বাংলাদেশ পাকিস্তান নৈকট্য ভারতের জন্যে কেন দুশ্চিন্তার?

Pakistan-Bangladesh Relations: গত কয়েক মাসে এই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য, সংস্কৃতি বা যোগাযোগ সব ক্ষেত্রেই দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বেড়েছে।

Tanvia Barua
৩ মিনিট
বাংলাদেশ পাকিস্তান নৈকট্য ভারতের জন্যে কেন দুশ্চিন্তার?

সম্প্রতি বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক ভালো হচ্ছে। চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে ওমানের মাস্কাটে ভারত মহাসাগর সম্মেলনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব তৌহিদ হোসেন দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা জোট বা সার্ক-কে আবার চালু করার প্রসঙ্গ তোলেন। এর আগেও বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস একাধিকবার সার্ককে পুনরায় চালু করার কথা প্রকাশ্যেই বলেছিলেন। কিন্তু বৈঠকে জয়শংকর পরিষ্কার জানিয়ে দেন, সার্কের কথা আপাতত না তোলাই ভালো। তিনি এও বলেন, কোন দেশের কারণে এবং কেন সার্ক এখন অচল তা জোটের সব সদস্য দেশগুলোরই ভাল মতো জানা। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়টিকে ভারত 'পাকিস্তানের সুরে সুর মেলানো' হিসেবেই দেখবে। অর্থাৎ পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ যে একটি বিষয়ে ঐক্যমতে পৌঁছেছে তা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ নেই। কিন্তু ১৯৭১ এর ক্ষত ভুলে কেন কাছাকাছি এল বাংলাদেশ পাকিস্তান, এই সম্পর্কের প্রভাবই বা কতটা, বিশ্লেষণ জরুরি।

গত কয়েক মাসে প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য, সংস্কৃতি বা যোগাযোগ সব ক্ষেত্রেই দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বেড়েছে। বহু বছর পর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে ৫০ হাজার মেট্রিক টন চাল আমদানি করেছে। এছাড়াও ভিসা বিধিনিষেধ শিথিল করা এবং ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে ডিরেক্ট ফ্লাইট চালু করার কথাও চলছে। দু'দেশের সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারাও এক অন্যের দেশে যাওয়া আসা শুরু করেছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এবং বাণিজ্যমন্ত্রী জাম কামাল খান সম্প্রতি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস-সহ অন্য উপদেষ্টাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে গিয়েছেন। শুধু তাই নয়, বিএনপি, জামায়াত বা এনসিপি-র শীর্ষ নেতাদের সঙ্গেও দেখা করেছেন ইসহাক দার। একাত্তরের যুদ্ধকে এই সফরে 'মীমাংসিত বিষয়' বলে দাবি করেন তিনি। যার অস্যার্থ দু-পক্ষই একে অন্যেকে কাছে টানার বার্তা দিচ্ছে। 'হৃদয় পরিষ্কার করে' বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে যাওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। লক্ষ্য করার মতো বিষয় হল, ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের ভিত্তিই হল একাত্তরের যুদ্ধ। সেখানে ভারতীয় সেনা ও বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী একসঙ্গে লড়েছিল। দু-দেশের মৈত্রীর সূত্রই ছিল পারস্পরিক নির্ভরতা, পাক সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা।

সেই রয়ায়ন আজ বদলে গেলে ভারতের কপালে ভাঁজ পড়াই স্বাভাবিক। কারণ এই দুই দেশের সঙ্গে আবার চিনের সখ্য একটি নতুন ত্রিভুজ তৈরি করতে পারে। ভারতের প্রধান সেনাধ্যক্ষ (চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ) জেনারেল অনিল চৌহান বিবিসি-কে বলেছেন, চিন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে, ভারতে এর প্রভাব পড়তে পারে। তাঁর কথায়, "এই তিনটি দেশের ক্ষেত্রে যে সম্ভাব্য 'কনভার্জেন্স অব ইন্টারেস্ট' দেখা যাচ্ছে, তা ভারতের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে বড় প্রভাব ফেলতেই পারে।"

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ট্রাম্পের ফোন আসেনি, মাথা নত করেছিল পাকিস্তানই, বলছেন এস জয়শঙ্কর

Pakistan: তিনি জানান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী ও সৌদি আরবের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে, কিন্তু ভারতের অবস্থান একই ছিল— পাকিস্তান সামরিক সূত্রের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ না করলে কোনও যুদ্ধবিরতি হবে না।

নিরাপত্তার ঝুঁকি

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বহুদিন সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলার ঝুঁকি রয়েছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান মাথায় রেখেই দু-দেশের মধ্যে বোঝাপড়া, কূটনৈতিক দূরত্ব কমিয়ে আনা জরুরি। বিগত কিছু বছরে নিরাপত্তা বজায় ছিল। বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, অতীতে অবস্থাটা স্থিতিশীল ছিল। কারণ পাকিস্তানের কোনো ইন্ধন বাংলাদেশে ছিল না। এখন দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়ায় এই সীমান্ত নিয়ে বাড়তি দুশ্চিন্তার অবকাশ তৈরি হচ্ছে।

একটি ঘটনার কথা এখন আলোচনায় উঠে আসছে। ২০০৩ থেকে ২০০৬ সালে বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনার ছিলেন ভিনা সিক্রি। সে সময়বাংলাদেশে বিএনপি-জামায়াতের জোট সরকার। তখনও বাংলাদেশ ও ইসলামাবাদের মধ্যে ভালো সম্পর্ক ছিল। ভিনা সিক্রি রাষ্ট্রদূত থাকাকালীন ২০০৪ সালে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দশটি ট্রাকে করে অস্ত্র পাচারের ঘটনা ঘটেছিল। তখন অভিযোগ উঠেছিল, আলফা-সহ ভারতের বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর জন্য এই অস্ত্র নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্ক ভালো হওয়ার বিষয়টিকে ভিনা সিক্রি 'খুব বড় সিকিওরিটি কনসার্ন' বলে মনে করেছিলেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
পাকিস্তানের সেনা প্রধান মুনিরের সঙ্গে কেন বৈঠকে ট্রাম্প?

Donald Trump Asim Munir: মার্কিন মুলুকে বসবাসরত পাকিস্তানি এবং পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ কর্মীদের ব্যাপক ক্ষোভের মুখোমুখি হন মুনির।

পাকিস্তানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বৃত্তি

বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের পাকিস্তানে বৃত্তি দেওয়ার বিষয়টিও ভারতের থেকে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের টানার কৌশল বলে মনে করছেন অনেকে। ভারত এতদিন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের শান্তিনিকেতনে বা বরোদার এম এস ইউনিভার্সিটিতে পড়ার জন্য বৃত্তি দিয়েছে। পাকিস্তান এখন একই পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশটি এখন জিন্নাহ বা আল্লামা ইকবালের ডকট্রিনে বাংলাদেশের পড়ুয়াদের বৃত্তি দেবে।

কূটনৈতিকদের একটা পক্ষ আবার মনে করছেন, বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের সম্পর্ক ভালো হওয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সায় রয়েছে। কারণ, ভারতকে যে তিনি আর তাঁদের প্রধান মিত্র বা সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চান না, সেটিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কূটনৈতিক সিদ্ধান্তে স্পষ্ট হয়েছে। ৫০ শতাংশ ট্যারিফের মতো পদক্ষেপ পরিষ্কার করে দিয়েছে, ভারত ও পাকিস্তানকে তিনি একই চোখে দেখেন। শুধু তাই নয়, আসীম মুনিরের সঙ্গে ট্রাম্পের মধ্যাহ্নভোজের ছবিটিই ছিল নৈকট্যের অলিখিত বার্তা। শুল্কযুদ্ধের আবহে দু'মাসে দু'বার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছেন মুনির

উল্লেখ্য, ভারতের পশ্চিম সীমান্তে রয়েছে পাকিস্তান, উত্তর সীমান্তে চিন, দুই দেশের সঙ্গেই ভারতের সংঘাত। পূর্ব সীমান্তে কিছু বছর অপেক্ষাকৃত শান্ত ছিল। কিন্তু এখন যদি এই সীমান্ত নিয়েও চিন্তা বাড়ে, তাহলে ভারতের চাপ আরও বাড়বে।

লিখেছেন
Tanvia Barua
Tanvia Barua
7 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

সরবোন থেকে যন্তরমন্তর: যে আগুন বারবার বদলে দেয় পৃথিবীকে

May 1968 France student protests: এই যে ছেলেমেয়েরা যন্তরমন্তরের রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছে, ধারাশ্রাবণের ভয় পিছনে ফেলে পার্লামেন্ট স্ট্রিটের দিকে এগিয়ে গেল, দক্ষিণী এক বৃদ্ধ তার ধুতি সামলাতে সামলাতে ছুটছেন তাদের সঙ্গে—কী মনোরম এই বারিপাত! কেমন যেন একটা দুর্দান্ত ফ্ল্যাশব্যাকে ঘুরে গেল সময়।

অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলা: তিন অভিযুক্তের সাজা হয়েও মেটেনি ‘ভিআইপি’ রহস্য

Ankita Bhandari case highlights :অঙ্কিতার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, গৌতমই সেই ভিআইপি, যিনি তাঁদের মেয়েকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে গৌতমের রাজ্যপাল নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন, এই যুক্তিতে যে এই ‘ভিআইপি’কে কোনো পদে বহাল থাকার অনুমতি দেওয়ার আগে সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত।

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।