক মেয়েটি অদিতির চুলে নাক ডুবিয়ে গন্ধ শোঁকে বুক ভরে, অনুবাদক মেয়েটি অদিতির আঁচে উষ্ণ হয়ে ওঠে। তারা উল্টোডাঙা এসে পৌঁছলে অদিতি নেমে যায়।

রাস্তা পার হবে অদিতি, এই সময় দেখে চেয়ে দেখে, মিষ্টির দোকানের উর্ধ্বে, ফুটব্রিজের গায়ে বশীকরণ, সরকারি চাকুরি, প্রেমে বিফলতা ইত্যাদি মুশকিলের আসান “মা মাতঙ্গী”র বিরাট এক বিজ্ঞাপন, মুখটি অবিকল অনুবাদক ১ এর মায়ের দেওয়াল থেকে ঝুলে থাকা ছবির মুখের মতো।

স্মৃতি খসে যাওয়ার আগে অনুবাদক ১ কে দেখাবে বলে অদিতি বিজ্ঞাপনের ছবি তুলে রাখে। এরপরের দিন অনূদিত হওয়ার সময় ছবিটি একান্তে জাহির করা যাবে।

বাড়ি ফিরে অদিতি একটু বেড়াল ঘাঁটে। একটু রান্নাঘরে যায়। চিজ অমলেট খেতে খেতে অদিতির মুখ থেকে আনন্দের শীৎকার নির্গত হয়। ক্ষুধার অতীত ক্ষুরধার তৃপ্তির সন্ধান অদিতি পায়নি এখনও অবধি। সে নিজের আঙুল চাটে কুকুরের মতো। অদিতি নিজের চুল মুঠো করে নিজের নাকে মুখে চেপে ধরে, তারপর রান্নাঘরে টুলে বসেই অদিতি নিজেকে অনুবাদ করে বেশ কিছুক্ষণ। বারোটা বাজলে অদিতি নিজেকে “শুভ জন্মদিন” বলে।

জন্মদিনের সকাল এগারোটায় অদিতি ট্যাটু পার্লারে যায়, গিয়ে কবজিতে ছোট করে b+s লেখায়। সুপরিচিত ট্যাটুশিল্পী অদিতিকে জিজ্ঞেস করে, “Who is B? And who is S?”

অদিতি মুখ টিপে হাসে। জবাব দেয়, “কেউ না। তবে, তাদের মধ্যে ভাব আছে, ভালোবাসা আছে।” ট্যাটুশিল্পী হেসে জানতে চায়, “বয়স কত হলো তোমার অদিতি?” “তিনশত পাঁচ বৎসর!” হাসতে হাসতে নিজের ভাষায় জবাব দেয় সে।

লিখেছেন
Alokparna
Alokparna
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।