অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী, জীবন কাটিয়েছেন ভবানী মায়ের সাধনায় || ভবাপাগলা আজও মানুষের মনে

Rupa Mitra
৪ মিনিট
অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী, জীবন কাটিয়েছেন ভবানী মায়ের সাধনায় || ভবাপাগলা আজও মানুষের মনে

তুমি কি ভেবেছো মনে,এই ত্রিভুবনে,

তুমি যাহা করে গেলে কেহ জানে না

বারে বারে আর আসা হবেনা,

বারে বারে আর আসা হবেনা।

এমন মানব জনম আর পাবেনা

বারে বারে আর আসা হবেনা।

এই লেখা ভাবের পাগল, প্রেমোন্মাদ, ভবানীমায়ের প্রিয় সন্তান ভবাপাগলা-র। বাউল কথাটির একটি অর্থ 'পাগল'।

কেহ ধনে কেহ মনে

কেউবা পাগল ভাবের টানে

তন্ত্র মন্ত্র নাহি মানে তারা

লাগায় শুধু প্রেমের ল্যাঠা

কথাগুলি পদকর্তা মনমোহন দত্ত তাঁর নিজের ভাষায় লিখেছেন।তবে একথা সত্য যে, ভবাপাগলাকে সম্পূর্ণ রূপে

বাউল বলা যায় না।কারণ তাঁর গানে ভক্তিরস থাকলেও,বাউল ধর্মের প্রভাবকে তিনি প্রকট হতে দেননি। তিনি ভবানী মায়ের চরণতলে বসে রচনা করে গেছেন অসাধারণ কিছু গান।প্রকৃত সাধক ছিলেন তিনি। হালকা-পাতলা দেহ, মাথায় ঘন ঝাঁকড়া চুল, চিবুকে একগোছা দাড়ি। অতি প্রিয় তাঁর এই চেহারা ভক্তদের মনে আঁকা হয়ে আছে।

আনুমানিক ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে (মতান্তরে ১৮৯৭ সালে) ভবাপাগলা ঢাকার কাছে আমতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম ছিল গজেন্দ্রমোহন রায়চৌধুরী (মতান্তরে সাহা চৌধুরী), মাতা গয়াসুন্দরী দেবী চৌধুরানী। ভবার নিজের কথায়-

পূর্ববঙ্গে ঢাকার গর্ভে

গর্বিত গ্রাম আমতা।

সেই গাঁয়ে জন্ম মোর,

পিতা গজেন্দ্র,গয়ামাতা।

বাঁচন মরণ এই দুই কূল,

সমাজ অমরধাম।

সেই সমাজের অধিকারী মুই

ভবা পাগলা মোর নাম।

তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ভবেন্দ্রমোহন (ভবাপাগলা) ও দেবেন্দ্রমোহন (যমজ ভাই)। ছোটবেলায় তিনি লেখাপড়ার থেকে মন্দিরে বেশি সময় কাটাতে পছন্দ করতেন।মাত্র পনেরো বছর বয়সে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় লেখাপড়ায় ইতি টানেন। জন্মভিটে আমতার পার্শ্ববর্তী গ্রাম পাকুটিয়া স্কুলে পড়ার সময় গড়ে তুলেছিলেন নিজের কীর্তন দল। তাঁর সুললিত কণ্ঠে গান এবং অমায়িক ব্যবহার সকলকে মুগ্ধ করত। তিরিশ বছর বয়সে মা গয়াসুন্দরী দেবী গ্রামেরই এক দশম বর্ষীয়া বালিকা শৈবালিনীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ দিলেন। তখন তিনি রীতিমতো সাধক কবি। তাঁকে ঈশ্বররূপে পূজো করত তাঁর ভক্তবৃন্দ। একবার নন্দলাল দাস নামের এক ব্যক্তি দুরারোগ্য ব্যাধি নিয়ে ভবার ভবনে হাজির হন। তাঁর বিশ্বাস ভবাপাগলা তাঁকে ছুঁয়ে দিলেই তাঁর ব্যাধি দূর হবে। অটুট বিশ্বাস দেখে মুগ্ধ ভবা নন্দলালকে স্পর্শ করলেন। আশ্চর্যভাবে সে ব্যধিমুক্ত হলো।ভবার অলৌকিক ক্ষমতার কথা তখন ছড়িয়ে পড়েছে চতুর্দিকে।দলে দলে দর্শনপ্রার্থী তখন ভবার ভবনে আসতে শুরু করলেন।ভবাপাগলার ভক্তগণের মধ্যে মুসলমান ভক্তেরও খামতি ছিল না। তিনি জাতপাত মানতেন না। তাঁর বাণী ছিল,

মায়ের কাছে সবাই সমান,কিবা হিন্দু,কিংবা মুসলমান।

তিনি বলতেন-

যারা ছোঁয়াছুঁয়ির ধার ধারে না, তারাই ভবার গৌরসুন্দর।

ছোটবেলা থেকেই ভবা ছিলেন কালীভক্ত,এটা কিছুটা পারিবারিক কারণেই হয়েছিল। তাঁর পরিবারের সকলেই ছিলেন কালীভক্ত। ধামরাইয়ে নিজের বাড়িতে মাত্র পনেরো বছর বয়সে একটি কালী মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি সেই কষ্টিপাথরে তৈরি মূর্তিটিকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরতেন। যেখানেই যেতেন সঙ্গে নিয়ে যেতেন মা ভবানীর সেই মূর্তি। পরবর্তীতে এই কালী মূর্তি 'ভবার ভবানী' নামে খ্যাত হয়। দুই বাংলায় তিনি মোট ৭টি মন্দির স্থাপন করেন।লালন

ফকির ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো ভবার গানেও মিশে থাকে বিষাদ-অভিমান, আনন্দ-ভালবাসা। পুঁথিগত বিদ্যায় অষ্টম শ্রেণির চৌকাঠ না পেরনো মানুষটা জীবনে প্রায় দশ হাজার (মতান্তরে ছিয়াশি হাজার) গান রচনা করে গেছেন।ভক্তিভাব ও সকলের প্রতি ভালবাসা এবং মার্জিত ও কোমল ব্যবহার ছিল ভবার পরিচয়। তিনি বলতেন, মনের শুচিতাই আসল শুচি। নিত্য 'প্রসবিনী মা' আমাদের, প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের জন্ম দিয়ে চলেছেন তিনি। কখনও কোনও সন্তানকে বলবেন না যে, ওরে স্নান করে শুচি হয়ে আয়... তিনি তো মা, সদা-সর্বদা বুকে টেনে নেবেন আমাদের। তাই তিনি অক্লেশে লিখেছেন, 'দূর করে দে মনের ময়লা'।

১৯৪৭ সালে, ভারত স্বাধীন হওয়ার সময় দেশভাগ হল। ভবা বুঝতে পারলেন, এবারে বাংলাদেশে আর থাকা যাবে না। তিনি পুত্র-সহ পরিবারকে কলকাতায় দাদা গিরীন্দ্রমোহনের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। এরপর একমাস পরে বাংলা সনের ১৩৫৭-য়, আষাঢ় মাসের একদিন তিনি নিজ বাসভবন ছেড়ে পাড়ি দিলেন ভারতে। সঙ্গে ছিল তাঁর অতি প্রিয় ও ঘনিষ্ঠ ১৫ জন সঙ্গী এবং তাঁর কষ্টিপাথরের ভবানী মা। অনেক ঘুরে ঘুরেও কোথাও জায়গা পছন্দ হয় না তাঁর। অবশেষে ভাগীরথীর তীরে কালনার জাপট-এ পুরনো হাসপাতাল পাড়ায়, স্বত্বাধিকারী নিমাই সাহার কাছ থেকে ১৭০ টাকায় ১ বিঘা জমি কিনে নেন।এখানেই তাঁর মনের মতো করে মাতৃ আরাধনা আরম্ভ করেন। প্রথমে খড়ের ছাউনির আটচালা বেঁধে সেখানেই সাধনা শুরু করেন। এরপর

ভক্তদের দানে ১৯৫১ সালে তৈরি হয় মাতৃমন্দির।

বাইবেল কোরান নয়রে প্রভেদ,

শোন রে হিন্দু শোন মুসলমান

ছেড়ে দে তোর ভিন্ন ভেদ

দেখনা শাস্ত্র দেখনা বেদ

এই ছিল তাঁর প্রাণের কথা, মনের আলাপ। সংগীতের সাধনা এবং মাতৃ আরাধনায় জীবন উৎসর্গ করে গেলেন এই মহাপুরুষ।তিনি ছিলেন আসলে এক ক্ষণজন্মা পুরুষ, একাধারে গীতিকার, সুরকার এবং গায়ক। অসাধারণ বেহালা বাজাতেন, হারমোনিয়াম তাঁর হাতে যেন কথা বলত। সৃষ্টি করে গেছেন শ্যামাসংগীত, বাউল গান, গুরুতত্ত্বের গান, দেহতত্ত্বের গান, সৃষ্টিতত্ত্বের গান, রাধাকৃষ্ণের সহজিয়া বৈষ্ণবতত্ত্বের গান আবার সুফি মারফতি দর্শনের গান। ধর্মবিশ্বাসের নিরিখে তাঁকে কোনও একটি নির্দিষ্ট ধারায় ফেলা অসম্ভব।

জনশ্রুতি শোনা যায় গভীর রাতে ভবার ভবনী 'মা',তাঁর সাথে কথা বলতেন। মন্দিরের গর্ভগৃহের ভিতরে নূপুরের মিষ্টি ধ্বনী শোনা যেত।আমার ছোট বয়সে এই সঙ্গীত পাগল মানুষটিকে খুব কাছের থেকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিলো। ঘটনাটি হলো, আমার সঙ্গে আশ্রমের কিছু মেয়ে পড়াশোনা করতো। তাদের সঙ্গে কিছু বন্ধু মিলে ছুটির পরে প্রায়ঃশই আশ্রমে চলে যেতাম। ওনার কোলে বসে একটি গান শেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল।

ভবাপাগলার পরনে লাল ধুতি ও নীল উত্তরীয় দেখে মনে হত, ঠিক যেন অবধূত সন্ন্যাসী। ভবা সংসারের মায়ার বাঁধনে থেকেই লীলা করেছেন কিন্তু চেতন থেকেছেন। তাঁর কালী মাতা 'ভবার ভবানী' নামে খ্যাত, মন্দিরটিকে বলা হয় 'হরবোলা'।

১৯৮৪ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ভবা তাঁর ভবানী মায়ের রাঙা চরণে আশ্রয় গ্রহণ করেন।২৭ তারিখ তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। তাঁর সমাধিস্থলে লেখা আছে- 'মহাযোগে মহাযোগী'।

মাগো মা ছুটি দেবে কবে

তুমি যা বলেছ তাই করেছি

আমায় বাড়ী যেতে হবে

লিখেছেন
Rupa Mitra
Rupa Mitra
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।