কেবল রথের মেলাতেই কেন পাওয়া যায় মুর্শিদাবাদের এই মাটির পুতুল?

Clay Dolls of Murshidabad : হস্তশিল্প সংক্রান্ত কোনো সরকারি মেলায় অজয় কুমার চৌধুরীর তৈরি মাটির পুতুল দেখা যায় না। তিনি কেবলমাত্র নসিপুরের রথের মেলায় বসেন।

Suvankar Das
৩ মিনিট
কেবল রথের মেলাতেই কেন পাওয়া যায় মুর্শিদাবাদের এই মাটির পুতুল?

মুর্শিদাবাদ শহরের মোগলটুলিতে বাংলার মাটির তৈরি পুতুলের শিল্পকে ধরে রেখেছেন অজয় কুমার চৌধুরী। প্রতি বছর রথযাত্রার এক মাস আগে থেকে পুতুল তৈরির কাজ শুরু করেন তিনি। প্রায় পঞ্চাশরকম মাটির পুতুল তৈরি করে থাকেন বরিষ্ঠ এই শিল্পী। প্রচারের আলো থেকে শতহস্ত দূরে থেকেও নিষ্ঠা সহকারে শিশুমনকে আনন্দ দেওয়ার জন্য এক খোল ছাঁচের পোড়ামাটির রঙিন পুতুল তৈরি করে থাকেন তিনি।

পুতুল-নির্মাণের ক্ষেত্রে এটেল ও বালিমাটি ব্যবহার করা হয়। শিল্পীর তৈরি কয়েকটি পুতুলের মধ্যে ইউরোপীয় শৈলীর ছোঁয়া বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়। সিংহের সঙ্গে গ্লাডিয়েটরের যুদ্ধের দৃশ্যাবলী তাঁর পুতুলনির্মাণে উঠে এসেছে। যদিও অজয় কুমার চৌধুরী নির্দিষ্ট এই পুতুলকে শিকারের দৃশ্য হিসেবেই বর্ণনা করতে চেয়েছেন। তবুও শিকাররত পুরুষ-পুতুলের শারীরিক গঠন, পায়ের জুতো, পোশাক এবং হাতে-থাকা ঢাল, বর্শা স্পষ্টভাবে প্রাচীন রোমের অ্যাম্পি থিয়েটারের গ্লাডিয়েটরদের কথাই মনে করিয়ে দেয়।

কামান-সহ সৈনিক

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ডাইনোসরের মুখে সরলতার হাসি, বাংলার কোথায় তৈরি হয় ঝুলন যাত্রার পুতুল?

Swinging Dolls in Palpara : কোনও পুতুলই খুব পরিপাটি করে তৈরি করা হয় না এখানে। শিল্পী তাঁর নিজস্ব লোকজ-ভঙ্গিতে পুতুল নির্মাণ করে থাকেন।

অন্যদিকে তোপের গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক মহিলার মধ্যে সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীর ইউরোপীয় শৈলীর ছাপ স্পষ্টভাবে দেখা যায়। মহিলার গায়ের রং এবং যুদ্ধের পোশাক সেই দিকেই ইঙ্গিত করে। এমনও হতে পারে, পলাশীর যুদ্ধে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পর মুর্শিদাবাদ শহরে প্রবল ইউরোপীয় সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তার হতে থাকে, তারই ফলস্বরূপ ওখানকার মাটির পুতুলে এই পাশ্চাত্যের প্রভাব দেখা দিয়েছে।

তানপুরা হাতে গৃহিণী

অজয় কুমার চৌধুরীর তৈরি পুতুলের মধ্যে বাংলার মেয়েদের জীবনের সাংসারিক সংগ্রামও চিত্রিত হয়েছে। টিউকল থেকে জল তোলা, বটি দিয়ে মাছ কাটা, এসবই তাঁর পুতুল-ভাবনার মধ্যে খেলা করে যায়। অন্যদিকে অন্তঃপুরে থেকেও শিল্প ও সংগীতের প্রতি নারীর সাধনা শিল্পীর মনকে ছুঁয়ে গিয়েছে। আর সেই কারণে, পদ্মাসনে বসে একজন গৃহিণী তানপুরা বাজাচ্ছে, এই দৃশ্য তাঁর পুতুলের মধ্যে দেখাতে। ভল্লুকের খেলা দেখানো ব্যক্তি, বাদামবিক্রেতা, বেলুনবিক্রেতা, ঢাকি, নৌকার মাঝি, এই সমস্ত কিছু নিয়েই তাঁর পুতুলের সম্ভার। এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, শিল্পীর তৈরি ঢাকিদের নৃত্যরত অবস্থায় দেখা যায়। ঢাক বাজানোর সময় ঢাকিরা অনেক সময় নেচে ওঠে। সেই নৃত্যরত ঢাকির দৃশ্য পুতুল নির্মাণে তুলে ধরেছেন শিল্পী। ঢাকির মাথায় পাগড়ি। আজকের দিনে পাগড়ি পরা ঢাকি রায় দেখা যায় না। তাঁর আরও একটি অভিনব পুতুলদৃশ্য হল দাড় টানা মাঝি এবং ডোমের পুতুল।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ইন্দোনেশিয়ার পুতুলনাচ ‘ওয়ায়াং’-এর উৎস লুকিয়ে আছে ভারতেই?

Indonesian puppet show : পুতুল তৈরির জন্য তিন ধরনের চামড়া ব্যবহার করা হয়: হরিণ, দাগযুক্ত হরিণ ও ছাগল। হরিণের ত্বক শক্তিশালী এবং প্রতিরোধকারী। তাই এগুলো যোদ্ধা ভীম ও দশানন রাবণের জন্য ব্যবহৃত হয়।

আধুনিক সময় চিত্রের প্রভাবও রয়েছে শিল্পীর পুতুল নির্মাণের মধ্যে। ফটোগ্রাফার, ফুটবল খেলোয়াড়, ট্রাফিক পুলিশ, মিলিটারি ইত্যাদি পুতুলের মধ্যে সেই আধুনিকতার স্পর্শ অনুভব করা যায়। ভারত বনাম পাকিস্তানের সামরিক দ্বৈরথ শিল্পীর পুতুল নির্মাণে প্রভাব ফেলেছে। বিশাল একটা মাটির তৈরি কামানের পেছনে জলপাই রংয়ের উর্দি পরে দাঁড়িয়ে রয়েছে পুরুষ সৈনিক। শিল্পীর কথায় কার্গিল যুদ্ধের সময় এই ধরনের পুতুলটি তৈরি করা হয়। নব্বইয়ের দশকে কোনো পর্যটনস্থলে গেলে গলার মধ্যে ক্যামেরা ঝুলিয়ে থাকা ফটোগ্রাফারদের দেখা মিলত। অল্প টাকার বিনিময় তাঁরা পর্যটকদের ছবি তুলে দিতেন। যদিও বিক্ষিপ্তভাবে আজও এঁদের দেখা মেলে। সেই ফটোগ্রাফাররাও জীবন্ত ভঙ্গিমায় উঠে এসেছেন শিল্পীর পুতুলগুলিতে।

শিল্পী অজয় কুমার চৌধুরী

হস্তশিল্প সংক্রান্ত কোনো সরকারি মেলায় অজয় কুমার চৌধুরীর তৈরি মাটির পুতুল দেখা যায় না। তিনি কেবলমাত্র নসিপুরের রথের মেলায় বসেন। পাইকারি ব্যবসায়ীরা তাঁর থেকে মাটির পুতুল বিভিন্ন উপলক্ষে নিয়ে যায়। ছাঁচের দেবপ্রতিমা বিক্রিই শিল্পীর মূলত তাঁর প্রধান উপার্জন । তাঁর দুই ভাই কিশোর ও অশোক কুমার চৌধুরীও মাটির পুতুল তৈরি করেন। আজকে মুর্শিদাবাদ জেলার প্রসঙ্গ উঠলেই শোলার হস্তশিল্প, পাটের পুতুলের কথা সবার মনে আসে। কিন্তু রঙিন ছাঁচের পুতুল প্রায় ব্রাত্যই থেকে গিয়েছে। মুর্শিদাবাদের পর্যটনস্থলগুলির সামনে সরকারি উদ্যোগে এই ধরনের পুতুল যদি রাখা যেত তাহলে এই সকল প্রান্তিক শ্রেণির শিল্পীরা তাঁদের প্রাপ্য সম্মান, পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য দুই-ই পেতেন।

বিশেষ কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ

শিক্ষাবিদ মঞ্জিরা সেন

লিখেছেন
Suvankar Das
Suvankar Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কালীপূজার আলোয় সোহরাইয়ের ছায়া, আদিবাসী লোকধর্মের সঙ্গে শাক্ত ঐতিহ্যের সম্পর্ক কতটা গভীর?

Tribal Folk Religion in Bengal: কার্তিক মাসের অমাবস্যায় বাংলার বহু অঞ্চলে যখন দীপাবলি ও শ্যামাপূজা উদ্‌যাপিত হয়, তখন রাঢ়বাংলা ও ছোটনাগপুর মালভূমির বিভিন্ন জনপদে কৃষিজীবন, গৃহপালিত পশু এবং প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে সোহরাই বা বাঁদনা পরব পালিত হয়।

শিকলে বাঁধা দেবী, ডাকাতদের আরাধ্যা! দক্ষিণ কলকাতার চেতলার ডাকাত কালীর ইতিহাস

Dakat Kali: দক্ষিণ কলকাতার চেতলায় রয়েছে রহস্যে মোড়া প্রাচীন ডাকাত কালীবাড়ি। লোককথা অনুযায়ী, একসময় ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে এই মন্দিরে পুজো দিত দস্যুরা। লুটের সম্পদও নিবেদন করত দেবীর চরণে। কিন্তু কেন শিকলে বাঁধা রয়েছে দেবীমূর্তি? নীলু-ভুলু ডাকাতের কাহিনি থেকে সারদা দেবীর আগমন—জানুন এই মন্দিরের ইতিহাস।

বাংলার ভূতেরা কেমন দেখতে, কোথায় থাকে, কী খায়?

Ghosts of Bengal: পাশ্চাত্যের বহু ভৌতিক আখ্যানের তুলনায় বাংলার লোককথায় ভূতেরা অনেক বেশি গৃহস্থালি জীবন, খাদ্যাভ্যাস, সামাজিক পরিচয়, শ্রেণিবিন্যাস এবং ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যুক্ত। তারা কখনও মাছের প্রতি আসক্ত, কখনও গাছের ডালে আশ্রয় নেওয়া ভবঘুরে, কখনও অসমাপ্ত সংসারের স্মৃতি বহনকারী নারী, আবার কখনও ব্রাহ্মণ্য সামাজিক মর্যাদার প্রতীক।

দেশভাগের ক্ষত বুকে নিয়েই গড়ে উঠেছিল ঢাকা কালীবাড়ি, দক্ষিণ কলকাতার মন্দিরের ইতিহাস

Dhaka Kalibari: দেশভাগের পর বরিশাল থেকে কলকাতায় এসে নিজের শিকড়ের স্মৃতি ধরে রাখতে মন্দির গড়ে তুলেছিলেন ননীগোপাল চক্রবর্তী। দক্ষিণ কলকাতার প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডের এই মন্দিরই আজ পরিচিত ঢাকা কালীবাড়ি নামে। মাটির প্রতিমা থেকে কষ্টিপাথরের বিগ্রহ, কালীপুজোর বিশেষ ভোগ—মন্দিরটির ইতিহাসে মিশে রয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস ও দেশভাগের স্মৃতি। কী ভাবে?

বইয়ের জন্য হাঁটতে হয় কেন?

Walk for Books 2026: প্রায় পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে বইমেলাকে মনে করে বইয়ের জন্য একবার হেঁটেছিল বাঙালি। তারপর দীর্ঘ বিরতি পেরিয়ে আবার এই ৩১ অক্টোবর, ২০২৬-এ দেখা গেল সেই ছবি। হুড়দুড় করে ছেলেবুড়োমেয়েমদ্দ সব রাস্তায় নেমে এল—এ কী আজব খেলা রে ভাই!

শতবর্ষ পেরিয়েও ঋত্বিক ঘটক যেন আজও সমকালীন

Ritwik Ghatak: আমরা যখন ছোট ছিলাম, মানে ষাটের দশকের সেই শেষ দিকে বা সত্তরের দশকে, তিনি কত না অদ্ভুতভাবে আমাদের প্রভাবিত করতেন। যেমন একদিন আমাদের রবীন্দ্রসদনের সামনে দেখতে পেয়ে তিনি হঠাৎ বললেন, আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দেবে?

কলকাতায় চালু হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস

West Bengal School of Magic: মুখ্যমন্ত্রী ‘পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক, ইল্যুশন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস’ স্থাপনের প্রস্তাবে অনুমোদন করেছেন। পুজোর পর উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা বৈঠক করবেন।

বিভূতিভূষণের উপন্যাস কেবল দৃশ্যের নয়, শব্দেরও এক জগৎ তৈরি করে

Bibhutibhushan Bandyopadhyay: বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণকে আমরা সাধারণত প্রকৃতির কবি বলেই চিনি। তাঁর বর্ণনায় নদী, মাঠ, বন, আকাশ, ঋতু আর গ্রামীণ জীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে যদি একটু অন্য দিক থেকে দেখা যায়? যদি আমরা শুধু দৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে শোনার চেষ্টা করি?