অঞ্জনের প্রিয় বন্ধু: শিকড়হীন আর শিকড়গাঁথাদের সংলাপ

Anjan Dutta Priya Bandhu: অর্ণব কমলা এজেন্সির চাকরি ছাড়ে সদর্পে। অঞ্জন বারবার বোঝান, চাকরির দিনগত আবর্তে আটকে থাকা অর্ণবদের ধর্ম নয়।

priyak mitra
৪ মিনিট
অঞ্জনের প্রিয় বন্ধু: শিকড়হীন আর শিকড়গাঁথাদের সংলাপ

যখন 'প্রিয় বন্ধু' শুনেছি‌, তখন জানতাম না, আসমা চৌধুরী জয়িতা বা জয়ী, আদরের নামে, আদতে শিকড় খুঁজতে কোন দেশে যাবে! তখন ক্লাস ইলেভেন। বাংলার একটি সুপরিচিত এফএম চ‍্যানেল তখন বেশ কিছু অডিও প্লে সম্প্রচার করে‌, প্রতি রোববার দুপুরে। তখন স্মার্টফোনহীন, সামান্য মোবাইলের রেডিও অ্যাপ যেমন আছে, তেমন তখনও, রেডিও নামে যন্ত্রটাও আছে কিছু বাড়িতে। উত্তর কলকাতার, বাগবাজারি আবহে, শাক্ত-তামস পাঁচমিশালির মধ‍্যে মানিকতলার অর্ণব এসেছিল আমার কাছে, রেডিওর হাত ধরে। তার সঙ্গে প্রতিটি পল আমি মেলাতে পারতাম। তখনও শিখিনি, স্কুলের সহপাঠী থেকে 'প্রিয় বন্ধু' হয়ে ওঠা দূরের কারও সঙ্গে কথা বলার ভাষা।

অঞ্জন দত্ত, তারও আগে, অন্য একটি এফএম চ‍্যানেলে বাচ্চাদের নিয়ে একটি প্রোগ্রাম করতেন। সেই অনুষ্ঠানে তখনও মজে থাকতাম, কারণ, তখনও শৈশব কাটেনি। বয়ঃসন্ধি যখন আস্তে আস্তে টোকা দিতে শুরু করেছে মন-হরমোনের দরজায়, তখন প্রথম একটু একটু পাকিয়ে দিয়েছে 'চ‍্যাপটা গোলাপ'‌। যে স্কুলপড়ুয়াদের নিয়ম ভাঙার মন আছে, নিয়ম ভাঙার বয়স নেই, তাদের কথা অঞ্জন ছাড়া আর কে লিখেছেন মনের মতো করে? কোন অঞ্জন? যাঁকে নিয়ে বাঙালির কল্পলোক পার্ক স্ট্রিট থেকে দার্জিলিংয়ের মধ‍্যে সীমাবদ্ধ, না কি সেই অঞ্জন, যাঁর টেলিফিল্মে দেখেছি 'দীপা সুলতানার তিনদিন', গোধরা-পরবর্তী গুজরাত দাঙ্গার (না কি সুপরিকল্পিত গণহত্যা!) বিক্ষুব্ধ সময়ের আখ‍্যান, বা 'বাবার ক্রিস্টমাস'-এর মর্মস্পর্শী উদযাপনের গল্প, বা রুদ্র সেনের রোড মুভি এবং 'গরম গরম গল্প'-র মতো কমেডি থ্রিলার বা 'রাশিয়ান রুলে'-র মতো রিভেঞ্জ ড্রামা ও হুডানিট থ্রিলারের ককটেল— সেই বিচিত্র, ছকে না বাঁধা, রংবেরঙের অঞ্জন?

আদতে অঞ্জন জানেন অচেনা গল্প সেই ভঙ্গিতে বলতে, যা চেনা লাগে হঠাৎই কোনও চলমান অশরীরি গোধূলিতে। এসব ম্যানড্রেকীয় নয়, বরং সহজ রঙের তাস। অঞ্জন তাই অর্ণবের দাদার যে গল্প বলেন, তেমন গল্প বুদ্বুদের মতো ভেসে ওঠে কিছু কিছু স্মৃতিতে। বন্ধুদের পোস্টার রাখার জন্য তালতলা থানায় পুলিশের মার খেয়ে, পরে 'কিডনি ফেলিওর' হয়ে মারা যাওয়া সেই দাদারা সত্তর জুড়েই ছড়িয়ে। ঠিক সেসময়ই বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ। হয়তো পরে জয়িতা সেখানে নিজের দেশ খুঁজে পাবে। কিন্তু যে-সময়ের এপার-ওপার বাংলা বিক্ষুব্ধ, তখন অর্ণব তার দূরের শহরের জয়িতাকে যে যে চিঠি লিখেছে, সেসবে সময়ের চিহ্নগুলো পুঁজরক্তসমেত ফুটে উঠছিল।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
অপ্রাপ্তির ভিতর দিয়ে বন্ধুত্বের সেতু গড়ে দেয় যে কবিতারা

Rituparna Ghosh: আমরা যদি খেয়াল করি বুঝতে পারব ‘তিতলি’-তে ‘মা’ শব্দটির একটি বিবর্তন রয়েছে। ঊর্মি প্রথমাবধি তিতলি-র ‘মা’, তারপর নিজের মেয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী, শেষে পৌঁছে তিতলি-র সঙ্গে ঊর্মির এক সখীসম্পর্ক জন্ম নেয়।

চিঠিপত্রের প্রেমালাপ বিশ্বসাহিত্যে বহু ব্যবহৃত। কিন্তু অঞ্জন ও নিমা রহমান অভিনীত 'প্রিয় বন্ধু', শ্রুতিনাটকের বাইরেও যদি টেক্সট হিসেবে তার পাঠ সম্ভব হয়, তাহলে তাকে কি প্রেমের চিঠি বলা হবে? স্কুলের কাঁচা প্রেম পাকিয়ে ওঠে পরিণত বন্ধুত্বে, বয়স হলে প্রেমে পাক ধরে, কবীর সুমনের পঙক্তি মাথায় রেখেই তাই 'প্রিয় বন্ধু' ছাপিয়ে যায় প্রেমকে, তৈরি করে এক আবহমান যোগাযোগের সূত্র, ভূগোল পেরিয়ে। আর এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ছিন্নমূলের বয়ান। অর্ণবের মায়ের মৃত্যু অর্ণবকে বুঝতে শেখায়, তার মানিকতলার বাড়ি আসলে মায়ের আঁচলেই লেপটে ছিল এতদিন। কিন্তু তাও সে শিকড়হীন হয় না কিছুতেই। সে জয়ীর বিবাহপ্রস্তাব ফেরায়, ফেরায় বিলাসবহুল চাকরির প্রস্তাব। একা একা জিন খেয়ে বৃষ্টিস্নাত ঘোড়ার গাড়ি চড়ার কলকাতা সফরের বিষাদ সে বরণ করতে চায়।

বারবার ভাঙে চিঠির সূত্র। বারবার দূরত্বের সেতু তৈরি হয়। জয়ী বিয়ে করে, বিয়ে ভাঙে বারবার, শহর বদলাতে থাকে। অর্ণব অন্যদিকে কমলা এজেন্সির চাকরি ছাড়ে সদর্পে। অঞ্জন বারবার বোঝান, চাকরির দিনগত আবর্তে আটকে থাকা অর্ণবদের ধর্ম নয়। অঞ্জন তাঁর গান ও ছবির গল্পকে জোড়েন এমন ভবঘুরে চরিত্রদের বিনিসুতোয়। অঞ্জনের গোয়েন্দা সুব্রত শর্মা ক্রাইম রিপোর্টারের চাকরি ছাড়ে দুর্নীতির পাকচক্রকে প্রত্যাখ্যান করে, 'চলো লেটস গো'-র সঞ্জয় সাংবাদিকতার চাকরি ছেড়ে বন্ধুদের সঙ্গে নানা উদ্যোগে মাততে মাততে, একদিন ঠিক পেয়ে যায় সিনেমাকে, রেস-খেলা শেখর একদিন গায়ক হয়ে যায়, অসীম বলে, জীবনে টাকা রোজগারের চেয়েও বড় কিছু আছে, সে পাহাড়ের বুকে এক মিশনারি হোমে আজীবনের গাঁটছড়া বাঁধে, 'রনো আর ভিকি'-র শেষে রনো তার উইগ খুলে ফেলে, ভেবে নেয়, সিরিয়ালের জগৎ সে ছেড়ে চলে যাবে। ভবিষ্যৎচিন্তা ও বাঙালির তথাকথিত সাফল্যের মাপকাঠিকে তুড়িতে উড়িয়ে দিয়ে অঞ্জন দত্ত খুঁজে নিতে বলেন মুক্তি, জীবনের যে মানে হয়তো কোনওদিন খুঁজে পাওয়া যাবে না। অর্ণবও তাই হঠাৎ গান খুঁজে পায়। আর জয়িতা, সে শিকড়সন্ধানী হয় অবশেষে, শহরের পর শহরকে সে ভালবাসতে থাকে, কিন্তু সব শহরই তাকে ঠাঁইনাড়া করে, সাকিন দেয় না।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
নির্ভেজাল, নিঃশর্ত বন্ধুত্বে বিশ্বাস করেননি সত‍্যজিৎ?

Satyajit Ray: সত্যজিতের লেখায় দুই বন্ধুর সম্পর্ক খুবই জটিলতর বিষয়।

'প্রিয় বন্ধু' তাই শিকড়হীন আর শিকড়গাঁথা দুই নারীপুরুষের সংলাপ, যে সংলাপ ফুরোয় না। যে সংলাপ প্রেমের পরিণতি দেবে না কোনওদিন। অর্ণব যেমন কলকাতা ছাড়ে না, জয়ীও কলকাতা ফেরে না। দু'জনেই দূরত্বকে ভালবাসতে থাকে, আর দু'জনের মধ্যে তৈরি হতে থাকে তিলে তিলে, চিরদিনের সাঁকো।

এই শ্রুতিনাটক প্রায় মিউজিক্যাল। এর মধ্যে অঞ্জনের নিজের দু'টি গান 'প্রিয় বন্ধু'-র মূল সূত্র রচনা করে। একটি গান এই শ্রুতিনাটকের মাঝে আসে, যখন অর্ণব জানিয়ে দেয়, কলকাতা ছেড়ে সে যাবে না। প্রায় ভুতুড়ে সুরে ও গায়কিতে সেই গান চলে, কারণ কলকাতার ভূত আসলে পেয়ে বসে অর্ণবকে।

'করব যে আর কত ঘেন্না

নিজেই নিজের ছায়াটাকে

করব যে আর কত অপমান

আবার তো সেই আষ্টেপৃষ্ঠে

জড়িয়ে নিজের নরকটাকে

গাইব আমি ভালবাসার গান'

'আমি কীরকম ভাবে বেঁচে আছি তুই এসে দেখে যা নিখিলেশ', সুনীলের এই উচ্চারণকেই উল্লেখ করা হচ্ছে যেন, শহরের প্রতি এই গাথায়। 'প্রিয় বন্ধু' তাই কলকাতা অপেরা, দূরের শহরে তা যায় চিঠির আকারে, ঘেঁটে দেখলে কি স্বরলিপি পাওয়া যেত? ভিয়েনাবাসী মিলেনাকে লেখা কাফকার বিরহের চিঠি নয়, বরং ন্যাবা আর জয়ী দূরেই থাকতে চেয়ে চিঠি লেখে পরস্পরকে। আজ কি জয়ী বাংলাদেশের শাহবাগের, চট্টগ্রামের জমায়েতে কোথাও লুকিয়ে? ন্যাবা কি সেদেশের জন্য গান বাঁধবে?

লিখেছেন
priyak mitra
priyak mitra
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।