ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই কীভাবে গড়ে উঠেছিল এই অজানা সভ্যতা?

Old Civilization in Pompeii : ভিসুভিয়াসের সেই ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাতে পম্পেই-এর মোট জনসংখ্যার ১৫-২০ শতাংশ মারা গিয়েছিল বলে অনুমান করা হয়। অধিকাংশের মৃত্যু হয়েছিল আগ্নেয়গিরির বিষাক্ত গ্যাস, ছাই থেকে সৃষ্ট থার্মাল শকে।

inscript
৩ মিনিট
ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই কীভাবে গড়ে উঠেছিল এই অজানা সভ্যতা?

প্রায় দু-হাজার বছর ধরে বিশ্ববাসীর কাছে পম্পেই শহর পরিচিতি ছিল ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরির বিধ্বংসী অগ্ন্যুৎপাতে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়া এক অভিশপ্ত নগর রূপেই। ৭৯ খ্রিস্টাব্দে আগ্নেয়গিরির লাভা আর ছাইয়ের তলায় চাপা পড়ে যায় ২০,০০০ মানুষের এই প্রাচীন সমৃদ্ধ জনপদ। এতদিন ধারণা করা হত, এই বিপর্যয়ের পর সেখানে প্রাণের কোনো চিহ্ন অবশিষ্ট ছিল না। কিন্তু সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা এক অবিশ্বাস্য সত্যকে সামনে এনেছে। জানা যাচ্ছে, ধ্বংসের পরেও পম্পেই পুরোপুরি জনশূন্য হয়ে যায়নি। বরং, বেঁচে যাওয়া একদল মানুষ ফিরে এসেছিলেন সেই ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন নিয়ে।

পম্পেই প্রত্নতাত্ত্বিক পার্কের ডিরেক্টর গ্যাব্রিয়েল জুখট্রিগেলের নেতৃত্বে পরিচালিত নতুন গবেষণাকাজ এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে। গ্যাব্রিয়েল জানিয়েছেন,

আমাদের নতুন খননকার্যের ফলে ছবিটি এখন অনেক স্পষ্ট। ৭৯ খ্রিস্টাব্দের পরের পম্পেই কোনো শহর ছিল না, বরং ছিল এক অনিশ্চিত এবং ধূসর বসতি। অনেকটা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে গড়ে ওঠা এক অদ্ভুত বস্তি বা শিবিরের মতো।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
হাজার বছর পুরনো কাপিসনিক সভ্যতার নতুন ইতিহাস প্রত্নতাত্ত্বিকেরা কীভাবে খুঁজে পেলেন?

Cupisnique Civilization : ইনকাদের বহু আগে পেরুর উত্তরাঞ্চলীয় উপকূলীয় উপত্যকাগুলিতে কাপিসনিক সংস্কৃতির উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছিল। পরবর্তীকালের চাভিন সভ্যতার সঙ্গে তাদের ধর্মীয় ও শৈল্পিক ঐতিহ্যের অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

অর্থাৎ, যে পম্পেই একদিন রোমান সাম্রাজ্যের অন্যতম বিলাসবহুল এবং প্রাণচঞ্চল কেন্দ্র ছিল, ভিসুভিয়াসের তাণ্ডবের পর তা পরিণত হয়েছিল এক অস্থায়ী আশ্রয়স্থলে।

গবেষকরা বলছেন, অগ্ন্যুৎপাতের পর যারা প্রাণে বেঁচে গিয়েছিল, তাদের সকলের অন্যত্র চলে যাওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য ছিল না। জীবনধারণের তাগিদে এবং ধ্বংসস্তূপ থেকে মূল্যবান সামগ্রী পুনরুদ্ধারের আশায় একদল মানুষ ফিরে আসতে বাধ্য হয়। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় কিছু বহিরাগতও, যারা তখন মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজছিল।

পম্পেই নগরী

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
নদী-উপত্যকায় ছিল প্রাচীন সভ্যতা? লালগ্রহের যে আশ্চর্য খোঁজ চমকে দিয়েছে বিজ্ঞানীদের

Ancient Life On Mars: সম্প্রতি নাসার পারসিভারেন্স রোভার মঙ্গলগ্রহে আশ্চর্য একটি জিনিস খুঁজে বের করেছে। কী সেটি? বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, সেটি নাকি এক ধরনের পাথরের নমুনা। যার নাম রাখা হয়েছে 'চেয়াভা জলপ্রপাত'।

খননকার্যে দেখা গেছে, মানুষগুলি ছাইয়ের স্তূপের উপরে থাকা বাড়িগুলির ওপরের তলাতে বসবাস শুরু করে। যে বাড়িগুলির নিচতলা ছাইয়ের নিচে চাপা পড়ে গিয়েছিল, সেগুলিকে তারা ভাঁড়ার ঘরে রূপান্তরিত করে নেয়। এই সব জায়গা থেকে গবেষকরা খুঁজে পেয়েছেন রুটি তৈরির উনুন, শস্য পেষাইয়ের কল প্রভৃতি। এ-তথ্য প্রমাণ করে, তারা কেবল আশ্রয়ই নেয়নি, বরং সেখানে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবনযাত্রা গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিল। এই বসতিতে কোনো পরিকল্পিত রাস্তা, জলনিকাশি ব্যবস্থা বা রোমান শহরের প্রশাসনিক পরিকাঠামো ছিল না। এটি ছিল কেবল টিকে থাকার এক মরিয়া লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি। গবেষকদের মতে, এই ছোট এবং দুর্বল সম্প্রদায়টি প্রায় পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত টিকে ছিল। এরপর 'পোলেনা অগ্ন্যুৎপাত' নামে আরেকটি অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনায় সম্ভবত এই অঞ্চলটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়।

ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরি

প্রশ্ন হল, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইতিহাস-খোঁজ কেন এতদিন প্রত্নতাত্ত্বিকদের নজর এড়িয়ে গেল? ডিরেক্টর জুখট্রিগেলের মতে, এর কারণ খনন পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা। আগেকার প্রত্নতাত্ত্বিকরা মূলত পম্পেই-এর বিখ্যাত ফ্রেস্কো, মূর্তি এবং অক্ষত বাড়িগুলি উদ্ধারের দিকেই বেশি মনোযোগ দিতেন। ফলে, পুনরায় বসতি স্থাপনের এই সূক্ষ্ম চিহ্নগুলি—যেমন মাটির পাত্রের টুকরো বা অস্থায়ী উনুন—তাঁদের কাছে গুরুত্ব পায়নি। অনেক ক্ষেত্রে, এই প্রমাণগুলি পরবর্তী খননকার্যের সময় না বুঝেই সরিয়ে ফেলা হয়েছিল এবং তার কোনো নথিও রাখা হয়নি।

ভিসুভিয়াসের সেই ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাতে পম্পেই-এর মোট জনসংখ্যার ১৫-২০ শতাংশ মারা গিয়েছিল বলে অনুমান করা হয়। অধিকাংশের মৃত্যু হয়েছিল আগ্নেয়গিরি থেকে নির্গত বিষাক্ত গ্যাস এবং ছাইয়ের কারণে সৃষ্ট থার্মাল শকে। আজ সেই অভিশপ্ত নগরী ইতালির দ্বিতীয় জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র, যা প্রতি বছর লক্ষ-লক্ষ পর্যটককে আকর্ষণ করে। কিন্তু এখন থেকে পর্যটকরা কেবল ধ্বংসের কাহিনি নয়, বরং তার মধ্যে লুকিয়ে থাকা মানব সভ্যতার এক অবিশ্বাস্য সহনশীলতার গল্পও জানতে পারবেন। এই নতুন আবিষ্কার প্রমাণ করে দিল, প্রকৃতির চরমতম আঘাতের পরেও মানুষ কীভাবে ধ্বংসের মধ্যে থেকেই জীবনের নতুন অঙ্কুরোদগম ঘটাতে পারে।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।