জুন মাস কেন সমকামীদের জন্য জরুরি? যে ইতিহাস অনেকের অজানা

 

প্রত্যেক বছরের জুন মাস এলেই চারপাশ রামধনু রঙে সেজে ওঠে। এই রঙের পিছনে প্রকৃতির তেমন অবদান নেই। আছে কয়েকশো বছরের অধিকার আদায়ের লড়াই। জুন মাসজুড়েই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ রামধনুরঙা পতাকা নিয়ে বা পোস্টার হাতে নিয়ে পথে নামেন সমপ্রেমের সমর্থনে। বিশ্বজুড়েই জুন মাসে সমকামী, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের সমান ক্ষমতা আদায়ের লড়াই জেতার আনন্দ উদযাপন করা হয়। নিজেদের অধিকারের দাবিতে পথে নামা এবং রাষ্ট্রের কাছ থেকে সেই অধিকার নেওয়ার ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই প্রথম আন্দোলন শুরু করেন এলজিবিটিকিউ গোষ্ঠীর মানুষরা। সেই লড়াই আজ দেশকালের সীমা ভেদ করে প্রতিটি দেশের সমকামীদের কাছে লড়াইয়ের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। জুন মাসজুড়ে এই উদযাপনেরও এক ইতিহাস আছে।

ইতিহাসকে ফিরে দেখা
১৯৬৯ সালের ২৮ জুন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরের স্টোনওয়াল ইনন নামের একটি সমকামী বারে পুলিশ হানা দেয়। যুক্তি ছিল, এই বারটি কোনওরকম মদের লাইসেন্স ছাড়াই মদ বিক্রি করছে। মার্কিন সংবাদ সংস্থার একটি রিপোর্ট বলছে, ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত আমেরিকার কোথাও কোনও সমকামী বারে মদ বিক্রি করাই বেআইনি ছিল। সেই সময় প্রায়ই পুলিশ সমকামী বারগুলি আক্রমণ করত। ওই বারগুলিতে উপস্থিত লোকজনও নিজেদের মতো করে পুলিশি আক্রমণ প্রতিহত করার চেষ্টা করত। কিন্তু ব্যতিক্রম হল ১৯৬৯ সালের ২৮ জুন। বারে উপস্থিত নিরীহ সমকামী মানুষদের ওপর পুলিশের নৃশংস আক্রমণের বিরুদ্ধে গর্জে উঠল গোটা নিউ ইয়র্ক শহর। সেই দিন সন্ধের মধ্যেই হাজারের বেশি মানুষ পুলিশি আক্রমণের সামনে রুখে দাঁড়ালেন। ছয়দিন ধরে চলল পুলিশের সঙ্গে সাধারণ জনগণের লড়াই।

সেই প্রথম সমকামীদের ওপর রাষ্ট্রের অত্যাচার উঠে এল সংবাদপত্রের শিরোনামে। এই ঘটনার প্রতিবাদেই বিভিন্ন জায়গায় তৈরি হল সমকামীদের অধিকারের দাবিতে লড়াই করা কিছু গোষ্ঠী। সেদিনের সেই ঘটনা স্টোনওয়াল বিদ্রোহ নামে ছড়িয়ে পড়েছিল সারা পৃথিবীর বুকে।

আরও পড়ুন: প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবন কতটা ‘সবার’

এলজিবিটিকিউ-র ইতিহাসে জুন মাসের এত গুরুত্ব কেন?
১৯৬৯ সালে আমেরিকায় সমকামীদের ওপর অত্যাচারের ঘটনার কথা মাথায় রেখে যে অধিকার আদায়ের লড়াই শুরু হয়েছিল তারই বর্ষপূর্তিতে জুন মাস জুড়ে আমেরিকার সমস্ত সমকামী, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ আমেরিকার বিভিন্ন রাস্তায় একত্রিত হয়ে পথ হাঁটেন। লাইব্রেরি অফ কংগ্রেসের তথ্য বলছে, শুধুমাত্র নিউ ইয়র্ক শহরেই জুন মাসজুড়ে তিনহাজার থেকে পাঁচহাজার মানুষ মিছিলে পথ হাঁটেন। সেই ১৯৭০ সাল থেকেই সমকামী মানুষরা সমান অধিকারের দাবিতে জুন মাসজুড়ে আওয়াজ তোলেন।

২০১৩ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা মার্কিন ইতিহাসে প্রথমবার তাঁর বক্তৃতায় সমকামী ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের কথা উল্লেখ করেন। সেদিন ওবামা বলেন, "যতদিন না অবধি আমাদের সমকামী ভাইবোনরা সমান অধিকার পাচ্ছে ততদিন আমাদের এই লড়াই শেষ হবে না।"

ভারতে এলজিবিটিকিউ অধিকারের লড়াইটা ঠিক কেমন ছিল?
ভারতে ব্রিটিশ আমল থেকেই সমকামী ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের সমানাধিকার আইনত নিষিদ্ধ ছিল। পৃথিবীজুড়ে সমকামী ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের অধিকার আদায়ের দাবিতে যে আন্দোলন, তার আঁচ এসে পড়তে শুরু করে ভারতেও। দীর্ঘদিন এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়ের মানুষদের লাগাতার আন্দোলনের পর অবশেষে ২০১৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্ট সমকামিতাকে আইনের মান্যতা দেয়। ২০১৩ সালে যে সুপ্রিম কোর্ট সমকামিতাকে আইনের চোখে অপরাধ বলে ঘোষণা করেছিল, সেই সুপ্রিম কোর্টই ব্রিটিশ আইন ৩৭৭ নম্বর ধারা প্রত্যাহার করে। রায়দানের সময় সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র বলেন, "অনেককাল আগেই আমরা ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়েছি। এখন আমাদের সমস্ত পুরনো গোঁড়ামি দূরে সরিয়ে রেখে নতুন করে ভাবতে হবে। আইনের রক্ষক হিসেবে আমাদের প্রথম কর্তব্য জাতি-লিঙ্গভেদে সমস্ত নাগরিককে সমান ক্ষমতা নিশ্চিত করা। লিঙ্গের ভিত্তিতে ভেদাভেদ আসলে আমাদের মৌলিক অধিকারকেই খর্ব করে।" ১৫৮ বছরের আইনের প্রত্যাহার ভারতের সমকামী ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের কাছে ছিল শাপমুক্তির মতো। অচলয়াতন ভাঙার সেই দিন ভারতের এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়ের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে এক ‘রেড লেটার ডে’।

গোটা ভারতের এই সমকামিতার সমানাধিকারের দাবিতে সেদিন সরব হয়েছিল বাংলাও। বিভিন্ন এনজিও-র তথ্য অনুযায়ী সমকামী ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের সমাধিকারের লড়াইয়ে বাংলা অন্যান্য রাজ্যর থেকে অনেকটাই এগিয়ে। করোনার সময় যখন এলজিবিটিকিউ গোষ্ঠীর মানুষদের পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হচ্ছে, তখনও সারা দেশের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ সমকামী ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের কাছে তাঁদের প্রাপ্য অধিকার পৌঁছে দিয়েছে। প্রত্যয় জেন্ডার ট্রাস্ট, কলকাতা রিস্তা, ত্রয়ী ফাউন্ডেশনের মতো একাধিক সংস্থা পশ্চিমবঙ্গে এলজিবিটিকিউ-দের জন্য লাগাতার কাজ করে চলেছে।

More Articles

;