একজন নয়, গোপাল ভাঁড় আসলে একাধিক ব্যক্তি! ঐতিহাসিক এই চরিত্রকে ঘিরে হাজারও রহস্য

বাংলায় গোপাল ভাঁড়ের মতো কিংবদন্তি খুব কম রয়েছেন এবং বিতর্ক যাই থাকুক না কেন, বাংলার বেশিরভাগ মানুষের কাছে গোপাল ভাঁড় সদাহাস্যময়, উপস্থিত বুদ্ধিমত্তার অধিকারী এক রক্তমাংসের মানুষ।

Raktim Dey
৩ মিনিট
একজন নয়, গোপাল ভাঁড় আসলে একাধিক ব্যক্তি! ঐতিহাসিক এই চরিত্রকে ঘিরে হাজারও রহস্য

বাংলার মানুষের কাছে খুবই পরিচিত একটা নাম গোপাল ভাঁড়। হাস্যরস, কৌতুক এবং উপস্থিত বুদ্ধিমত্তার জন্য লোকমুখে এবং বিভিন্ন লেখায় তাকে ঘিরে রয়েছে অসংখ্য গল্প। যদিও এই বিখ্যাত মানুষটিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে অসংখ্য বিতর্ক। তার অস্তিত্ব নিয়ে রয়েছে সবথেকে বড় বিতর্ক। মানুষের পরিচিত গোপাল ভাঁড় কি সত্যি বাস্তবের কোনও চরিত্র নাকি শুধুই তিনি শুধু এক কাল্পনিক চরিত্র?

গোপাল ভাঁড় যে আসলে বাস্তবের এক চরিত্র সেই সংক্রান্ত প্রচুর তথ্য রয়েছে। বিভিন্ন নথি এবং জনশ্রুতি অনুযায়ী গোপাল ভাঁড়ের জন্ম হয়েছিলো নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগরের কাছে ঘূর্ণিতে। যদিও বিরোধী কিছু তথ্য অনুযায়ী মুর্শিদাবাদে গোপালের জন্ম হয়েছিল। এই জন্মস্থান সম্পর্কিত বিবাদ ছাড়া গোপালকে বাস্তব জগতের মানুষ হিসেবে প্রমাণ করা সমস্ত তথ্য এবং নথি গোপালের জীবন সম্পর্কে মোটামুটি একইরকম ঘটনা বলে। তাঁর পিতৃদত্ত নাম ছিল গোপালচন্দ্র প্রামাণিক। ছোটবেলায় গোপাল তাঁর মা, বাবাকে হারিয়েছিলেন। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভার সভাসদ গোপাল হাস্যরস, কৌতুকের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। এই হাস্যরস তাঁকে গোপাল ভাঁড় নাম এনে দিয়েছিল কারণ তিনি রাজসভার ভাঁড়ের ভূমিকা পালন করতেন। যদিও শুধুমাত্র মানুষকে হাসানোর মধ্যে তাঁর কাজ সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর প্রখর বুদ্ধিমত্তার কারণে মহারাজ অনেক সময় অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে তাঁর সঙ্গে আলোচনা করতেন। কৌতুকের সঙ্গে তাঁর উপস্থিত বুদ্ধিমত্তার পরিচয় তাঁকে ঘিরে তৈরি হওয়া বহু ঘটনা থেকে আমরা জানতে পারি। লোকমুখে প্রচলিত থাকলেও গোপাল ভাঁড়ের সম্পর্কে প্রথম বই ঊনবিংশ শতকে প্রকাশিত হয়। গোপাল মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রর সভার পঞ্চরত্নের মধ্যে একজন ছিলেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বিজ্ঞাপনের আকাল, কী অবস্থায় রয়েছে চিৎপুরের যাত্রাপাড়া?

এই শহরে বাগবাজারের মাঠ, দমদম, বারাসত বা সল্টলেকেও বছরের পর বছর জমেছে যাত্রাপালা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের আমলে যাত্রার জন্য নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। হঠাৎ আসা করোনা কাবু করেছে যাত্রাশিল্পীদের।

কথিত আছে যে, সিরাজ-উদ-দৌল্লার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে গোপাল কৃষ্ণচন্দ্রকে বারণ করেছিলেন। মহারাজ নিজে সিরাজ-উদ-দৌল্লার বিরোধী ছিলেন এবং বন্ধু জগৎ শেঠকে সাহায্য করবেন বলে কথা দিয়েছিলেন। তাই শুরুতে গোপালকে বোঝানোর চেষ্টা করলেও পরে তিনি ষড়যন্ত্র থেকে সরে আসার জন্য গোপালের কাছে একটা শর্ত রেখেছিলেন। সেই শর্ত অনুযায়ী গোপাল নবাবের সভায় গিয়ে জনসমক্ষে নবাবকে ভেংচি কাটেন। নবাব প্রথমে অবাক এবং ক্রমে ক্রুদ্ধ হয়ে গোপালকে বন্দি করার আদেশ দিয়েছিলেন। বন্দি অবস্থায় গোপাল কোনওক্রমে মিরজাফরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং কৃষ্ণচন্দ্রকে জানাতে বলেন যে তিনি শর্ত পূরণ করেছেন। মিরজাফর এই ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়ে গোপালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার জন্য নবাবকে বোঝাতে শুরু করেন। নবাব প্রথমে গোপালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার কথা ভাবলেও পরে তাঁকে পাগল ভেবে মৃত্যুদণ্ড খারিজ করে মুক্তি দিয়েছিলেন। মুর্শিদাবাদ থেকে মুক্তি পেয়ে গোপাল কৃষ্ণনগরে ফিরে এসে কৃষ্ণচন্দ্রকে পুনরায় বোঝানোর চেষ্টা করেন কিন্তু কৃষ্ণচন্দ্র তার কথা কানে তোলেননি। পলাশির যুদ্ধে ইংরেজদের জয়ের পরে গোপাল ভাঁড় কৃষ্ণনগর ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। সেই ঘটনার পরে তাঁর সম্পর্কে আর কোনও তথ্য পাওয়া যায় না।

গোপাল ভাঁড় সংক্রান্ত এই সকল তথ্য বিভিন্ন বই, নথি এবং জনশ্রুতি থেকেই জানতে পারা যায়। যদিও সুকুমার সেনের মতে গোপাল ভাঁড় আসলে কোনও মানুষ না, বরং উপাধি বলা যেতে পারে। শঙ্কর এবং তরঙ্গ। অনেকের মতে দু'জন মানুষ, আবার অনেকের মতে একজন মানুষ। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র এই শঙ্কর তরঙ্গকে উপস্থিত বুদ্ধিমত্তা এবং সাহসের জন্য নিজের সভায় বিশেষ স্থান দিয়েছিলেন। সুকুমার সেনের মতে এই ঘটনা গোপাল ভাঁড়ের কিংবদন্তির জন্ম দিয়েছিল। গোপাল ভাঁড়ের গল্প আসলে এই ঘটনা থেকেই তৈরি হয়েছে। যদিও গোপাল ভাঁড়ের সন্ধানে বইয়ের লেখক সুজিত রায়ের মতে গোপাল ভাঁড় কোনও কাল্পনিক চরিত্র না। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের সময়কালে ছবি তোলার জন্য ক্যামেরার ব্যবহার শুরু হয় নি। সেই সময়ের হাতে আঁকা এক ছবিতে দেখা যায় যে মহারাজকে তার সভাসদদের সাথে বসে আলোচনা করছেন। সুজিত রায়ের মতে ছবিতে উপস্থিত সকলের মধ্যে এক ব্যক্তিকে গোপাল ভাঁড় হিসাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে। গোপাল ভাঁড়ের বিভিন্ন গল্প নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। গোপাল ভাঁড়ের সম্পর্কে লেখা অনেক গল্পের সঙ্গে বীরবল এবং তেনালি রামনের বিভিন্ন গল্পের মিল রয়েছে। ইতিহাস গতিপথ অনুযায়ী প্রথমে তেনালি, তারপর বীরবল এবং শেষে গোপাল রয়েছে। গৌতম ভদ্রর মতে এটা খুবই সম্ভব যে, গোপাল সম্পর্কিত কিছু গল্প অন্য কোনও ভাঁড়ের জীবন থেকে নেওয়া হয়েছে, কারণ ঊনবিংশ শতকের প্রথম বই প্রকাশের পর গোপাল এবং তাঁর গল্প পড়ার কৌতূহলী পাঠকের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিল।

বাংলায় গোপাল ভাঁড়ের মতো কিংবদন্তি খুব কম রয়েছেন এবং বিতর্ক যাই থাকুক না কেন, বাংলার বেশিরভাগ মানুষের কাছে গোপাল ভাঁড় সদাহাস্যময়, উপস্থিত বুদ্ধিমত্তার অধিকারী এক রক্তমাংসের মানুষ।

লিখেছেন
Raktim Dey
Raktim Dey
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।