এক বৃদ্ধের হাতে জীবিত নাড়াজোলের কাঠের পুতুল শিল্প

Bengal Oldest Craft : বিশ্বনাথ বাবুর কথায় পুতুল সংগ্রাহক কুন্তল কুইল্যা তাঁকে নতুন করে এই পুতুল তৈরি করার অনুপ্রেরণা দিয়ে গিয়েছেন। সেই জন্য আজও এই পুতুল শিল্পটিকে তিনি টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছেন।

Suvankar Das
৩ মিনিট
এক বৃদ্ধের হাতে জীবিত নাড়াজোলের কাঠের পুতুল শিল্প

বঙ্গ জীবনের রঙ্গমঞ্চে রাজনৈতিক হানাহানি, কুৎসা, কেচ্ছা, দুর্নীতির খবরের বাইরেও রয়েছে এক অন্য বাংলা, যা সৃজন দিয়ে ঘেরা। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও সেই বাংলা বলে চলে বাঙালির লোকায়ত জীবনের কথা। শিল্পের সহজাত অনুভূতি বাঙালির মধ্যে চির বিদ্যমান। আর তার উপর ভর করেই কখনও পাথরের মধ্যে তো কখনও মাটি ও কাঠ দিয়ে অনিন্দ্য সুন্দর মরমী শিল্পের সৃষ্টি করেছে বাঙালি। তার শৈল্পিক চেতনার বীজ নিহিত রয়েছে সমাজের প্রান্তিক শ্রেণির মধ্যে। পশ্চিম মেদিনীপুরের ঐতিহাসিক জনপদ নাড়াজোলে সেই চেতনার বীজের দেখা মেলে আজও। ৮২ বছর বয়সে দাঁড়িয়েও নিজের অনুপম তুলির ছোঁয়ায় নিথর কাঠের মধ্যে জাগতিক প্রাণের স্পন্দন সৃষ্টি করে চলেছেন শিল্পী বিশ্বনাথ দে। তাঁর নির্মিত কাঠের পুতুল বাংলার লোকসংস্কৃতির ও ঐতিহ্যের অন্যতম স্তম্ভ।

বর্তমান সময় দাঁড়িয়ে কাঠের তৈরি পুতুলের প্রসঙ্গ উঠলে প্রথমেই পূর্ব বর্ধমানের অগ্রদ্বীপের নতুন গ্রামের প্রসঙ্গ উঠে আসে। কিন্তু এ বঙ্গভূমে এমন কয়েকটি জায়গা রয়েছে যেখানে আজও বহু প্রতিকূলতার মধ্যে কাঠের পুতুল তৈরির অস্তিত্ব টিকে রয়েছে। তাদের মধ্যে অন্যতম হলো নাড়াজোল। শৈশবে পিতা পঞ্চানন দে-র থেকে কাঠের পুতুল তৈরির শৈলী শেখেন বিশ্বনাথ দে। বংশপরম্পরায় কাঠের পুতুল তৈরির প্রাথমিক পাঠ বাবার কাছ থেকে শিখলেও কিশোর বিশ্বনাথ দে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন পিয়াশালা এবং ক্ষীরপাইয়ের ঘরানার পুতুল নির্মাণ দেখে। শিল্পীর কথায়, আজ থেকে অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় আগে অবিভক্ত মেদিনীপুরের বিভিন্ন জায়গায় রথের মেলা উপলক্ষ্যে বিপুল পরিমাণে কাঠের পুতুল গড়ে তুলত আঞ্চলিক শিল্পীরা। এমনকি সেই সময় শিল্পীদের থেকে পাইকারি বিক্রেতারা কাঠের পুতুল কিনে নিয়ে মেলায় বসতেন। সেই সময় একেকটা পুতুলের দাম ছিল এক থেকে দেড় টাকার মধ্যে। কৈশোর বয়সে বাবার সঙ্গে নাড়াজোলের মেলায় পুতুল নিয়ে বসতেন বিশ্বনাথ দে। সেই সময় আমড়া কাঠ দিয়ে পুতুল তৈরির রীতি ছিল। বাজার চলতি গুঁড়ো রঙকে তেঁতুল বীজের তৈরি আঠায় মিশিয়ে পুতুল দেহ রাঙিয়ে তোলা হতো। বর্তমানে যদিও পুতুল নির্মাণে আকাশমণি কাঠ ব্যবহার করা হয়। পুতুলের শরীর রঙে বাঙ্ময় করার ক্ষেত্রে আধুনিক ফেব্রিক কালার ব্যবহার করা হয়।

বিশ্বনাথ দে-র তৈরি কাঠের পুতুলের উচ্চতা ৯ ইঞ্চি। পুতুলটি আদতে বঙ্গবধূর প্রতীক। উন্নত ললাট। টানা চোখ। সিঁথিতে সিঁদুর। নাকে নথ। গাঢ় হলুদ মুখমণ্ডল। কপালে গোলাকার লাল টিকা। আর সেই টিকাকে ঘিরে ছোট ছোট সাদা রঙের গোলাকার টিকা। আলাদা করে পুতুলের হাত বা পা নেই। পুতুলটির কপালের দিকের অংশটি ত্রিকোণাকৃতি। পুতুলের গোটা শরীর নিজের মনের ভাবনায় অলংকরণ করে গিয়েছেন শিল্পী। এখানে শিল্পীর অনুপম ও ধৈর্যশীল তুলির স্পর্শ আমরা অনুভব করতে পারি। পুতুলের অলংকরণের মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে শিল্পীর আলপনা শৈলী।

পুতুলটি গোলাকার নয়। অর্ধবৃত্তাকার। রঙ করার আগে কাঠটিকে খোদাই করে পুতুলের প্রাথমিক গঠন তৈরি করে নেন শিল্পী। তারপর শুরু হয় রঙের খেলা। পুতুলটির শরীরে ঘাগরা শৈলী তুলে ধরার জন্য কাঠের শরীরে বুকের দিকে বাটালি দিয়ে খাজ তৈরি করেন। আবার ঘাগরা শৈলীর প্রয়োজন না পড়লে খাঁজ দেন না। শিল্পীর কথায়, আজকের সময় দাঁড়িয়ে মেলায় এই পুতুলের চাহিদা একেবারেই নেই। তবুও কলকাতা থেকে আগত শিল্প রসিকরা নাড়াজোল ঘুরতে এলে এই পুতুলের খোঁজে তাঁর কাছে আসেন। রথযাত্রা উপলক্ষে এ বছর কাঠের ৯ ইঞ্চি উচ্চতার গোলাকার জগন্নাথদেব, বলভদ্র ও সুভদ্রা নির্মাণ করেছেন বিশ্বনাথ দে। জগন্নাথদেবের মস্তকে অনিন্দ্য সুন্দর মুকুট শিল্পীর মুন্সিয়ানার পরিচয় বহন করে চলেছে। বিশ্বনাথ বাবুর কথায় পুতুল সংগ্রাহক কুন্তল কুইল্যা তাঁকে নতুন করে এই পুতুল তৈরি করার অনুপ্রেরণা দিয়ে গিয়েছেন। সেই জন্য আজও এই পুতুল শিল্পটিকে তিনি টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু শুধু এই কাঠের পুতুল তৈরি করে সংসার চলে না, তাই এর পাশাপাশি মাটির প্রতিমা নির্মাণ করে থাকেন তিনি। উল্লেখ করা যেতে পারে গোটা নাড়াজোলে একমাত্র তিনিই এই কাঠের পুতুল তৈরির শিল্পকে ধরে রেখেছেন। নাড়াজোল পোড়ামাটির মন্দিরের জন্য বিখ্যাত। সেখানে দাঁড়িয়ে নাড়াজোলের লুপ্তপ্রায় শিল্পধারাকে নিজের হাতে টিকিয়ে রেখেছেন শিল্পী বিশ্বনাথ দে।

লিখেছেন
Suvankar Das
Suvankar Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

দেশভাগের ক্ষত বুকে নিয়েই গড়ে উঠেছিল ঢাকা কালীবাড়ি, দক্ষিণ কলকাতার মন্দিরের ইতিহাস

Dhaka Kalibari: দেশভাগের পর বরিশাল থেকে কলকাতায় এসে নিজের শিকড়ের স্মৃতি ধরে রাখতে মন্দির গড়ে তুলেছিলেন ননীগোপাল চক্রবর্তী। দক্ষিণ কলকাতার প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডের এই মন্দিরই আজ পরিচিত ঢাকা কালীবাড়ি নামে। মাটির প্রতিমা থেকে কষ্টিপাথরের বিগ্রহ, কালীপুজোর বিশেষ ভোগ—মন্দিরটির ইতিহাসে মিশে রয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস ও দেশভাগের স্মৃতি। কী ভাবে?

বইয়ের জন্য হাঁটতে হয় কেন?

Walk for Books 2026: প্রায় পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে বইমেলাকে মনে করে বইয়ের জন্য একবার হেঁটেছিল বাঙালি। তারপর দীর্ঘ বিরতি পেরিয়ে আবার এই ৩১ অক্টোবর, ২০২৬-এ দেখা গেল সেই ছবি। হুড়দুড় করে ছেলেবুড়োমেয়েমদ্দ সব রাস্তায় নেমে এল—এ কী আজব খেলা রে ভাই!

ঋত্বিক: ফিরে দেখা

Ritwik Ghatak: আমরা যখন ছোট ছিলাম, মানে ষাটের দশকের সেই শেষ দিকে বা সত্তরের দশকে, তিনি কত না অদ্ভুতভাবে আমাদের প্রভাবিত করতেন। যেমন একদিন আমাদের রবীন্দ্রসদনের সামনে দেখতে পেয়ে তিনি হঠাৎ বললেন, আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দেবে?

কলকাতায় চালু হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস

West Bengal School of Magic: মুখ্যমন্ত্রী ‘পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক, ইল্যুশন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস’ স্থাপনের প্রস্তাবে অনুমোদন করেছেন। পুজোর পর উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা বৈঠক করবেন।

বিভূতিভূষণের উপন্যাস কেবল দৃশ্যের নয়, শব্দেরও এক জগৎ তৈরি করে

Bibhutibhushan Bandyopadhyay: বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণকে আমরা সাধারণত প্রকৃতির কবি বলেই চিনি। তাঁর বর্ণনায় নদী, মাঠ, বন, আকাশ, ঋতু আর গ্রামীণ জীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে যদি একটু অন্য দিক থেকে দেখা যায়? যদি আমরা শুধু দৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে শোনার চেষ্টা করি?

স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও আমেরিকার অভিবাসন: আমেরিকার ইতিহাসে আশ্রয়প্রার্থীদের জায়গা কোথায়?

Statue of Liberty: স্ট্যাচু অব লিবার্টির ধারণার সূত্রপাত ১৮৬৫ সালে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এদুয়ার্দ দ্য লাবুলে আমেরিকার স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা দেন।

এশিয়ার সেরা মিউজিয়ামের স্বীকৃতি পাটনার, কীভাবে বিশ্বসেরাদের টেক্কা দিল বিহার মিউজিয়াম?

Patna Outranks paris: বিশ্বের সেরা ১০০টি মিউজিয়ামের তালিকায় নবম স্থান অর্জন করে কীভাবে ল্যুভর ও মেটের মতো বিখ্যাত জাদুঘরকে পিছনে ফেলে এশিয়ার সেরা মিউজিয়াম হয়ে উঠল পাটনার বিহার মিউজিয়াম?

দেশভাগের ইতিহাসকে নারীর চোখে দেখা: অংশুমান করের ‘হিরণবালা’

Hiranbala Novel Review: বাংলা উদ্বাস্তু-আখ্যানের বড় অংশে দেশভাগের অভিজ্ঞতা এসেছে পুরুষের জীবন, তার মনস্তত্ত্ব ও তার গতিবিধির ভিতর দিয়ে। ‘হিরণবালা’ প্রথমেই এই কাঠামো ভেঙে দেয়। উদ্বাস্তু পরিবারের গল্পে একজন নারীকে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ ভূমিকায় না দেখিয়ে, উদ্বাস্তু হওয়ার অভিজ্ঞতাটিকে প্রত্যক্ষভাবে বুনে দেয় নারীটির জীবন। দেশভাগকে প্রায় অদৃশ্য করে হিরণকে উদ্বাস্তু করা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে, বিয়ের মধ্য দিয়ে।