বাইবেল লিখেছিলেন কে? যে রহস্যের উত্তর মেলে না আজও...

Writer of the Bible : বাইবেল কে লিখেছেন এই নিয়ে চারখানা ভিন্ন তত্ত্ব মেলে।

inscript
৩ মিনিট
বাইবেল লিখেছিলেন কে? যে রহস্যের উত্তর মেলে না আজও...

খ্রিস্টানদের ধর্মগ্রন্থ। যিশুর নানা গল্প, নানা কীর্তির বর্ণনা, এর বেশি অন্য ধর্মের কাছে বিস্তারে জানা হয় না বাইবেলকে। অথচ বিশ্বের ইতিহাস সম্পর্কে এক সামগ্রিক গল্প বলে বাইবেল। সৃষ্টি, পতন, মুক্তি এবং জীবিত এবং মৃতদের প্রতি ঈশ্বরের শেষ বিচারের কথা বলা আছে বাইবেলে। ওল্ড টেস্টামেন্ট (৩০০ খ্রিস্টপূর্ব) বিশ্বের সৃষ্টি এবং আদম ও ইভ, ঈশ্বরের প্রতি তাদের অবাধ্যতা এবং ইডেন বাগান থেকে আদম ও ইভকে তাড়িয়ে দেওয়া থেকেই এই কাহিনির শুরু। নিউ টেস্টামেন্ট আবার যিশুর জীবন, মৃত্যু এবং পুনরুত্থানের মাধ্যমে মানবতার মুক্তির কথা বলে। খ্রিস্টধর্মের প্রথম ৪০০ বছরে নিউ টেস্টামেন্ট গ্রহণের বিষয়টা খুব স্বচ্ছ ছিল না। অবশেষে, ৩৬৭ খ্রিস্টাব্দে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ২৭টি বইকে মান্যতা দেয়। সে তো হলো। কিন্তু বাইবেলের রচয়িতা আসলে কে?

বাইবেল কে লিখেছেন এই নিয়ে চারখানা ভিন্ন তত্ত্ব মেলে।

১. ঈশ্বর নিজেই বাইবেল লিখেছেন

খ্রিস্টধর্মাবলম্বীরা মোটামুটি এই বিষয়ে একমত যে বাইবেলয়ের কথার মধ্যে এক অদ্ভুত কর্তৃত্ব আছে। অনেকেই বিশ্বাস করেন ঈশ্বরেরই প্রকাশিত বাণী বাইবেল। কিন্তু এর অর্থ কী তা নিয়ে ব্যাপক মতভেদ রয়েছে। অনেক বিশ্বাসীই মনে করেন বাইবেলের শব্দগুলি ঈশ্বরের লিখিত। ঈশ্বরই বাইবেলের লেখকদের নির্দেশ দিয়েছিলেন এই কথাগুলি লেখার।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কোনওকালেই নাকি ক্রুশবিদ্ধ হননি যিশু! চাঞ্চল্যকর দাবি বাইবেলে

1500-Year-Old Bible: ২০০০ সালে কয়েক জন দুষ্কৃতি বইটি পাচারের ধান্দায় ছিল। সেই সময়েই বইটির দাম ছিল ২৮ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। ফলে বুঝতেই পারছেন কালো বাজারে বইটির গুরুত্ব ঠিক কতটা।

মধ্যযুগীয় ক্যাথলিক গির্জার সঙ্গে জড়িতরা এই বিশ্বাসই রাখতেন। ক্যাথলিক ধর্মতাত্ত্বিক থমাস অ্যাকুইনাস ১৩ শতকে বলেন, এই পবিত্র লেখার লেখক হলেন ঈশ্বর। এই লেখার প্রতিটি শব্দের বিভিন্ন নির্যাস থাকতে পারে, অর্থাৎ এটি বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।

ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন প্রোটেস্ট্যান্টবাদ ১৫০০-র দশকে ইওরোপে ছড়িয়ে পড়ে। খ্রিস্টধর্মের ক্যাথলিক এবং ইস্টার্ন অর্থোডক্স ঐতিহ্যের পাশাপাশি গির্জার একটি নতুন দল গঠিত হয়। প্রোটেস্ট্যান্টরা 'সোলা স্ক্রিপ্টুরা'-র উপর জোর দিয়েছিল, যার অর্থ বাইবেলের পাঠ্যই গির্জার সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব। প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কারক জন ক্যালভিন ঘোষণা করেন: প্রফেট বা নবীরা নিজেদের কথা বলেননি স্বর্গ থেকে তাঁদের যা ঘোষণা করার জন্য নিযুক্ত হয়েছিল তারা সেটাই লিখে গেছেন। খ্রিস্টিয় ইতিহাসের প্রথম ১,৭০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এটিই সত্য ধরে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ১৮ শতক থেকে, ইতিহাস এবং বিজ্ঞান বাইবেলের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতে শুরু করে। ধর্মগ্রন্থে কোনও ধরনের ত্রুটি যে নেই এই নিয়ে চারদিকে হইচই পড়ে যায়। ২০ শতকের গোড়ার দিকে মৌলবাদী আন্দোলন শুরু হয়।

২. ঈশ্বরই বাইবেল লেখকদের অনুপ্রাণিত করেছেন

আরেকটি তত্ত্বে বলে, লেখকদের ঈশ্বর অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। অর্থাৎ ঈশ্বর এবং মানুষ দুইয়ে মিলে বাইবেল লিখেছেন। প্রোটেস্ট্যান্টিজমে বিশ্বাসীরা বলেন, বাইবেল মানুষের দ্বারা লিখিত হলেও ঈশ্বরের প্রভাব তাতে সবচেয়ে বেশি। প্রোটেস্ট্যান্টরা বিশ্বাস করত ঈশ্বরের সার্বভৌমত্ব মানুষের স্বাধীনতাকে খর্ব করে। ক্যাথলিকরা ঐশ্বরিক সার্বভৌমত্বের ঊর্ধ্বে মানুষের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দিতেই বেশি আগ্রহী ছিল। ১৬২০-র দশকের গোড়ার দিকে স্প্লিটের আর্চবিশপ, মার্কানটোনিও ডি ডোমিনিস বাইবেলের দু'টি অংশকে আলাদা করেন, যেগুলি ঈশ্বরের দ্বারা লিখিত, এবং যেগুলি মানুষের দ্বারা। পরবর্তীতে, তিনি বিশ্বাস করেন যে বাইবেলে ত্রুটি ঘটতেই পারে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
যিশু নেই, সান্তা নেই! ক্রিসমাসে বেথলেহেমের এই চেহারা আগে দেখেনি বিশ্ব

Bethlehem Christmas 2023 : বেথলেহেম যিশুহীন, শান্তিহীন। কেবল যুদ্ধ আর অমানবিকতা। এই ক্রিসমাসে সান্তা নেই কোনও বেথলেহেমে।

৩. ঈশ্বর লেখকদের অনুপ্রাণিত করেছেন: উদারপন্থা

১৯ শতকের সময় প্রোটেস্ট্যান্ট এবং ক্যাথলিক- দুই বিশ্বাসীরাই মনে করেন বাইবেলের লেখকরা ঈশ্বর অনুপ্রাণিত ছিলেন ঠিকই কিন্তু তারা তাদের লেখাগুলি যে সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে লিখেছিলেন তা পূর্ব নির্ধারিত ছিল। ১৮৬৮ সালে, একটি রক্ষণশীল ক্যাথলিক চার্চ বলে বাইবেল সরাসরি ঈশ্বর লিখিত। ভ্যাটিকান ১ নামে পরিচিত চার্চের কাউন্সিল ঘোষণা করেছিল যে, ওল্ড এবং নিউ টেস্টামেন্ট দুই-ই 'পবিত্র আত্মার অনুপ্রেরণায় লেখা, তাদের লেখক ঈশ্বর।'

৪. মানুষই কোনও ঐশ্বরিক সাহায্য ছাড়াই বাইবেল লিখেছে

সবচেয়ে উদারপন্থী খ্রিস্টানরা বাইবেলের ঐতিহাসিক বা বৈজ্ঞানিক নির্ভুলতা বা অপূর্ণতার প্রশ্নে মনে করেন মানুষই বাইবেলে লিখেছে। বাইবেল কে লিখেছেন এই প্রশ্নে তারা চার জনের নাম করেন, ম্যাথিউ, মার্ক, লুক এবং জন – এরা চারটি গসপেলের লেখক। ওল্ড টেস্টামেন্টের ৩৯টি বইয়ের বিষয়বস্তু ইহুদি হিব্রু বাইবেলের ২৪টি বইয়ের মতোই।

মনে করা হয়, চারটি গসপেলের লেখকদের মধ্যে ম্যাথিউ এবং জন, মার্ক যিশুর শিষ্য পিটারের সহচর, এবং লুক হচ্ছেন পলের সহচর, যিনি প্রথম শতাব্দীতে গ্রিকো-রোমান বিশ্বে খ্রিস্টধর্ম প্রচার করেছিলেন। গসপেল তৈরির তারিখ দেখে বোঝা যায়, যিশুর জীবনের প্রত্যক্ষদর্শীরা মোটেই এগুলি লেখেননি। প্রাচীনতম গসপেল, মার্ক (৬৫-৭০ খ্রিস্টাব্দ) যিশুর মৃত্যুর প্রায় ৩০ বছর পরে (২৯-৩৪ খ্রিস্টাব্দ) লেখা হয়েছিল। শেষ গসপেল, জন (৯০-১০০ খ্রিস্টাব্দ) যিশুর মৃত্যুর প্রায় ৬০-৯০ বছর পরে লেখা হয়েছিল।

মজার বিষয় হলো, অ্যাপোক্রিফা নামে পরিচিত একটি রচনা ওল্ড এবং নিউ টেস্টামেন্টের (৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দী) সময়কালে লেখা হয়েছিল। ক্যাথলিক চার্চ এবং ইস্টার্ন অর্থোডক্স খ্রিস্টান ঐতিহ্যগুলি এগুলিকে বাইবেলের অংশ হিসাবে বিবেচনা করে, কিন্তু প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চগুলি তা মনে করে না।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।