অন্ধদের শহরের রূপকথা!

Anasuya Sen
৩ মিনিট
অন্ধদের শহরের রূপকথা!

মাত্র ৮ বছর বয়সেই লিওন পোর্জ ক্রমাগত তার চোখের দৃষ্টি খোয়াতে শুরু করেছিল কোনও এক জন্মগত কারণে | রোগটি প্রথম ধরা পরে যখন তাকে একটি কম্পিউটার দেওয়া হয় চর্চা করার জন্য | সেই কম্পিউটার মেশিন নির্গত যে সমস্ত শব্দ ও স্বর তাকে বিভিন্ন ওয়েবসাইট এবং ইলেকট্রনিক টেক্সটের পাঠ নিতে সাহায্য করত, তাদের গতিকে দ্রুততর করার কায়দা লিওন যখন আয়ত্ত করে নিয়েছিল তখন তার বয়স মাত্র ৯ | এরফলে ওয়েবসাইটগুলি থেকে পাওয়া যায় এমন সমস্ত তথ্য সে অত্যন্ত দ্রুত করে ফেলতে পারত | বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে সাধারণত যে গতিতে শব্দ ও স্বরের মাধ্যমে তথ্যগুলির পাঠ দেওয়া হয় তার তুলনায় পাঁচগুণ গতির তথ্যপাঠ লিওন এখন তার শ্রবণশক্তিতে ধারণ করতে পারে, যা একটি অপ্রশিক্ষিত ও সাধারণ মানের শ্রবণশক্তিযুক্ত মানুষের কাছে বোধগম্য নয় |

লিওনের বেড়ে ওঠা মধ্য জার্মানির একটি শহরে | সেখান থেকে কাছেই রয়েছে আরেকটি গাছপালা ও শ্যামলিমায় ঘেরা শহর, নাম মার্বার্গ | এই মধ্যযুগীয় শহরটি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বিখ্যাত | অন্ধ ছেলে-মেয়েদের বিশেষ ভাবে প্রশিক্ষিত করার কাজে বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন একটি স্কুল আছে এই মার্বার্গ শহরে | সেই স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই বিজ্ঞান চর্চার প্রতি লিওনের আগ্রহ সত্যি সত্যি বেড়ে ওঠে | এই আগ্রহ এবং ওই স্কুলের শিক্ষা লিওনকে নানা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের দিকে এগিয়ে দেয় |

এই স্কুল আজ মার্বার্গ শহরের গর্ব | অন্ধ এবং ক্ষতিগ্রস্ত দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন মানুষদের আশ্রয় এবং সেবাদানে বিশেষ দক্ষতা ও নিষ্ঠার কারণে মানুষ এই শহরটির নাম রেখেছে 'ব্লাইন্ডেনস্টাট' বা 'ব্লিস্টা' | প্রথম বিশ্বযুদ্ধের তান্ডবে যে সমস্ত তরুণ ছেলে - মেয়ে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছিল, মূলতঃ তাদের সাহায্যার্থেই এই স্কুলটির প্রতিষ্ঠা হয়েছিল | সেই থেকে অন্ধ মানুষদের শক্তি জোগানোর উদ্দেশ্যে এই স্কুল একের পর এক গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে |

এই সব গবেষণার পাশাপাশি গোটা মার্বার্গ শহরটাকে এমন ভাবে আধুনিক সরঞ্জামে সাজানো হয়েছে যা সর্বার্থে অন্ধ মানুষদের স্বাধীনভাবে চলাফেরার কাজে প্রতি পদে সাহায্য করে | চতুর্দিকে নানা রকমের পথনির্দেশক যন্ত্রের ঠকঠক ঠনঠন শব্দ অন্ধ মানুষদের পথ চলতে ইশারা দিয়ে সাহায্য করে | ফুটপাথের ওপরকার বাম্পগুলি এবং কিনারাগুলি এমন ভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে অন্ধ মানুষেরা স্পর্শের মাধ্যমেই বুঝে নিতে পারে কোথায় বাধা আছে | শহরের বিভিন্ন বাড়ির নকশা এবং ফ্লোর-প্ল্যান বাড়ির সামনে এমনভাবে সাজিয়ে রাখা আছে যে অন্ধ মানুষেরা স্পর্শেন্দ্রীয়ের মাধ্যমে সেগুলি বুঝে নিতে পারে | মার্বার্গ শহরের প্রাচীন দুর্গ, টাউন স্কোয়ার এবং অন্য দর্শনীয় স্থানের ব্রোঞ্জ-মডেলের ক্ষুদ্র সংস্করণ এমনভাবে প্রকাশ্য স্থানে সাজিয়ে রাখা আছে যে অন্ধ যাত্রীরাও সেই সব গুরুত্বপূর্ণ স্থানের পরিপূর্ণ অনুভব ও আন্দাজ পেতে পারে |

মার্বার্গ শহরের প্রাকৃতিক অবস্থানটিও এই সমস্ত আয়োজনের পক্ষে সর্বার্থেই অনুকূল | এটি একটি ছোট পাহাড়ি শহর | পাহাড়ি শহর হওয়ার ফলে, সেখানে একজন অন্ধ মানুষ ওপর দিকে যাচ্ছে অথবা নিচের দিকে নামছে এই বিষয়টির ওপর নজরদারি চালিয়ে অন্ধ মানুষটিকে সহজে পথনির্দেশ দেওয়া যায় | সারা মার্বার্গ শহর জুড়ে অন্ধ মানুষদের অবসর যাপনের ও বিনোদনের জন্য বিভিন্ন আয়োজন আছে | যেমন অন্ধদের জন্য ঘোড়ায় - চড়া শেখানোর স্কুল | যেমন অন্ধদের জন্য নৌকাবিহার, ফুটবল, পাহাড়ে চড়া এবং বরফের ওপর ছোড়ে বেড়ানো শেখার ক্লাব | মার্বার্গ শহরে যে বিশ্ববিদ্যালয়টি আছে তার অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রীই অন্ধ, যারা বিভিন্ন বিষয় শিক্ষালাভ করেছে এবং পাঠান্তে বিভিন্ন সম্মানজনক ডিগ্রীলাভ করেছে |

ব্লিস্টার অন্ধ ছাত্র-ছাত্রীরাও অনেক গবেষণাধর্মী কাজ করেছে এবং অন্ধ-সহায়ক বস্তুর উদ্ভাবন করেছে | অন্ধ ছাত্র-ছাত্রীরা যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশুনা করার এবং গবেষণা করার সুযোগ পায়, সে বিষয়েও তারা তৎপরতা দেখায় | উচ্চশিক্ষার ব্যাপারে তাদের পছন্দের বিষয়গুলির মধ্যে অন্যতম হল আইন এবং মনস্তত্ত্ববিদ্যা | বিষয়গুলির পাঠবস্তু সুদীর্ঘ, গভীরতাপূর্ণ এবং স্ক্রিন রিডারের মাধ্যমে সেগুলি সহজে পড়া যায় বলে জনপ্রিয়ও বটে | বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা এবং অন্ধ ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের যৌথপ্রচেষ্টায় আর একটি বাধার প্রাচীর অতিক্রম করেছে | এতকাল অন্ধ ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য প্রকৃতিবিজ্ঞান চর্চার সুযোগ ছিল না | এবার সেই বাধাও সরিয়ে ফেলা হল |

লিওন পোর্জ, যার কথা দিয়ে এই প্রতিবেদন শুরু হয়েছে, সে এখন ডাসেলডর্ফে বায়োকেমিস্ট্রি এবং কম্পিউটার বিজ্ঞানের ছাত্র | বায়োকেমিস্ট্রি বিষয়ের অন্ধ ছাত্র হিসেবে সেই প্রথম |

কেমিস্ট্রির চর্চা করতে গেলে প্রচুর ল্যাবরেটরির কাজ করতে হয়, যা অন্ধ ছাত্র -ছাত্রীদের পক্ষে কষ্টসাধ্য | এর সঙ্গে প্রচুর ইমেজ, চার্ট এবং গ্রাফের থেকেও পাঠ নিতে হয় | এই সব কারণে কেমিস্ট্রি চর্চার দরজা অন্ধ ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য একরকম বন্ধই ছিল | কিন্তু কেমিস্ট্রির বিখ্যাত শিক্ষক টোবিয়াস মাঙ্কে, যিনি মার্বার্গ-এর কার্ল স্ট্রেল স্কুলে লিওন পোর্জ-এর শিক্ষক ছিলেন, মতপ্রকাশ করেছেন যে কেমিস্ট্রি নিয়ে পড়াশুনার ব্যাপারে অন্ধ ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য এত বিধি-নিষেধ থাকা উচিত নয় | সে সব বিধি-নিষেধ অযৌক্তিক | মাঙ্কে বলেছেন - "কোনও মানুষই অণু দেখতে পান না, কোনও মানুষই পরমাণু দেখতে পান না | তা সত্ত্বেও কেমিস্ট্রির চর্চা সকলের কাছে এত দৃষ্টিগোচর| তার কারণ কী? দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন মানুষেরা যখন ওই বস্তুগুলির কিছুই দেখতে পায় না, তখন অন্ধ মানুষেরা সে সব বিষয়ে চর্চা করতে গেলে তার পথে কোনও অসুবিধা সৃষ্টি করা উচিত নয় |"

লিখেছেন
Anasuya Sen
Anasuya Sen
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।