গায়ে জাতীয় দলের জার্সি, মনে চিকিৎসার মন্ত্র, বিশ্বের বিস্ময় আফগান শরণার্থী নাদিয়া নাদিম

Piya Saha
৪ মিনিট
গায়ে জাতীয় দলের জার্সি, মনে চিকিৎসার মন্ত্র, বিশ্বের বিস্ময় আফগান শরণার্থী নাদিয়া নাদিম

সব রিফিউজিদের জীবনের গল্পই মোটামুটি একরকম। সাপলুডো খেলার এই জীবনে স্বপ্নই তাঁকে নতুন করে বাঁচতে শেখায়। সব হারিয়েও দিনবদলের স্বপ্ন জাপটে ধরে নতুন উদ্যমে কাজে লেগে পড়েন। বেশির ভাগই গড্ডালিকাপ্রবাহে গা ভাসিয়ে দেন, দিতে বাধ্য হন। তবে এমন বিরলতম মানুষও থাকেন যিনি বেয়নেটের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে পারেন, ভরসা দিতে পারেন অজুত মানুষকে। আর এমন হার না মানা জেদকে আটকাবে কে? ইতিহাসের নিয়মটাই এই, সব বাঁধা কাটিয়ে মধ্যগগনে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মত উদয় হয় এই অকুতোভয় পুরুষ নারীর। সারাবিশ্ব তখন লড়াকু শক্তিকে সেলাম ঠোকে। এমনই এক উজ্জ্বল নক্ষত্র নাদিয়া নাদিম, আফগান ফুটবল তারকা। বাবার মৃত্যু, শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় আর সেখান থেকে ম্যানচেস্টার সিটির ফুটবল দলে জায়গা করে নেওয়া, ১১টি ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারা, ডাক্তারি পাশ করা- নাদিয়া নাদিম যেন লড়াই শব্দটির প্রতিশব্দ হয়ে উঠেছেন অভিধানে।

ফিরে দেখা লড়াইয়ের সেই দিনগুলি

নাম নাদিয়া নাদিম। জন্ম ১৯৮৮ সালের ২ জানুয়ারি আফগানিস্তানের হেরাতে। বাবা মা ছাড়াও চার বোন নিয়ে তাঁর পরিবার আফগানিস্তানেই থাকতেন। বাবা রাবানি নাদিম আফগান সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। তালিবান গোষ্ঠী আফগানিস্তানের ক্ষমতার দখল নিতে শুরু করলে রাবানিকে বৈঠকের জন্য ডেকে পাঠিয়েছিলেন তাঁরা। পরের ছ'মাস আর খোঁজ মেলেনি তাঁর। পরে একদিন নাদিয়ার মা হামিদা জানতে পারেন তালিবানের হাতে নিহত হয়েছেন রাবানি। নাদিয়ার বয়স তখন মাত্র ১১। তাঁর কথায়, 'সেই সময়টা ছিল বিভীষিকার মত। আপনারা হয়তো তালিবান সম্পর্কে অনেক কথাই শুনেছেন।তাঁরা আফগান মানুষের মন ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল। আমি সবকিছু স্বচক্ষে দেখিনি কারণ সে সময় আমাদের একা বাড়ি থেকে বেরোনোর অনুমতি ছিল না কিন্তু চারিদিকের কথা কানে আসত '। নাদিয়া আরও জানান,"পৃথিবীর অন্যান্য স্বৈরতন্ত্রের মতোই তালিবানরা ক্ষমতা দখলের জন্য আফগান সরকারের যে সব উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মীদের খুন করেছেন আমার বাবা তাঁদের একজন। আমরা ভেবেছিলাম হয়তো তাঁরা বাবাকে জেলবন্দি করবে"। সেই থেকেই লড়াই শুরু নাদিয়া ও তাঁর পরিবারের। সেসময় আফগান মহিলাদের কোনো পুরুষ ছাড়া বাইরে বেড়ানোর অনুমতি ছিল না। মেয়েদের পড়াশোনা, গান শোনা এমনকী টেলিভশন দেখাও মানা ছিল। পুরুষরা জিন্স পড়তে পারবে না,এমনকী তাঁদের দাঁড়ি রাখতেই হবে"।

এমন পরিস্থতিতে বহু কষ্টে আফগানিস্তান ত্যাগ করে নাদিম পরিবার, দেশছাড়ার যন্ত্রণা যে ছেড়েছে সেই শুধু জানে। হামিদা তাঁদের সমস্ত জমি,বাড়ি, গাড়ি এবং গয়না বিক্রি করে টাকা জোগাড় করেন দেশ ছাড়ার। তারপর একদিন মধ্যরাতে ছোট একটি ভ্যানে করে সুন্দর ভবিষ্যতের খোঁজে রওনা হন নাদিয়া ও তাঁর পরিবার। পাকিস্তান বর্ডার পেরিয়ে দুমাস লুকিয়ে থাকেন করাচিতে। নকল পাসপোর্ট বানিয়ে কোনোক্রমে ইতালি এসে পৌঁছান। এরপর বেশ কিছু রাত কেটেছিল একটি লন্ডনগামী ট্রাকের মধ্যে। কিন্তু ভাগ্য তাঁকে পৌঁছে দিয়েছিল ডেনমার্কের প্রত্যন্ত এক গ্রামের শরণার্থী শিবিরে। সেদিন ওই শিবিরে কর্মরত এক ব্যক্তি ক্ষুধার্ত নাদিয়ার হাতে তুলে দিয়েছিলেন দুধ, টোস্ট এবং একটি কলা।

২১ বছর পরে সেই দিনের স্মৃতি হাতড়ে নাদিয়া জানিয়েছেন,' শরণার্থী শিবিরের ওই ঘটনায় আমার জীবনের সেরা মুহূর্ত। সেই খাবারের মূল্য হয়তো খুব বেশি হলে ২ পাউন্ড হবে কিন্তু এই খাবারটুকু আমি সারাজীবন মনে রাখব। একজন মানুষ হিসেবে ওই ঘটনাটি আমাকে ভাবতে বাধ্য করেছিল যে আমি অন্যদের জন্য কী করতে চাই!' সব মিলিয়ে মোট ন’মাস ডেনমার্কের সেই শিবিরে কাটিয়েছিলেন নাদিয়া ও তাঁর পরিবার।

দিনবদলের গল্প

শরণার্থী শিবিরে ধীরে ধীরে জীবন বদলাতে শুরু করে নাদিয়ার। একদিন শিবিরের কাছে একদল মেয়েকে ফুটবল খেলতে দেখে সে। নাদিয়া সেই দৃশ্য মনে করে বলেছেন ,' প্রথমদিকে ভয় পেতাম.... কাঁটাতারের বাইরে দাঁড়িয়ে মেয়েদের ফুটবল খেলা দেখতাম। আমার স্পষ্ট মনে আছে যে প্রথমবার তাঁদের ফুটবল খেলতে দেখে মনে হয়েছিল আমিও মাঠে যেতে চাই। চারিদিকের সবকিছু থমকে গিয়েছিল সেদিন।'

পরের দু'মাস টানা প্রশিক্ষণের পর প্রথম ম্যাচ খেলতে নামলেন দলের জার্সি গায়ে। ডেনমার্কের স্থায়ী নাগরিকত্ব মিলতেই নাদিয়ার পেশাগত ফুটবল খেলা শুরু হয়। আলবর্গ ক্লাবের হয়ে প্রথম খেলেন নাদিয়া। এরপর জীবন খানিক সিনেমার গল্পের মতোই। ওই বছরের শেষে ভাইবর্গে যোগ দেন । এরপর প্রায় ১০ বছর ডেনমার্কের একাধিক ক্লাবের নির্ভরযোগ্য স্ট্রাইকার হয়ে খেলেছেন নাদিয়া। ২০০৯ সালে ডেনমার্কের জাতীয় দলের খেলার সুযোগ পান এই ফুটবল রমণী। নাদিয়াই ডেনমার্কের প্রথম ফুটবলার যিনি জন্মসূত্রে ড্যানিশ নন। দেশের হয়ে ৯৯ ম্যাচে ৩৮ টি গোল রয়েছে নাদিয়ার ঝুলিতে।

২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্কাই ব্লু এফসির হয়ে মাঠে নামেন আফগান এই তরুণী। ২০১৮ সালে ম্যানচেস্টার সিটির জার্সি গায়ে ওঠে নাদিয়ার। সেখানে এক বছর কাটিয়ে প্যারিসের সঁ জঁ ক্লাবে তিনি যোগ দেন ২০১৯ সালে। সহ অধিনায়ক হিসেবে খেলে প্রথমবার লিগ খেতাব জিতে নেয় তাঁর ক্লাব। ওই মরশুমে ২৭ ম্যাচে ১৮ টি গোল করেন নাদিয়া। গত বছর থেকে মার্কিন লিগ ফুটবলে রেসিং লুইভিল ক্লাবের হয়ে খেলা শুরু করেছেন তিনি। অনেকই মনে করেন ৩৪ বছরের নাদিয়াই সর্বকালের সেরা আফগান মহিলা ফুটবলার। তবে এখানেই নিজেকে থামিয়ে রাখেননি নাদিয়া। ফুটবলের পাশাপাশি পাঁচ বছর ধরে চালিয়ে গেছেন ডাক্তারির পড়াশোনাও। আজ নাদিয়া একজন প্রতিষ্ঠিত ডাক্তারও। সম্প্রতি ট্যুইট করে জানিয়েছেন," যাঁরা প্রথম দিন থেকে আমাকে সমর্থন করেছেন এবং যাত্রাপথে যে সকল মানুষকে নতুন বন্ধু হিসেবে পেয়েছি,তাঁদের সবাইকে ধন্যবাদ'। ১১ টি ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারেন নাদিয়া।

আফগান মহিলা ও শিশুদের অধিকার নিয়েও সরব হয়েছেন এই মেয়ে। নাদিয়ার মত, যত খারাপ সময়ই আসুক না কেন, হাল ছাড়লে চলবে না। বিশ্বাস রাখতে হবে ,একদিন ঠিক সময় বদলাবে। ইতিবাচক মানসিকতা ও চিন্তাধারাই আপনার জীবন বদলে দেবে। আজও অগ্নিপরীক্ষা দিচ্ছেন বহু আফগান নারী। কঠিন সময়ে নাদিয়ার জীবন এবং তাঁর লড়াই জীবনে ঘুরে দাঁড়াবার মন্ত্র দিয়ে যাচ্ছে তাদের কানে।

লিখেছেন
Piya Saha
Piya Saha
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

নারী টেস্টে এত অনীহা কেন, লর্ডসের ইতিহাসও বদলাবে না সেই ছবি?

Women’s Test Cricket: লর্ডসে ভারতের নারী ক্রিকেট দলের ঐতিহাসিক জয় নারী টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ বদলানোর সুযোগ এনে দিয়েছে? এত সাফল্য ও জনপ্রিয়তার পরও কেন এই ফরম্যাটে নিয়মিত ম্যাচ নেই?

শিব-পরশুরামের যুদ্ধবিদ্যা কালারিপায়াট্টু থেকেই জন্ম কুংফুর!

Kalaripayattu Indian Martial Art: ভারতীয় পৌরাণিক ঐতিহ্যে কালারিপায়াট্টুকে স্রেফ যুদ্ধের কৌশল হিসেবে দেখা হয়নি, বরং এটিকে মানব শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রাণশক্তিকে জাগিয়ে তোলার এক মহান সাধনা বলে মনে করা হয়।

দু'হাজার বছর পুরনো ‘আত্য পাত্যা’: এই খেলাই শিখিয়েছিল যুদ্ধের কৌশল!

Atya Patya Traditional Indian Game: আনুমানিক ১০০ থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত প্রাচীন তামিল সাঙ্গম সাহিত্য ‘নাটতৃণৈ’-তে এই খেলার প্রথম লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায়। অতএব, এই খেলার বয়স প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি। সেখানে বলা আছে, প্রাচীন চোল রাজবংশের সেনারা যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার আগে নিজেদের ক্ষিপ্রতা, দ্রুত দৌড়ানোর ক্ষমতা আর শরীরকে এক নিমেষে বাঁকানোর চপলতা বাড়াতে এই খেলায় মেতে উঠত।

১৬ বছর পর ফের ভারতের পথে ললিত মোদী

Lalit Modi return to India: দীর্ঘ সময় পর দিল্লির আপিল ট্রাইব্যুনাল তাঁর বিরুদ্ধে থাকা আর্থিক অনিয়মের বড় অভিযোগ ও জরিমানা বাতিল করে দেওয়ার পরেই এই আলোচনার সূত্রপাত। সোশ্যাল মিডিয়ায় ললিত মোদী নিজেই স্পষ্ট করেছেন, সমস্ত বড়সড় আইনি জটিলতা কাটার পর ২০২৬ সালের শেষ দিকে অথবা ২০২৭-এর শুরুতেই ফের তিনি ভারতে পা রাখতে চলেছেন।

গোলের আড়ালে ঘৃণার খেলা: ২০২৬ বিশ্বকাপে ট্রাম্প, ফিফা আর ফুটবলের পরাজয়

Trump FIFA World Cup: এই বিশ্বকাপ শুধুই একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; মাঠের লড়াই ছাপিয়ে তা হয়ে উঠেছে ভূ-রাজনীতি, বর্ণবিদ্বেষ এবং বাণিজ্যিক আধিপত্যের এক জটিল ময়দান।

একটা রাজপুত্তুর যার মুকুট হারিয়ে গিয়েছে

Lionel Messi Retirement: তিনটে ফাইনালের বোঝা। একে একে ছেড়ে যায় সহযোদ্ধারা। রক্তাক্ত মাসচেরানো চলে যান, কুন আগুয়েরোর অসুখ... তবু লিও পড়ে থাকে, আমরা পড়ে থাকি আর কিছুদিন। বৃত্ত সম্পূর্ণ করতে প্রয়োজন ছিল একজন স্ক্যালোনির, তিনি সেটুকু সেতু নির্মাণের দায়িত্ব নিলেন। আমরা অপেক্ষা করলাম লুসাইলে। আমরা তো কবেই হেরে গিয়েছিলাম, সৌদি আরব শুধু চিনিয়ে দিয়েছিল আশপাশটা।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: যেভাবে ১৫ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসায় পরিণত হল ফুটবল

FIFA Revenue 2026: 'কুইন্টেট প্রাইভেট ব্যাংক'-এর সাম্প্রতিক একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শেয়ারবাজারের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের অনুঘটক হওয়ার চেয়ে বিশ্বকাপ আসলে একটি শক্তিশালী স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক উদ্দীপক হিসেবেই বেশি কাজ করে। ফিফা, সম্প্রচারকারী সংস্থা, স্পোর্টসওয়্যার ব্র্যান্ড এবং আতিথেয়তা (হসপিটালিটি) ক্ষেত্রগুলি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করলেও, কোম্পানির শেয়ারের দামে সেই ইতিবাচক প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে রাখা বেশ কঠিন।

যখন ইউরোপে নারীরা গৃহবন্দি, তখন অসমে মেয়েরা খেলছিলেন ধোপখেল

Dhop Khel Assam: আহোম রাজাদের রাজপ্রাসাদ থেকে বিহুর মেঠো মাঠ—অসমের মাটিতে একসময় গমগম করত ধোপখেলের আওয়াজ। ফুটবল, কাবাডি আর দূরন্ত নিশানার এই অদ্ভুত রোমাঞ্চকর খেলাটি শুধু পুরুষদের বীরত্ব প্রমাণের লড়াই ছিল না; যখন ইউরোপে নারীদের জীবন ছিল চার দেওয়ালে বন্দি, তখন অসমে মেয়েরাও মাঠে নেমে মেতে উঠতেন ধোপখেলে।