ইজরায়েলি হামলায় নিহত ইরানের শীর্ষ জেনারেলরা! প্রত্যাঘাত অবশ্যম্ভাবী?

Israeli attack : ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা সূত্র জানিয়েছে, শুধু পারমাণবিক স্থাপনাই নয়, বরং ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যাটারি, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, অস্ত্রাগার, পরীক্ষাগার এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বাসভবনও লক্ষ্যবস্তু ছিল।

Asish Gupta
৩ মিনিট
ইজরায়েলি হামলায় নিহত ইরানের শীর্ষ জেনারেলরা! প্রত্যাঘাত অবশ্যম্ভাবী?

শুক্রবার সকালের আলো ফোটার আগেই ইজরায়েল এক নজিরবিহীন সামরিক অভিযানে ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাগুলিতে ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছে। এই অভিযানে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কর্পস (IRGC)-এর প্রধান জেনারেল হোসেইন সালামি-সহ অন্তত তিনজন শীর্ষ জেনারেল নিহত হয়েছেন। তেহরানের নিরাপত্তা এবং সামরিক কাঠামোর হৃদয়ে এই সরাসরি হামলা ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী কূটনৈতিক ও সামরিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে এবং একটি পূর্ণমাত্রার আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা প্রবল হয়ে উঠেছে। ইজরায়েল এই হামলাকে একটি 'প্রি-এম্পটিভ স্ট্রাইক' হিসেবে বর্ণনা করেছে, যার মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের সম্ভাব্য পারমাণবিক বোমা প্রস্তুতিকে রুখে দেওয়া।

ইজরায়েলি প্রতিরক্ষা সূত্র জানিয়েছে, শুধু পারমাণবিক স্থাপনাই নয়, বরং ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যাটারি, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, অস্ত্রাগার, পরীক্ষাগার এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বাসভবনও লক্ষ্যবস্তু ছিল। এই অভিযানের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রেসিডেন্ট খামেনির পাঠ করা এক বিবৃতিতে বলা হয়, 'ইসরায়েল নিজেকে এক বেদনাদায়ক ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিয়েছে।' খামেনি স্পষ্ট ভাষায় প্রতিশোধের ইঙ্গিত দেন, যদিও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ করা এড়িয়ে যান। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করেছে, জানিয়েছে , 'এই হামলা ওয়াশিংটনের অনুমোদন ছাড়া সম্ভব হতো না।' নিহতদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মেজর জেনারেল মোহাম্মদ বাঘেরি, ইরানের সামরিক বাহিনীর চিফ অফ স্টাফ। IRGC এক বিবৃতিতে সালামিকে 'জাতীয় প্রতিরক্ষার অগ্রভাগে থাকা এক মহান যোদ্ধা' বলে বর্ণনা করেছে। এই হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে যুক্ত কয়েকজন সিনিয়র বিজ্ঞানীও নিহত হয়েছেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছে খামেনির বিবৃতি। হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক মানচিত্রে একরকম কম্পন অনুভূত হয়েছে।

ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এক বিবৃতিতে বলেন, 'আমাদের অভিযান সফল হয়েছে। যদি ইরান প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে আমাদের জনগণকে প্রস্তুত থাকতে হবে।' নেতানিয়াহুর এই বক্তব্যের পর ইজরায়েলের জনজীবনে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। সাধারণত সাব্বাথের প্রাক্কালে সরব বাজার ও রাস্তা ছিল ব্যতিক্রমীভাবে ফাঁকা। খাদ্যসামগ্রী ও জ্বালানির দোকানগুলিতে ভোরের আগে থেকেই ভিড় দেখা গেছে। অন্যদিকে জর্ডান, ইজরায়েল ও ইরানের মধ্যবর্তী রাষ্ট্র হিসেবে, আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে। দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে তারা এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে।

গত বছর ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র জর্ডানের আকাশ দিয়ে ইজরায়েল অভিমুখে যাওয়ায় আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। এই হামলার প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বজুড়ে তাৎক্ষণিক কাঁপন অনুভূত হয়েছে অর্থনৈতিক মঞ্চেও। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এক ঘণ্টার মধ্যেই ৯ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৭৮ ডলারে পৌঁছেছে। বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কা, এই বৃদ্ধির ধারা বজায় থাকলে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি তীব্র হবে, বিশেষত তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলিতে। এই হামলা এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ওমানের মাধ্যমে পারমাণবিক আলোচনার সূক্ষ্ম প্রচেষ্টা চলছিল।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, ফক্স নিউজকে জানিয়েছেন ইজরায়েলের হামলার পরিকল্পনার বিষয়ে তিনি আগে থেকেই জানতেন, হামলার পর তাৎক্ষণিকভাবে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতিকে কূটনৈতিক আলোচনার নতুন সুযোগ বলে উল্লেখ করেন। তবে, ওমান এই হামলাকে 'বিপজ্জনক ও বেপরোয়া' বলে সমালোচনা করেছে এবং তা কূটনৈতিক পথ রুদ্ধ করে দিতে পারে বলে সতর্ক করেছে। ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাতে জানিয়েছেন, তিনি রবিবার ওমানে ইরানি প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনায় বসার পরিকল্পনা করছেন। কিন্তু হামলার ফলে এই পরিকল্পনা স্থগিত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই হামলা ইজরায়েল ও ইরানের দীর্ঘদিনের ছায়াযুদ্ধকে এক নতুন, অনেক বেশি প্রকাশ্য ও বিস্ফোরক পর্যায়ে নিয়ে গেছে। অতীতে ইজরায়েল একাধিকবার গোপন অপারেশনের মাধ্যমে ইরানি বিজ্ঞানী ও কর্মকর্তাদের হত্যা করলেও, এই ধরনের সরাসরি ও বিস্তৃত আক্রমণ নজিরবিহীন। এটি শুধু ইরানের সামরিক কাঠামোর উপর সরাসরি আঘাত নয়, বরং এক ধরনের রাজনৈতিক বার্তা— যা স্পষ্টভাবে বলছে, ইজরায়েল আর অপেক্ষা করবে না। পরিস্থিতি কোনদিকে মোড় নেবে, তা এখন নির্ভর করছে ইরানের পরবর্তী পদক্ষেপের উপর। বিশ্ব নেতৃবৃন্দ এই সংকট নিরসনে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন, কিন্তু যুদ্ধ যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তবে এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, গোটা বিশ্বকেই নাড়া দিতে পারে— বিশেষত জ্বালানি, খাদ্য, আন্তর্জাতিক পরিবহন এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের দিক থেকে।

লিখেছেন
Asish Gupta
Asish Gupta
2 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই আপত্তি, ১০ মাসে দুই কমিশনারের ১৪ বার প্রশ্ন

Election Commission SIR: এসআইআর ঘিরে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই তৈরি হয়েছে মতপার্থক্য। গত ১০ মাসে দুই নির্বাচন কমিশনার ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছেন বলে দাবি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। ফর্ম ৬ বদল, ভোটার তথ্যভান্ডারের কেন্দ্রীয়করণ, পশ্চিমবঙ্গের আপিল এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিয়েও উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও আইন মেনে চলার বিষয়টি ফের আলোচনায়।

হুথিরা যেভাবে স্থানীয় বিদ্রোহী থেকে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিতে পরিণত হলো

Houthi Expansion in Yemen: ইয়েমেনে ফের কেন যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে? হুথিরা কীভাবে স্থানীয় জায়দি আন্দোলন থেকে শক্তিশালী সামরিক-রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হল? ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কতটা গভীর? মোখা ও হানিশ দ্বীপপুঞ্জ দখলের পর কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বাব আল-মান্দাব? এই সংঘাতের প্রভাব কি শেষ পর্যন্ত বিশ্ব বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহণ ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে পড়বে?