দু'পেয়ে প্রথম পাওয়া গিয়েছিল ভারতেই, উঠে এল যে চমকপ্রদ তথ্য

Homo-erectus originated from India: মানবসভ্যতার বিবর্তনের ইতিহাসের পদক্ষেপে আদিমানব যখন চার পা ছেড়ে দু’পায়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করল, সেই হোমো-ইরেক্টাস-এর সব থেকে পুরনো চিহ্ন মিলেছে ভারতে।

Srota Dutta
৪ মিনিট
দু'পেয়ে প্রথম পাওয়া গিয়েছিল ভারতেই, উঠে এল যে চমকপ্রদ তথ্য

মানবসভ্যতার বিবর্তনের ইতিহাসের পদক্ষেপে আদিমানব যখন চার পা ছেড়ে দু’পায়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করল, সেই হোমো-ইরেক্টাস-এর সব থেকে পুরনো চিহ্ন মিলেছে ভারতে। নয়াদিল্লির ন্যাশনাল মিশন অন মনুমেন্টস অ্যান্ড অ্যান্টিকুইটি এবং ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ বিভাগ এ শহরে একটি দুদিনের হাইব্রিড মোড কর্মশালার আয়োজন করেছিল। সেখানেই উঠে এল এই চমকপ্রদ তথ্য। ডিসেম্বরের ১৭ এবং ১৮ তারিখ উদয়াচলে এই কর্মশালা হয়। এতে যোগ দিয়েছিলেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, অধ্যাপক, প্রত্ন সংরক্ষণে উৎসাহী ও শিক্ষা জগতের মানুষজন।

ইতিহাসের দর্পণে দু’পায়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতা, বিবর্তনের আঙিনায় এক পট পরিবর্তন। এ জিনিস এক মিনিটে ঘটে না, কোনও বিশেষ এক এলাকা নির্ভরও নয়। আমরা অনেকেই শুনেছি, প্রথম মানুষ, প্রত্ন-বিজ্ঞানের পরিভাষায় যার নাম হোমো-ইরেক্টাস, তার প্রাচীনতম ফসিল পাওয়া যায় আফ্রিকায়। সাধারণ মানুষ অবাক বিস্ময়ে মেনে নেন, মানুষের জন্মস্থল আফ্রিকা। কিন্তু প্রত্ন অনুসন্ধানীরা প্রায় গোয়েন্দার মতো বিভিন্ন ছিন্ন সূত্র জড়ো করে তত্ত্ব প্রমাণ করেন। প্রত্নবস্তুর সযত্ন সংরক্ষণ কেন প্রয়োজন─তা বোঝাতেই হোমো-ইরেক্টাস নিয়ে এই চালু তত্ত্ব খণ্ডন করে বলিষ্ঠ তথ্য দিলেন পুনের ডেকান কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা ডাঃ শীলা মিশ্র। তিনি জানালেন, হোমো-ইরেক্টাসের সব থেকে প্রাচীন ফসিল পাওয়া যায় ইন্দোনেশিয়ার জাভাতে। আর ভারতীয় ভূখণ্ডে মেলে হোমো-ইরেক্টাস ব্যবহৃত পাথুরে অস্ত্র সামগ্রী। দু'য়েরই বয়স আনুমানিক চব্বিশ লক্ষ বছরের আশেপাশে। আফ্রিকায় উদ্ধার করা হোমো-ইরেক্টাসের ফসিল তুলনায় বেশ নবীন। তার বয়স কুড়ি লক্ষ বছরের কাছাকাছি। কোনও এক বস্তুকে এককভাবে দেখলে ইতিহাসকে ভুল বোঝার সমুহ সম্ভাবনা। তাকে সামগ্রিক প্রেক্ষিতের বিচারে দেখা উচিৎ। ইন্দোনেশিয়ায় সেই ফসিলের সমকালীন আর যে সব জীব জন্তুর জীবনের প্রমাণ পাওয়া গেছে, সেগুলোর জন্ম ভারতীয় ভূখণ্ডে। তাঁর আরও ব্যখ্যা, হোমো-ইরেক্টাসের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো নির্ঘাৎ এই ভূখণ্ড থেকেই ওখানে গিয়েছিল। এমনও হতে পারে যে, এই ভূখণ্ড থেকেই আফ্রিকায় পাড়ি দিয়েছিল একদল। এই সম্ভাবনার সঙ্গে সঙ্গে তিনি আরও একটি সম্ভাবনার কথাও বলেন, যা প্রত্নতত্ত্বের নিরিখে গুরুত্বপূর্ণ। ভারত ভূখণ্ডে হোমো-ইরেক্টাসের ফসিল না মেলার কারণ উপমহাদেশীয় আবহাওয়া, তাপমাত্রা। তাঁর আরও দাবি, বিবর্তনের প্রত্নতাত্ত্বিক নমুনা কোনও এক বিশেষ ভূখণ্ডে বেঁধে রাখা সমীচীন নয়। বরং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের পরিবেশ বৈচিত্র, মাটি ইত্যাদি নিয়েই মানবসভ্যতার বিবর্তন এগিয়েছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
নদীর অতলে তলিয়ে গেছে একের পর এক মন্দির, পুরুলিয়ার যে ইতিহাস চলে গেছে আড়ালে

Telkupi Temples: গত শতাব্দীতেই শেষ মন্দিরগুলিও ডুবে গিয়েছে। হয়তো এই শতকেও দু'-একটি মন্দির আরও বেশিই বেঁচে থাকত। কিন্তু '৫৭ সালে দামোদরের ওপরে দেওয়া হল বাঁধ।

মানবজাতির ইতিহাসের আঙিনায় বিভিন্ন মণি মুক্ত এদিক ওদিক পড়ে থাকে। তাকে জড়ো করে গেঁথে ইতিহাস জানা আসলে নিজেকেই জানা। প্রকারান্তরে নিজের সভ্যতাকে স্বীকার করে তাকে চিনতে শেখা। কিন্তু চরিত্রগতভাবে ভারত ইতিহাস বিস্মৃতির দেশ বলেই হয়তো এদিকে ওদিকে ছড়ানো টেরাকোটা মন্দির, প্রাচীন অট্টালিকাকে সাধারণ মানুষ একেবারে অন্যভাবে ব্যবহার করে তার তাৎপর্যকে অবহেলা করে। এই রাজ্যেই গড়ে বছরে একাধিক প্রত্নবস্তু আজ এখান থেকে কাল ওখান থেকে উদ্ধার হয়। হয়তো কোথাও পাওয়া গেল কোনও প্রস্তর মূর্তি। ইতিহাসের বাটখারায় তা যথেষ্ট মূল্যবান হলেও তাতে তেল, সিঁদুর, গোবর লেপে, কোনও দেবতার জামা পরিয়ে ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে শুরু হয় পুজো। আমাদের দেশে প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণ আসলে Problem of Plenty. গোটা দেশে প্রায় ষাঠ লাখ প্রত্নবস্তু ছড়িয়ে রয়েছে। রয়েছে বহু ঐতিহ্যময় স্থাপত্য ও প্রাঙ্গণ। কিন্তু সেই সব সম্পদ সম্পর্কে আমরা কতটা ওয়াকিবহাল?

প্রত্ন-বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, বিশ্বের বৃহত্তম প্রত্ন-আকর সম্ভবত এই উপমহাদেশ। এই সুবিশাল প্রত্নভাণ্ডার পুনরুদ্ধার ও তার সুষ্ঠু সংরক্ষণের কর্মযজ্ঞ শুধু মাত্র সরকারের দ্বারা পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব। তাই সাধারণ মানুষকে সচেতন করে, তাঁদের সঙ্গে নিয়ে উদ্ধার করা ছড়ানো ছিটানো চিহ্ন-সূত্র কে এক মালায় গেঁথে সংরক্ষণ অত্যন্ত প্রয়োজন। এবং এই গোটা প্রক্রিয়া যথেষ্ট পরিশ্রমসাধ্য ও সময়-সাপেক্ষ। তাছাড়া, এই সব প্রাচীন প্রত্নবস্তু সংরক্ষণের অনেকটাই বিজ্ঞান নির্ভর। তার জন্য দরকার বিশেষ প্রশিক্ষণ। ন্যাশনাল মিশন অন মনুমেন্টস অ্যান্ড অ্যান্টিকুইটি তাই মূলত ছাত্রছাত্রী এবং স্কলারদের প্রশিক্ষিত করে কাজে লাগানোর জন্য এ দেশে বিভিন্ন কর্মশালার আয়োজন করেছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে সাধারণ মানুষের কথা বলা হচ্ছে কেন? তার ব্যাখ্যা দিলেন আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার ডিরেক্টর জেনারেল অধ্যাপক কিশোর কুমার বাসা। তিনি মনে করেন, এই সব প্রত্নবস্তু সংরক্ষণ বিজ্ঞান ও ইতিহাসের হাতে কলমে প্রয়োগের উপর নির্ভরশীল। তাই ন্যূনতম জ্ঞান থাকা জরুরি। সেই সঙ্গে কর্মশালায় প্রশিক্ষিতরা প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণ ও সাধারণের মধ্যে সেতু হিসাবে কাজ করতে পারে। এঁদের সান্নিধ্যে আমজনতা সচেতন হবে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মানুষ মরে গেলে কবর দিতে হয়, কবে শিখল আদিম মানুষ?

First Human Burial: প্রায় ৭৮,০০০ বছর আগে, একটি ছোট আড়াই বা তিন বছরের শিশুকে ভ্রূণের অবস্থানে শুইয়ে রাখা হয়েছিল একটি অগভীর কবরে।

এই কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার প্রাক্তন ডিরেক্টর জেনারেল ডাঃ গৌতম সেনগুপ্ত। বিশিষ্ট অতিথিবর্গের মধ্যে ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ জেনারেল এবং অফিশিয়াল ট্রাস্টি শ্রী বিপ্লব রায়। তাঁর বক্তব্যে বিপ্লব রায়, লালাবাজার ও তার সংশ্লিষ্ট এলাকাকে হেরিটেজ জোন ঘোষণা করার দাবি তোলেন। তাঁর মতে, এই এলাকায় রয়েছে সিনাগগ, কলকাতার প্রথম আগিয়ারি (পার্সি অগ্নি মন্দির) গীর্জা সহ বেশ কিছু পুরনো স্থাপত্য। তিনি মনে করেন, এলাকায় হকারের দৌরাত্ম্য মূলত এই অসচেতনতার জন্যই। হেরিটেজ ঘোষণা করা হলে এলাকায় বিশেষ নজর দেওয়া সম্ভব হবে।

উপস্থিত বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করেন, এই বিপুল প্রত্নভাণ্ডার সামলানোর পাশাপাশি প্রত্ন-পাচারও একটা মস্ত সমস্যা। গোটা ব্যবস্থা সামলানোয় প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রিতা ও লাল ফিতের ফাঁসও গেরো। ব্যক্তিগত না সর্বজনীন? নাকি রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি? এই ধরনের জটিলতার বলি হয় প্রত্নবস্তু। এ সমস্যার মোকাবিলা কীভাবে সম্ভব? কর্মশালায় যোগ দিতে আসা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সায়নী দাসের কাছে এর কোনও সদুত্তর না থাকলেও, তাঁর মতে ইন্টারনেটকে হাতিয়ার করে অন্তত নিজেদের ইতিহাস চিনতে শেখার প্রচার চালানো যেতে পারে।

লিখেছেন
Srota Dutta
Srota Dutta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।