প্রেমে পড়েছিলেন তিনিও! কেন সারাজীবন বিয়ে করলেন না রতন টাটা?

একবার প্রেমে পড়েছিলেন, বিয়ে করে সংসার পাততেও চেয়েছিলেন। যদিও অপূর্ণ রয়ে গিয়েছে সেই স্বপ্ন। সম্পর্কটিও ভেঙে গিয়েছিল।

 

টাটা কোম্পানির নাম এলে আপনাআপনিই যেন এসে পড়ে রতন টাটার নাম। ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় শিল্পপতি তিনি। বর্তমানে তাঁর বয়স প্রায় ৮৪। এখন আর টাটা গ্রুপের চেয়ারম্যান নন। তবে এককালে চেয়ারম্যান হিসেবেও খ্যাতি তাঁর কম ছিল না। সঙ্গে নানা জনকল্যাণমূলক কাজ, ভদ্র, নম্র ব্যবহার, অতি সাধারণ জীবনযাত্রা— সবটা মিলিয়ে মাটির মানুষ রতন টাটাকে ভালবেসেছিল মানুষ, এখনও শ্রদ্ধার চোখে দেখা হয় তাঁকে।

নওল টাটার ছেলে রতনের জন্ম হয় মুম্বইয়ে, ১৯৩৭-এর ২৮ ডিসেম্বর। অনেকেই জানেন না, রুতন টাটার আপন মাতামহী ছিলেন হীরাবাই টাটার বোন। অর্থাৎ, জামশেদজী টাটার শ্যালিকা। আপন মাতামহ হরমুসজি টাটাও টাটাদেরই জ্ঞাতি। সেই টাটা পরিবারেরই উত্তরসূরি রতন টাটা। নওল এবং সোনু ১৯৪৮ সাল থেকে আলদা থাকতে শুরু করেন। তখন রতনের বয়স মাত্র ১০ বছর। তখন রতনজি টাটার বিধবা স্ত্রী নওয়াজবাই টাটা তাঁকে মানুষ করেন। তিনি জে এন প্রীত পার্সি অনাথাশ্রম থেকে আইনি পদ্ধতিতেই দত্তক নেন রতনকে। আজও বেশিরভাগ লোকই তাঁকে অবিবাহিত বলে জানেন। সত্যিই বিয়ে করেননি রতন টাটা। কিন্তু প্রেমে পড়ছিলেন ঠিকই।

২০২০ সালে 'হিউম্যানস অফ বম্বে' নামক একটি জনপ্রিয় ফেসবুক পেজের সঙ্গে কথোপকথনের সময় রতন টাটা নিজের শৈশবের কথা জানান। উঠে আসে তাঁর প্রেম, সম্পর্ক এবং প্রায় বিয়ে করে ফেলার কথাও। জানান, একবার প্রেমে পড়েছিলেন, বিয়ে করে সংসার পাততেও চেয়েছিলেন। যদিও অপূর্ণ রয়ে গিয়েছে সেই স্বপ্ন। সম্পর্কটিও ভেঙে গিয়েছিল। সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার নেপথ্যে একটি বড় কারণ অবশ্য ১৯৬২তে চিন-ভারত যুদ্ধ। ফেসবুক পেজটিকে দেওয়া বয়ানে টাটা বলেছিলেন, “কলেজের পর লস এঞ্জেলেসে আর্কিটেক্টের কাজ করেছিলাম বছরদুয়েক। সেসময় আবহাওয়া মনোরম, নিজের গাড়ি ছিল একটা, পছন্দের কাজ— সব মিলিয়ে চমৎকার দিন কাটছিল। সেখানেই, মানে লস এঞ্জেলেসেই প্রেমে পড়ি, এবং আমাদের প্রায় বিয়েও হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ঠিক সেই সময়েই আমাকে কয়েকদিনের জন্যে হলেও দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিতে হয়। ঠাকুমা অসুস্থ ছিলেন। প্রায় সাত বছর ওঁর সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ হয়নি। ঠাকুমার সঙ্গে দেখা করার জন্যই ফিরলাম। ভেবেছিলাম আমার সঙ্গীটি, যাঁকে আমি বিয়ে করতে চাই, সেও আমার সঙ্গে ভারতে আসবে হয়তো, কিন্তু ১৯৬২ সালে তখন চিন-ভারত যুদ্ধ চলছে। ওঁর বাবা মা ব্যাপারটায় আর রাজি হলেন না। সম্পর্কটা ভেঙে গেল।"

আরও পড়ুন: কেন ন্যানো বানিয়েছিলেন রতন টাটা?

টাটার এক সৎ ভাই রয়েছেন, নোয়েল টাটা। নওল টাটা পরে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেছিলেন সিমন টাটাকে। তাঁদেরই সন্তান নোয়েল। নিজেদের শৈশবের কথা বলতে গিয়ে টাটা বলেন, “শৈশবটা আমাদের মন্দ ছিল না। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু মন কষাকষি, অস্বস্তি চেপে বসল। বাবা-মায়ের ডিভোর্স অন্যতম প্রধান কারণ। আজকের মতো সেসময় ডিভোর্স ব্যাপারতা এত স্বাভাবিক হয়ে ওঠেনি। ফলে ভুগতে হয়েছিল। ঠাকুমাই আমাদের বড় করে তুলেছিলেন।”

বৃদ্ধ শিল্পপতির মনে পড়ছিল, তাঁর মা দ্বিতীয়বার বিয়ে করার পর স্কুলে তাঁদের সম্বন্ধে কীসব জঘন্য আলোচনা হত। “ডিভোর্সের কিছুকাল পরে মা যখন আবার বিয়ে করলেন, স্কুলের ছেলেমেয়েরা আমাদের সম্বন্ধে কত কী বলত! সবসময় বলত, খুব বাজেভাবে বলত। কিন্তু ঠাকুমা শিখিয়েছিলেন, নিজের মর্যাদা কখনও খোয়াতে নেই। সেই স্বভাবটা আজও রয়ে গিয়েছে। ফলে কেউ কিছু বললে আমরা মারপিট করতে যেতাম না কখনও, বরং এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে সেখান থেকে সরে আসতাম।”

রতন টাটার ঠাকুমা তাঁর জীবনের অনেকটা জুড়ে। শৈশব থেকে কৈশোর, যৌবন– ঠাকুমার ছায়ায় কেটেছে তাঁর। নিজের মূল্যবোধ প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে টাটা স্মরণ করেন, কীভাবে গরমের ছুটিতে তাঁকে ও তাঁর ভাইকে লন্ডনে নিয়ে গিয়েছিলেন ঠাকুমা, কীভাবে একটু একটু করে মূল্যবোধের ধারণা গেঁথে দেওয়া হয়েছিল তাঁদের মনে। “কখনও বলতেন, এটা বলতে নেই, কখনও বলতেন, একদম চেপে যাও, এড়িয়ে যেতে শেখো, আত্মমর্যাদাকে সবার ওপরে রেখো। সেসব আমাদের মনে ছাপা হয়ে গিয়েছে। সবসময়ই আমাদের পাশে থাকতেন। আজকাল দিনে কে ঠিক আর কে বেঠিক বলাই মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে,” বলেছিলেন টাটা।

আমেরিকার কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে তাঁর পড়াই হতো না ঠাকুমা না থাকলে। ঠাকুমা যে কী সাহায্য করেছেন, বারবার সেই কথাই বলছিলেন টাটা। সম্পূর্ণ ঠাকুমার দৌলতেই মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে নাম উঠেছিল তাঁর। যদিও মেজর পালটে আর্কিটেকচারের ডিগ্রি নিয়ে স্নাতক সম্পূর্ণ করেন রতন টাটা। “আমার বাবা একদমই খুশি হতে পারেননি ব্যাপারটায়, রাগারাগিও হয়েছিল। কিন্তু তখন আমি মুক্ত, স্বাধীন। নিজের কলেজে আমি আত্মনির্ভর, স্বতন্ত্র এক ব্যক্তি। এবং নরমভাবেও যে সাহসী উচ্চারণ করা যায়, নিজের মর্যাদা বজায় রেখে চলা যায়, তা ঠাকুমাই আমাদের শিখিয়ে ছিলেন।” রতন টাটা শুধু শিল্পপতি নন। গোটা ভারতের কাছে তাঁর জনপ্রিয়তা অন্য মাত্রার। এই সবকিছুই তাঁর অনন্য আত্মমর্যাদার জন্য। আর তিনি সেই মর্যাদা রক্ষা করতে শিখেছিলেন তাঁর ঠাকুমার কাছেই।

 

More Articles