দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত, বিদেশে চিকিৎসায় নিষেধাজ্ঞা, কতটা অসুস্থ খালেদা জিয়া?

গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় শনিবার হাসপাতালে ভর্তি করা হয় খালেদা জিয়া-কে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী পার্টির চেয়ারপার্সন ও বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার হৃদযন্ত্রে কয়েকটি ব্লকেজ ধরা পরে। জরুরি ভিত্তিতে তাঁর অ্যাঞ্জিওগ্রাম করা হয় শনিবার দুপুরেই। জানা গেছে, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা আপাতত খুব জটিল না হলেও স্থিতিশীল নয়। ৭২ ঘণ্টা তাঁকে নজরদারিতে রাখার কথা জানিয়েছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

সংবাদমাধ্যম সূত্রের খবর-অনুযায়ী শনিবার ১১ জুন, বাংলাদেশ স্থানীয় সময় দুপুরে তাঁর অ্যাঞ্জিওগ্রাম করা হয়। এর আগে ১০ জুন তিনি অসুস্থ বোধ করলে বাংলাদেশ স্থানীয় সময় অনুযায়ী রাত ৩টের দিকে তাঁকে রাজধানী ঢাকা শহরের এভারকেয়ার হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে ভর্তি করা হয়।তাঁর চিকিৎসার জন্য ১২ সদস্যর মেডিক্যাল বোর্ডও তৈরি করা হয়। হার্টে রিং বসানো হয়েছে তাঁর। পরীক্ষার পর জানা যায়, খালেদার হার্টে তিনটি ব্লকেজ রয়েছে। এর মধ্যে করোনারি আর্টারিতে ৯৯ শতাংশ ব্লকেজ ধরা পড়ায় তড়িঘড়ি অ্যাঞ্জিওগ্রাম করার সিদ্ধান্ত নেয় মেডিক্যাল বোর্ড। তিনদিন ধরে তাঁর শারীরিক অবস্থা লক্ষ্য করার পর বাকি সিদ্ধান্ত নেবেন বোর্ডের চিকিৎসকরা।

৭৬ বছর বয়সি খালেদা জিয়া অনেকদিন ধরেই ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, ফুসফুস, কিডনি, চোখের সমস্যা-সহ নানা বয়সজনিত রোগে ভুগছেন। গত বছর করোনা-আক্রান্ত হলে নভেম্বর মাসে তাঁকে ভর্তি করা হয়েছিল ওই হাসপাতালেই। প্রায় তিন মাস চিকিৎসাধীন থাকার পরে গুলশনের বাড়িতে ফেরেন বিএনপি নেত্রী। তখনই পরিপাকতন্ত্রে রক্তক্ষরণ ও লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন চিকিসকরা।

আরও পড়ুন: নুপুর শর্মা বিতর্কে ভারতের পাশে ‘বন্ধু’ বাংলাদেশ, নেপথ্যে যে কারণ

দুর্নীতির মামলায় ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কারাগারে ছিলেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর ২০২০ সালের ২৫ মার্চ হাসিনা সরকারের আদেশে শর্তসাপেক্ষে সাজা স্থগিত রেখে সাময়িকভাবে মুক্তি দেওয়া হয় তাঁকে। এরপর থেকেই বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত হন ৭৭ বছর বয়সি খালেদা।

বাংলাদেশে খালেদা জিয়ার সু-চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই দাবি করে তাকে বিদেশে পাঠাতে কয়েক দফায় হাসিনা সরকারের কাছে আবেদন করেছিলেন তাঁর ভাই শামীম এস্কান্দার। কিন্তু প্রতিবারই তা নাকচ করেছে সরকার।বিএনপি সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ রবিবার এই প্রসঙ্গে বলেছেন, "বেগম খালেদা জিয়ার জীবন বিপন্ন। আর ওঁরা উল্লাস করছেন। আদিমকালে শিকারকে আঘাত করে, তাকে কবজায় নেওয়ার পর শিকারি যেভাবে উল্লাস করত, সেই আদিম উল্লাস করছেন। গোটা জাতিকে বন্দি করে, তাঁদের বাকস্বাধীনতাকে বন্দি করে, মৌলিক অধিকারকে বন্দি করে, শেখ হাসিনা এখন উল্লাস করছেন পদ্মা সেতু দেখিয়ে।"

গত বৃহস্পতিবারই খালেদার আইনজীবী আদালতের কাছে তাঁর বিরূদ্ধে চলা দু'টি মামলার শুনানি পিছনোর আর্জি জানান। তিনি আদালতকে আবেদনে জানান, "অসুস্থতার কারণে খালেদা জিয়া আদালতে হাজির হতে পারছেন না। তাঁর নড়াচড়া করার মতো অবস্থা নেই। তাই শুনানি স্থগিত করা উচিত। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই মুহূর্তে মোট ৩৭টি মামলা চলছে খালেদার বিরুদ্ধে। এর মধ্যে ৩৫টি মামলায় তিনি জামিনে রয়েছেন। বাকি দু'টি মামলায় তাঁর সাজা হয়েছে। জিয়া অরফ‍্যানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ১০ বছরের সাজা হয়েছে খালেদার। ১৩টি মামলা হয়েছে ২০০৭ এবং ২০০৮ সালের জরুরি শাসনকালে। মামলাগুলোর মধ্যে পাঁচটি দুর্নীতি মামলা, চারটি মানহানির মামলা ও একটি রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা রয়েছে। বাকি মামলাগুলো হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও নাশকতার অভিযোগে। ঢাকা, কুমিল্লা ও খুলনায় তাঁর বিরুদ্ধে বেশিরভাগ মামলা হয়েছে। প্রায় ২১টি মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে এখনও বিচার প্রক্রিয়াই শুরু হয়নি। যার কিছু মামলায় চার্জশিট হলেও কয়েকটি তদন্ত পর্যায়েই আটকে রয়েছে।

নাইকো দুর্নীতি মামলা
কানাডার জ্বালানি কোম্পানি নাইকোর সঙ্গে গ্যাস-সংক্রান্ত চুক্তি করে রাষ্ট্রের প্রায় ১০,০০০ কোটি টাকা ক্ষতি করার অভিযোগে ২০০৭ সালের ৯ ডিসেম্বর তেজগাঁও থানায় মামলা দায়ের হয় তাঁর নামে। ২০০৮ সালের ৫ মে খালেদা জিয়া-সহ ১১ জনের বিরুদ্ধে এই মামলায় অভিযোগপত্রও পেশ করা হয়। বর্তমানে মামলাটি ঢাকার বিশেষ জজ আদালতে বিচারাধীন।

গ্যাটকো দুর্নীতি মামলা
ঢাকার কমলাপুর আইসিডি ও চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেনার হ্যান্ডলিংয়ে গ্লোবাল অ্যাগ্রো ট্রেড কোম্পানি লিমিটেড-কে (গ্যাটকো) ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। ২০০৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়া-সহ ১৪ জন অভিযুক্তর বিরুদ্ধে রাজধানীর তেজগাঁও থানায় গ্যাটকো দুর্নীতি মামলা দায়ের করে দেশের দুর্নীতিদমন কমিশন (দুদক)। মামলায় গ্যাটকোকে ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ দিয়ে রাষ্ট্রের ১৪ কোটি ৫৬ লাখ ৩৭ হাজার ৬১৬ টাকা ক্ষতির অভিযোগ করা হয়। এই মামলাটি ঢাকার বিশেষ জজ আদালতে বিচারাধীন।

জিয়া অরফ‍্যানেজ ট্রাস্ট মামলা
ট্রাস্টের নামে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ২০০৮ সালে ৩ জুলাই জিয়া অরফ‍্যানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা করে 'দুদক'। এই মামলায় ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত। পরে ওই রায়ের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়া হাইকোর্টে আপিল করলে তা খারিজ হয়ে যায়। একইসঙ্গে 'দুদক'-এর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সাজার পরিমাণ বাড়িয়ে ১০ বছর কারাদণ্ড দেয় হাইকোর্ট।

তবে এই মুহূর্তে জানা গেছে বিদেশে চিকিৎসা করাতে হলে খালেদাকে আদালতের অনুমতি নিতে হবে, কারণ তিনি এতগুলো মামলায় অভিযুক্ত। এখন দেখার, এই অবস্থায় আদালত অনুমতি দেবে কি না!

 

More Articles

;