জানুন কেন দুর্গার মূর্তি তৈরিতে পতিতালয়ের মাটি লাগে

Sourish Das
৪ মিনিট
জানুন কেন দুর্গার মূর্তি তৈরিতে পতিতালয়ের মাটি লাগে

বাঙালিদের সবথেকে বড় উৎসব এই দুর্গাপুজো। সারা পশ্চিম ভারত দশেরার আগের ৯টি দিনকে নবরাত্রি হিসাবে পালন করলেও বাংলা তথা ভারতের পূর্ব অংশের কাছে দুর্গাপুজো নামে এই উৎসবটি প্রচারিত। এই দুর্গাপুজো উৎসবের একাধিক জায়গার একাধিক আলাদা আলাদা নিয়মকানুন আছে। তার মধ্যে কিছু নিয়মের ব্যাখ্যা আছে, আবার কলকাতায় এমন কিছু নিয়ম আছে যেগুলির তেমন কোনও ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায় না অথবা সেগুলির ব্যাখ্যা তেমন একটা কেউ জানে না। সেরকম একটি রীতি বা নিয়ম হল পতিতালয়ের মাটি ব্যবহার করে মায়ের মূর্তি গড়া এবং এই মূর্তি বিশেষত তৈরি হয় কলকাতার প্রতিমা তৈরিতে। এই রীতিটির ব্যাপারে সকলেই কমবেশি জানলেও, কেউই প্রায় জানেন না কেন এটা করা হয়। চলুন, আজকে এটাই জেনে নিই, কেন হঠাৎ পতিতালয়ের মাটি ব্যবহার করা হয় মা দুর্গার মূর্তি তৈরিতে।

প্রতি বছর এই চারটে দিনের জন্য মা দুর্গা কৈলাস থেকে নিজের বাপের বাড়িতে আসেন। তার জন্যে মর্তে প্রত্যেকটি জায়গায় শুরু হয়ে যায় উৎসব। ধুপ, দীপ, আলপনা দিয়ে সেজে ওঠে বাড়ির প্রত্যেকটি কোনা। প্রতিটি মণ্ডপে পূজিত হন দেবী দুর্গা। কিন্তু এই দেবী দুর্গার মূর্তি তৈরি করতেই ব্যবহৃত হয়েছে 'অশুদ্ধ' পতিতালয়ের মাটি। বহুদিন ধরে এই নিয়ম শাস্ত্র মেনে করাও হচ্ছে। সমাজ যেখানে এই সমস্ত নারীদের পরিহার করেছে, তাদের দূরে ঠেলে দিয়েছে, সেখানেই তাদেরকে কাছে টেনে নিয়েছে আদিশক্তি। মা দুর্গার কাছে সবাই তার সন্তান। তার কাছে কেউ ভালো, কেউ অশুচি এরকম কোনো তফাত নেই।

বলাই বাহুল্য, তার কাছে এই সমাজের ব্রাত্য নারীরাই রয়েছেন উপরে, তাই এখানকার মাটি দুর্গা মূর্তি তৈরি করতে অবশ্যই প্রয়োজন। শাস্ত্রের বিধান, মা দুর্গার মূর্তি তৈরিতে যদি পতিতালয়ের মাটি ব্যবহার না করা হয় তাহলে সেটা মা দুর্গার সঠিক মূর্তি নয়। কথিত আছে, অকাল বোধনের সময় মহিষাসুরমর্দিনীকে পতিতালয়ের মাটি দিয়েই তৈরি করতে হবে। তবে, শাস্ত্রের বিধান এখন পুরোপুরি মানা হয়না। শাস্ত্রে যেখানে পুরো মূর্তিটি এই মাটি দিয়ে করার কথা, সেখানে এখন কিছুটা মাটি আসল মাটির তালের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়। সম্পূর্ণ না হলেও আংশিকভাবে এই মাটি লেপতেই হবে চিন্ময়ীর কাঠামোয়। কিন্তু এর কারণ জানেন কি আপনি?

হিন্দু ধর্ম অনুযায়ী, মা দুর্গার মূর্তি তৈরি করতে ৪টি জিনিস লাগবেই। এই ৪টি জিনিস হল, গঙ্গার পলি মাটি, গোমূত্র, গোবর এবং পতিতালয়ের মাটি। এই ৪টি জিনিসের সঙ্গে সাধারণ মাটি মিশিয়ে তৈরি করা হয় মা দুর্গার মূর্তি। বর্ণিত আছে, পুরুষরা পতিতালয়ে গিয়ে সেখানে তার জীবনের সমস্ত সঞ্চিত পূণ্য ফেলে দিয়ে আসে। পরিবর্তে সঞ্চয় করে নিয়ে আসে বহু পাপ। বহু পুরুষের পুণ্যের জন্যই সেই জায়গা নাকি সবথেকে বেশি বিশুদ্ধ, সবথেকে বেশি পূণ্য মাটি। এককথায়, বর্ণিত, সমাজকে বিশুদ্ধ রাখতে এই অশুচি পতিতারাই সাহায্য করেন। তাই দুর্গাপুজোয় মূর্তি তৈরিতে অবশ্যই লাগবে এই পতিতালয়ের মাটি।

আর এই পূণ্য মাটি জোগাড় করতে হবে মন্দিরের পুরোহিতকে। এই পূণ্য মাটি জোগাড় করার পদ্ধতি বড় অদ্ভুত। এই পদ্ধতিটি যেমন শাস্ত্রসম্মত তেমনি নাটকীয়। এখানে মন্দিরের পুরোহিতকে যে কোনও একটি পতিতালয়ে গিয়ে সেখানে দরজায় দরজায় ঘুরতে হবে সেই মাটির জন্য। দুর্গা মায়ের মূর্তি তৈরির জন্য এই জায়গায় ঘুরে তাদের প্রত্যেকের বাড়িতে একবার করে মাটি চাইতে যেতে হবে। মাটি না পাওয়া পর্যন্ত তাকে সেখানে অপেক্ষা করতে হবে। তারপর মাটি পাওয়া গেলে মন্ত্র পড়ে তারপর তাকে মাটি নিয়ে সেই মাটি দিয়ে মূর্তি তৈরি করতে হবে।

কিন্তু এই মাটি ব্যবহারের পিছনে আসল কারণ কী? পুরুষদের পূণ্য এই মাটিতে আছে বলে একেই 'পূণ্যমাটি' বলা হয় শাস্ত্রমতে। আর দুর্গাপুজোর মত একটা অনুষ্ঠানে এই রকম পূণ্য মাটি লাগবেই। মনে করা হয়, যদি পতিতাদের কেউ আশীর্বাদ না নিয়ে দুর্গা পুজো করেন তাহলে সেটা শুভ হয় না। তাই এই মাটি গ্রহণ করা মানে একদিক থেকে সমাজের ব্রাত্য মহিলাদের আশীর্বাদ প্রাপ্তি। মা দুর্গার কাছে সকল সন্তান এক সমান। তাই তিনি চেয়ে থাকেন যাতে সমাজের ব্রাত্যজনদেরও সবাই এক চোখে দেখুক। এই কারণেই এই মাটি ব্যবহার।

তবে, এই মাটি ব্যবহারের আরেকটি কারণ আছে এবং সেটার সঙ্গে সরাসরিভাবে যোগ রয়েছে শাস্ত্রের। কথিত আছে, এই দুর্গাপুজোয় মা দুর্গার ৯টি রূপের পুজো একসঙ্গে হয়। আর এই ৯ রূপের মধ্যে শেষ রূপটি পতিতালয়ের প্রতিনিধি হিসাবে উপস্থিত থাকে। ৮ কন্যার পরে নবম কন্যাও পুজো পায়।

তবে, এই প্রথা কিন্তু শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই প্রচলিত। বাংলার বাইরে আর কোথাও এই ধরনের কোনও প্রথা চলে না। কোনও বাধ্যবাধকতা নেই, কিন্তু বাংলার বাইরের কোনও পুজোয় এই নিয়ম পালন করা হয় না সাধারণত। বাংলায় দুর্গাপুজোর সময় এই যৌনকর্মীদের কিছুটা গুরুত্ব দেওয়ার জন্যই এই পন্থা অবলম্বন। তবে প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। সমাজের পতিতাদেরকেও সঠিক সম্মান দেওয়ার উদ্দেশ্যে যে মাটি ব্যবহারের রীতি পালন করা হয়, তার আসল উদ্দেশ্য কি আদৌ রক্ষা করা হয়? প্রত্যেক বছর পুজোয় এইসব পতিতাদের বাড়ি গিয়ে তাদের কাছ থেকে মাটি নিয়ে আসা হয়। তারপর সারা বছর তাদের কথা কেউ ভাবেই না। তারা যেখানে আছে, তাদের সেখানেই ফেলে রাখা হয়।

যারা প্রত্যেক বছর মাটি সংগ্রহ করে তা ব্যবহার করে মূর্তি বানিয়ে পুজো করেন, তারা যদি সমাজের এই মহিলাদের জীবনযাপনের মানোন্নয়নের জন্য সামান্য কিছুও করতেন, তাহলেও হয়তো এই রীতিপালনের আসল উদ্দেশ্য কিছুটা হলেও সফল হতো। কেউ কেউ হয়তো করেনও, কিন্তু বেশিরভাগেরই আগমন ঘটে শুধু দুর্গাপুজোর সময় এই পূণ্যমাটি নিতে।

লিখেছেন
Sourish Das
Sourish Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।