খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে বিরাট শিশু আনমনে

Virat Kohli Masterclass Comeback: সময়ের সঙ্গে ক্রিকেটের রূপ গতি সবই বদলেছে। কিন্তু শিল্পীর নিজেকে প্রমাণের দায়? বদলায়নি। এখানে লড়াইটা যে একান্তই নিজের, ছায়ার সঙ্গে কুস্তি। কোহলির সাম্প্রতিক ইনিংসগুলি যেন সেভাবেই নিজের সাথে নিজের কথোপকথন হয়ে উঠছিল।

Abhirup pal
৩ মিনিট
খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে বিরাট শিশু আনমনে

ক্রিকেটের ইতিহাসে বডিলাইন সিরিজের ক্ষত এখনও সবচেয়ে নৃশংস স্মৃতি। শরীর,মন ভেঙে পড়ার পরও ১৯৩৪-এর অ্যাশেজে ডন ব্র্যাডম্যান যখন ফিরে আসেন- শূন্য থেকে নতুন করে শুরু করেন; বোল্টন ট্রমার পর ১৯৬ রান করেন লেন হাটন বা পাকিস্তানের ইনিংস রক্ষা করতে হানিফ মোহাম্মদ যখন ব্রিজটাউনে ১৯৫৮ সালে ১৬ ঘণ্টার ইনিংস খেলেন, তখন ক্রিকেট ঈশ্বর নীরবেই তা দেখেছিলেন। সময়ের সঙ্গে ক্রিকেটের রূপ গতি সবই বদলেছে। কিন্তু শিল্পীর নিজেকে প্রমাণের দায়? বদলায়নি। এখানে লড়াইটা যে একান্তই নিজের, ছায়ার সঙ্গে কুস্তি। কোহলির সাম্প্রতিক ইনিংসগুলি যেন সেভাবেই নিজের সাথে নিজের কথোপকথন হয়ে উঠছিল। আর শেষে, মহারাজ এ কী সাজে...

তিনি শুরু করেছিলেন বেশ সতর্ক ভাবে। ইনিংসের প্রথম ২০টা বলে রান তুললেন মাত্র ১২। একটা চার, বাকি সব সিঙ্গল, ডট। আধুনিক ক্রিকেটে আড়ষ্টতা অমার্জনীয়; হঠকারিতাও আত্মঘাতী, তাই ধ্যানমগ্ন হওয়ার সংকল্পেই ওপ্রান্ত থেকে বলগুলি তিনি পরখ করছিলেন। প্রথম ত্রিশ বলে স্ট্রাইক রেট ছিল ৮২। কেউ মনে করবে মারভিন আটাপাট্টুকে, কারও মনে পড়বে স্টিভ ওয়ার অবিচল মন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
টেস্ট ক্রিকেটে আধুনিক ব্যাটিংয়ের জয়গান গেয়েছেন বিরাট কোহলি

Virat Kohli: টেস্ট ব্যাটসম্যান হিসেবে কোহলির তুলনা গাভাস্কার, সচিন, পন্টিং, দ্রাবিড়, কালিস এমনকী স্টিভ ওয়, সঙ্গকারা, বর্ডার বা ব্রায়ান লারার সঙ্গে হয় না, বরং হয় হাসিম আমলা বা গ্রেম স্মিথের সঙ্গে।

পরিসংখ্যান বলছিল পন্টিং, সচিন, সাঙ্গাকারার মতোই কোহলির স্ট্রাইক রেট বেশ অনেকটা কমেছে। বাউন্ডারির হারও নিম্নমুখী। তবু বেলা যত গড়ায় মাঠ আঁকড়ে পড়ে থাকতে হয়, জানেন কোহলি।

এদিনের ইনিংস ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে করিয়ে দেবে ১৯৬৯ সালে মাদ্রাজে আঘাত থেকে ফিরে চাঁদু বোর্ডের ৬৭ রানের ইনিংসকে। কোহলি মাঠে নেমেছিলেন নিজের আজীবনের শিক্ষাকে আরেকবার পরখ করতে।

৩২তম বলে মারলেন কভারড্রাইভ। ওটাই টার্নিং পয়েন্ট। পরের ৫০ বলে করলেন ৭৮ রান,স্ট্রাইক রেট ১৫৬। ফুটওয়ার্ক তখনও পুরোপুরি সাবলীল না । হয়তো বয়সের ভারেই। কিন্তু দৃষ্টিটা যে একইরকম ধারালো তা স্পষ্ট বোঝা গেল যখন তিনি পেসারের ভুল লেংথের বলকে আলতো করে অফ সাইডে ঠেললেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
পোস্টার বয় থেকে ফ্যামিলি ম্যান— অন্দরের বিরাট, অন্তরের বিরাট

Virat Kohli: বিরাট একবারও নিজেকে গড়ে-পিটে নিতে চাননি সমাজের ফেলে দেওয়া টেমপ্লেটে। কারণ? বিরাট নিজের ভেতরের রক্তমাংসের বিরাট কোহলির নিঃশব্দ রক্ষক হয়ে থেকেছেন।

স্পিনের বিরুদ্ধে বিরাটের সংগ্রহ ৪৪ বলে ৬২ রান। ডাউন দ্য গ্রাউন্ডে ৩টি চার। একটা অন-ড্রাইভ, একটি বুদ্ধিদীপ্ত লেট-কাট আর একটি পুল। মাঠ শাসনের পুরোনো অভ্যেস বেশ টের পাওয়া গেল। কিন্তু এসবের থেকেও বড় বিষয় হল, কোহলি নিজেকে নতুনভাবে চিনতে চাইছেন, সাদা ক্যানভাসে যে ভাবে নিজেকে মেলে ধরতে চান কোনো বড় শিল্পী।

মার্কো ইয়ানসেনের বল থার্ড ম্যান দিয়ে বাউন্ডারির বাইরে পাঠিয়ে ১০২ বলে সেঞ্চুরি করলেন বিরাট। ২৯১ দিনের অপেক্ষা । আবার রেকর্ড। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সব মিলিয়ে ৮৩তম সেঞ্চুরি তাঁর। সচিনের ১০০ টি। গুরুর থেকে এখন ১৭ ধাপ পিছনে তিনি। নান্দ্রে বার্গারের বলে সোজা ছক্কা হাঁকিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে রিকি পন্টিংকেও টেক্কা দিয়েছেন ছয়ের সংখ্যায়। ২০১১ সালে ইউসুফ পাঠানের আটটা ছয়ের পর কোহলির সাতটা ; একটা একদিনের ইনিংসে ভারতের জন্য যৌথভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যক ছয় হাঁকিয়েছেন তিনি। ওয়ানডে’তে ৫২তম সেঞ্চুরির পর তাই চেনা ভঙ্গিতে ভাসলেন উল্লাসে। সচিন আর ডেভিড ওয়ার্নরকে ছাপিয়ে প্রোটিয়াদের বিপক্ষে সর্বোচ্চ শতরানের মালিক এখন তিনি (৬টি)। চেনা কোহলি ধরা দিল এক লহমায়। আকাশের দিকে তাকিয়ে লাফিয়ে উঠলেন, মুঠিবদ্ধ হাত আঘাত করল বাতাসকে। এক সমর্থক তো নিরাপত্তার বেষ্টনীকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মাঠে ঢুকে পায়েই পড়লেন কোহলির। হাততালি দিলেন গম্ভীরও। ২০২০ সালের পর প্রথম কোহলি এবং রোহিতের মধ্যে ১৩৬ রানের পার্টনারশিপ। পিছনে সৌরভ-শচীন, তেণ্ডুলকর- সেওবাগ, কুমার সাঙ্গাকারা এবং তিলকরত্নে দিলশানের রেকর্ড। রোহিতের সাথে খেলে ফেলেছেন ইতিমধ্যেই ৩৯১-এর বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ। এখানেও পিছনে ফেলেছেন সচিন-দ্রাবিড় জুটিকে। শেষ পর্যন্ত ১২০ বলে ১৩৫ রান। আউট হলেন। সাজঘরে ফিরলেন। ড্রেসিংরুমে তাঁকে জড়িয়ে ধরেছেন গৌতম গম্ভীর।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বিরাট কোহলি: খুঁজে ফেরা এক অনন্য লড়াইক্ষ্যাপাকে

Virat Kohli: 'ঘর মে ঘুস কর', বিরাট কাঁদিয়ে ছাড়তে উদ্যত প্রতিপক্ষকে। তিনি স্থায়ী ক্ষতচিহ্ন দেখতে বিশেষ রূপে আগ্রহী।

কোহলি বুঝছেন কেরিয়ারের এই পর্যায়ে আর শুধু স্কোরকার্ড নয়; তাঁকে বহন করতে হবে খেলার প্রতি অনুচ্চারিত আধ্যাত্মিক দায়। প্রতিটি বলের পর হয়তো তিনি ভিতরে ভিতরে হয়তো রিচি রিচার্ডস বা অ্যালান বর্ডারের মত বলছিলেন-আমি আছি,আমি লড়ব, আমি ফিরব।

প্রতিভারও বয়স হয়, কিন্তু প্রত্যাবর্তনের?

কোহলি জানেন, সমালোচনা থাকবে, প্রত্যাশার বোঝাও থাকবে। কিন্তু তিনি তবু ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে ভিভ রিচার্ডসের ১৮৯ বা ইনজামামের ব্যাঙ্গালোরের ১৮৪ করার স্মৃতি নিয়ে এগোবেন - একলা, নিজের গভীর বিশ্বাসে, অবিচল অনুশীলনে। পরিণত, পরিশীলিত হবেন। আর নীরবেই তাঁর ব্যাট গড়বে 'বিরাট ' কীর্তি।

লিখেছেন
Abhirup pal
Abhirup pal
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

নারী টেস্টে এত অনীহা কেন, লর্ডসের ইতিহাসও বদলাবে না সেই ছবি?

Women’s Test Cricket: লর্ডসে ভারতের নারী ক্রিকেট দলের ঐতিহাসিক জয় নারী টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ বদলানোর সুযোগ এনে দিয়েছে? এত সাফল্য ও জনপ্রিয়তার পরও কেন এই ফরম্যাটে নিয়মিত ম্যাচ নেই?

শিব-পরশুরামের যুদ্ধবিদ্যা কালারিপায়াট্টু থেকেই জন্ম কুংফুর!

Kalaripayattu Indian Martial Art: ভারতীয় পৌরাণিক ঐতিহ্যে কালারিপায়াট্টুকে স্রেফ যুদ্ধের কৌশল হিসেবে দেখা হয়নি, বরং এটিকে মানব শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রাণশক্তিকে জাগিয়ে তোলার এক মহান সাধনা বলে মনে করা হয়।

দু'হাজার বছর পুরনো ‘আত্য পাত্যা’: এই খেলাই শিখিয়েছিল যুদ্ধের কৌশল!

Atya Patya Traditional Indian Game: আনুমানিক ১০০ থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত প্রাচীন তামিল সাঙ্গম সাহিত্য ‘নাটতৃণৈ’-তে এই খেলার প্রথম লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায়। অতএব, এই খেলার বয়স প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি। সেখানে বলা আছে, প্রাচীন চোল রাজবংশের সেনারা যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার আগে নিজেদের ক্ষিপ্রতা, দ্রুত দৌড়ানোর ক্ষমতা আর শরীরকে এক নিমেষে বাঁকানোর চপলতা বাড়াতে এই খেলায় মেতে উঠত।

১৬ বছর পর ফের ভারতের পথে ললিত মোদী

Lalit Modi return to India: দীর্ঘ সময় পর দিল্লির আপিল ট্রাইব্যুনাল তাঁর বিরুদ্ধে থাকা আর্থিক অনিয়মের বড় অভিযোগ ও জরিমানা বাতিল করে দেওয়ার পরেই এই আলোচনার সূত্রপাত। সোশ্যাল মিডিয়ায় ললিত মোদী নিজেই স্পষ্ট করেছেন, সমস্ত বড়সড় আইনি জটিলতা কাটার পর ২০২৬ সালের শেষ দিকে অথবা ২০২৭-এর শুরুতেই ফের তিনি ভারতে পা রাখতে চলেছেন।

গোলের আড়ালে ঘৃণার খেলা: ২০২৬ বিশ্বকাপে ট্রাম্প, ফিফা আর ফুটবলের পরাজয়

Trump FIFA World Cup: এই বিশ্বকাপ শুধুই একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; মাঠের লড়াই ছাপিয়ে তা হয়ে উঠেছে ভূ-রাজনীতি, বর্ণবিদ্বেষ এবং বাণিজ্যিক আধিপত্যের এক জটিল ময়দান।

একটা রাজপুত্তুর যার মুকুট হারিয়ে গিয়েছে

Lionel Messi Retirement: তিনটে ফাইনালের বোঝা। একে একে ছেড়ে যায় সহযোদ্ধারা। রক্তাক্ত মাসচেরানো চলে যান, কুন আগুয়েরোর অসুখ... তবু লিও পড়ে থাকে, আমরা পড়ে থাকি আর কিছুদিন। বৃত্ত সম্পূর্ণ করতে প্রয়োজন ছিল একজন স্ক্যালোনির, তিনি সেটুকু সেতু নির্মাণের দায়িত্ব নিলেন। আমরা অপেক্ষা করলাম লুসাইলে। আমরা তো কবেই হেরে গিয়েছিলাম, সৌদি আরব শুধু চিনিয়ে দিয়েছিল আশপাশটা।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: যেভাবে ১৫ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসায় পরিণত হল ফুটবল

FIFA Revenue 2026: 'কুইন্টেট প্রাইভেট ব্যাংক'-এর সাম্প্রতিক একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শেয়ারবাজারের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের অনুঘটক হওয়ার চেয়ে বিশ্বকাপ আসলে একটি শক্তিশালী স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক উদ্দীপক হিসেবেই বেশি কাজ করে। ফিফা, সম্প্রচারকারী সংস্থা, স্পোর্টসওয়্যার ব্র্যান্ড এবং আতিথেয়তা (হসপিটালিটি) ক্ষেত্রগুলি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করলেও, কোম্পানির শেয়ারের দামে সেই ইতিবাচক প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে রাখা বেশ কঠিন।

যখন ইউরোপে নারীরা গৃহবন্দি, তখন অসমে মেয়েরা খেলছিলেন ধোপখেল

Dhop Khel Assam: আহোম রাজাদের রাজপ্রাসাদ থেকে বিহুর মেঠো মাঠ—অসমের মাটিতে একসময় গমগম করত ধোপখেলের আওয়াজ। ফুটবল, কাবাডি আর দূরন্ত নিশানার এই অদ্ভুত রোমাঞ্চকর খেলাটি শুধু পুরুষদের বীরত্ব প্রমাণের লড়াই ছিল না; যখন ইউরোপে নারীদের জীবন ছিল চার দেওয়ালে বন্দি, তখন অসমে মেয়েরাও মাঠে নেমে মেতে উঠতেন ধোপখেলে।