বদহজম কাটাতে মুঠো মুঠো অ্যান্টাসিড খাচ্ছেন, অজান্তেই ডেকে আনছেন মারণ রোগ

যদি অতিরিক্ত অ্যাসিড না থাকে, তবে অ্যান্টাসিডে থাকা ক্ষার পাকস্থলীর ক্ষতি করে। শরীরের রক্তাল্পতাও দেখা দেয়।

Piya Saha
৩ মিনিট
বদহজম কাটাতে মুঠো মুঠো অ্যান্টাসিড খাচ্ছেন, অজান্তেই ডেকে আনছেন মারণ রোগ

খাবার খেলেই গলা-বুক জ্বালা করছে। কখনও কখনও আবার মুখ টক হয়ে থাকছে। বুকের মাঝে চিন চিন করে ব্যথা অনুভব হচ্ছে। কমবেশি আমরা সবাই হজমের সমস্যায় ভুগে থাকি। এই অবস্থায় স্বস্তি পেতে অ্যান্টাসিডই একমাত্র ভরসা। তাই বেশিরভাগ মানুষই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই দোকান থেকে মুঠো মুঠো অ্যান্টাসিড কিনে খেতে থাকেন। কিন্তু জানেন কি, এর ফলে স্বাস্থ্যের কতখানি ক্ষতি করে ফেলছেন আপনি?

প্রখ্যাত কার্ডিওলজিস্ট চিকিৎসক শ্রীরাম নেনে তাঁর ইউটিউব ভিডিওতে বলেছেন যে, ভারতের প্রায় ৩০% মানুষ গ্যাস-অম্বলের সমস্যায় ভোগেন। ফলস্বরূপ দিনের পর দিন যথেচ্ছভাবে অ্যান্টাসিড খেয়ে চলেন।কিন্তু এই অ্যান্টাসিড মানবদেহের কিডনি, হৃদপিণ্ডর ক্ষতি-সহ একাধিক রোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

অম্বল বা হজমের সমস্যার প্রধান কারণ কী?

গৃহীত খাদ্যবস্তু হজম করতে এবং তাতে উপস্থিত জীবাণুকে ধ্বংস করতে আপনাদের পাকস্থলীতে অ্যাসিড উৎপন্ন হয়। কিন্তু কখনও কখনও উৎপাদিত অ্যাসিডের পরিমাণ বেড়ে গেলে শরীরে অস্বস্তি বোধ হতে থাকে। চিকিৎসকদের মতে গ্যাস-অ্যাসিডিটির সমস্যার ক্ষেত্রে গোড়াতেই লুকিয়ে রয়েছে গলদ। অর্থাৎ, মূলত খ্যাদাভাসের কারণেই এই সমস্যা দেখা দেয়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ব্রেকফাস্টে যা খাচ্ছেন, তা মৃত্যু ডেকে আনছে না তো? সতর্ক হন আজই

আপনি যেসব খাবার ডায়েট ফুড হিসেবে খেয়ে চলেছেন, কিংবা যেগুলিকে সুস্বাদু খাবার বলে মনে করছেন, সেগুলি স্বাস্থ্যকর নাও হতে পারে। এক্ষেত্রে হয়তো আপনার ওজন হ্রাস পেতে পারে, তবে একইসঙ্গে এগুলি ডায়াবেটিস থেকে শুরু করে অন্যান্য একাধিক অসুখ ডেকে আনবে‌।

দ্রুত খাবার খেলে বা খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জল খেলে অতিরিক্ত পরিমাণ গ্যাস আমাদের শরীরের মধ্যে প্রবেশ করে। যেমন ধরুন, বিরিয়ানি খেয়েই কোল্ড ড্রিঙ্কস খেলে আপনি ভাবছেন পেট হালকা হলো, কিন্তু না এতে গ্যাসের সমস্যা বাড়ে। আবার অতিরিক্ত তেল ঝালমশলা-সহ খাবার খেলে বা সঠিক সময় খাবার না খেলেও এই সমস্যার উদ্রেক হতে পারে। এছাড়া অনেকে জল গ্লাসে না ঢেলে সরাসরি জগ থেকে খান। এতেও কিন্তু বাড়ে অ্যাসিডিটির সম্ভাবনা। আবার শরীরে কোনও যদি কোনও ইনফেকশন থাকে, বিশেষত পেটে, তাহলেও খাবার হজমে সমস্যা দেখা দেয়।

অত্যধিক হজমের ওষুধ খাওয়ার ফলে কী কী সমস্যা হতে পারে?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অত্যধিক মাত্রায় হজমের ওষুধ খেলে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সম্ভাবনা বাড়ে। ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি স্কুলের মেডিসিন বিভাগের এক গবেষণাপত্রে দাবি করা হয়েছে, অতিরিক্ত অ্যান্টাসিড হাড় ভঙ্গুর করে দেয়। কিডনির অবস্থা ধীরে ধীরে খারাপ হতে থাকে এবং সবচেয়ে ক্ষতিকারক প্রভাব পড়ে হৃদপিণ্ডে। হৃদযন্ত্রের অবস্থা এতটাই খারাপ করে দেয় যে, হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা মারাত্মক বেড়ে যায়। পরিসংখ্যান বলছে, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই বহু মানুষ প্রতিদিন অ্যান্টাসিড খান। প্রেসক্রিপশনের প্রয়োজন না হওয়ায় ওষুধের দোকান থেকেও প্রচুর পরিমাণে বিক্রি হয় এই ওষুধ। ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি-র গবেষকরা বলছেন, অ্যান্টাসিড খাওয়ার প্রবণতা ২৫% পর্যন্ত মৃত্যুর হার বাড়িয়ে দেয়।

পাকস্থলীতে অতিরিক্ত অ্যাসিড থাকলে, তা এই ওষুধগুলি কমিয়ে দেয়। কিন্তু যদি অতিরিক্ত অ্যাসিড না থাকে, তবে অ্যান্টাসিডে থাকা ক্ষার পাকস্থলীর ক্ষতি করে। শরীরের রক্তাল্পতাও দেখা দেয়। ওষুধের উপাদানগুলি কিডনিতে জমা হতে শুরু করে। শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা ব্যাপক হারে কমে যায়। তাতে বাড়ে রক্তচাপ। ফলস্বরূপ হঠাৎই হার্ট অ্যাটাক হয় ব্যক্তির। এছাড়াও অ্যান্টাসিডের কারণে ডায়েরিয়া, কিডনিতে পাথর, শরীরে বি টুয়েলভ-এর পরিমাণ কমে যাওয়া, স্মৃতিভ্রংশ, স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে যাওয়া, মাথার যন্ত্রণা এবং তলপেটে ব্যথা প্রভৃতি সমস্যা দেখা দেয়।

করণীয়

এক্ষেত্রে কম তেলমশলার খাবার খান। গ্যাস-অম্বলের সমস্যায় ভুগলে প্রতিদিন শাকসবজি-ফল বেশি করে খাওয়া প্রয়োজন। প্রতি সপ্তাহে নিয়ম করে অন্তত ৩০ রকমের ফল, শাকসবজি-বাদাম এই খাবারগুলি খান। রোজ এক বাটি করে ডাল অবশ্যই খাবেন। এর পাশাপাশি শরীরচর্চা আবশ্যক। শরীরে কোনও অস্বস্তি মনে হলেই বেশি করে হাঁটাহাঁটি করুন, উপকার পাবেন। অতিরিক্ত অ্যাসিডিটির সমস্যায় ভুগলে দুধ এবং দুগ্ধজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলুন।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বিখ্যাত সংগীতশিল্পী কে কে-র মৃত্যুর কারণ হিসেবে ময়নাতদন্তের রিপোর্টে হৃদযন্ত্রের সমস্যার কথা উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি শোনা যায়, হৃদযন্ত্রের যে সমস্যা ছিল সেটা জানতেনই না কে কে। হজমের সমস্যা ভেবে প্রচুর অ্যান্টাসিড খেতেন সংগীতশিল্পী। কে কে-র স্ত্রীও কলকাতা পুলিশকে জানিয়েছেন যে, শারীরিক অস্বস্তির কারণে প্রায়ই অ্যান্টাসিড খেতেন কে কে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া একটানা অ্যান্টাসিড খাওয়া মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখতে চিকিৎসকরাও অ্যান্টাসিড ত্যাগেরই পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

লিখেছেন
Piya Saha
Piya Saha
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

চিনির বিকল্প স্টেভিয়া! ঘরের বাগানে রাখা যায় যে ‘মধু পাতা’

Stevia benefits: গাছ থেকে সদ্য তোলা কাঁচা পাতা কিংবা রোদে শুকিয়ে নেওয়া পাতা সরাসরি চা বা যেকোনো পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়। এতে চিনির মতো একই রকম মিষ্টতা পাওয়া যায়। স্টিভিয়ার নির্যাস থেকে তৈরি মিষ্টান্ন ডায়াবেটিস রোগীরা খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে না বললেই চলে।

ফুটপাথের ধারের সেই খাবার যেভাবে হয়ে উঠল কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

Kolkata Street food history: সুতানুটি-গোবিন্দপুর-কলিকাতার শ্রমজীবী মানুষের তৃপ্তির জন্য জন্ম হয়েছিল ফুটপাতের খাবারের। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের 'সংবাদ প্রভাকর' থেকে হুতোম প্যাঁচার নকশা, এফএও সমীক্ষা থেকে এফএসএসএআই আইন হয়ে ২০২৫ সালে রাসেল স্ট্রিটে প্লাস্টিক-মুক্ত ফুড হাবের জন্ম। কলকাতার স্ট্রিট ফুড আজও এই শহরের প্রাণ। এই শহরের অন্যতম ঐতিহ্য।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি কেন আরশোলার মৃত্যুতে দুঃখ পেয়েছিলেন?

Sanae Takaichi cockroach story: ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ। সরকারি বাসভবনে গভীর রাতে একা কাজ করতে গিয়ে তিনি একটি আরশোলা দেখতে পেয়েছিলেন। সচরাচর আরশোলা দেখলে তিনি চিৎকার করে ওঠেন, কিন্তু সেদিন তিনি সেটিকে মারেননি।

স্ট্রেস কি সবসময় খারাপ? কখন স্বাভাবিক চাপ হয়ে ওঠে মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি?

mental stress: একটি ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করতে গিয়ে তারা দেখেছেন, একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ইঁদুরটির মধ্যে স্ট্রেস বাড়ানোর সঙ্গে তার কাজকর্মের মান আরও উন্নত হয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সীমা পার করবার পর পরই তার ফলাফল করার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা ক্রমশ কমতে কমতে শেষে সেটা প্রায় শূন্যতে নেমে গিয়েছে।

নিজের সর্বস্ব দিয়ে হাসপাতাল গড়েছিলেন রাধাগোবিন্দ কর

History of RG Kar Medical College and Hospital: আজ যে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল বারবার খবরের শিরোনামে, তার দীর্ঘ ইতিহাস কী? কে ছিলেন রাধাগোবিন্দ কর, যিনি নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে গরিব মানুষের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল গড়ে তুলেছিলেন? প্লেগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বাংলায় চিকিৎসাবিজ্ঞান চর্চা ও সমাজসেবায় তাঁর অবদান আজ কতটা মনে রাখা হয়েছে?

হিরোশিমা-নাগাসাকির আগুন থেকে বেঁচে যাঁরা, কেমন ছিল তাঁদের পরের জীবন?

Hiroshima, Nagasaki: বিস্ফোরণের বহু বছর পর এমিকোর ঘরে মেয়ে এল, আর তারও পর জন্ম নিল এমিকোর নাতনি কাজুমি কুওয়াহারা। নবজাতক নাতনিকে দেখে চিকিৎসকেরা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, "এই বাচ্চা তিন দিনের বেশি বাঁচবে না।" জিনের ভিতরে লুকিয়ে থাকা কোনো অজানা দুর্বলতা যেন জন্ম থেকেই জাপটে ধরেছিল ছোট কাজুমিকে।

কেন কম ঘুমেও কেউ সুস্থ, কেউ হারাচ্ছেন স্মৃতি? জানালেন গবেষকরা

sleep deprivation and brain health: গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে AQP4 (Aquaporin-4) নামে একটি জিন। এই জিনকে অনেকটা মস্তিষ্কের 'সাফাই কর্মী' বলা যায়। আমরা যখন গভীর ঘুমে থাকি, তখন মস্তিষ্কে শুরু হয় এক বিশেষ পরিষ্কার করার কাজ। সারাদিনে জমে থাকা বর্জ্য এবং আলঝাইমার্স রোগের সঙ্গে যুক্ত ক্ষতিকর প্রোটিন এই সময় ধীরে ধীরে শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। আর সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজে বড় ভূমিকা পালন করে AQP4 জিন।