পৃথিবীর সবচেয়ে লম্বা মানুষ তিনি, সুলতান কোসেনের যে গল্প চোখে জল আনবে

World's tallest man: জন্ম থেকেই তাঁর উচ্চতার এই বৃদ্ধির কারণ হলো তাঁর মস্তিষ্কের পিটুইটারী গ্ল্যান্ডে একটি ছোট্ট টিউমারের অবস্থান।

Amit Pratihar
৪ মিনিট
পৃথিবীর সবচেয়ে লম্বা মানুষ তিনি, সুলতান কোসেনের যে গল্প চোখে জল আনবে

ধরুন আপনার বাড়ির দোতলার ঘরের জানলাটা বন্ধ না করেই আপনি নীচে চলে এসেছেন, এদিকে সিঁড়ি চড়ে উপরে গিয়ে জানলাটা বন্ধ করে আসতেও ইচ্ছে করছে না; এমতাবস্থায় আপনারই বাড়ির এক সদস্য উঠোনে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে দোতলার ঘরের জানলাটা বন্ধ করে দিলো বাইরে থেকে, কেমন লাগবে? আপনি কি চমকে তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠবেন? নাকি অবাক হয়ে ভাববেন এটা কী করে সম্ভব? মই ছাড়া, সিঁড়ি ছাড়া, একতলার উঠোনে দাঁড়িয়ে দু'তলার ঘরের জানলা কীভাবে বন্ধ করে দিতে পারে কেউ? পারে, ভারতবর্ষে না পারলেও, ভারতবর্ষ থেকে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে তুর্কির এক ছোট্ট শহর মার্দিন-এর অধিবাসী বছর ৩৯ এর সুলতান কোসেন নামক এক ব্যক্তি এই কর্ম করতে পারেন অনায়াসে কারণ তিনি এই মুহূর্তে এই বিশ্বের সবথেকে লম্বা মানুষ। যার উচ্চতা প্রায় ৮ফুট ৩ইঞ্চি। হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন, আট ফুট তিন ইঞ্চি অর্থাৎ ২৫১ সেন্টিমিটার।

সুলতান কোসেন এই মুহূর্তে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নিজের নাম লিখিয়ে ফেলেছেন বিশ্বের সবথেকে লম্বা মানুষ হিসাবে। বিশ্বের সব থেকে বড় হাতের পাতার অধিকারী হিসাবেও তিনি প্রণিধানযোগ্য। সুলতানের এক একটা হাতের পাতা প্রায় ১১ ইঞ্চির। অর্থাৎ একটি সাধারণ মানুষের হাতের পাতার প্রায় দ্বিগুণ। সুলতান এতটা লম্বা যে তিনি সাধারণ বাস, গাড়ি চড়তে পারেন না। তিনি সাধারণ দরজা দিয়ে প্রবেশও করতে পারেন না, বেরও হতে পারেন না। সাধারণ জামা কাপড় প্যান্ট জুতো তাঁর শরীরে আঁটে না। তিনি বিমানে যাতায়াত করা কালীন ইকোনমি বিভাগেও এঁটে ওঠেন না, তাই তাঁকে দেওয়া হয় ফার্স্ট ক্লাসের টিকিট। সুলতান এতটা লম্বা যে তিনি রাস্তায় দাঁড়িয়ে একটি দোতলা বাসের উপরের তলার যাত্রীদের সঙ্গে হাত মেলাতে পারেন, গল্প করতে পারেন। তাঁর হাতে একটি আইপ্যাডকে দেখলে মনে হয় সেটি একটি ছোট্ট আইফোন। সুলতান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বদলে দিতে পারেন বাড়ির উঁচু টিউবলাইট, জানালার পর্দা। সুলতানের দৃষ্টিশক্তি অন্যদের থেকে বেশি, তিনি এতটাই লম্বা যে তিনি যা দেখতে পান তাঁর উচ্চতা থেকে তা একটি সাধারণ মানুষের চোখেও পড়ে না।

তাঁর এই মাত্রাতিরিক্ত উচ্চতার যেমন কিছু ভালো দিক আছে, তেমনই আছে কিছু খারাপ দিকও। ১০ ডিসেম্বর, ১৯৮২ সালে সুলতানের জন্ম। জন্ম থেকেই তাঁর উচ্চতার এই বৃদ্ধির কারণ হলো তাঁর মস্তিষ্কের পিটুইটারী গ্ল্যান্ডে একটি ছোট্ট টিউমারের অবস্থান। যা তাঁকে দৈত্যাকার করে তুলেছে দিনের পর দিন। ছোট থেকেই সুলতানের উচ্চতার কারণে তিনি বন্ধু পাননি, সাধারণ স্কুলে পড়াশোনা বন্ধ হয়েছে, রাতে ঘুমানোর সময় শোওয়ার বিছানা থেকে পা ঝুলে পড়েছে সুলতানের, ভালোবাসার মানুষ খুঁজতে তাকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে, তিনি সহজে যাতায়াত করতে পারেন না এ'খান থেকে সেখানে কারণ তিনি কোনও গাড়িতেই এঁটে ওঠেন না। অবশেষে তিনি আমেরিকা যান নিজের চিকিৎসা করাতে, নিজের ক্রমবর্ধমান উচ্চতাকে আটকে রাখতে। উচ্চতা নিয়ে অসুবিধার কথা জিজ্ঞেস করা হলে সুলতান বলেন, আমায় সব সময়ে একটি লাঠির সাহায্যে হাঁটতে হয়। ছোটবেলায় একবার পা ভেঙে গেলে ১০ দিন হসপিটালে কোনও চিকিৎসা পাইনি। কারণ আমার দৈর্ঘ্যের কোনও বিছানা ছিল না সেই হাসপাতালে। ১০ দিন ছটফট করেছি যন্ত্রণায়। বিয়ে হওয়াটাও সম্ভব হচ্ছিল না উচ্চতার জন্য। অবশেষে যাঁর সঙ্গে বিয়ে হয় তিনি কেবল আরবি ভাষায় কথা বলতে পারেন, তুর্কিশ ভাষা না বোঝেন না বলেন।"

সহজ নয়, জীবন নামক নদীর স্রোত যদি আজন্মকাল বিপরীতে বয়ে যায়, সে নদীতে আজন্মকাল টিকে থাকা সহজ নয় মোটেও। কিন্তু সুলতান কোসেনের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা উল্টো। সুলতান কখনও নিজের জীবন নিয়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে অভিযোগ করেননি, কখনও জীবনের ওপর অসন্তুষ্ট হননি। বরং তিনি ধন্যবাদ জানিয়েছেন নিজের স্রষ্টাকে, হাতজোড় করে বলেছেন 'আমি এই জীবনের জন্য কৃতজ্ঞ আমার ঈশ্বরের কাছে।'

সুলতান সব সময়ে হাসিমুখে থাকেন। নতুন মানুষজন তাঁর সাথে দেখা করতে গেলে আন্তরিকতার ওমে ছুঁয়ে নেন তাঁদের অন্তরাত্মা। বুকে জড়িয়ে ধরেন, ফ্লাইং কিস দেন। হাসিমুখে গল্প করেন, ১০১টা প্রশ্নের উত্তর দেন একটুও বিরক্ত না হয়ে। সুলতান পৃথিবীর ১২৮টা দেশ ঘুরে ফেলেছেন ইতিমধ্যেই। বপন করেছেন হাজার হাজার বন্ধুত্বের বীজ।

বন্ধুরা বলে সুলতান কোসেন আসলে পৃথিবীর সব থেকে লম্বা মানুষই নন, তিনি পৃথিবীর সব থেকে বড় হৃদয়ের অধিকারীও বটে। জীবনের সমস্ত প্রতিকূলতা কাটিয়ে, ঝড়ের রাতের তাল গাছ কীভাবে হেসে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় তা সুলতান কোসেন জানেন। যারা তাঁকে আলাদা করে দিয়েছিল শরীরের অতিকায়ত্বের জন্য, যাঁরা তাঁকে বন্ধু হিসাবে অস্বীকার করেছিল এক সময়, যারা তাকে একলা করে দিয়েছিল, যাদের দেওয়া দুঃখ তাঁর গাল বেয়ে মাটি ছুঁয়েছিলো নিস্তব্ধে, তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, 'মানুষকে তাঁর শারীরিক বৈশিষ্ট্য দিয়ে বিচার করতে নেই। মানুষ সুন্দর না অসুন্দর তার বিচার করে তাঁর মন। আমাদের উচিত একে অন্যকে ভালোবাসা, ঘেন্না করা নয়। আলাদা করে দেওয়া নয়, বুকে জড়িয়ে ধরা'।

আর এভাবেই পৃথিবীর বুকের সবথেকে লম্বা মানুষে পরিণত হন পৃথিবীর সব থেকে উঁচু মানুষে। সুলতান কোসেনের আয়ু এমনই দীর্ঘ হোক।

তথ্যসূত্র : গিনিস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের ওয়েব পেজ

লিখেছেন
Amit Pratihar
Amit Pratihar
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।