পান্তা আর চুনো মাছের বাসি টক || জিভের হিসেব কলিজার হিসেব

Amrita Bhattacharya
৪ মিনিট
পান্তা আর চুনো মাছের বাসি টক || জিভের হিসেব কলিজার হিসেব

আকাশে যেন সূয্যিদেব আগুন ঢালতে লেগেছেন। মাটির বুকের রসটুকু টেনে নেবেন, এই তাঁর ইচ্ছে? ডোবা, পুকুর, নয়ালজুলির মাটি ফেটে চৌচিক্কার। কাঁদড়ে ঘাসের আড়াল আছে বটে, তবু জলের পিত্যেশা কি তাতে মেটে! থিতিয়ে থাকা পাঁকে মোষেরা তাই সারাদিন গা এলিয়ে পড়ে থাকে। বেলা পড়ে গেলে জীবনখুড়ো ওদের বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায়। তা সাধ্যি কি ওদের তোলে! রমজানের মাসে এমন আগুন জ্বলা দুপুরে তাই নির্জলা পড়ে থাকে মানুষের বিল, বিলান... নয়ানজুলি। রাতভোর শ্যালো চলে মাঠে মাঠে। খরার চাষের এই তো নিয়ম!

মানুষের পো তাই রাত জেগে জমি আগলায়, জল আগলায়। রাতের নরম হাওয়ায় তার চোখের পাতা লেগে আসে খানিক খানিক। তালের গাছে ঝটপটিয়ে ওঠে পাখির বাসা। এমন নিশ্চিন্তের ঘুমের মাঝে এসব শব্দ কানে আসে বটে, তবু মনে হয়, এ যেন জমির পাশটিতে নয়, এ যেন অনেক দূরে, অনেক। তিরতিরে হাওয়া ওঠে ধানের ক্ষেতে, চাঁদের আলোয় মায়ার পৃথিবী পড়ে থাকে একটেড়ে। আগুন জ্বলা দিনকে তখন মায়া বলে বিভ্রম হয় বুঝি বা। তবু তো মানষের মন! সে এমন মায়ায় ডুবে যেতে চেয়েও পারে না। মসজিদে ঘোষণা দেয়, সেহেরির সময় হয়েছে। নরম হয়ে আসা জোছনা পেরিয়ে, শ্যালোর আওয়াজ পেরিয়ে শ্যামল এখন ঘরে ফেরে তাই।

মা বসে আছে পান্তা নিয়ে। ছাতু দিয়ে ভাত মেখে খেতে খেতে ওর পিঠ বেয়ে তখন গড়িয়ে পড়তে চায় মায়াবী জোছনার মেদুরতা। আর খানিক পরেই তো আলোর বর্ণমালায় ভেসে উঠবে চরাচর। মাঠে মাঠে তখন ধানজমির ঘাস তোলার ব্যস্ততা। মেয়েদের ফুলহাতা জামা আর গামছাবাঁধা মাথা তখন কেবল উঠবে পড়বে। রোদ্দুরের মাঝখানে উবু হয়ে কাজ করছে ওই ঘাস নিড়ানিরা। ওদের কি আর ইচ্ছে করে এমন রোদ্দুরের মধ্যে ডুবে যেতে! কারই বা করে! ঘরে ঘরে মানুষ এখন কেবল ঘরে ফিরে বুক ভিজিয়ে জল খেতে চায়। মেটে কলসির গায়ে ভিজে ত্যানা জড়িয়ে রাখা দিনে মানুষের ইচ্ছে করে একদলা আখের গুড় ভিজিয়ে সরবৎ খেতে। চিনির পানায় কি আর তেষ্টা মেটে! সে তুমি যাই বলো, গুলুকন ডি না ছাই কী! আকের সরবতের মতো আর কিছু নাই বাপ। দানা দানা গুড় কিনে এনেছে তাই সংসারী মানুষ। এসব গুড়ের খোঁজ রাখতি হয় বাপু। অমুকের বাড়িতে আখশাল হচ্ছে জানলিই হাতে টিপিন ঝুলিয়ে সেদিকে দৌড় লাগায় হিসেবি মানুষ। এ হিসেব কি আর অঙ্কের হিসেব! এ হলো গে জিভের হিসেব, কলিজার হিসেব। মানুষেরে এমন হিসেব করতে হয় বইকি! নইলে জীবন টেকে ক্যামনে! বোশেখের দিনে মানুষ আকের সরবৎ খেয়ে খানিক দাওয়ায় হেলান দে বসবে, ওই দূরে রোদে ঝিম মেরে দাঁড়িয়ে থাকবে ঝাঁকড়া মাথার গাছগাছালি, গরম হাওয়া পাক খেয়ে বেড়াবে কেবল এদিক থেকে ওদিক, তবে না মানুষ জানবে এখন ভিজে ভাত খাওয়ার দিন এল!

ভিজে ভাতে এখন কলিজা ডুবিয়ে দুপুর কাটানোর পালা। জংলা ছাপ ছাপ শাড়ি এখন তাই জুত করে কুর্তি কলাই বাটছে। কাঁচালঙ্কা দে কলাই বাটা হলে পাটা কাচিয়েকুচিয়ে তুলে রাখছে ব্যস্ত হাত। খাওয়ার আগে কাঁচা পেঁয়াজ কেটে নেবে'খন। এত আগে কাটলে কি আর পেঁয়াজের স্বাদ থাকে গো! বাপের পছন্দ ছাতু দে জলঢালা ভাত, ছেলে-মেয়ে খাবে কলাই বাটা দে। মায়ের অবশ্য ইচ্ছে করে মাখা মাখা চুনো মাছের টক খেতে। আহা, বাসি টকের স্বাদ যে কী! কলাইয়ের বাটিতে ভরে সে টক রেখে দাও না দু'দিন, তিন দিন! ফিরিজের টকে কি স্বাদ হয়! টক মজলে তবে না তার সোয়াদ!

এ তো গেল দোপোরবেলার কথা। সক্কাল সক্কাল টিউশনি যাওয়া মেয়ের বুঝি খিদে পায় না! মায়ে তাই গমের ছাতু বানায় ভারি যত্ন করে। ছেলে বলে, মা সময় নেই আর। তুমি গুড়-মুড়ি মেখে দাও শিগগির। মায়ে বলে, খানিক ছাতু দে দিই বাপ। শুধু গুড়-মুড়ি কি প্যাটে থাকে! খানিক পরেই প্যাটখান পড়ে যাবে। তখন অঙ্ক ভুল হবে ব্যাবাক। ছেলে মায়ের এমন সুর তোলা কথায় হাসে। মায়ে কয়, হাসোস ক্যান! আমার মায়ে এমন কথা কইত, সেই শিখসি ছেলেবেলায়। মায়ে এমন দিনে কাজির ভাত খাওয়াইতো। তরা কি আর খাইছিস সেসব! ছেলে বলে ওসব খেয়ে কাজ নেই মা, তুমি গুড়-মুড়ি দাও দিকিনি!

গুড়-মুড়ি এগিয়ে দিতে দিতে মায়ের খেয়াল যায়, বলে, আসার সময় নিমফুল পেড়ে আনিস তো ক'টা। আনবে না জেনেও মায়ের এই নিত্যদিনের ফরমায়েশ। এ আসলে নিজেকেই কাজ মনে পড়িয়ে দেবার ছলছুতো। ছেলে-মেয়ে বেরিয়ে গেলি'পর মায়ে আমের কুলো রোদে দেয়, আহিরি কলাইয়ের ধামা রোদে দেয়। তারপর হাঁটুর ওপর খানিক কাপড় তুলে দিয়ে বাজার থেকে আনা পাকা তেঁতুল কুটতে বসে। হাতে খানিক তেল মেখে বঁটি পেতে তেঁতুল কাটে, বিচি ছাড়ায়। এসব তেঁতুল বয়াম ভরে ভরে রোদ্দুর খাবে। এসব তেঁতুলে বছরের টক হবে, আচার হবে, হাত অম্বল হবে। কাজের কি শেষ আছে বাপু! মেয়েলোকের কাজ কি ফুরোয়!

এমন দুপুরে সাইকেলে সাইকেলে কুর্তি কলাই ফেরি করে বুড়া ফকির। না না, ফকির সে নয়। নাম তার ফকির। তেঁতুলের বঁটি ফেলে তাই কলাইয়ের দর করতে হয় এখন আবার। বুড়া ফকির বলে, খানিক পানি দ্যান মা। এউ গরমে রোজা রাখতে পারি নাই। বয়স তো কম না, কামকাজ না করলি খাব কী! কলাই কেনা মাথায় ওঠে। মেয়ের মা বলে, খাড়ায় আসেন ক্যান, বয়েন। এক দলা গুড় দে কলসি কাত করে জল ঢালে জংলা ছাপের শাড়ি। কলাই বেচতে বেচতে বুড়া ফকির চলে যাচ্ছে ওই। ওর তেষ্টা মেটানো ইস্টিলের গেলাস পড়ে আছে দাওয়ার এক ধারে। ঝেড়ে-বেছে কলাই তুলে রাখতে হবে এখন। এই গরমে কলাই বাটার মতো আর কিছু আছে! পোস্তয় হাতে ছ্যাঁক লাগে। মানুষে কি করবে আর, কলিজা জুড়িয়ে জল খাবে, গড় খাবে, আর ভিজে ভাতে কলাই বাটা খাবে। সেহেরির সকাল থেকে কুর্তি-কলাই বেচা দুপুর এখন গা ডুবিয়ে শুয়ে পড়তে চাইছে ভিতে ভাতের গামলায়। মোষেদের মতো, মেয়ে-মরদের বুঝি ইচ্ছে করে না, আমানির জলে ডুবে যেতে!

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

অথর ইজ ডেড, যে লেখে সে আমি নয় এআই?

Caine Prize winning story AI allegations: ১১ অক্টোবর লেখক ও সাংবাদিক ভোহিনি ভারা ‘দ্য আটলান্টিক’-এ একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেন—যার শিরোনাম ছিল “Yet Another Literary Prizewinner Seems to Be AI”। সেখানে তিনি জানান, ‘পাংগ্রাম’ নামের একটি এআই-ডিটেকশন সফটওয়্যারের মাধ্যমে গল্পটি পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে এটি প্রায় পুরোটাই কৃত্রিমভাবে উৎপাদিত।

জমিদারগিন্নির অপমানের জবাব দিতেই শুরু পাঞ্জা বাড়ির দুর্গাপুজো

Panja family Durga Puja: এক বর্ষামুখর দুর্গাষ্টমীর দিনে জমিদারবাড়ির মহিলারা, জমিদারগিন্নির সঙ্গে, বাড় সিউড়ির দুর্গাপ্রতিমা দর্শনে যান। ফেরার পথে কর্দমাক্ত রাস্তা পেরোনোর সময় দামি শাড়ি কাদা থেকে বাঁচাতে তাঁরা শাড়ির পাড় কিছুটা তুলে হাঁটছিলেন। কথিত আছে, তা দেখে পাড়ার কয়েকজন কটূক্তি করে বলেন— “পাঞ্জা বাড়ির বউ কাপড় উঠিয়ে চলছে!”

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।