মা, তোমার জেদ আর অধ্যবসায়ই আমার শিক্ষা, তুমিই শিক্ষক...

Teachers' Day 2023 : সকালবেলা দেরি করে ওঠার বকুনিটা খেয়ে, এই লেখাখানা পড়ে শোনাব।

Kaberi Mallick
৩ মিনিট
মা, তোমার জেদ আর অধ্যবসায়ই আমার শিক্ষা, তুমিই শিক্ষক...

ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে সেপ্টেম্বর ঢুকলেই শিক্ষার্থী মহলে শিক্ষক দিবস নিয়ে একটা আবছা ফিসফাস শুরু হয়। বাকি মনুষ্য জাতি ও ব্যাঙ্কের চাকুরিজীবী লোকজন হলিডে না থাকায় ওই দিনটিকে নিতান্তই কীভাবে অমুক স্যার জীবন পাল্টে দিয়েছিলেন, তমুক ম্যামের জন্যই আজ জীবনে এতটা সাফল্য লাভ করেছি-র মতো গালগল্পে টাইমলাইন ভরে ওঠার দিন হিসাবে পালন করে। শিক্ষক দিবসের দোরগোড়ায় বেশিরভাগ সরকারি ইস্কুলগুলোর ক্লাসে ক্লাসে বেশ একটা সাজো-সাজো রব পড়ে। পাঁচ-দশ টাকা চাঁদা তুলে রঙিন রিবন, বেলুন দিয়ে সাজানো ক্লাসরুমে প্রিয় মিস বা স্যার প্রবেশ করা মাত্রই সব্বার আগে পায়ের ধুলো একদম মাথায় তুলে নেওয়ার হুটোপাটি। সেরকম প্রিয় শিক্ষক বা শিক্ষিকা হলে তাঁর জন্য হাতে আঁকা গ্রিটিংস কার্ড বা মাস দুয়েকের পকেটমানি জমিয়ে নিদেনপক্ষে একখানা সেলোর পেন দেওয়া আবশ্যিক।

এসব নির্ঝঞ্ঝাট দিন বহুকাল আগেই পেরিয়ে এসেছি, তবুও প্রতি বছর শিক্ষক দিবস এলেই এক দু'জন পছন্দের শিক্ষক, শিক্ষিকার বাড়িতে আজও অভ্যাসবশতই ঘুরে আসি। তবুও আজ পর্যন্ত কোনও শিক্ষক দিবসেই নিজের দ্বিধা কাটিয়ে প্রিয় শিক্ষিকাকেই একটা প্রণাম করে উঠতে পারিনি। মা খুব ছোটবেলায় বর্ণপরিচয় আর অ্যালফাবেট বইয়ের পাশাপাশি এনে দিয়েছিলেন 'হাঁদা ভোদা' আর 'নন্টে ফন্টে' কমিক্স। আর ওই রঙিন কমিক্সের এক বর্ণও পড়তে অক্ষম আমাকে প্রতিদিন রাতে নিয়ম করে তা পড়ে শোনানোর পাশাপাশি বাংলা শিশু সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় করানোই ছিল ভদ্রমহিলার প্রধান কাজ। বাকি পাঁচটা মধ্যবিত্ত বাঙালি বাড়ির নিয়ম মেনে, বয়স প্রায় পাঁচ হওয়ার আগেই আমাকেও সুবোধ বালিকার মতো নাচের স্কুলে পাঠানো শুরু হয়। ওই বয়সে দাদরা থেকে কাহারবা সব তালই বেতালে লাগত, তার উপর আবার মেঘের কোলে নাকি রোদ হেসেছে! পরের দিন ক্লাসে গিয়ে তালে তাল মিলিয়ে পা ফেলতে ভুল হলেই নাচের গুরুজি মাথায় তবলা ভেঙে দেওয়ার ভয় দেখাতেন। এমতাবস্থায় মেয়ে যাতে নৃত্যে ঊর্বশী বা অন্তত যেন রম্ভা হয়ে ওঠে তাই কোনওদিন তাল, সুর, লয়ের ধারে কাছেও না যাওয়া আমার মা নাচের ক্লাসের দরজার বাইরে প্রতি হপ্তায় দু'ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে শুরু করেন। তারপর বাড়িতে ফিরে দরজার বাইরে থেকেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রায় হুবহু রপ্ত করা নাচ মেয়েকে তালিম দিতে শুরু করেন। আজ বহু বছর পর এসব ভাবলে নিজেই অবাক হই মায়ের জেদ আর অধ্যবসায় দেখে।

নিজের ব্যক্তিগত পছন্দ যে কারও উপরেই জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যায় না এই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটার জন্যও এই ভদ্রমহিলার আরেকবার প্রণাম প্রাপ্য। আজন্ম আমার পড়াশোনার ব্যাপারে রক্তচক্ষু ধারণকারী মা, মেয়ে তাঁর ডাক্তার হবে সেই স্বপ্নে জল ঢেলে উচ্চমাধ্যমিকের পর সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনা করতে চায় জেনে রাগ করেননি; বরং বাকিদের মন্তব্যে কান না দিয়ে মেয়েকে তার পছন্দের পথে হাঁটতে গিয়ে যাতে বিপদে না পড়তে হয় সেদিকে খেয়াল রেখেছেন। আজকাল যে হারে রাজ্য থেকে বাংলা মিডিয়াম স্কুলগুলির অবলুপ্তিকরণ ঘটছে, কিছুদিন পর বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলিকে ডাইনোসরের ডিম বলে ভ্রম হতেই পারে। কিন্তু আমার মা আজীবন তাঁর নিজের ভাষা, ইস্কুলের পড়ার বইয়ের ভাষা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার ভাষাতেই মেয়েকে শিক্ষিত করতে চেয়েছেন। এই ভাষাতে পড়াশোনা করিয়েই আমার মাধ্যমিক পাস মা মেয়েকে হাত ধরে পার করিয়ে দিয়েছেন অন্যতম নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট।

এসব কথা লেখার জন্য বা কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্য এমনিতেই ক্যালেন্ডার দিন নির্ধারণ করে দিয়েছে। তাহলে হঠাৎ মাতৃদিবস ছেড়ে শিক্ষক দিবসে এসব কেন বাপু, বলে অনেকেই ভ্রু কোঁচাকাতেই পারেন। তাদের উদ্দেশ্যে বলি, আমার মাতৃ দেবী আজকাল তাঁর মধ্য চল্লিশে এসেও আমার মতো কুল, জেন জি'কেও রীতিমত কাগজ কলম নিয়ে বসে জীবনের বহু নিত্যনতুন জিনিসপত্র শিখতে বাধ্য করছেন। জীবনের প্রায় মাঝপথে এসেও নিজের সামান্যতম ইচ্ছে থাকলেই যে স্বাবলম্বী হওয়া যায় অথবা নিজের সমস্ত কুণ্ঠাবোধ কাটিয়ে মেয়ের সঙ্গে অনুষ্ঠানে স্টেজে উঠে দিব্যি নেচে ফেলা যায় একথা আমি মা'কে না দেখলে হয়তো এ জম্মে বিশ্বাস করতাম না। আজকাল মাঝে মাঝেই মা ও পাড়ার কাকিমাদের রবীন্দ্র জয়ন্তী বা বিজয়া দশমীর মজলিসের জন্য নাচ শিখিয়ে দিই। মা'কে শেখাতে গিয়ে মাকে বেশ নিজের ছাত্রী বলে মনে হয়, ভুলভাল হলে মাঝে মাঝে বকুনিও দিয়ে ফেলি। তারপর মনে মনে খুব হাসি এই রোল রিভার্সাল দেখে। ঠিক তারপরেই আমার আজীবন ছাপোষা, গৃহিণী মা'য়ের দিকে তাকাই। এক পৃথিবী মনের জোর নিয়ে ভদ্রমহিলা কী নির্দ্বিধায় এই মাঝ বয়সে এসে নিজের পছন্দগুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আজকাল প্রতিদিন এসব ছোট ছোট জিনিস শিখি, নিজের জীবনেও প্রয়োগ করার চেষ্টা করি। তবুও ভুল ত্রুটি থেকেই যায়! যদিও এবছর শিক্ষক দিবসে আর কোনও ভুল করবো না বলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সকালবেলা দেরি করে ওঠার বকুনিটা খেয়ে, এই লেখাখানা পড়ে শোনাব। তারপর না হয় বড়জোর আবার সেই একখান সেলোর পেন দিয়ে টুক করে প্রণামটাও সেরেই ফেলব।

লিখেছেন
Kaberi Mallick
Kaberi Mallick
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।