‘বাসন্তী’ই আসলে বাংলার আদি দুর্গা, জানেন কোন ইতিহাস লুকিয়ে আছে এই পুজোর নেপথ্যে?

Basanti Puja : কবে থেকে শুরু হয়েছিল বাঙালির ‘আসল’ দুর্গার আরাধনা? জানেন, কী এর ইতিহাস?

Kankana Mukherjee
৩ মিনিট
‘বাসন্তী’ই আসলে বাংলার আদি দুর্গা, জানেন কোন ইতিহাস লুকিয়ে আছে এই পুজোর নেপথ্যে?

একই রকম দাকের বাদ্যি, একই রকম আবহ। ষষ্ঠীতে আবাহন, তারপর সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী, অতঃপর দশমীতে দেবীর বিসর্জন। তবে সময়টা মোটেই আশ্বিনের মাঝামাঝি নয়, ভরা চৈত্র মাসেই নতুন রূপে সেজে ওঠেন বাংলার দুর্গা। সহজ করতে বলতে গেলে আদি দুর্গা। বসন্তের দেবী বলেই যাঁর নাম বাসন্তী। আজকের দিনে বাঙালির যে দুর্গাপুজো ঘিরে এত উত্তেজনা তার কাহিনী অবশ্য কমবেশি সকলেই জানেন। অকাল বোধন, নামেই তো পরিচয়। পুরাণ অনুযায়ী, শ্রীরামচন্দ্র রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামার আগে দেবী দুর্গার যে আরাধনা করেছিলেন, তার সময়কাল ছিল আশ্বিন মাস। অর্থাৎ আদি দুর্গাপুজোর সময়কাল ধরে বিবেচনা করলে অকাল তো বটেই। তার পর থেকে যদিও সেই অকাল বোধনেই অভ্যস্ত হয়ে পড়ে বাঙালি। খানিকটা হলেও আড়ালে চলে যায় বাঙালির আদি দুর্গার কথন।

বছরে চারটি নবরাত্রি আসলেও তার মধ্যে দুটো নবরাত্রিই পালন করা হয় গোটা দেশে। যার মধ্যে একটি হল শরৎ নবরাত্রি অর্থাৎ এখনকার দুর্গাপুজোর সময়, আর অন্যটি হল বসন্ত নবরাত্রি অর্থাৎ আদি দুর্গাপুজোর সময় কালে। এখন এই বসন্ত নবরাত্রি মেনে পালন করা হয় বাসন্তী পুজো। শারদীয় দুর্গাপূজার মত এই বাসন্তী পুজোতেও আরাধনা করা হয় দেবী দুর্গার। যদিও সময়ের সঙ্গে যতোই জনপ্রিয় হয়েছে শরতের নবরাত্রি ততই যেন ফিকে হয়ে গিয়েছে এই বসন্তের নবরাত্রি তথা বাসন্তী পুজো পালনের রেওয়াজ। একটা সময় বাংলার এই আদি দুর্গা পুজো উপলক্ষ্যে সরকারি ছুটিও বহাল ছিল, তবে সে সবকিছুই এখন অতীত। এই বাসন্তী পূজা এখন কেবল কিছু জমিদার বাড়ি তথা বনেদি বাড়িতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
হিন্দু দেবতার দেখভাল করেন মুসলিমরা, ধর্মের ভেদাভেদ মিলেমিশে যায় বাংলার এই শিব মন্দিরে

Famous shishuyeswar shiv mandir : বিভেদের মাঝে যে মহা মিলনের কথা ভারতের প্রসঙ্গে বারবার বলে গিয়েছেন মুনী ঋষিরা, তা যে প্রকৃতই সে কথা মিলে যায় এই মন্দিরের অন্দরে

আসুন জেনে নেওয়া যাক পুরাণের কিছু কথা। শরতের দুর্গাপুজো যেমন শ্রীরামচন্দ্রের হাতে শুরু তেমনই কি বসন্তের এই আদি দুর্গাকে ঘিরেও কিছু রহস্য রয়েছে?

কথিত আছে যে, সমাধি নামক বৈশ্যের সঙ্গে মিলে চন্দ্র বংশীয় রাজা সুরথ বসন্ত কালে চৈত্র মাসের শুক্ল পক্ষে ঋষি মেধসের আশ্রমে প্রথমবার দুর্গা পুজো শুরু করেছিলেন। বসন্তকালে দেবী রূপের বন্দনা করা হয়েছিল বলেই নাম হয়েছিল বাসন্তী। সেই নামেই বাংলায় ছড়িয়ে পড়েন মহামায়া। এমনকী দেবী দুর্গার প্রথম পুজারী হিসাবেও চন্ডীতে রাজা সুরথের কাহিনীর উল্লেখ রয়েছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
শিব নয়, পায়ের নীচে থাকে অসুর, সিংহ! চমকে দেবে ৩০০ বছরের পুরনো বাংলার এই কালীর রহস্য

Balurghat Kali Puja : দোল উৎসবের সময় হয় এই বিশেষ পুজো, অবাক করবে বাংলার তিনশ বছরের পুরনো এই কালীর রহস্য

হিন্দু পুরাণ ঘেঁটে জানা যায়, এই রাজা সুরথ ছিলেন প্রাচীন বঙ্গ রাজ্যের একজন সুশাসক। যোদ্ধা হিসেবেও যথেষ্ট খ্যাতি ছিল তাঁর। শোনা যায়, তিনি নাকি কখনোই কোনও যুদ্ধে পরাজিত হননি, এতটাই ক্ষমতার জোর ছিল তাঁর। কিন্তু এই সময়েরও বদল ঘটে, একসময় প্রতিবেশী রাজ্য যবন সুরথের রাজ্য আক্রমণ করে। আচমকা এই আক্রমণের জন্য কোনও ভাবেই প্রস্তুত ছিলেন না রাজা সুরথ, তাছাড়া এই সময় সুযোগ বুঝে তাঁর নিজের সভাসদরাও বেইমানি শুরু করে। ধনসম্পত্তি লুট করে নিয়ে যায় তারা। নিজের কাছের মানুষদের থেকে পাওয়া এরূপ প্রতারণামূলক আচরণে রাজা স্তম্ভিত হয়ে যান রাজা সুরথ। এরপরই তিনি রাজ্যপাট হারিয়ে বনে বনে ঘুরতে ঘুরতে একসময় মেধস আশ্রমে এসে উপস্থিত হন।

অন্যদিকে একই রকম প্রতারণার শিকার হন বনিক রাজ্য সমাধিও। তবুও তাঁরা দুজনে শুভ চিন্তায় করেন, আর এই কথা শুনে ঋষি মেধস তাঁদের জানান সবই মহামায়ার ইচ্ছে, আর তাঁর মুখেই প্রথম মহামায়ার বর্ণনা শোনেন তাঁরা। এরপর তপস্যা শুরু করেন তাঁরা। রাজা সুরথ এবং সমাধি বৈশ্য পশ্চিমবঙ্গের গড় জঙ্গলে মাটি দিয়ে দেবী দূর্গার মূর্তি তৈরি করে প্রথম পূজা করেন। সেটিও ছিল এই বসন্তকাল। শোনা যায়, এই পুজোর পর মহামায়ার বর পেয়ে সুরথ রাজা নিজের সমস্ত হারানো সম্পত্তি ফেরত পান এবং রাজ্যে ফিরে আসেন। আর এই কাহিনীই অনুপ্রাণিত করেছিল স্বয়ং শ্রীরামচন্দ্রকেও। তাই তিনি শরৎকালেই দেবীর অকাল বোধন করেন।

প্রাচীন রাজাদের মধ্যে একটা বিশ্বাস প্রচলিত ছিল যে, মহামায়ার আশীর্বাদ না পেলে যুদ্ধে জয় সুনিশ্চিত নয়। ফলে, সেই থেকেই রাজবাড়ী এবং বেশ কিছু জমিদার বাড়িতে বসন্তকালে বাসন্তী তথা অন্নপূর্ণা পূজো করার রেওয়াজ শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেই রেওয়াজ প্রজন্মের হাত ঘুরে অনেকটা ফিকে হয়েছে ঠিকই, তবে একেবারেই হারিয়ে যায়নি। আজও এই বাংলার বহু পুরনো বাড়িতে পূজিতা হন দেবী বাসন্তী অর্থাৎ বাংলার আদি দুর্গা। আগামীকাল এই বছরের বাসন্তী পুজোর অষ্টমী, ইতিমধ্যেই তার তোড়জোড় শুরু হয়ে গিয়েছে। গত কাল নিয়ম মেনেই শুরু হয়েছে ষষ্ঠীর আরাধনা। টানা চারদিনের পুজো শেষ হবে ৩১ মার্চ শুক্রবার। ওই দিনই এবছরের বাসন্তী পুজোর বিজয়া।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।