সাফল্য পেতে ছাড়েনি খেলাধুলা, কীভাবে JEE পরীক্ষায় ১০০ শতাংশ নম্বর পেল বাংলার ছেলেটি?

Success In JEE Exam : JEE পরীক্ষার ফলাফলে ১০০ শতাংশ নম্বর তুলে তাক লাগিয়ে দিয়েছে দক্ষিণ কলকাতার এই ছেলেটি। সমাজের উদাহরণ হয়ে ওঠার জার্নিতে কীভাবে লড়াই করেছিল সোহম?

Kankana Mukherjee
৪ মিনিট
সাফল্য পেতে ছাড়েনি খেলাধুলা, কীভাবে JEE পরীক্ষায় ১০০ শতাংশ নম্বর পেল বাংলার ছেলেটি?

বয়স যখন সবে তিন ছুঁইছুঁই তখন থেকেই শুরু হয়ে যায় যুদ্ধটা। একরত্তির পিঠে মস্ত একটা বোঝা চাপিয়ে দৌড় শুরু। নার্সারি, কেজি পার করে হাই স্কুলের গণ্ডিতে পা। হাই স্কুলের যাতায়াতও শেষ হয়ে যায় একদিন, তারপর শুরু হয় কলেজ, ইউনিভার্সিটি ইত্যাদি নানা কিছু। একটা নিরন্তর প্রক্রিয়া, কেবল ধাপ বদল করে নতুন ধাপে উত্তীর্ণ হওয়া মাত্র। লক্ষ্য একটাই, জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়া। কেবল মোটা মাইনের চাকরিটুকুই সব নয়, তার সঙ্গে এই এতদিনের যুদ্ধ জয়ের আনন্দ মিশে যায় নিমেষে। লেখাপড়া করে গাড়িঘোড়া চড়ার এই জার্নিতে আজকের প্রজন্মের কাছে একটা অলিখিত প্রতিযোগিতা প্রথম থেকেই চলে আসে। আর সেই ইঁদুর দৌড়ে সন্তানদের ঠেলে দিতে বাধ্য হন অভিভাবকরা।

বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে ‘চাকরি’ শব্দটাই যেন হ্যালির ধূমকেতু। চারিদিকে শুধু ছাঁটাইয়ের হিসেব। তবুও হাল ছাড়ার উপায় তো নেই, লড়তে হয়। রাত দিন এক করে লড়তে হয়। তবেই সাফল্য আসে। আর সেই সফলের দিকেই আঙুল দেখিয়ে অভিভাবকরা সন্তানদের এগিয়ে দিতে চান। কোচিং সেন্টারগুলো তাদের দেওয়ালে বড় করে ছবি টাঙায়। প্রশ্ন উত্তরের বই হাতে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য ডাক পড়ে। তবে এই সবের ব্যবসায়িক দিকটি বাদ দিলেও অন্য একটি সত্যি লুকিয়ে রয়েছে। যাতে আরও পাঁচজন ওই একই ভাবে সফলতা পেতে পারে সেই চেষ্টা রয়েছে।

বয়স সবে সতেরো। রুবি পার্কের ডিপিএস স্কুলের ছাত্র সোহম দাস। সম্প্রতি JEE পরীক্ষার ফলাফলে ১০০ শতাংশ নম্বর তুলে তাক লাগিয়ে দিয়েছে দক্ষিণ কলকাতার এই ছেলেটি। সমাজের উদাহরণ হয়ে ওঠার জার্নিতে কীভাবে লড়াই করেছিল সোহম? কীভাবে বা সফলতার এসেছে, সেই সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে সোহমই। সকাল থেকে রাত অবধি ঠিক কী কী করত সোহম? কোন পথে এগলে আপনার সন্তানও পেতে পারবে সাফল্য, জানুন সেসব...

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
জাতীয় রেকর্ডে নাম দুজনেরই, বাঁকুড়ার মা-মেয়ে এই জুটির ট্যালেন্ট জানলে অবাক হবেন আপনিও

India book's of records : মায়ের দেখানো পথেই হাঁটল ছোট্ট খুদে, মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে ইন্ডিয়া বুক অফ রেকর্ডসে নাম মা মেয়ে জুটির

পরীক্ষার প্রস্তুতি

প্রথম থেকেই পড়াশোনা নিয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং মনোযোগী সোহম। দিনে অন্তত ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পড়াশোনার মধ্যেই ডুবে থাকত সে। পরিশ্রমের যে কোনও বিকল্প নেই, সে কথাও মানে সে। তবে আজকের এই যে JEE পরীক্ষার সফলতা, তার পিছনে রয়েছে আরও অনেক কিছুই। জীবনে সবথেকে জরুরি হল ফোকাস। কী করতে চাই আমরা, কী হতে চাই আমরা, এ সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা জরুরী। তার পর নিজের দেখা সেই স্বপ্নের পিছনে নিরন্তর দৌড়। একাদশ শ্রেণীতে ওঠার সময় থেকেই সোহম তাই ঠিক করে নিয়েছিলেন JEE মেইনস-এ ফোকাস করার কথা। সেই মতো অঙ্ক, ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি নিয়ে মনোযোগ দিতে শুরু করে সে। যেন একটা নিরলস জার্নি। যেহেতু JEE পরীক্ষার সিলেবাস, স্কুলের পরীক্ষার সিলেবাসের থেকে অনেকটাই আলাদা, এমন কিছু প্রশ্ন এই প্রবেশিকা পরীক্ষায় থাকে যেখানে ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ে আসা বিষয়গুলিও জরুরী হয়ে পড়ে, তাই দুটিকে পাশাপাশি রেখে এগিয়ে চলতে হয়েছে তাকে। যদিও এই বিষয়ে সহায়তা পেয়েছে স্কুলেরও। উপস্থিতির হিসেব নিয়ে কোনওদিনই বিশেষ কড়াকড়ির সম্মুখীন হতে হয়নি তাকে।

দৈনন্দিন রুটিন

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়েছিলেন! মাত্র পঁচিশেই ১০০ কোটির মালিক এই যুবক

পৃথিবীজুড়ে আরও এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে। ফলে জীবনে কিছু করতে চাইলে বয়স কোনও বাধাই নয়।

ঘড়িতে সকাল আটটা নাগাদ ঘুম থেকে উঠত সোহম। তারপর টানা দু ঘন্টা পড়াশোনা করে মাঝে আধ ঘণ্টার বিরতি নিত। আবার দুপুর দুটো পর্যন্ত পড়াশোনা করত। এরপর আরও এক ঘণ্টা বিরতি নিয়ে বিকেল ৩টা থেকে সাড়ে ৫টা পর্যন্ত পড়াশোনা করত। তারপর আবার বিরতি, এরপর সন্ধে সাড়ে সাতটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত সারাদিনের পড়া বিষয়গুলি রিভিশন দিত সে। একটানা পড়ার ফাঁকে ফাঁকে ওই বিরতিগুলোই আসল মূলধন ছিল সোহমের। পড়াশোনাকে তাই কোনও দিনই বদ্ধ মনে হয়নি তার। বিকেলের দিকে প্রায়দিনই ফুটবল খেলতে মাঠেও যেত সে, কখনও আবার কাছেপিঠে খানিক হাঁটতে যেত। এমনকী পরিবারের সঙ্গে সময়ও কাটাত সোহম। আর এইসবই ছিল তার কাছে মুক্ত বাতাসের মতো। এসব থেকে এনার্জি নিয়ে আবার পড়াশোনায় ফিরত সে। সোহমের পড়াশোনায় পারিপার্শ্বিক সমর্থন ছিল বলেই এই জয় সম্ভব হয়েছে।

ছোট থেকেই মেধাবী ছাত্র সোহম। দশম শ্রেণীর বোর্ড পরীক্ষাতেও ৯৮.৬ শতাংশ নম্বর তুলেছিল সে। তবে আজকের প্রজন্মের ইঁদুর দৌড় থেকে খানিকটা দূরেই নিজেকে সরিয়ে রেখেছিল সোহম। প্রতিযোগিতামূলক প্রবেশিকা পরীক্ষায় ভালো ফলের আশায় নামজাদা কোনও কোচিং ইনস্টিটিউটে যোগ দেয়নি সে। পরিবর্তে বেছে নিয়েছিল ঘরোয়া টিউশন শিক্ষকদের।

দক্ষিণ কলকাতার বাসিন্দা সোহম। বাবা মায়ের একটিই ছেলে সে। তার বাবা কলকাতার একটি নামী হাসপাতালের একজন ডাক্তার এবং তার মা তার পড়াশোনার সাথে গভীরভাবে জড়িত, তাকে ক্লাসে নিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে তার পড়াশোনার বিষয়টা পুরোপুরি বোঝানো পর্যন্ত, পরিবারের কাছ থেকে প্রচুর সমর্থন পেয়েছে সোহম। প্রবেশিকা পরীক্ষা ভালো হয়েছে, এমন আশা প্রথম থেকেই ছিল তার, তাই বলে ১০০ শতাংশ পার্সেন্টাইল, এমন আশা করেনি সেও। তাই স্বাভাবিক ভাবে এই ফলাফলে উচ্ছ্বসিত সে।

ভবিষ্যতের কী করতে চায় সোহম?

ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার ইচ্ছে সোহমের। সেই জন্যই JEE পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিল সে। যদিও এই বিষয়ে বাবা মায়ের গাইডেন্স তাকে সবথেকে বেশি সাহায্য করেছে। তাঁরাই প্রথম সন্তানকে বিজ্ঞান বিষয় গ্রহণ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এখানেই শেষ নয়, বিজ্ঞানকে কীভাবে ভালোবাসতে হয়, কীভাবে অধ্যয়ন করতে হয় তার প্রাথমিক ধাপটুকু চিনিয়ে দিয়েছিলেন তাঁরাই। সোহমের কথায়, “আমার বাবা-মা কখনই আমাকে ইঞ্জিনিয়ারিং নেওয়ার জন্য চাপ দেননি, এটি সম্পূর্ণ আমার নিজের সিদ্ধান্ত। তাঁরা শুধু আমাকে বিজ্ঞান নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। এবং বিজ্ঞানকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন।” সোহম আজকের এই সাফল্যে তার বন্ধুদের কথাও উল্লেখ করতে ভোলেনি সে। বন্ধুদের সমর্থন, তাদের পাশে থাকাগুলো যে সোহমের এই সাফল্যের অন্যতম অংশ সে কথাও স্বীকার করে সে। অর্থাৎ সাফল্যের অন্তরালের জীবনে পাশের মানুষগুলোর পাশে থাকাটা যে কতটা জরুরী, সে কথাও নিশ্চিত করে সোহম।

সোহম আপাতত তার JEE অ্যাডভান্সড এবং বোর্ড পরীক্ষায় মনোনিবেশ করছে এবং আইআইটি বম্বেতে কম্পিউটার সায়েন্স ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার লক্ষ্য নিয়ে নিজেকে তৈরি করছে। পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য তাই আপাতত নিজেকে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন রেখেছে সে। এমনকী নিজের কাছে নিদেনপক্ষে একটা ফোনও রাখেনি সে। তার একটাই কথা, জীবনে লক্ষ্যে স্থির থাকা আবশ্যক। বিভ্রান্তিতে বিচলিত হয়ে পা টলতে দিলে চলবে না, নিজের জায়গাটুকু তৈরি করতে নিজেকে ধরে রাখার থেকে বড় আর কিছুই নেই। সামনে একটাই গোল, তাই লক্ষ্যভেদ করতেই হবে। নিজেকে উজাড় করে দিতে হবে। সাফল্য পেতে কঠোর পরিশ্রমের কোনও বিকল্প নেই।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।