বিজয়ের আড়ালে বঞ্চনার ইতিহাস: মহিলা ক্রীড়াবিদদের যন্ত্রণার আখ্যান

women athletes struggle: ভিনেশের প্রতি হওয়া বঞ্চনার দশ বছর আগে, দক্ষিণ কোরিয়ার এশিয়ান গেমসের আসরে, পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে ব্রোঞ্জ পদক প্রত্যাখ্যান করেছিলেন মণিপুরী বক্সার সারিতা দেবী।

Suvankar Das
৩ মিনিট
বিজয়ের আড়ালে বঞ্চনার ইতিহাস: মহিলা ক্রীড়াবিদদের যন্ত্রণার আখ্যান

মেয়েদের ক্রিকেটে ভারতের বিশ্বকাপজয় নির্দ্বিধায় জাতীয় ক্রীড়ার ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকবে। অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকার আধিপত্যকে চূর্ণ করে বিশ্ব ক্রিকেটের শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা লড়াই করে ছিনিয়ে নেওয়াটা মোটেও সহজ ছিল না হারমনপ্রীতদের কাছে। সেই অসাধ্য তাঁরা সাধন করে দেখিয়েছেন। ফলে হেমন্তের বিকেলগুলো এখন উৎসবমুখর রিচা, দীপ্তি, জেমিমা নিয়ে। উৎসবের এই আলোর মাঝে আমরা যেন ভুলে না যাই সেই সকল ভারতীয় মহিলা ক্রীড়াবিদদের, যাঁরা প্রবল প্রতিকূলতার মধ্যে লড়াই করে স্বপ্ন দেখেছিল বিশ্বকে জয় করার। সামাজিক ও প্রশাসনিক বঞ্চনার মাঝেও তাদের স্বপ্ন দেখার স্পর্ধা ও লড়াই করে যাওয়ার তীব্র ইচ্ছেগুলোকে যেন আমরা মনে রাখি। বিজয় উল্লাসের এই মাসে লড়েও ব্যর্থ হয়ে যাওয়ার প্রতি আমাদের যেন সমবেদনা ও একই সঙ্গে কুর্নিশ থাকে।

২০২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিকে কুস্তিগীর ভিনেশ ফোগটের মরণপণ লড়াইকে আমরা যেন ভুলে না যাই। অলিম্পিক ট্রায়ালে ওজন সংক্রান্ত জটিলতায় বাতিল না হলে তিনি হয়ত নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করতেন। ট্রায়ালের আগের রাতে ওজন কমানোর জন্য তার মরণপণ চেষ্টার মুহূর্তগুলোকে আমরা যেন ভুলে না যাই। নিজেদেরকে 'বিশ্বগুরু' দাবি করে, ক্রমাগত ঢাক পিটিয়ে যাওয়া আমরা, ভিনেশকে ন্যায় দিতে ব্যর্থ হয়েছিলাম। উল্টে কিছু জনপ্রতিনিধির কটূক্তির শিকার হতে হয় ভিনেশকে। আজ বিশ্বক্রিকেটে ভারতীয় মেয়েদের সাফল্যের উপর ভাগ বসাতে ছুটে আসা পুরুষতন্ত্র সেদিন ভিনেশের প্রতি উদাসীন ছিল।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মাঠে জয়, সমাজে লড়াই; খেলাধুলোর মেয়েরা যে লড়াই লড়ছে

Women Sports: বিজয়ীদের নাম উচ্চারণ করে মনে মনে খালি গর্ব অনুভব করলেই তো আর হবেনা। যারা জেতেনি, যারা খেলা শুরু করলেও চালিয়ে যেতে পারেনি, এমনকি যারা খেলেওনি, তাদের কথাটা ভাবতে গেলে মনটা বিষণ্ণ হয়ে আসে।

ক্রন্দনরত ভিনেশ ফোগট

ভিনেশের প্রতি হওয়া বঞ্চনার দশ বছর আগে, দক্ষিণ কোরিয়ার এশিয়ান গেমসের আসরে, পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে ব্রোঞ্জ পদক প্রত্যাখ্যান করেছিলেন মণিপুরী বক্সার সারিতা দেবী। তিনি দাবি করেছিলেন, সেমিফাইনাল ম্যাচে পয়েন্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁকে বঞ্চিত করা হয়। সেদিন তাঁর চোখের জলের পাশে কোনো নামী বা প্রভাবশালী পুরুষতন্ত্রের প্রতিনিধিকে দেখা যায়নি। হেরে যাওয়ার পর, ক্রীড়াবিদদের মনে পরাজয়ের গ্লানি কাজ করে। সেই পরিস্থিতিটাকে সামাল দেওয়ার জন্য সাপোর্টিং স্টাফের বিশেষ ভূমিকা থাকে। কিন্তু সারিতা দেবীর ক্ষেত্রে গোটা পরিস্থিতিটাই প্রতিকূল হয়ে উঠেছিল। যদিও পরে নিজের কেরিয়ার বাঁচানোর জন্য তিনি ক্ষমা চেয়ে নেন। কিন্তু সেই মুহূর্তে তার মনের দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার মানুষ খুঁজে পাওয়া যায়নি।

নব্বইয়ের দশকে হওয়া অলিম্পিকগুলোতে ভারতের অবস্থান একেবারে তলানির দিকে ছিল। '৯২- এর খালি হাত। '৯৬-এর সহায় লিয়েন্ডার পেজের ব্রোঞ্জ। ভারোত্তোলক কর্ণম মালেশ্বরীর ব্রোঞ্জ পদকটা না থাকলে, ২০০০ সিডনি অলিম্পিক থেকে ভারতকে খালি হাতে আসতে হতো। বিশ্বমঞ্চে একার কাঁধে দেশের নাম উজ্জ্বল করেও পাদপ্রদীপের বাইরেই থেকে গিয়েছেন তিনি। সেই সময় দাঁড়িয়ে পুরুষ ক্রিকেটাররা আন্তর্জাতিক মঞ্চে ব্যর্থ হয়েও একটার পর একটা ব্র্যান্ড এনডোর্স করে গিয়েছেন। ক্রীড়া থেকে শুধুমাত্র ক্রিকেট সাংবাদিক-এ নিজেদের পরিবর্তন করে নেওয়া প্রচারযন্ত্রও কর্ণম মালেশ্বরীর প্রতি উদাসীন থেকে গিয়েছে। ২০০৮ সালে বেইজিং অলিম্পিকে অভিনব বিন্দ্রার সোনা জয়কে এদেশের সিংহভাগ ক্রীড়া বিশেষজ্ঞ মাইলফলক হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। কিন্তু, শুটিংয়ে সাফল্যের সলতে পাকানোর কাজ, অনেক আগেই শুরু হয়ে গিয়েছিল। আর সেটা করে দেখিয়েছিলেন মহিলা শুটার অঞ্জলি ভাগবত। কিন্তু প্রচারের বৃত্ত থেকে তিনি বাইরেই রয়ে গেলেন। মহিলাদের ব্যাডমিন্টনের ডাবলস বিভাগে অশ্বিনী পোনাপ্পা ও জ্বালা গাট্টা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে গড় সামলেছিলেন। নিজেদের সেরা সময়েও তাঁদের ওপর প্রচারের আলো পড়েনি। এই তালিকা হয়ত দীর্ঘ থেকে আরও বেশি দীর্ঘতর হবে। সেখানে বুলা চৌধুরী, আরতি সাহা, দীপা কর্মকার, অঞ্জুববি জর্জ ও বহু মহিলা ক্রীড়াবিদের নাম থাকবে। যাদেরকে সমাজ, প্রশাসন ও প্রচার মাধ্যম বঞ্চিত করে এসেছে। যাদের জীবনের রোজনামচার খবর কেউ রাখেনি। দুর্বল পরিকাঠামো, দুর্নীতিগ্রস্ত ক্রীড়া পরিবেশ, অপর্যাপ্ত পুষ্টির মধ্যেও তাঁরা সংগ্রাম করে গিয়েছেন। সেই সংগ্রামকে যেন আমরা কোনোদিন ভুলে না যাই। আমার-আপনার পাড়ার যে মেয়েটি প্রত্যেকদিন সকালে উঠে জ্যাভলিন নিয়ে ছুটে চলে বা টেবিল টেনিস খেলে, তার পাশে যেন আমরা অন্তত গিয়ে দাঁড়াই। তার সাফল্যের প্রতি যেন আমাদের সমীহ থাকে।

দিল্লির রাজপথে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রহরীরা যেভাবে অলিম্পিক পদকজয়ী কুস্তিগীর সাক্ষী মালিকের উপর এবং অন্যান্য কুস্তিগীরদের উপর নির্যাতন চালিয়েছিল, সেসব যেন কোনোদিন আমাদের স্মৃতিপট থেকে মুছে না যায়। পুলিশি হেফাজতে পিঙ্কি প্রামাণিকের উপর হওয়া শারীরিক নির্যাতনের ছবি প্রকাশ্যে আসতেই গর্জে উঠেছিলেন কবীর সুমন। এ নিয়ে একটি কবিতাও তিনি লিখেছিলেন। আজ উৎসবের উল্লাসে সেগুলো যেন আমরা ভুলে না যাই। আমরা যেন প্রশ্ন করতে শিখি— পুরুষ ক্রিকেটের প্রাক্তন বাঙালি ভারত অধিনায়ককে নিয়ে যদি 'দাদাগিরি'র মতো রিয়েলিটি শো হতে পারে, তাহলে 'চাকদা এক্সপ্রেস'কে (ঝুলন গোস্বামী) নিয়ে কেন 'দিদিগিরি' হবে না? গণতন্ত্র ও লিঙ্গসাম্য তখনই রক্ষিত হবে যখন আমরা সচেতন হয়ে প্রশ্ন করতে শিখব। আর তখনই প্রশ্ন করতে শিখব যখন আমাদের স্মৃতিপট থেকে এসব ঘটনা মুছে যাবে না।

লিখেছেন
Suvankar Das
Suvankar Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

নারী টেস্টে এত অনীহা কেন, লর্ডসের ইতিহাসও বদলাবে না সেই ছবি?

Women’s Test Cricket: লর্ডসে ভারতের নারী ক্রিকেট দলের ঐতিহাসিক জয় নারী টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ বদলানোর সুযোগ এনে দিয়েছে? এত সাফল্য ও জনপ্রিয়তার পরও কেন এই ফরম্যাটে নিয়মিত ম্যাচ নেই?

শিব-পরশুরামের যুদ্ধবিদ্যা কালারিপায়াট্টু থেকেই জন্ম কুংফুর!

Kalaripayattu Indian Martial Art: ভারতীয় পৌরাণিক ঐতিহ্যে কালারিপায়াট্টুকে স্রেফ যুদ্ধের কৌশল হিসেবে দেখা হয়নি, বরং এটিকে মানব শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রাণশক্তিকে জাগিয়ে তোলার এক মহান সাধনা বলে মনে করা হয়।

দু'হাজার বছর পুরনো ‘আত্য পাত্যা’: এই খেলাই শিখিয়েছিল যুদ্ধের কৌশল!

Atya Patya Traditional Indian Game: আনুমানিক ১০০ থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত প্রাচীন তামিল সাঙ্গম সাহিত্য ‘নাটতৃণৈ’-তে এই খেলার প্রথম লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায়। অতএব, এই খেলার বয়স প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি। সেখানে বলা আছে, প্রাচীন চোল রাজবংশের সেনারা যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার আগে নিজেদের ক্ষিপ্রতা, দ্রুত দৌড়ানোর ক্ষমতা আর শরীরকে এক নিমেষে বাঁকানোর চপলতা বাড়াতে এই খেলায় মেতে উঠত।

১৬ বছর পর ফের ভারতের পথে ললিত মোদী

Lalit Modi return to India: দীর্ঘ সময় পর দিল্লির আপিল ট্রাইব্যুনাল তাঁর বিরুদ্ধে থাকা আর্থিক অনিয়মের বড় অভিযোগ ও জরিমানা বাতিল করে দেওয়ার পরেই এই আলোচনার সূত্রপাত। সোশ্যাল মিডিয়ায় ললিত মোদী নিজেই স্পষ্ট করেছেন, সমস্ত বড়সড় আইনি জটিলতা কাটার পর ২০২৬ সালের শেষ দিকে অথবা ২০২৭-এর শুরুতেই ফের তিনি ভারতে পা রাখতে চলেছেন।

গোলের আড়ালে ঘৃণার খেলা: ২০২৬ বিশ্বকাপে ট্রাম্প, ফিফা আর ফুটবলের পরাজয়

Trump FIFA World Cup: এই বিশ্বকাপ শুধুই একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; মাঠের লড়াই ছাপিয়ে তা হয়ে উঠেছে ভূ-রাজনীতি, বর্ণবিদ্বেষ এবং বাণিজ্যিক আধিপত্যের এক জটিল ময়দান।

একটা রাজপুত্তুর যার মুকুট হারিয়ে গিয়েছে

Lionel Messi Retirement: তিনটে ফাইনালের বোঝা। একে একে ছেড়ে যায় সহযোদ্ধারা। রক্তাক্ত মাসচেরানো চলে যান, কুন আগুয়েরোর অসুখ... তবু লিও পড়ে থাকে, আমরা পড়ে থাকি আর কিছুদিন। বৃত্ত সম্পূর্ণ করতে প্রয়োজন ছিল একজন স্ক্যালোনির, তিনি সেটুকু সেতু নির্মাণের দায়িত্ব নিলেন। আমরা অপেক্ষা করলাম লুসাইলে। আমরা তো কবেই হেরে গিয়েছিলাম, সৌদি আরব শুধু চিনিয়ে দিয়েছিল আশপাশটা।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: যেভাবে ১৫ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসায় পরিণত হল ফুটবল

FIFA Revenue 2026: 'কুইন্টেট প্রাইভেট ব্যাংক'-এর সাম্প্রতিক একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শেয়ারবাজারের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের অনুঘটক হওয়ার চেয়ে বিশ্বকাপ আসলে একটি শক্তিশালী স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক উদ্দীপক হিসেবেই বেশি কাজ করে। ফিফা, সম্প্রচারকারী সংস্থা, স্পোর্টসওয়্যার ব্র্যান্ড এবং আতিথেয়তা (হসপিটালিটি) ক্ষেত্রগুলি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করলেও, কোম্পানির শেয়ারের দামে সেই ইতিবাচক প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে রাখা বেশ কঠিন।

যখন ইউরোপে নারীরা গৃহবন্দি, তখন অসমে মেয়েরা খেলছিলেন ধোপখেল

Dhop Khel Assam: আহোম রাজাদের রাজপ্রাসাদ থেকে বিহুর মেঠো মাঠ—অসমের মাটিতে একসময় গমগম করত ধোপখেলের আওয়াজ। ফুটবল, কাবাডি আর দূরন্ত নিশানার এই অদ্ভুত রোমাঞ্চকর খেলাটি শুধু পুরুষদের বীরত্ব প্রমাণের লড়াই ছিল না; যখন ইউরোপে নারীদের জীবন ছিল চার দেওয়ালে বন্দি, তখন অসমে মেয়েরাও মাঠে নেমে মেতে উঠতেন ধোপখেলে।