নারীবাদী শুনলেই বাঙালিদের মতোই আঁতকে ওঠে ফরাসিরা?

Women Rights in France: ফ্রান্সের মতো দেশ, প্যারিসের মতো শহর, যেখানে নারীবাদ তত্ত্বের অর্ধেক বা তারও বেশি গড়ে উঠেছে, সেখানে মানুষ পথে নামছে নারীর অধিকারের দাবিতে। আজও।

৮ মার্চ সংগ্রামের দিন, উৎসবের নয়। ৮ মার্চ নারী-দিবস নয়, মা-দিবসও নয়। ৮ মার্চ নারীর অধিকার আদায়ের আন্তর্জাতিক সংগ্রামের দিন। বিশ্বের সব নারীর প্রতি সংহতির দিন এবং লিঙ্গবৈষম্যমূলক ও পিতৃতান্ত্রিক কট্টরপন্থী চিন্তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের দিন।

প্রতিটি পেশায় নারীরা বৈষম্যের শিকার। গার্হস্থ্য ও পারিবারিক কাজের দায়িত্ব এখনও মূলত নারীদের কাঁধে এবং লিঙ্গবৈষম্যমূলক সহিংসতা আজও অব্যাহত। Nous Toutes Lille-এর নেতা এমি বা বলেছেন,

"এখন থেকে ৮ মার্চ হবে #একদিন_আমরা_নেই দিবস। একটি ধর্মঘটের দিন, যেদিন আমরা দেখাচ্ছি যে, নারীরা যদি একদিন থেমে যায়, তবে সবকিছু থেমে যাবে।"

কোন দেশের পত্রিকায় বেরিয়েছে এই খবর? কোন ভাষায়?

২০২৫ সালে এই খবর যে কোনও দেশে, যে কোনও ভাষার দৈনিকে সংবাদপত্রে দেখা যেতে পারে। আজও কোনও দেশ, কোনও ভাষার মানুষ একসঙ্গে চিৎকার করে বলতে পারবে না যে, আমাদের এই দাবিগুলো তোলার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। আমরা সব পেয়েছির দেশে বাস করি! দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই কথা আজও কেউ বলতে পারবে না।

৮ মার্চ, ২০২৫ প্যারিসে নারীর অধিকার রক্ষায় ৪৮,০০০ মানুষ বিক্ষোভ করেছে বলে পুলিশের হিসাব। সংগঠকদের মতে, এই সংখ্যা ছিল ১,২০,০০০। শোনা গেছে, ফ্রান্সজুড়ে ২,৫০,০০০ মানুষ ১৫০টি শহরে অংশ নেয়। এর মধ্যে ৮৫,০০০ মানুষ প্যারিসের বাইরে বিভিন্ন অঞ্চলের বাসিন্দা। লিওনে ৯,৩০০, তুলুজে ৭,৫০০, মার্সেইতে ৬,০০০ মানুষ, রেনে ৫,০০০ মানুষ পথে পথে হেঁটেছেন এই দিন।

আরও পড়ুন- যুদ্ধে নারীর শরীরই সেনার নিশানা

এ বছর বিক্ষোভের রাজনৈতিক রঙ ছিল প্রবল, অনেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম উল্লেখ করেছেন। ৪৯ বছর বয়সি সাবিন তাঁর ৭ বছরের ছেলের সঙ্গে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। সাবিন বলেছেন, "এটি একটি দীর্ঘ লড়াই। ট্রাম্পের মতো পুরুষ আধিপত্যবাদীরা যতই চিৎকার করুক, তারা আমাদের চেয়ে শক্তিশালী নয়।" সদ্য অষ্টাদশী লুসি জীবনে প্রথমবার বিক্ষোভে অংশ নিয়ে বলেছেন, "আমি গর্ভপাতের অধিকারের পক্ষে লড়ছি এবং চরম দক্ষিণপন্থীদের উত্থান নিয়ে শঙ্কিত, কারণ এটি ভয়ংকর হয়ে উঠছে।"

বিক্ষোভের মূল সুর, অন্য বছরগুলোর মতোই, বাঁধা ছিল সমান বেতনের দাবি, নারী হত্যা (féminicides) ও লিঙ্গবৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং 'মাসকুলিনিস্ট' মতাদর্শের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা বলাতে।

আরও পড়ুন- সর্ষের ভিতর ভূত না, সর্ষের মধ্যে সুখ পেয়েছে ভোজনবিলাসী বাঙালি ও ফরাসি

নারী-পুরুষের মজুরি বৈষম্য সব দেশের মতো ফ্রান্সেও এখনও প্রধান সমস্যা। ইনসি (INSEE)-এর তথ্য অনুসারে, ২০২৩ সালে বেসরকারি খাতে নারীরা পুরুষদের তুলনায় গড়ে ২২.২% কম বেতন পেয়েছে। একই সময় কাজ করলেও, নারীদের গড় বেতন ১৪.২% কম।

জাতীয় ট্রেড ইউনিয়ন সংস্থা French Democratic Confederation of Labour (CFDT)-এর প্রধান মারিলিজ লেওঁ এক সাক্ষাৎকারে বলেন, "আমরা খুব ধীরগতিতে এগোচ্ছি, যা এখন সহ্য করা কঠিন হয়ে উঠেছে।"

নারী সহিংসতার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ আরও জোরদার করার দাবি ওঠে। বলা হয়, এখনও অনেক কাজ বাকি। ২০২৩ সালে ফ্রান্স সরকার নারী সহিংসতার বিরুদ্ধে পাঁচ বছরের একটি পরিকল্পনা চালু করে। এর আওতায় টেলিফোন হেল্পলাইনের জন্য অতিরিক্ত তহবিল বরাদ্দ করা হয়। ২০২৪ সালে এই হেল্পলাইনে ১,০০,০০০-এর বেশি ফোন গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়াও নারী সহিংসতা প্রতিরোধে বিশেষ সেফ হাউস বৃদ্ধি করা হয়েছে। "Téléphone grave danger" ও "anti-approchement bracelets" (নিরাপত্তা আলার্ম ও ট্র্যাকার ডিভাইস) চালু রাখা হয়েছে। কিন্তু সংগঠনগুলোর মতে, এই পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। UNEF-এর সহসভাপতি সালোমে ওকার্দ্ জানিয়েছেন, "নারী সহিংসতার খবরগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা নয়, এটি বৃহত্তর পিতৃতান্ত্রিক দমনমূলক ব্যবস্থার প্রতিফলন।"

স্ট্রাসবুর্গ ও প্যারিসের বিক্ষোভে নারীবাদীদের স্লোগান ছিল,
"নারী হয়ে জন্মাই না, কিন্তু নারীর কারণে হত্যা করা হয়।"
"নারীবাদ কখনও কাউকে হত্যা করেনি, কিন্তু পুরুষতন্ত্র প্রতিদিন হত্যা করছে।"

আরও পড়ুন- কোথায় সেই সংগীতমাধুর্যে ভরপুর লব্জ! দেশজুড়ে ‘অশুদ্ধ’ ভাষাই বলে ফরাসিরা?

তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী ৪৮ বছর বয়সি ক্রিস্টেল বলেন, "ফ্রান্স ও সারা বিশ্বে নারীদের অধিকারের উপর হুমকি রয়েছে, তাই আমি বিক্ষোভে এসেছি।"

সারা দেশ জুড়ে এই দিন, গোটা সপ্তাহ বা মাসব্যাপী চলেছে একাধিক বিষয়ভিত্তিক আলোচনা— লিঙ্গভিত্তিক ও যৌন সহিংসতা রোধ, কর্মক্ষেত্রে নারীদের অনিশ্চিত অবস্থান, বেতন বৈষম্য (বিশেষত নারীরা ন্যূনতম মজুরির চাকরিতে অতিরিক্তভাবে নিয়োজিত), অধিকার হরণের ঝুঁকি (বিশেষ করে গর্ভপাতের অধিকার), গর্ভপাত সংক্রান্ত ভেইল আইনের ৫০ বছর পূর্তি, রাস্তাঘাটে হয়রানির বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা, চরমপন্থী আদর্শের উত্থান নিয়ে আলোচনা চলেছে পাড়ায় পাড়ায়। প্যারিসের প্লাস দ্য লা রিপাবলিক থেকে বেরনো মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা দাবি জানিয়েছেন প্রকৃত সমতার; নিন্দা করেছেন চলমান বৈষম্যের বিরুদ্ধে।
সমগ্র মার্চ মাস জুড়ে, Le Pavillon des Canaux নারীদের সংগ্রাম ও অর্জনকে উদযাপন করবে এবং চারটি মূল থিমের উপর ভিত্তি করে আলোচনা, প্রদর্শনী ও পারফরম্যান্স অনুষ্ঠিত হবে— "ব্যক্তিগতই রাজনৈতিক", "সংগ্রামের সংগঠন", "আমাদের ঐতিহ্য নতুন করে লেখা", "সমষ্টিগত শক্তিকে স্বাগত জানানো"।

Musée National d’Art Moderne – Centre Pompidou নারী দিবস উপলক্ষ্যে এক ঐতিহাসিক প্রদর্শনী করছে। সুজান ভালাদঁ, যিনি শুরুতে মডেল ছিলেন পরে নিজেই চিত্রশিল্পী হিসেবে শিল্প-ইতিহাসের এক অনন্য চরিত্র হয়ে ওঠেন, তাঁর সমস্ত কাজ দেখা যাচ্ছে পম্পিদু সেন্টারে। কীভাবে পুরুষশাসিত শিল্পজগতে নিজের স্থান করে নিয়েছিলেন সুজান এবং পোস্ট-ইমপ্রেশনিস্টিক শৈলীতে অনন্য দাগ রেখেছিলেন, তা এই প্রদর্শনীতে তুলে ধরা হয়েছে। মেল-গেজ থেকে বেরিয়ে আঁকা মেয়েদের নগ্ন প্রতিকৃতি তাঁর কাজের বিষয়। একজন বিস্মৃত নারীবাদী শিল্পীর উত্তরাধিকার পুনরাবিষ্কার করার একটি দুর্দান্ত সুযোগ এই প্রদর্শনী!

এ বছর ৮ মার্চ একটা ছোট লেখা লিখেছিলাম ফেসবুকে। নির্দিষ্ট কোনও দেশের মেয়েদের কথা সেখানে ছিল না। নারীদের ক্যাপিটালিস্টিক চরিত্রায়ণ এবং সরলীকরণ নিয়ে লিখেছিলাম। তাতে মন্তব্য আসে,  "তাহলে কি কোথাও কিছুই বদলাল না?"

আমার জন্ম এবং বড় হয়ে ওঠা তৃতীয় বিশ্বের শহরে, কর্মসূত্রে থাকি প্রথম বিশ্বের শহরে। ধরে নেওয়া হয়, সব কিছু খারাপ থেকে সব কিছু স্বপ্নময় পরিস্থিতিতে উত্তরণ হয়েছে এই যাত্রা। তাই কোনও কিছু নিয়ে হতাশার অবকাশ থাকার কথাই নয় আমার। জনমানসে একটা ধারণা আছে, "আমাদের এখানে এসবের প্রয়োজন আছে, ওদের ওখানে এখনও কিছু বদলাল না?"

'আমাদের' আর 'ওদের' থেকে 'নিজেদের' বাদ দিয়ে দেখলে বাস্তবের থেকে মুখ লুকোনো এক উটপাখির জীবনযাপন করা হয়। সেখান থেকেই এই ধরনের প্রশ্ন উঠে আসে এবং বদ্ধমূল ধারণা হয়— বিদেশ মানেই চুরি-ছিনতাই নেই, ভিখিরি নেই, দুর্দশা নেই, নারী নির্যাতন নেই, ওসব কেবল দেশজ সামগ্রী!

আরও পড়ুন- বাজার করা একটা আর্ট! কাঁচা সবজির বাজারে যেভাবে মিলে যায় বঙ্গ-ফরাসি মন

ফ্রান্সের শহরজুড়ে মার্চকালীন অনুষ্ঠানের তালিকা দিয়ে এত কথা লেখার একটাই কারণ— ফ্রান্সের মতো দেশ, প্যারিসের মতো শহর, যেখানে নারীবাদ তত্ত্বের অর্ধেক বা তারও বেশি গড়ে উঠেছে, সেখানে মানুষ পথে নামছে নারীর অধিকারের দাবিতে। আজও। এই কথা বারবার বলা প্রয়োজন। কারণ মেয়েদের অধিকারের কোনও প্রথম-তৃতীয় বিশ্ব হয় না।

মার্গারেট অ্যাটউডের লেখায় যে ডিস্টোপিয়ান সমাজের কথা আমরা পড়ি, যেখানে মেয়েদের শরীরকে একটি প্রজনন যন্ত্র হিসেবে দেখা হয়, তার বাইরে মেয়েদের অস্তিত্বের কোনও স্বীকৃতি নেই, যে উপন্যাস নিয়ে বিখ্যাত টিভি সিরিজ হয়েছে Handmaid’s Tale, সেই সব পড়ে, দেখে আমরা শিউরে উঠি। ভাবি, এমন যেন সত্যি না হয় বাবা! অথচ, আড়ালে আবডালে সেটাই বাস্তব। আপামর সমাজের সত্যি। সেদিকে তাকানোর সময় হয়েছে।

এই কথাগুলো মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যই রাস্তায় নেমেছে প্যারিসবাসী, ফ্রান্সের অন্যান্য শহরের মানুষ। মিছিল-মিটিং হয়েছে নিউ ইয়র্কের রাস্তায়, ইস্তানবুলে, স্পেনের পথেঘাটে, এমনকী যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনেও।

এই কথাগুলো মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য এই দেশে দেখেছি লাগাতার সভা-সমিতি চলে। কেবল ৮ মার্চের পুণ্যলগ্নে নয়, সারাবছর ধরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নারী ও কুইয়ার সম্প্রদায়ের মানুষদের কথা বলতে গবেষক, সমাজকর্মী, বিশেষজ্ঞরা আসেন। সেসব আলোচনায় যে কেউ যেতে পারে, বিনামূল্যে প্রবেশ এবং অবারিত দ্বার। যে কেউ প্রশ্ন করতে পারে, যুক্তিপূর্ণ সংলাপের জায়গা তৈরি হয়। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্রছাত্রীরা, নানা বয়সের নানা পেশার মানুষ আসেন এসব সভায়। সভার শেষে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলার জায়গা করে দেওয়া হয়।

সবচেয়ে বড় কথা, নারীবাদী সভায় যাচ্ছি শুনলে কেউ নাক সিঁটকে চোখ পাকায় না। বরং বলে, আমিও যাব তোমার সঙ্গে। এই পথটা অতিক্রম করা প্রতিবাদের অংশ। অনেক বড় একটা অংশ। এখানে 'ওরা' এটা পেরেছে। 'আমরা' পারছি কি?

More Articles