দলে থেকেই ফোঁস! সিবিআইয়ের তলব ঘিরে দেবের প্রতিক্রিয়া কেন দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে?

বাংলার রাজনৈতিক জগতের বিশেষ বিশেষ কিছু ব্যক্তির যে কথাগুলো অনেক আগেই বলা উচিত ছিল, তারা সে পথে ভুলেও হাঁটছেন না৷ সবাই নীরব৷ হয়তো বা অজানা কোনও আশঙ্কায়৷ কিন্তু ঠেকানো যায়নি তৃণমূল সাংসদ দেব-কে৷ তাঁর রাজনৈতিক সতীর্থরা চুপ থাকলেও তিনি বলেই দিলেন৷ এবং এমন কথা বললেন, যা হয়তো তাঁর দলের কারও কারও গায়েই বিঁধছে৷

কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই গরু পাচার মামলায় গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ৫ ঘণ্টার ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল বাংলা সিনেমার তারকা তথা তৃণমূল সাংসদ দেব-কে৷ সিবিআই দুম করে দেব-কে এভাবে গরু পাচার মামলায় ডেকে পাঠানোয় বিস্মিত হয়েছিল অনেকেই৷ দেব-ও পাচারকাণ্ডে জড়িত? অতীতের কিছু দৃষ্টান্তের ভিত্তিতে এটা ধরেই নেওয়া যায়, সেই সময় তৃণমূলের শীর্ষ স্তরের অনেকেই হয়তো ভেবেও ফেলেছিলেন, এবার দেব-এর সঙ্গেও দূরত্ব বাড়াতে হবে৷

সেই দেব এবার মুখ খুলেছেন বিতর্কিত ওই প্রসঙ্গেই৷ এক সংবাদমাধ্যমে স্পষ্টভাষায় তিনি বলেছেন, "দোষ না করলে ভয় কী? সিবিআই ডাকা মানেই তুমি ক্রিমিনাল নও। তাঁরা বলেছিলেন, আমার বয়ান রেকর্ড করবেন। যেদিন ডেকেছেন, সেদিনই গিয়েছি।’’

আসল কথাটা ওই প্রথম লাইনেই বলা হয়েছে, 'দোষ না করলে ভয় কী?' যাঁদের ভয় আছে, ধরেই নেওয়া যায়, তাঁরা হয়তো দোষ করেছেন৷ তেমন কোনও বড়সড় দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত না থাকলে সিবিআই কেন, মার্কিন মুলুকের এফবিআই বা ব্রিটিশ নিরাপত্তা সংস্থা, স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড ডাকলেই বা ক্ষতি কী? সিবিআই অফিসারদের কাছে বলা দেব-এর ভাষাতেই তো অন্যান্যরাও বলতে পারতেন, "আমি জানি না আমাকে কেন ডাকা হয়েছে, এবার আপনাদের কাছ থেকে তা জানব।" দেব আরও বলেছেন, "কেন ডেকেছেন, সেটা তাঁদের ব্যাপার। যা চেয়েছিলেন, আমি সঙ্গে সঙ্গে দিয়েও দিয়েছি। আমি চুরি করিনি। দোষ না করলে ভয় কী?"

আরও পড়ুন: আশ্বাসে কল্পতরু আদানি, বঙ্গ বিজেপির নৌকা টলোমলো?

কিন্তু সাংসদ দেব-এর যেসব রাজনৈতিক সহকর্মীদের কোনও না কোনও কারণে সিবিআই বা ইডি তলব করছে, তাঁদের একাংশের মুখ থেকে রাজনীতির মঞ্চ ছাড়া এমন কথা শোনা যাচ্ছে কোথায়? বরং ডাক এড়াতে কোর্টের সিঙ্গল বেঞ্চ, ডিভিশন বেঞ্চের দরজায় ঘুরতে দেখা যাচ্ছে৷ আর এই কারণেই যে জনমানসে তাঁদের ভাবমূর্তি কালিমালিপ্ত হয়ে যাচ্ছে, বিশ্বাসযোগ্যতাও ধ্বংস হচ্ছে, তা না বোঝার মতো বুদ্ধিহীন এঁরা কেউই নন৷

কেন্দ্রীয় সরকার নিয়ন্ত্রিত সিবিআই বা অন্যান্য কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলিকে ‘রাজনৈতিক' উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার অভিযোগ নিয়ে ধারাবাহিকভাবেই তোপ দেগে চলেছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিজেপি-বিরোধীরা। যেসব রাজ্যে অ-বিজেপি সরকার, সেখানে এই আওয়াজের তীব্রতা অনেক বেশি৷ বিরোধী শিবিরের প্রায় সর্বস্তর থেকেই অভিযোগ উঠছে, পরিকল্পনামাফিক তাঁদের হেনস্থা করতেই রাজনৈতিক হাতিয়ার করা হয়েছে তদন্তকারী কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলিকে৷ সিবিআইয়ের বিরুদ্ধে আনা এই ধরনের অভিযোগ যে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, বুক ঠুকে অতি বড় বিজেপিও একথা বলতে পারবে না৷ এই ইস্যুতে প্রায় প্রতিদিনই বিজেপির সঙ্গে 'ঝগড়া' চলছে তৃণমূল কংগ্রেস এবং ভুক্তভুগী অন্য বিরোধীদের। আর সাধারণ মানুষ ভাবছে, স্বচ্ছতা থাকলে তদন্তের মুখোমুখি হতে আপত্তি কোথায়? নেতা- মন্ত্রীরা নিজেরাই নিজেদের কাঠগড়ায় তুলছেন কেন?

গত কিছুদিন যাবৎ রাজ্যবাসী দেখছে তৃণমূলের দোর্দণ্ডপ্রতাপ এক নেতা পর পর ছ'বার সিবিআই হাজিরা এড়িয়েছেন৷ ওই নেতা ধাপে ধাপে সিঙ্গল বেঞ্চ থেকে ডিভিশন বেঞ্চে গিয়েও আইনি রক্ষাকবচ আদায়ে ব্যর্থ হয়েছেন৷ ফলে জনমানসে একটা ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে, কেন তিনি তদন্তকারী সংস্থার ডাকে সাড়া দিচ্ছেন না? তিনি যখন কোনও অপরাধই করেননি, তখন সিবিআই বা অন্য যে-কোনও সংস্থার প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধা কোথায়? ডাক এড়ানোর প্রক্রিয়া কতদিন চালু রাখতে পারবেন তিনি? অথচ ওই নেতার এই ধরনের আচরণের দায় অকারনে বহন করতে হচ্ছে প্রশাসন এবং শাসক দলকে৷ অন্যদিকে, রাজ্যে শিক্ষক-নিয়োগ পদ্ধতিতে বড়সড় কোনও ফাঁকফোকর ছিল কি'না তা খতিয়ে দেখতে কোর্টের নির্দেশে তদন্ত করছে সিবিআই৷ যদিও আদালতের নির্দেশেই ওই তদন্ত আপাতত স্থগিত রয়েছে৷ ওই তদন্তের অঙ্গ হিসেবে সিবিআই কথা বলতে চেয়েছিল প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে৷ কারণ, এই ব্যাপারে ওঁর বক্তব্য শোনা একান্তই জরুরি৷ প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রীর কথা না জানা গেলে ওই তদন্ত কখনওই সম্পূর্ণ হতে পারে না৷ কিন্তু সিবিআইয়ের তলবি নোটিশে স্থগিতাদেশ প্রার্থনা করে আদালতের দ্বারস্থ হলেন প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী৷ আদালত সবকিছু খতিয়ে দেখে স্থগিতাদেশ জারি করে৷ ফলে, একদিকে যেমন স্বস্তি পেলেন ডাক পাওয়া প্রাক্তন মন্ত্রী, তেমনই অন্যদিকে বাংলার মানুষ জানতেই পারলেন না, নিয়োগে দুর্নীতির যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা সত্যি, না কি রাজ্য প্রশাসনকে কালিমালিপ্ত করার চক্রান্ত ছিল এসব৷

সন্দেহ নেই, এই দুই ঘটনার জেরে নানা জল্পনা যেভাবে পল্লবিত হচ্ছে, তার একটাও সরকারের পক্ষে যাচ্ছে না৷ কিছু কোনও ব্যক্তি যদি অসৎ পথ নিয়ে থাকেন, তার জন্য সরকার কেন গায়ে কাদা মাখবে? অথচ স্বচ্ছ থাকা সত্ত্বেও অহেতুক একটা সন্দেহের বলয়ে ফেঁসে যাচ্ছে প্রশাসন৷ এমনও তো হতে পারে, এঁদের বিরুদ্ধে আনা কোনও অভিযোগই প্রমাণিত হল না, সবাইকেই ক্লিনচিট দিল আদালত? তাহলে কেন এই সন্দেহের বাতাবরণ যত্ন করে তৈরি করা হচ্ছে? কেন নিজেরাই নিজেদের রক্তচাপ বাড়িয়ে তুলছেন? এতে প্রশাসনই বা কতখানি লাভবান হচ্ছে? হোক না তদন্ত৷ তদন্তকারী সংস্থা কথা বলুক প্রয়োজনীয় ব্যক্তির সঙ্গে৷ স্বচ্ছতা থাকলে সরকার বা সরকারি কোনও প্রভাবশালীর গায়েই একফোঁটা কাদা লাগবে না৷ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিরোধী দল বা বিরোধী দলের সরকারকে কালিমালিপ্ত করা সহজ কাজ নয়৷ কিন্তু তদন্ত চলতে দিলে বরং তাবৎ বিরোধীদের অপপ্রচারের যথাযথ জবাব দিতে পারবে প্রশাসন বা সিবিআইয়ের ডাক পাওয়া লোকজন৷

আর ঠিক এই আবহেই তৃণমূল সাংসদ দেব-এর মন্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ।

সংবাদমাধ্যমে দেব বলেছেন, ‘‘আমাদের দেশে সিবিআইয়ের ডাক বা নোটিস আসাকে খুব খারাপভাবে নেওয়া হয়। আমাকে যখন ডাকা হয়েছিল, তখন সবাই আমার দিকে তাকিয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই আমিও সবার দিকেই তাকিয়েছিলাম, কে আমাকে নিয়ে কী বলছে। কিন্তু, হয়তো আমার আট বছরের রাজনীতি-জীবনের পরিশ্রম বা ভালবাসার দরুন, আমি একজন বিরোধী নেতাকেও আমাকে নিয়ে খারাপ বলতে দেখিনি। জীবনে এটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। কারণ কাউকে সিবিআই তলব করলে, নিউজ চ্যানেলে বিশেষ অনুষ্ঠান হয়, প্রাইম টাইমে ডিবেট শুরু হয়ে যায়। আমি দেখিনি, আমাকে নিয়ে কেউ একটা কুকথা বলেছেন।" পাশাপাশি সব ক’টি রাজনৈতিক দলকে ধন্যবাদ জানিয়ে দেব বলেছেন, ‘‘আমি এই রাজনীতিটাই চাই। এই ভাল লাগা, ভালবাসার রাজনীতিটাই চাই। এবং যতদিন এটা পাব, ততদিন রাজনীতির জগতে থাকব।’’

More Articles

;