কোন 'ভুলের' শাস্তি? বাংলাদেশে মাঝরাতে কেন সাংবাদিককে তুলে নিয়ে গেল পুলিশ?

Bangladesh Journalist Arrest: দিনমজুরের বক্তব্য বলে লেখা হয়, “পেটে ভাত না জুটলে স্বাধীনতা দিয়া কী করুম। বাজারে গেলে ঘাম ছুটে যায়। আমাগো মাছ, মাংস আর চাইলের স্বাধীনতা লাগব।”

inscript
৩ মিনিট
কোন 'ভুলের' শাস্তি? বাংলাদেশে মাঝরাতে কেন সাংবাদিককে তুলে নিয়ে গেল পুলিশ?

"সিআইডি থেকে আসছি"। ভোররাতে সাংবাদিকের বাড়িতে ঢুকে এই পরিচয়ই দিয়েছিলেন তারা। সংখ্যায় প্রায় ১৪ থেকে ১৫ জন! জিজ্ঞাসাবাদের লক্ষ্যে সাংবাদিককে তুলে নিজেদের গাড়িতে করে নিয়েও চলে যান তারা। তারপর ৩০ ঘণ্টা কেটে যায়, সাংবাদিক কোথায়? খোঁজ মেলে না। ৩০ ঘণ্টা পার করে নাটকীয়ভাবে 'অপহৃত' সাংবাদিককে তোলা হয় ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে! সেখানে তাঁর জামিনের আবেদনও খারিজ করে দেওয়া হয়। বাংলাদেশের প্রথম সারির দৈনিক প্রথম আলোর সাংবাদিক শামসুজ্জামান ঠিক কোথায় ছিলেন এই ৩০ ঘণ্টা? কেনই বা ভোররাতে তাঁকে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো বাড়ি থেকে?

সাভারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের আমবাগান এলাকায়, শামসুজ্জামানের বাড়িতে ভোর চারটে নাগাদ ওই ১৪-১৫ ব্যক্তি নিজেদের সিআইডি সদস্য পরিচয় দিয়ে ঢুকে পড়েন। শামসুজ্জামানের শোয়ার ঘরে তল্লাশি চালিয়ে তাঁর ব্যবহৃত একটি ল্যাপটপ, দু'টি মোবাইল ও একটি পোর্টেবল হার্ডডিস্ক বাজেয়াপ্ত করেন, পরে শামসুজ্জামানকেও তুলে নিয়ে যান তাঁরা। ওই ব্যক্তিদের সঙ্গে আশুলিয়া থানার পুলিশ আধিকারিকও উপস্থিত ছিলেন। অথচ পরে কেউই সাংবাদিকের সঙ্গে এই আচরণের প্রেক্ষিতে কিছুই স্বীকার করেননি। পরে জানা যায়, সৈয়দ মহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া নামের এক ব্যক্তি মঙ্গলবার রাত দুটো নাগাদ তেজগাঁও থানায় শামসুজ্জামানের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একটি মামলা দায়ের করেছেন। কে এই সৈয়দ মহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া? কেনই বা মাঝরাতে মামলা দায়ের? সূত্রের খবর বলছে, সৈয়দ মহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া ঢাকার কল্যাণপুরের বাসিন্দা। তিনি যুবলীগের ঢাকা মহানগর উত্তরের ১১ নম্বর ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক। আগে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন সৈয়দ মহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
দুইবোন মাত্র কথা বলতে পারেন আর, কীভাবে খাদের ধারে পৌঁছল বাংলাদেশের এই ভাষা?

Endangered language Kharia : বর্তমানে এই ভাষা জানা মানুষ বলতে মাত্র দুই জন। তাঁদেরও বয়স প্রায় আশি ছুঁইছুঁই। তাঁরা মারা গেলেই পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে একটা আস্ত ভাষা।

গত ২৬ মার্চ প্রথম আলো অনলাইনের একটি প্রতিবেদন ফেসবুকে প্রকাশের সময় দিনমজুর জাকির হোসেনের একটি 'বাইট' ব্যবহার করা হয়। দিনমজুরের বক্তব্য বলে লেখা হয়, “পেটে ভাত না জুটলে স্বাধীনতা দিয়া কী করুম। বাজারে গেলে ঘাম ছুটে যায়। আমাগো মাছ, মাংস আর চাইলের স্বাধীনতা লাগব।” কিন্তু সেখানে জাকির হোসেনের নাম থাকলেও ভুল করে ছবি দেওয়া হয় একটি শিশুর। পোস্ট করে দেওয়ার ১৭ মিনিটের মাথায় অসংগতি নজরে এলে তা সরিয়ে ফেলা হয়। প্রতিবেদন সংশোধনও করা হয়। প্রতিবেদনে বক্তার নাম হিসেবে জাকিরের নামই ছিল। স্রেফ ছবিটি ভুল ছিল। এই প্রতিবেদনটি লিখেছিলেন শামসুজ্জামান। এই ঘটনার জের ধরেই তাঁর বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেন গোলাম কিবরিয়া। শাসক দলের নেতাদের দাবি, ওই ছবিতে স্বাধীনতা দিবসের গর্বকেই যে শুধু খাটো করা হয়েছে তাই নয়, সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরির চক্রান্তও করা হয়েছে।

শামসুজ্জামানকে যখন তুলে আনা হয়, সে সময় স্থানীয় একজন সাংবাদিকও তাঁর বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় ওই সাংবাদিক জানিয়েছেন, সিআইডির সদস্য পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিরা ভোর পৌনে পাঁচটার দিকে শামসুজ্জামানের বাড়িতে এসে ঘরের মধ্যেই দাঁড় করিয়ে তাঁর ছবি তোলা হয়। তল্লাশির সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা সুদীপ্ত শাহীন উপস্থিত ছিলেন সেখানে। তবে শামসুজ্জামানের ক্ষেত্রেই থেমে নেই বিষয়টি। শোনা যাচ্ছে প্রথম আলো সংবাদপত্রের সম্পাদককেও গ্রেফতার করতে চলেছে পুলিশ! কঠোর ডিজিটাল আইনে সংবাদপত্রের বর্ষীয়ান সম্পাদক মতিউর রহমানের বিরুদ্ধেও অভিযোগ দায়ের হয়েছে ওই একই দিন, গভীর রাতে!

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
'বাংলাদেশি বাবু' ও ইন্দিরা গান্ধীর কণ্ঠস্বর! দেশের সবচেয়ে বড় রহস্য আজও অধরা

Nagarwala Scam: রুস্তম সোহরাব নাগারওয়ালা আসলে কে ছিলেন? সেই ‘বড় খবর’, যা তিনি ফাঁস করতে চেয়েছিলেন, সেটাই বা কী?

রমনা থানায় ডিজিটাল আইনে যে মামলায় সাংবাদিক শামসুজ্জামানকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে, তারই প্রধান আসামি করা হয়েছে সম্পাদক মতিউর রহমানকে। শামসুজ্জামান ও ‘অজ্ঞাতনামা আলোকচিত্রী’কে সহযোগী আসামি করা হয়েছে।

শামসুজ্জামানের বড় ভাই রবিউল ইসলাম পুলিশের কর্মকর্তা ছিলেন। ২০১৬ সালে গুলশানের হোলি আর্টিজানে জঙ্গিরা হামলা চালালে যে পুলিশ সদস্যরা প্রথমে তাঁদের রুখতে গিয়েছিলেন, সেখানেই ছিলেন সে সময়ের গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার রবিউল ইসলাম। তখন জঙ্গিদের হামলায় প্রাণ হারান রবিউল।

দুই ছেলের ছাত্রাবস্থাতেই স্বামীকে হারান শামসুজ্জামানের মা করিমন নেসা। দুই ছেলেকে পড়াশোনা করিয়েছেন তিনিই। রবিউলের মৃত্যুর পর শামসুজ্জামানই তাঁর সর্বস্ব। ছেলের এই গ্রেফতারিতে মায়ের কান্না থামানো যাচ্ছে না। অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তিনি। প্রশ্ন তুলেছেন, "আমার ছেলে কি চুরি করেছে, নাকি ডাকাতি করেছে। আমার ছেলের কী অপরাধ? আমার ছেলেকে বললে ও নিজেই থানায় গিয়ে হাজির হতো। কেন এভাবে রাতে আমার ছেলেকে তুলে নেওয়া হলো?”

মায়ের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে বাংলাদেশের সরকার। বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রী হাসান মাহমুদ বলেছেন, “এ ঘটনায় অবশ্যই মিথ্যা বলে রাষ্ট্রের ভিত্তিমূলে আঘাত হানা হয়েছে, স্বাধীনতাকে কটাক্ষ করা হয়েছে। সাংবাদিক ভুল করলে শাস্তি পাবেন না?” বিদেশ প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলছেন, “বাংলাদেশের স্বাধীনতা, ভাষা আন্দোলন, ৩০ লক্ষ শহিদের আত্মদান, এটা এতো ঠুনকো নয় যে যেকোনও কিছুর সঙ্গে এর তুলনা করা যাবে।” সাংবাদিকদের শাস্তি হিসেবে ভোররাতে তুলে নিয়ে যাওয়া, জামিন না মঞ্জুর! তাহলে নির্বাচনের আগে ভয়ের রাজনীতিতেই আস্থা রাখছেন শেখ হাসিনাও? উত্তর জানে বাংলাদেশের আমজনতা।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলা: তিন অভিযুক্তের সাজা হয়েও মেটেনি ‘ভিআইপি’ রহস্য

Ankita Bhandari case highlights :অঙ্কিতার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, গৌতমই সেই ভিআইপি, যিনি তাঁদের মেয়েকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে গৌতমের রাজ্যপাল নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন, এই যুক্তিতে যে এই ‘ভিআইপি’কে কোনো পদে বহাল থাকার অনুমতি দেওয়ার আগে সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত।

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? সরকার বদলায়, কেন বদলায় না মন?

Rabindranath Tagore Targeted in Bangladesh: বাংলাদেশে বারবার কেন নিশানা হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর? হাসিনা থেকে ইউনূস, সরকার বদলালেও কেন থামছে না তাঁর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার মুছে ফেলার চেষ্টা? জাতীয় সঙ্গীতের স্রষ্টাকেই কেন বারবার প্রত্যাখ্যানের মুখে পড়তে হচ্ছে?