কোথায় মোদির 'আত্মনির্ভর'তা? কেন নিউজিল্যান্ডের ২০,০০০ কেজি উল লাগল সংসদের কার্পেটে?

New Parliament Carpet Controversy: ২০,০০০ কেজি নিউজিল্যান্ডের উল দিয়ে নতুন পার্লামেন্টে একটি বিশেষ কার্পেট তৈরি করা হয়েছে।

Zerin Hossain
৩ মিনিট
কোথায় মোদির 'আত্মনির্ভর'তা? কেন নিউজিল্যান্ডের ২০,০০০ কেজি উল লাগল সংসদের কার্পেটে?

প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'ভোকাল ফল লোকাল'। মানে নিজের জিনিসের জন্য ফলাও করে প্রচার করো। দেশ সমৃদ্ধ, তাই দেশের মানুষকে হতে হবে আত্মনির্ভর। খামোখা অন্য পণ্য উৎপাদনের জন্য বাইরের দেশের উপর নির্ভর করা কেন। আমদানি নয়, নিজের দেশের উৎপাদিত পণ্য দিয়েই দেশজ উৎপাদন বাড়াতে হবে। অথচ দেশের নয়া সংসদ ভবন গড়তে গিয়ে 'আত্মনির্ভর' রইলেন না নরেন্দ্র মোদি। পুরনো বৃত্তাকার আকৃতির সংসদ ভবনের জায়গায় ৬৫,০০০ বর্গ মিটার এলাকা জুড়ে নতুন ত্রিভুজাকার সংসদ ভবন গড়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ২৮ মে রবিবার বিনায়ক দামোদর সাভারকারের জন্মবার্ষিকীতে নতুন সংসদ ভবন উদ্বোধনও করেছেন। নানা বিতর্ক ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়াতে হইচই ফেলেছে। বিতর্ক স্তিমিতও হয়েছে। তবে দু'টি বিষয় নিয়ে সমালোচনা দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। আনুমানিক ৯৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই নতুন সংসদ ভবনে একটি কার্পেট নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। কেন?

কার্পেট তৈরি করতে গিয়ে নিউজিল্যান্ড থেকে আমদানি করা হয়েছে উল! ২০,০০০ কেজি নিউজিল্যান্ডের উল দিয়ে নতুন পার্লামেন্টে একটি বিশেষ কার্পেট তৈরি করা হয়েছে। দেশে তো পর্যাপ্ত উল উৎপাদন হয়। তা সত্ত্বেও বিদেশ থেকে উল আমদানি কেন? কেন সংসদ ভবনের বেলা 'লোকাল'-এর জন্য 'ভোকাল' হলেন না মোদি?

আরটিইআই অ্যাক্টিভিস্ট সাকেত গোখলে বলছেন, "একদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন ভোকাল ফর লোকাল যার অর্থ হচ্ছে আত্মনির্ভর ভারত, আর অন্যদিকে সরকার নতুন সংসদের জন্য নিউজিল্যান্ডের থেকে উল আমদানি করাকেই পছন্দ করছেন। সাকেত জানান, ভারতীয় উলের রপ্তানি ভারতের মোট রপ্তানির ৭% নিয়ে গঠিত। উল শিল্পে ৩২ লাখেরও বেশি ভারতীয় কাজ করে। তাহলে নিউজিল্যান্ড থেকে উল আমদানি করে ভারতীয় উল উৎপাদকদের কেন বঞ্চিত করা হয়েছে? প্রশ্ন উঠছেই।

"প্রায় ৩১৪ টি তাঁত এবং ৯০০ জনেরও বেশি তাঁতি এই কার্পেট বুনেছেন ৫ মাস ধরে," জানান মাস্টার তাঁতি গণেশ মৌর্য। লোকসভার কক্ষে ময়ূর পালকের মোটিফের কার্পেট তৈরি করেছে। ৩৮ টি শেড ব্যবহার করা হয়েছিল এর একটি ওম্ব্রে তৈরি করতে। অন্যদিকে রাজ্যসভার কক্ষের কার্পেটের মোটিফ জাতীয় ফুল পদ্ম। হালকা গোলাপি থেকে গভীর লাল রঙের এই কার্পেট। দর্শক এবং মিডিয়া গ্যালারির জন্য আবার রয়েছে আলাদা কার্পেট। ৭০% এরও বেশি তাঁতিই স্থানীয় এবং বাকিরা প্রতিবেশী রাজ্যের। তাছাড়া ১২০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে দুই সভার বিভিন্ন নকশা।

নতুন চারতলা সংসদ ভবনটিতে ১,২৭২ জন সংসদ সদস্যের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। যার মধ্যে লোকসভায় ৮৮৮ জন সদস্য এবং রাজ্যসভায় ৩৮৪ জন সদস্যের ধারণক্ষমতা রয়েছে। পুরনো সংসদ ভবনকে জাদুঘরে রূপান্তরিত করা হবে বলেও জানানো হয়েছে।

উলের পাশাপাশি নতুন পার্লামেন্টের ভেতরে নির্মিত ‘অখণ্ড ভারত’ ধারণায় নির্মিত ম্যুরাল নিয়েও বিতর্ক শুরু হয়েছে। এই ম্যুরালে দেখানো হয়েছে গৌতম বুদ্ধর জন্মস্থান লুম্বিনি। এটি আধুনিক ভারতের সীমানার বাইরে এবং নেপালের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলির মধ্যে অন্যতম। এই ম্যুরালে বর্তমান আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, মায়ানমার, থাইল্যান্ড এবং শ্রীলাঙ্কাকে পূর্ব ভারতের অংশ হিসাবে দেখানো হয়েছে। এই খবরের পর সর্বপ্রথম নেপালে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। গত সপ্তাহেই নেপালের প্রধানমন্ত্রী পুষ্প কমল দাহালের ভারত সফরের আগে, দেশটির রাজনৈতিক নেতারা তাঁকে বিষয়টি ভারতে উত্থাপন করার এবং ম্যুরালটি সরিয়ে ফেলার জন্য অনুরোধ করেন। ম্যুরাল বিতর্কের মধ্যেই নেপালের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরটি ছিল বেশ অস্বস্তিকর। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রকও ম্যুরালটির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়।

কাঠমাণ্ডু ও ইসলামাবাদের পর ঢাকার রাজনৈতিক মহলেও এই ম্যুরালের বিষয়টি সদ্য উত্থাপিত হয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের মতে, “ম্যুরালটি প্রাগৈতিহাসিক অশোকান সাম্রাজ্যের বিস্তারকে চিত্রিত করেছে সুতরাং রাজনীতির সঙ্গে এটার কোনও সম্পর্ক নেই, যদিও ব্যাপারটি বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে।” ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের কাছে বাংলাদেশ বিদেশ মন্ত্রকের তরফে ম্যুরাল বিষয়ে ব্যাখ্যাও চাওয়া হয়েছে।

নতুন সংসদের ভিতরের একটি বিভাগ হচ্ছে আর্ট গ্যালারি। এই গ্যালারিতে ভারতের ঐতিহাসিক কিছু ঘটনা এবং ভারতের ইতিহাসের কিছু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের ভাস্কর্য প্রর্দশিত হয়েছে। এই ‘অখণ্ড ভারত’ ধারণার ম্যুরালটিও আর্ট গ্যালারি বিভাগেই নির্মিত। নতুন সংসদ ভবনের আর্ট গ্যালারিতে ৩৫০ জনেরও বেশি কারিগরের কাজ প্রদর্শিত হয়েছে । প্রদর্শিত ভাস্কর্যের মধ্যে রয়েছে- রাম, লক্ষ্মণ, সীতা, ইন্দ্রদেব, বুদ্ধ, চাণক্য, আওরঙ্গজেব, পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল, বিনায়ক দামোদার সাভারকার, চিত্তরঞ্জন দাস, সুভাষ চন্দ্র বসু, বিআর আম্বেদকর প্রমুখ। এছাড়াও রয়েছে অশোক চক্রের ভাস্কর্য, মুদ্রার ভাস্কর্য, সমুদ্র মন্থন ভাস্কর্য ইত্যাদি।

তবে নতুন সংসদ ভবনের কোথাও মহাত্মা গান্ধিকে সেইভাবে রাখাই হয়নি। পুরনো সংসদ ভবনে স্থাপিত মহাত্মা গান্ধির ১৬ ফুট উঁচু মূর্তিটি তাড়াহুড়ো করে প্রধান দরজা থেকে ৩ নম্বর দরজার দৃশ্যমান জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। বাকি সংসদে পুরাণ, রামায়ণের দাপটের পাশে জাতির জনক যে ফিকে পড়বেন, এ তো জানা কথাই।

লিখেছেন
Zerin Hossain
Zerin Hossain
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর বির্তক: যে খবর স্বাভাবিক হওয়ার কথা, সেটাই আজ বিস্ময়

Gyanesh Kumar, SIR and Election Commission: এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন প্রক্রিয়া চালানো হল? জ্ঞানেশ কুমার কীভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হলেন? ২০২৩ সালে আইন বদলে প্রধান বিচারপতিকে নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটি থেকে সরানো হল কেন? এতদিন এই প্রশ্নগুলি গণমাধ্যম তুলল না কেন?

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।