কেন ট্রাম্পের নজরে ইরানের ফোর্দো পারমাণবিক কেন্দ্র?

Iran Fordo Nuclear Site: ফোর্দোর অবস্থান এবং গঠনের কারণে তাকে ধ্বংস করা সহজ নয়। এর অবস্থান পাহাড়ের গভীরে, তাই সাধারণ বোমা দিয়ে এটার ক্ষতি করা কঠিন।

inscript
৩ মিনিট
কেন ট্রাম্পের নজরে ইরানের ফোর্দো পারমাণবিক কেন্দ্র?

ইরানের ফোর্দো পারমাণবিক ঘাঁটিতে হামলার কথা জানিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। হামলা হয়েছে নাতাঞ্জ আর ইসফাহানের পারমাণবিক ঘাঁটিতেও। এই আক্রমণের সত্যতা স্বীকার করে নিয়েছে ইরান। ট্রাম্প এই হামলার কথা জানিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন 'ফোর্দো ইজ গন'। প্রশ্ন হলো, সত্যিই কি তাই? কেন ফোর্দোই ট্রাম্পের পাখির চোখ?

ফোর্দো ফুয়েল এনরিচমেন্ট প্ল্যান্ট, যাকে সংক্ষেপে এফএফইপি বলা হয়, ইরানের কোম শহরের কাছে একটি পাহাড়ের গভীরে অবস্থিত। এটা মাটির নীচে তৈরি একটি গোপন ঘাঁটি। আগে এখানে ইরানের বিপ্লবী গার্ডের একটি ক্যাম্প ছিল। ২০০৯ সালে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই কেন্দ্রের খবর পায়, তারপর থেকে ফোর্দো বিশ্বের নজরে।

এই কেন্দ্রে ইউরেনিয়ামের শক্তিবৃদ্ধি করা হয়। এই শক্তিশালী ইউরেনিয়াম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা যায়, আবার পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্যও। ফোর্দোর মতো জায়গা আন্তর্জাতিক মহলের তুমুল আগ্রহের বিষয়। ইজরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার পর ফোর্দো নিয়ে আলোচনা আরও বেড়েছে।

ফোর্দোর গঠন খুব শক্তপোক্ত। পাহাড়ের ভেতরে, মাটির অনেক গভীরে অবস্থিত। এই কারণে ফোর্দোকে ধ্বংস করা খুব কঠিন। কেন্দ্রটি আয়তনেও ছোট, তবে এখানে প্রায় তিন হাজার সেন্ট্রিফিউজ মেশিন আছে। এই মেশিনগুলো ইউরেনিয়ামের শক্তি বৃদ্ধি করতে ব্যবহৃত হয়। ইরানের দাবি, ফোর্দো সহ অন্যান্য জায়গায় যন্ত্রপাতি তারা আগেই সরিয়ে ফেলেছিল।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ইরানের পারমাণবিক ঘাঁটিগুলির কতটা ক্ষতি হয়েছে?

Nuclear: সেন্ট্রিফিউজ রটার তৈরির কেন্দ্র ও পরীক্ষা কেন্দ্রে টার্গেট করে হামলা করায় কারাজ ওয়ার্কশপে সেন্ট্রিফিউজ উৎপাদনের দুটি ভবন ধ্বংস হয়েছে।

ফোর্দোর গুরুত্ব কেন অন্য কেন্দ্রর থেকে বেশি?

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিশ্বে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। ২০১৫ সালে ইরান ও বিশ্বের তাবড় দেশের মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছিল, যাকে বলা হয় জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অফ অ্যাকশন (জেসিপিওএ)। এই চুক্তির মাধ্যমে ইরান প্রতিশ্রুতি দেয় যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। ফোর্দোতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করার কথাও ছিল। ২০১৮ সালে আমেরিকা এই চুক্তি থেকে সরে যায়। তারপর থেকে ইরান আবার ফোর্দোতে ইউরেনিয়াম প্রকল্প শুরু করে।

২০২৪ সালের হিসেবে, ফোর্দোতে ইরান ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়ামের শক্তিবৃদ্ধি করছে। পারমাণবিক অস্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় ৯০ শতাংশ। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের এখনও অস্ত্র তৈরির জন্য আরও কিছু পদক্ষেপ করা বাকি। ফোর্দোর কার্যক্রম তাই এখনও অসম্পূর্ণ বলেই ধরতে হবে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ইজরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়েছিল ইরান! কেন দুই দেশের সর্ম্পকের অবনতি হলো?

Iran-Israel War: এমনকি ১৯৪৮ সালে যখন ইজরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয়, তখন তুরস্কের পর ইজরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়া দ্বিতীয় মুসলিম দেশ ইরান। দুই দেশের মধ্যে গড়ে উঠেছিল অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক।

ফোর্দোকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা সম্ভব?

ফোর্দোর অবস্থান এবং গঠনের কারণে তাকে ধ্বংস করা সহজ নয়। এর অবস্থান পাহাড়ের গভীরে, তাই সাধারণ বোমা দিয়ে এটার ক্ষতি করা কঠিন। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এমন কিছু শক্তিশালী অস্ত্র আছে, যেগুলো মাটির গভীরে থাকা লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনিট্রেটর (এমওপি), যাকে বলা হয় জিবিইউ-৫৭। এই বোমার ওজন ১৪ টন। এই বোমা মাটির ৬০ মিটার গভীরে গিয়ে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। কিন্তু, ফোর্দোর গভীরতা এর থেকেও বেশি হতে পারে। কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এমওপি ব্যবহার করে ফোর্দোর মূল অংশ ধ্বংস করা সম্ভব নাও হতে পারে। এছাড়া, ফোর্দোর চারপাশে ইরানের শক্তিশালী এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম আছে। আমেরিকার বিমান বা মিসাইলকে এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে পরাজিত করতে হবে। সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, ফোর্দোর একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।

আরও একটি আশঙ্কা রয়েছে। ফোর্দোতে পারমাণবিক উপাদান থাকায় হামলা করলে তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়তে পারে। তেজস্ক্রিয় দূষণ মুহূর্তে লক্ষ মানুষের জীবন বিপন্ন করতে পারে।

উল্লেখ্য, ট্রাম্প ফোর্দো হামলা করেলে ইরানও চুপ করে থাকবে না। তারা পাল্টা হামলা করতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি বা তার মিত্র দেশগুলোর ওপর হামলা করতে পারে ইরান। এছাড়া, ইরানের মিত্র গোষ্ঠী, যেমন হিজবুল্লাহ বা ইয়েমেনের হুথিরা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্রদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করতে পারে। এমন পরিস্থিতি পুরো অঞ্চলকে আরও বড় যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। ইতিমধ্যেই ইরান বলছে, এখন যে কোনো মার্কিন নাগরিক-সামরিক স্থাপনাই তাদের টার্গেট হতে পারে।

তাছাড়া ফোর্দো ধ্বংস হলেও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ হবে না। ইরানের আরও কেন্দ্র রয়েছে, যেমন নাতাঞ্জ। তবে ফোর্দো ধ্বংস হলে তাদের অস্ত্র তৈরির গতি কমে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান এখন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির খুব কাছে। কিন্তু শেষ কথা বলার সময় আসেনি।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আমেরিকা এবং ইজরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। ইজরায়েল বারবার বলছে, তারা ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেবে না। আমেরিকাও এই বিষয়ে কঠোর অবস্থানে। এর ফলে বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফোর্দো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গভীর অবস্থান এবং গঠনের এই কেন্দ্র ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব। ফোর্দো নিয়ে উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক পথ কি এখনও খোলা? বিশ্ব তাকিয়ে সেদিকেই।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর বির্তক: যে খবর স্বাভাবিক হওয়ার কথা, সেটাই আজ বিস্ময়

Gyanesh Kumar, SIR and Election Commission: এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন প্রক্রিয়া চালানো হল? জ্ঞানেশ কুমার কীভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হলেন? ২০২৩ সালে আইন বদলে প্রধান বিচারপতিকে নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটি থেকে সরানো হল কেন? এতদিন এই প্রশ্নগুলি গণমাধ্যম তুলল না কেন?

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।