দীর্ঘায়ু হবে প্রিয় পোষ্য! যে চমৎকার ঘটাতে পারে কুকুরদের বয়স কমানোর এই ওষুধ
Anti-Aging Drug for Dogs: কোষের বৃদ্ধি এবং বার্ধক্যের সঙ্গে জড়িত ইনসুলিন-সদৃশ গ্রোথ ফ্যাক্টর ১ (IGF-1) হরমোন, কুকুর ছানাদের মধ্যে জীবনকালের তারতম্যে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
যে পোষ্যই পছন্দের হোক না, পশুপ্রেমীদের সর্বদা একটি ভয় তাড়া করে। এমন মায়ার সম্পর্ক, একদিন তো ছিন্ন হবেই। বিশেষ কোনও দুর্ঘটনা না ঘটলে, জৈবিকভাবে একদিন প্রিয় পোষ্যই মানুষের চেয়ে আগে মারা যাবে। প্রিয় সঙ্গীকে হারানোর যন্ত্রণা যারা জানেন, তাঁরা এমন বীভৎস দিনের কথা কল্পনাতেও আনতে চান না। মানুষও অমর নয়, একদিন প্রাণের মেয়াদ ফুরোয়। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের কৃপায় মানুষের মেয়াদ আগের চেয়ে ঢের বেড়েছে। তাহলে পোষ্যের ক্ষেত্রে কেন নয়? এমন এক পৃথিবী কি আমরা পেতে পারি না, যেখানে মানুষ আর প্রিয় পোষ্য একই সঙ্গে বড় হবে, বুড়ো হবে? জীবনের শেষ দিনগুলোতে সম্পর্কের সেই উষ্ণ স্পর্শ কেউ কাউকে ছেড়ে যাবে না! কুকুরের ক্ষেত্রে বিশেষ করে, সকলেই প্রায় জানেন, তাদের আয়ুষ্কাল মানুষের আয়ুর এক ভগ্নাংশ মাত্র। বিজ্ঞান কি পশুদের ক্ষেত্রে বার্ধক্যের নিয়ম নতুন করে লিখতে পারে?
শোনা যাচ্ছে, ২০২৬ সালের মধ্যে, সেই সম্ভাবনা বাস্তবে পরিণত হতে পারে। কুকুরদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা একটি যুগান্তকারী অ্যান্টি-এজিং ওষুধ অনুমোদন পাওয়ার অপেক্ষায় আছে। এই ওষুধ কুকুরদের আয়ু বাড়াতে পারে, স্বাস্থ্যকর আয়ু পেতে সাহায্য করতে পারে। তবে কেবল জীবনে আরও কিছু সময়কাল যোগ করার বিষয় নয়; এই ওষুধ জীবনীশক্তি যোগ করতে সক্ষম। কুকুরপ্রেমীদের কাছে এই ওষুধ মন্থনজাত অমৃতের মতোই! পোষ্য সারমেয়র রোগ বা যন্ত্রণামুক্ত দীর্ঘ আয়ু নিশ্চিত করার ওষুধ সম্ভবত তৈরি করে ফেলেছেন বিজ্ঞানীরা।
আরও পড়ুন- বারণ এবার পোষ্যেও! যে কারণে নিষিদ্ধ হল ২৩ প্রজাতির কুকুর
কুকুরের আয়ুর নেপথ্যের বিজ্ঞান
কুকুরের জীবন বেশ ছোট। কিছু ছোট প্রজাতি কিশোর বয়স অবধি ভালোভাবে বাঁচতে পারে, তবে বড় কুকুরদের আয়ু বেশিই কম। যত বয়স বাড়ে অনেকেরই চলাফেরার সমস্যা হয়, চেতনার হ্রাস ঘটে এবং আট-নয় বছর বয়সে পৌঁছনোর সময় নানা অঙ্গ বিকল হতে শুরু করে। পোষ্যের মালিকদের কাছে, প্রিয় সঙ্গীর এমন কষ্ট দেখার চেয়ে বেদনাদায়ক কিছু নেই। একসময়ের উদ্যমী সঙ্গীকে ধীর হয়ে যেতে দেখা, খেলাধুলোর প্রতি আগ্রহ কমে যেতে দেখা, ক্লান্ত হয়ে যেতে দেখা বিষণ্ণ করে তোলে। কিন্তু কেন আকারের সঙ্গে আয়ুষ্কাল এমন জড়িয়ে থাকে?
কুকুর মানুষকে এবং মানুষ কুকুরকে সঙ্গী হিসেবে বহু শতাব্দী আগেই নির্বাচিত করে নিয়েছে। মানুষ বহু শতাব্দী ধরেই কুকুরের নির্বাচিত প্রজনন ঘটিয়েছে যা কেবল তাদের চেহারা এবং মেজাজই নয়, তাদের আয়ুও গঠন করেছে। এর ফলে কুকুরের নানা প্রজাতির মধ্যে আয়ুষ্কালের ব্যবধান বিশাল। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া কিছু জেনেটিক দুর্বলতা কুকুরের বার্ধক্যকে ত্বরান্বিত করে। যেমন গ্রেট ডেনের মতো বিশালাকার কুকুর কেবল ছয় থেকে আট বছর বাঁচে। অন্যদিকে চিহুয়াহুয়ার মতো ছোট কুকুর কিন্তু ১৮ বছর বয়স অবধিও বাঁচতে পারে৷ বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, এই পার্থক্য মূলত কুকুরের দেহ কীভাবে বিপাক, বৃদ্ধির এবং বার্ধক্য পরিচালনা করে তার কারণেই ঘটে থাকে। দ্রুত বৃদ্ধি এবং বিপাকীয় হার বেশি হলে কুকুরের শরীরে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়, যার ফলে বয়স বেড়ে যায় দ্রুত।
সাম্প্রতিককালে, গবেষকরা কুকুরের বার্ধক্যজনিত জৈবিক কারণগুলি নিয়ে কাজ করতে শুরু করেন। নির্দিষ্ট জেনেটিক এবং বিপাকীয় প্রক্রিয়া কীভাবে বয়সের বৃদ্ধির কারণ হয় তা খতিয়ে দেখেন। গবেষণায় দেখা গেছে, কোষের বৃদ্ধি এবং বার্ধক্যের সঙ্গে জড়িত ইনসুলিন-সদৃশ গ্রোথ ফ্যাক্টর ১ (IGF-1) হরমোন, কুকুর ছানাদের মধ্যে জীবনকালের তারতম্যে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বড় কুকুরদের দেহ বেশি IGF-1 উত্পাদন করে, যা দ্রুত বয়স বৃদ্ধির কারণ হয়। বিজ্ঞানীরা কুকুরের বার্ধক্য কমানোর উপায় খুঁজতে থাকেন। শুধু বয়স কমানো নয়, সুস্থ, সক্রিয় জীবনযাপনের মেয়াদ বাড়ানোও ছিল তাঁদের লক্ষ্য৷ এই গবেষণার ফলেই বার্ধক্য কমানোর ওষুধ তৈরি হলো।
কীভাবে কাজ করবে এই ওষুধ?
অনেক বছর ধরেই, বিজ্ঞানীরা মানুষের মধ্যে বার্ধক্য প্রক্রিয়াকে ধীর করার উপায় খুঁজেছেন। সেই সাফল্য থেকেই পোষ্যের কথাও ভাবা। লয়াল নামে এক বায়োটেক কোম্পানি কুকুরের জীবনকাল বাড়ানোর বিষয় নিয়ে কাজ করে। তাদের পরীক্ষামূলক ওষুধ, LOY-001, বিশেষভাবে বড় আকারের কুকুরের জন্য তৈরি করা হয়েছে, যাদের ওজন ৪০ পাউন্ডের বেশি, যাদের সবচেয়ে কম আয়ু। সফল হলে, এই ওষুধটির ফলে বড় কুকুররা অতিরিক্ত, স্বাস্থ্যকর জীবন কাটাতে পারবে।
LOY-001 সেই অন্তর্নিহিত জৈবিক প্রক্রিয়াগুলির উপর কাজ করে যা কুকুরদের দ্রুত বুড়িয়ে দেয়। শরীরের আকার এবং জীবনকাল দুইয়ের সঙ্গে যুক্ত ইনসুলিন-সদৃশ গ্রোথ ফ্যাক্টর ১ (IGF-1) হরমোনকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ওষুধটি তৈরি করা হয়েছে। বড় কুকুর স্বাভাবিকভাবেই বেশি IGF-1 উৎপন্ন করে, যা ছানা অবস্থাতেই দ্রুত বৃদ্ধি ঘটায়। এই হরমোনকে নিয়ন্ত্রণ করে বার্ধক্যের প্রক্রিয়াকে ধীর করা, কুকুরদের জীবনীশক্তি দীর্ঘস্থায়ী করতে সাহায্য করাই LOY-001-এর লক্ষ্য।
আরও পড়ুন-কুকুরের দিকে তাকালেই তাদের মস্তিষ্কের সঙ্গে জুড়ে যায় মানুষের মস্তিষ্ক? কী বলছে গবেষণা?
লয়ালের গবেষণা অনুসারে, জাত এবং জেনেটিক কারণের উপর নির্ভর করে এই ওষুধটি কুকুরের স্বাস্থ্যকর জীবনকাল এক বছর বা তার বেশি বাড়িয়ে দিতে পারে। মনে হতেই পারে যে, এক বছর আয়ু বাড়িয়ে আর এমন কী হবে! তবে মনে রাখতে হবে, কুকুরের জীবনে একটি অতিরিক্ত বছর বৃদ্ধি মানুষের জীবনের সাত থেকে দশ বছরের সমতুল্য। এও মনে রাখতে হবে, ওষুধের লক্ষ্য কেবল আয়ু বাড়ানো নয়, ওই অতিরিক্ত বছরগুলিতে জীবনের গুণমানও বৃদ্ধি করা, কুকুরদের সচল, সতর্ক এবং সক্রিয় রাখা। ইঁদুর থেকে শুরু করে বাঁদর, অন্যান্য প্রজাতির উপর গবেষণায় দেখা গেছে যে IGF-1 মাত্রা কমিয়ে দিলে তা আয়ু বাড়াতে পারে এবং বয়স-সম্পর্কিত রোগকেও পিছিয়ে দিতে পারে। অনুমোদন পেতে পরীক্ষার একাধিক পর্যায় পেরোতে হবে LOY-001-কে। কীভাবে ওষুধটি IGF-1 মাত্রাকে প্রভাবিত করে তা খতিয়ে দেখছেন বিজ্ঞানীরা।
এখন ক্লিনিকাল ট্রায়াল চলছে। ২০২৬ সালের মধ্যে FDA অনুমোদন পাওয়ার পথে রয়েছে LOY-001। যদি তা অনুমোদন পেয়ে যায় তবে ভেটেরিনারি ওষুধের জগতে তা এক নতুন যুগের সূচনা করতে পারে। বার্ধক্য অনিবার্যতা ঠিকই, তবে বিজ্ঞানের মাধ্যমে তা ধীর করা যেতেই পারে। মানুষের ক্ষেত্রেও, পশুর ক্ষেত্রেও।