কলকাতার দুর্গাপুজোর আমেজ পেতে আসতেই হবে উত্তর কলকাতার এই মণ্ডপগুলিতে

সাবেকি এবং থিম মিলিয়ে উত্তর কলকাতার বেশ কিছু পুজো নিজেদের জায়গা পাকা করে নিয়েছে।

Raktim Dey
৪ মিনিট
কলকাতার দুর্গাপুজোর আমেজ পেতে আসতেই হবে উত্তর কলকাতার এই মণ্ডপগুলিতে

দুর্গাপুজোর অন্যতম বড় আকর্ষণ ঘুরে ঘুরে প্রতিমা এবং মণ্ডপ দেখতে যাওয়া। সকালবেলা মণ্ডপে মানুষের ভিড় একটু কম হলেও বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নামার সঙ্গেই মণ্ডপে বিভিন্ন বয়সি মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। অতিমারীর ফলে মণ্ডপে প্রবেশের ক্ষেত্রে বেশ কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। এই বছর দুর্গাপুজো ইউনেসকো-র ইনট্যানজিবল হেরিটেজ আখ্যা পাওয়া ও অতিমারী দূর হওয়ার ফলে মণ্ডপে হয়তো আবার মানুষের ভিড় ফিরতে চলেছে। উত্তর কলকাতার পুজো মানেই এখন আর শুধু সাবেকিয়ানা নেই। বিভিন্ন স্থাপত্য, চিন্তা প্রকাশের মাধ্যম, ট্রেন, প্লেন- সবকিছুর আদলে মণ্ডপ তৈরি হয়। এই ধরনের মণ্ডপ মানুষের কাছে থিম পুজো বলেই পরিচিত। সাবেকি এবং থিম মিলিয়ে উত্তর কলকাতায় শ্যামবাজার, বাগবাজার এবং শোভাবাজার এলাকায় আয়োজিত বেশ কিছু পুজো সাধারণ মানুষের মণ্ডপ এবং প্রতিমা দেখার তালিকায় বেশ কিছু বছর নিজেদের জায়গা পাকা করে নিয়েছে।

টালা বারোয়ারি

উত্তর কলকাতায় টালা ব্রিজের খুব কাছেই টালা বারোয়ারি পুজোর আয়োজন হয়। শতবর্ষ ছুঁয়ে ফেলা এই পুজো ২০১০ সাল থেকে বিভিন্ন সামাজিক চিন্তাভাবনা মণ্ডপের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে শুরু করেছিল। আজ অবধি বিভিন্ন প্রতিযোগিতা থেকে টালা বারোয়ারি প্রায় দুশোর বেশি পুরস্কার অর্জন করেছে। 'কই পাখি আকাশে', 'হাইব্রিডাসুরমর্দিনী' অথবা কাচের উপর লেখা 'আমি আমার মায়ের মতো' ইত্যাদি থিম মানুষের মধ্যে যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়েছিল। এই মণ্ডপে শহর এবং শহরতলির বিভিন্ন এলাকা থেকে খুব সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায়। নিকটবর্তী মেট্রো স্টেশন শ্যামবাজারের এক অথবা দুই নম্বর গেট থেকে অথবা চক্ররেলের টালা স্টেশন থেকে হাঁটা পথেই এই মণ্ডপে পৌঁছনো সম্ভব । এছাড়া বিভিন্ন এলাকা থেকে শ্যামবাজারগামী বাসে চড়ে টালা পোস্ট অফিস অথবা আর. জি. কর বাস স্টপেজে নেমে হেঁটে টালা বারোয়ারির মণ্ডপে পৌঁছে যাওয়া যাবে।

বাগবাজার সর্বজনীন

উত্তর কলকাতার দুর্গাপুজোর নাম উঠলে বারোয়ারি পুজোর মধ্যে বাগবাজার সর্বজনীনের দুর্গাপুজোর নাম আসতে বাধ্য। ১৯১৯ সালে এই পুজোর সূচনা হয়। ১৯৩৮-১৯৩৯ সালে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এই পুজোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। থিম পুজোর পাশ কাটিয়ে চলে গেলেও এই পুজো আজও মানুষের মধ্যে যথেষ্ট জনপ্রিয়। প্রতি বছর বাগবাজার সর্বজনীনের আয়োজিত দুর্গাপুজোর প্রতিমার মুখ এবং মণ্ডপ সেই সাবেকি আমেজ মানুষকে ফিরিয়ে দেয়। বাগবাজার স্ট্রিট ধরে হেঁটে গিরিশ মঞ্চ থেকে গঙ্গার দিকে কিছু দূর গেলেই বাগবাজার সর্বজনীন পুজোমণ্ডপে পৌঁছে যাওয়া যাবে। শহর এবং শহরতলির বিভিন্ন এলাকা থেকে বাসে চেপে রাজবল্লভ পাড়া অথবা বাগবাজার স্টপেজে নেমে এই মণ্ডপে পৌঁছনো যায়। এছাড়া চক্ররেলের বাগবাজার স্টেশন থেকেও ২-৩ মিনিটের হাঁটা পথে খুব সহজেই এই মণ্ডপে পৌঁছনো সম্ভব।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কলকাতার দুর্গাপুজোয় বিশেষ আকর্ষণ অষ্টধাতুর প্রতিমা! দৈর্ঘ্য থেকে ওজন, সবেতেই চমক

অষ্টধাতুর তৈরি 'হেভিওয়েট' প্রতিমা এবারের শারদীয়া কলকাতার বিশেষ আকর্ষণ।

জগৎ মুখার্জি পার্ক

গত দশকে কখনও তীর্থস্থান, কখনও লোকাল ট্রেনের আদলে মণ্ডপ তৈরি করে এই বারোয়ারি পুজো জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। শ্যামবাজার এবং বাগবাজারের খুব কাছেই রাজবল্লভ পাড়া বাস স্ট্যান্ডের কাছেই জগৎ মুখার্জি পার্কে এই পুজোর আয়োজন করা হয়। নিকটবর্তী মেট্রো স্টেশন শ্যামবাজারের তিন অথবা চার নম্বর গেট থেকে হাঁটা পথেও এই মণ্ডপে পৌঁছনো সম্ভব।

কুমোরটুলি সর্বজনীন এবং কুমোরটুলি পার্ক সর্বজনীন

কুমোরটুলি এলাকায় দু'টি জনপ্রিয় পুজো রয়েছে। বাগবাজারের বিচালি ঘাট এবং চিৎপুর রোডের (বর্তমানে রবীন্দ্র সরণি) মাঝামাঝি কুমারটুলির পাশেই মৃৎশিল্পীদের দ্বারা আয়োজিত কুমোরটুলি সর্বজনীন এবং কুমোরটুলি থেকে শোভাবাজার, আহিরিটোলার দিকে এগোলে কুমারটুলি পার্ক সর্বজনীন। দু'টি পুজোর মণ্ডপ এবং প্রতিমা সাবেকিয়ানা ছেড়ে থিমের হাত ধরেছে। বহু পুরস্কার পাওয়া দু'টি পুজো মানুষের কাছে খুব জনপ্রিয়। বাগবাজার সর্বজনীন পুজো মণ্ডপের থেকে হাঁটা পথেই কুমোরটুলি সর্বজনীন পুজো মণ্ডপে পৌঁছে যাওয়া যাবে । নিকটবর্তী চক্ররেলের বাগবাজার স্টেশন থেকেও হেঁটে এই মণ্ডপে পৌঁছনো সম্ভব। এছাড়া বাসে করে রাজবল্লভ পাড়া স্টপেজে নেমে বেশ কিছুটা হেঁটে এই মণ্ডপে পৌঁছনো সম্ভব।

শোভাবাজার রাজবাড়ির পুজো

কলকাতার অন্যতম প্রাচীন পুজোর তালিকায় থাকা এই পুজোর মধ্যে রয়েছে সাবেকিয়ানার গন্ধ। উত্তর কলকাতায় অন্যতম জনপ্রিয় পুজো শোভাবাজারের পুরনো এবং নতুন রাজবাড়ির পুজো। যদিও মানুষের মধ্যে পুরনো রাজবাড়ির পুজোর জনপ্রিয়তা একটু বেশি। পুরোনো রীতি মেনেই আজও ঠাকুরদালানে পুজোর আয়োজন করা হয়। পুরনো রাজবাড়ির প্রবেশের পথে কিছুটা ফাঁকা জায়গা রয়েছে। সেই ফাঁকা জায়গা থেকেই প্রতিমা দেখতে পাওয়া যায়। যদিও সামনে থেকে প্রতিমা দেখতে হলে জুতো খুলে সিঁড়ি দিয়ে উঠে প্রতিমার সামনে যাওয়া যায়। সারাদিন বহু মানুষের ভিড় থাকলেও রাতের বেলা নির্দিষ্ট সময়ের পরে বাড়ির দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। পুরনো রাজবাড়ির পুজোর এবং প্রতিমার ছবি তোলার ক্ষেত্রে কোনও নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও নতুন রাজবাড়ির কিছু অংশে ছবি তোলার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। নিকটবর্তী মেট্রো স্টেশন শোভাবাজার সুতানুটি থেকে হাঁটা পথেই রাজবাড়ি পৌঁছনো যায়। এছাড়া বাসে চেপে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ে লালমন্দির অথবা বিধান সরণির হাতিবাগান থেকে সহজেই শোভাবাজার রাজবাড়ি পৌঁছে যাওয়া যাবে। রাস্তার দুই পাশে দু'টি রাজবাড়িতে আগত বহু মানুষের ভিড় এই বাড়িদুটো চেনাতে সাহায্য করে।

আহিরিটোলা সর্বজনীন

শোভাবাজার থেকে চিৎপুর রোড (বর্তমানে রবীন্দ্র সরণি) ধরে কিছুটা হেঁটে আহিরিটোলা সর্বজনীন পুজো মণ্ডপে পৌঁছে যাওয়া যাবে। থিমের হাত ধরে এই পুজোর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে। আহিরিটোলা সর্বজনীনে পুরনো বনেদি বাড়ির আদলে তৈরি মণ্ডপ মানুষের মধ্যে যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়েছিল। বাসে অথবা অটো করে আহিরিটোলা বাস স্ট্যান্ডে নেমে কয়েক মিনিট হাঁটা পথে এই মণ্ডপে পৌঁছনো সম্ভব।

এইসব বনেদি বাড়ির এবং বারোয়ারি পুজো ছাড়াও বেনিয়াটোলা সর্বজনীনের আয়োজিত পুজো মানুষের মধ্যে যথেষ্ট জনপ্রিয়। এবছর সেখানে বিশেষ আকর্ষণ অষ্টধাতুর দুর্গাপ্রতিমা। এইসব বড় এবং জনপ্রিয় পুজোর মধ্যে বহু ছোট কিন্তু পুরনো পুজো এই এলাকাগুলিতে আয়োজিত হয়। বিভিন্ন ধরনের মানুষ সারাদিন ঘুরে ঘুরে উৎসবের আমেজ গায়ে মেখে মণ্ডপ এবং প্রতিমা দর্শন করে।

লিখেছেন
Raktim Dey
Raktim Dey
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।