দেওয়ালে খোদাই রহস্যময় লিপি, আজও এই গুহার ভেতর লুকিয়ে গুপ্তধনের সংকেত

সোন ভান্ডারের গুহা থেকে আজ অবধি কোনও সোনার ভান্ডার খুঁজে পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা শঙ্খলিপির পাঠোদ্ধার করতে পারেননি।

Raktim Dey
৩ মিনিট
দেওয়ালে খোদাই রহস্যময় লিপি, আজও এই গুহার ভেতর লুকিয়ে গুপ্তধনের সংকেত

গুপ্তধনের গল্প মানুষকে যুগ যুগ ধরে আকৃষ্ট করে । সেই আকর্ষণকে উপেক্ষা না করতে পেরে বহু মানুষ পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ছুটে গিয়েছেন। আজ অবধি যত গুপ্তধন খুঁজে পাওয়া গিয়েছে, তার থেকে অনেক বেশি হয়তো এখনও পাওয়া যায়নি। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন গুপ্তধনের গল্প শোনা যায়। সেইসব জনশ্রুতির মধ্যে অন্যতম সোন ভান্ডার বা স্বর্ণভান্ডার গুহার গুপ্তধনের গল্প।

বিহারের রাজগিরের কাছে অবস্থিত কৃত্রিমভাবে তৈরি দুটো গুহার নাম সোন ভান্ডার অথবা স্বর্ণভান্ডার গুহা। এই দুটো গুহার ঐতিহাসিক মুল্য অনেক। যদিও এই গুহাদুটো তৈরির সময়কাল নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ব্রিটিশ শাসনামলে আর্কিওলজিক‍্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া-র সদস্য কানিংহ্যাম এই গুহার গবেষণা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, এই গুহাদু'টি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষ ব্যবহার করতেন এবং সম্ভবত এই গুহাদু'টি তৈরির সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় থেকে প্রথম শতকের মধ্যে। যদিও এই মতের বিপরীতে একটি মত রয়েছে। সেই মত অনুযায়ী, এই গুহা তৈরির সময়কাল খ্রিস্টাব্দ শতক থেকে পঞ্চম শতকের মধ্যে। গুহার আকার, আয়তন এবং ধরন দেখে বিশেষজ্ঞরা এই ব্যাপারে একমত যে, গুহাদু'টি কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়েছিল। গুহার মধ্যে বিভিন্ন সময়ের ব্যবহৃত ভাষা খোদাই করা রয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য গুপ্তযুগে ব্যবহৃত ভাষা। সোনভান্ডারের গুহাগুলি ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এই গুহাদু'টি ঘিরেই রয়েছে এক বিপুল গুপ্তধনের গল্প।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে কীসের চোরাকুঠুরি? বাংলার গুপ্তধন নিয়ে রয়েছে যে যে জল্পনা

ব্রিটিশ শাসনের শুরুর দিকে এইরকম কুঠুরি সম্পদ লুকিয়ে রাখার জন্য অথবা মানুষকে বন্দি করার জন্য ব্যবহৃত হতো। ২০১২ সালের পর এই কুঠুরি নিয়ে আর কোনও তথ্য প্রকাশিত হয়নি।

সোন ভান্ডার গুহার গুপ্তধনের গল্পের সূত্র যে দুটো জিনিসে লুকিয়ে আছে, তার মধ্যে একটি হলো গুহা দুটোর নাম। সোন ভান্ডার শব্দের অর্থ সোনার ভান্ডার হওয়া সত্ত্বেও, এই গুহাদু'টি থেকে বিভিন্ন মূল্যবান জিনিস উদ্ধার হলেও, সোনার ভান্ডার বলতে সাধারণ মানুষ যা বুঝবে, সেইরকম কিছুই উদ্ধার হয়নি। বিপুল সোনার অনুপস্থিতিতে পাহাড়ের পাদদেশে তৈরি করা এই গুহাগুলির নাম সোন ভান্ডার হওয়ার কারণ নিয়ে আজও মানুষ ধন্ধে রয়েছে।

এই গুহার গুপ্তধনের গল্পের দ্বিতীয় সূত্র লুকিয়ে আছে গুহার ভিতরেই। গুহার ভেতরে একটি দেওয়ালে খুব আবছা একটি দরজার আকৃতি দেখতে পাওয়া যায়। এই আকৃতির পাশেই শঙ্খলিপিতে কিছু অক্ষর খোদাই করা রয়েছে। ব্রাহ্মী লিপি থেকে সৃষ্টি হওয়া এক বিশেষ ধরনের লিপি হলো শঙ্খ লিপি। অক্ষরের আকার শঙ্খের মতো হওয়ার কারণেই বিশেষজ্ঞরা এই লিপির নাম দিয়েছেন শঙ্খ লিপি। আবিষ্কার হওয়ার পর থেকে বর্তমানে সময় অবধি বহু প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কেউ শঙ্খ লিপির পাঠোদ্ধার করতে পারেন নি। এই ধরনের লিপি ভারত ছাড়াও জাভা এবং মায়ানমারে পাওয়া গিয়েছে। সোন ভান্ডারের গুহার দেওয়ালে পাওয়া এই লিপি যে শঙ্খলিপি, সেই ব্যাপারে সংশয় না থাকলেও সেখান খোদাই করা লেখা কেউ পড়তে পারেননি। এই শঙ্খ লিপিতে লুকিয়ে আছে গুপ্তধনের গল্পের দ্বিতীয় সূত্র। কথিত আছে যে, সোন ভান্ডারের গুহার দেওয়ালে দেখতে পাওয়া আবছা দরজার অবয়ব আসলে একটি গুপ্ত দরজা। এই গুপ্ত দরজার পিছনে লুকিয়ে রয়েছে সেই বিপুল পরিমাণ সোনা এবং অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী। দরজার পাশে দেওয়ালে শঙ্খলিপিতে লেখা শব্দ সঠিকভাবে উচ্চারণ করলেই দরজা খুলে যাবে এবং মানুষ খুঁজে পাবে সেই গুপ্তধন, যার কারণে এই গুহাদু'টির নাম হয়েছে সোন ভান্ডার। জনশ্রুতি রয়েছে যে, সোন ভান্ডারের গুপ্তধন আসলে মৌর্য রাজা বিম্বিসারের রাজকোষের সম্পত্তির কিছু অংশ যা তিনি দান করেছিলেন।

সোন ভান্ডারের গুহার ভেতরে এই দরজার আকৃতির ওপরে রয়েছে একটি কালো দাগ। ব্রিটিশ শাসনামলে এই গুহার গুপ্তধন উদ্ধার করার চেষ্টা হয়েছিল। ব্রিটিশরা এই গুপ্তধনের কথা জানতে পেরে প্রথমে শঙ্খলিপির পাঠোদ্ধার করার চেষ্টা করেছিল। লিপির পাঠোদ্ধারে অসমর্থ হয়ে তারা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এই দরজার আকৃতি সম্পন্ন দেওয়াল ধ্বংস করার চেষ্টা করেছিল। এই কালো দাগ সম্ভবত সেই প্রচেষ্টার সময় কামানের গোলা থেকে তৈরি হওয়া দাগ।

সোন ভান্ডারের গুহা থেকে আজ অবধি কোনও সোনার ভান্ডার খুঁজে পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা শঙ্খলিপির পাঠোদ্ধার করতে পারেননি। যদি সোন ভান্ডারের গুহার দেওয়ালে দেখতে পাওয়া দরজার মতো আকৃতি আসলেই গুপ্তধনের দরজা খুলে দিতে পারে, তাহলে শঙ্খলিপিতে খোদাই করা শব্দগুলি হলো তার চাবি। সেই শঙ্খলিপির পাঠোদ্ধার করতে পারলেই গুপ্তধনের সত্যতা যাচাই করা যাবে। তাই গুপ্তধনের থেকেও আগে শঙ্খলিপির পাঠোদ্ধার করার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

লিখেছেন
Raktim Dey
Raktim Dey
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।