একে একে নিভিছে দেউটি, এবার বন্ধ হল কলকাতার প্রথম মোমো ঠেক 'টিবেটিয়ান ডিলাইট'

Tibetan Delight Shuts Down: এ সকলই ছিল। কারণ 'টিবেটিয়ান ডিলাইট' আর নেই। বাঙালির স্বাদের তিব্বতি স্বর্গে তালা পড়ে গিয়েছে বৃহস্পতিবার।

Sohini Das
৩ মিনিট
একে একে নিভিছে দেউটি, এবার বন্ধ হল কলকাতার প্রথম মোমো ঠেক 'টিবেটিয়ান ডিলাইট'

তখনও মোবাইলের বোতাম টিপলেই খাবার এসে হাজির হত না বাড়ির দরজায়। তখনও শহরের আনাচে কানাচে গড়ে ওঠেনি 'ওয়াও মোমো' বা 'মোমো আই অ্যাম'-এর বেসাতি। সেসময় কলেজ পড়ুয়া থেকে ভোজনবিলাসীদের কাছে তিব্বতি খাবারের ওয়ান স্টপ সলিউশন ছিল 'টিবেটিয়ান ডিলাইট'। কার্যত কলকাতার সঙ্গে সেদিন মোমোর পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল সে-ই। ক্রমে মানুষ জানতে শুরু করল মোমো আর থুকপা ছাড়াও শত সহস্র সুস্বাদু তিব্বতি খাবারের অস্তিত্ব পৃথিবীতে আছে। আর এই সত্যের মালুম বেশ পাওয়া যেত চৌরঙ্গির এই একফালি আস্তানায় ঢুকলেই।

চারদিকে সোনা-রূপো গহনার দোকান। যেদিকেই চোখ রাখবেন, দেখবেন লক্ষ্মীবাবুর সোনার দোকান। আসল লক্ষ্মী কোন জন ঠাহর করা কঠিন! কিন্তু কলকাতার আসল তিব্বতি খাবারের ঠিকানার খোঁজ কিন্তু ঠিক ততটা কঠিন ছিল না। সরু অন্ধকার একফালি গলি, সেই গলি ধরে হাঁটতে শুরু করলেই মিলত সেই খানা খাজানা। পুরনো কলকাতার ঐতিহ্যবাহী তিব্বতি খাবারের সেরা ঠিকানা টিবেটিয়ান ডিলাইট। অন্ধকার ঘর, একটা দু'টো চিনে লণ্ঠের মিনিমালাইজ সাজসজ্জা। দু'টো-তিনটে চেয়ার। কিন্তু রবিগানের মতো 'টিবেটিয়ান ডিলাইট'-ও 'রূপে তোমায়' ভোলাতো না। চিনে খাবার, কিন্তু গড়পরতা মোমোর স্বাদের থেকে এ ছিল যেন আকাশ-পাতাল আলাদা।

এ সকলই ছিল। কারণ 'টিবেটিয়ান ডিলাইট' আর নেই। ৬৬/১, চৌরঙ্গী রোডের বাঙালির সেই সাধের তিব্বতি স্বর্গে তালা পড়ে গিয়েছে বৃহস্পতিবার। পুরনো কলকাতার সমস্ত চিহ্ন যেন একে একে খসে যাচ্ছে। কিছুদিন আগেই শোনা গেল, বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কলকাতার পুরনো নিলামখানা। এবার পালা 'টিবেটিয়ান ডিলাইট'-এর। রাজ্যের দূষণ নিয়ন্ত্রন বোর্ডের চিঠি এসেছে। এবার চিরতরে ঝাঁপ পড়ার পালা। একে একে কেটে দেওয়া হয়েছে রেস্তরাঁর বিদ্যুৎ ও জলসংযোগ। একাধিক বার চিঠি দিয়ে রেস্তরাঁর চিমনির উচ্চতা কাছের উঁচু বহুতলগুলি থেকে বাড়াতে বলা হয়েছিল। কিন্তু সে কাজে ব্যর্থ হয় 'টিবেটিয়ান ডিলাইটস' কর্তৃপক্ষ।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
৬০০ বছরের ঐতিহাসিক পাহাড়ি খাবার! মোমো কীভাবে ভারতে এল জানলে চমকে যাবেন...

History of Momo: নেপালে মোমোর জন্ম। মোমোর ইতিহাস খুঁড়তে গেলে যেতে হবে চতুর্দশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে।

২৭ জানুয়ারিই রেস্তরাঁ বন্ধের নির্দেশ এসেছিল। কাছাকাছি বহুতলগুলির থেকে অন্তত ৩.৫ মিটার বাড়াতে হবে চিমনির উচ্চতা। আকাশ ছোঁয়া কি আর মুখের কথা! অগত্যা ঝাঁপ পড়ল ঐতিহ্যশালী তিব্বতি খাবারের চিরন্তন আস্তানায়। কীভাবে যেন ইতিহাসের পাতায় চলে গেল কলকাতা শহরের একটা আস্ত নস্টালজিয়া। এ অবশ্য প্রথম বার নয়। এর আগেও দু'বার ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইবুনাল ও দূষণ নিয়ন্ত্রন বোর্ডের লাল চোখে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল রেস্তরাঁ। আড়াই বছর আগে একবার, আর একবার মাস ছয়েক আগে। তার পরেও কলকাতাবাসীর কথা ভেবে ফের খুলেছে তিব্বতি খাবারের ঠেক।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মন তার মরে গেছে কবেই

The Soul Of Kolkata: গাড়ি এগোতেই চোখে পড়ে পুরনো নিলামঘরটা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বুঝতে পারি যে কলকাতা শহরের নেশায় ভেসে ভেসে এতদূর এসেছি, সে শহরটার চোখে মুখে বীভৎস মেকআপ, রূপ তার জ্বলে গেছে।

১৯৮১ সালে জন্ম 'টিবেটিয়ান ডিলাইট'-এর। জিৎবাদল মুখিয়া এবং তাঁর পুত্র উদয় মুখিয়ার হাত ধরে শুরু হল ব্যবসা। উদয়ের প্রপিতামহ দার্জিলিং-এর মানুষ। কিন্তু পরবর্তী প্রজন্ম-র জন্ম এবং বড় হয়ে ওঠা এই শহরেই। এখন দোকানের দায়ভার জিৎবাদলের পুত্রবধূ নিমা মুখিয়ার হাতেই। নাতনি, অমৃতাও দেখেন মাঝে মাঝে। নিমা সমস্ত অভিযোগই মেনেছেন। কিন্তু তেমন কিছু করতে পারেননি এ নিয়ে। সিভিক বডির লাইসেন্স তাদের কাছে ছিল। কিন্তু রেস্তরাঁ চালাতে গেলে যে পরিবেশ দূষণ বোর্ডের অনুমতি ও ফায়ার লাইসেন্স লাগে, তা জানতেনই না বৃদ্ধ নিমা। আশপাশের অধিকাংশ রেস্তরাঁরই তো সেইসব লাইসেন্স নেই। তার জন্য ৫০ হাজার টাকা জরিমানাও দিয়েছিল রেস্তরাঁ কর্তৃপক্ষ। এমনকী এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বা ইটিপি-চিমনিও বসায় তারা। এমনকী চিমনির দৈর্ঘ্য বাড়ানোর চেষ্টাও যে একেবারে করেননি তা নয়, কিন্তু তার জন্য তো বিদ্যুৎ লাগে ওয়েল্ডিংয়ের জন্য। সেটা যে অনেকদিন ধরেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে তাদের রেস্তরাঁয়।

এর পিছনে ওই জায়গাটির মালিক অর্থাৎ বাড়িওয়ালা এবং প্রোমোটারদের হাত রয়েছে বলেই অভিযোগ করেছেন নিমারা। বারবার তাদের বিরুদ্ধে নালিশ ঠুকে ঠুকে রেস্তরাঁ বন্ধের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানাচ্ছেন তাঁরা। অন্য কিছু নয়, এত বছর ধরে ক্রেতাদের মন ভরিয়েই টিকে থেকেছে 'টিবেটিয়ান ডিলাইট'। তবে গত দিন কয়েকে অসংখ্য অতিথি তাঁদের রেস্তরাঁয় এসে ফিরে গিয়েছেন। সত্যি কথা বলতে, কোনও ভাবে চিমনির উচ্চতা বাড়িয়ে ফের পারিবারিক এই ব্যবসাকে চালু করতে চান বলেই জানিয়েছেন নিমার পুত্রবধূ রিকি।

সুস্বাদু রোস্ট চিলি পর্ক, বা দুর্দান্ত সেই চিকেন কোথে বা স্বর্গীয় সেই মোমোর স্বাদ কি আর কলকাতার মানুষ পাবেন? আকাল কাটিয়ে ফিরতে পারবে প্রিয় 'টিবেটিয়ান ডিলাইট'? আপাতত সেই প্রত্যাশাই বোধহয় প্রার্থনার মতো ফিরছে কলকাতার খাদ্যপ্রিয় সমস্ত বাসিন্দার ঠোঁটে ঠোঁটে। ইতিহাসের পাতা থেকে ফের 'জিয়া নস্টাল' করতে ফিরে আসুক তিব্বতি খাবারের জনপ্রিয় এই ঠেক।

লিখেছেন
Sohini Das
Sohini Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।