গদ্দার কে, যারা ভোট দিয়েছিল, তারাই বিচার করুক

ভুল বোঝাবুঝিতে ঘর ছেড়েছিলাম। ঘরের ছেলে ঘরে ফিরলাম।

 

কে, কখন, কেন বলেছেন একথা, কাউকে বলে দিতে হবে না। এটুকু দেখে যে কোনও নাট্যমোদী লোকই বুঝতে পারবেন, এটি কোনও তৃণমূল-ছুটের তৃণমূলে ফেরার পরবর্তী কৈফিয়ত। যে কেউ হতে পারেন, রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়, সবস্যাচী দত্ত, বাবুল সুপ্রিয়... দীর্ঘ তালিকায় নতুন সংযোজন অর্জুন সিং। দিনটা স্রেফ আলাদা। কেউ আগে, কেউ কেউ পরে আসছেন, ঠিক যেমনটা তৃণমূল নেত্রী বলেছিলেন। কোথায় আসছেন? ক্ষমতাকেন্দ্রের কাছে। কোথায় গিয়েছিলেন তাঁরা? সম্ভাব্য ক্ষমতাকেন্দ্রের সন্নিকটে। এই যাওয়া-আসা, স্রোতে ভাসা পালায় জনতার ভূমিকাটা ঠিক কেমন? কপর্দকশূন্য, দাঁতনখহীন বৃদ্ধের যেমন হয়, খানিকটা তেমন। বিশ্বাসের সপক্ষে সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছিল সে। পরিসংখ্যানই বলে দেয়, বিজেপিকে রুখতে কট্টর তৃণমূলের পাশাপাশি আম আদমিও তৃণমূলকে বিশ্বাস করেছিল। ভাবেনি, এই পক্ষনির্মাণ আসলে ভোটকেন্দ্রিক মায়াবিভ্রম। ভোট মিটতেই দুধ কা দুধ পানি কা পানি হয়ে যাবে। যার বিরুদ্ধে ভোট এবং যাকে ভোট- সেই শত্রুমিত্র গলাগলি করবে, জনতার হাতে থাকবে পেনসিল।

 

বিশ্বাসঘাতকতার কিছু নমুনা তুলে ধরা যাক। বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই এই রাজ্যে ছোট ছোট সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছে। তেলেনিপাড়া, ধুলাগড়ের মতোই একই মডেলে হিংসা হয়েছে ভাটপাড়ায়। ডিজিটাল দুনিয়ায় মুখ মুছে ফেলা সহজ নয়। তথ্য থাকে। যে কেউ চাইলে সার্চ করে দেখে নিতে পারেন, ২০১৯ থেকে আজ পর্যন্ত ঠিক কতবার এই অর্জুন সিংকে 'দাঙ্গাবাজ' বলেছে তৃণমূল। এমনকী, এবছরেও জানুয়ারি মাসে যখন ভাটপাড়ায় অশান্তি চলছে, তৃণমূল শিবিরের বড় বড় নেতারা অর্জুনের দিকেই আঙুল তুলেছেন, তাঁকেই দাঙ্গাবাজ বলে চিহ্নিত করেছেন। যিনি দাঙ্গাবাজ, বিশেষত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পথে কাঁটা, তাঁকে রাজসমারোহে কেন বরণ করে নেওয়া! তাহলে কি সম্প্রীতির বার্তা, সংখ্যালঘুর প্রতি সহানুভূতির দৃষ্টি কেবলই মানুষকে বোকা বানানো রাজনৈতিক বোলবোলা! এই অর্জুনই তো ভোটের আগে শুভেন্দু অধিকারীর তালে তাল মিলিয়ে মমতাকে নানা রকম কদর্য ভাষায় আক্রমণ করেছেন। ভবানীপুরে মমতাকে হারানোর জন্য চেষ্টার কসুর করেননি।

 

আরও পড়ুন: ফেরিওয়ালা প্রশান্ত কিশোর ও কংগ্রেসি জমিদারি: এক অলীক কুনাট্য

 

২৩ এপ্রিল, ২০২১, ভোট চলাকালীন সময়েই বেলগাছিয়ায় সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় একটি সভা করেন অর্জুন সিং। ঘটনাস্থলে উপস্থিত সংবাদমাধ্যমের একাংশ জানে সেদিন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার পর্যাপ্ত উসকানি ছিল। স্থানীয় মানুষই সেই ছক বাঞ্চাল করে দেয়। যে কেন্দ্রীয় বাহিনী শীতলকুচিতে গুলি চালিয়েছিল, তারাই উত্তপ্ত বেলগাছিয়ায় চার রাউন্ড গুলি চালায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে। তৃণমূল চাইছে, সেসব ভুলিয়ে দিতে। কেন ভুলবে সাধারণ মানুষ, তাঁরা তো ভোট দিয়েছিলেন এই দৌরাত্ম্যের বিরুদ্ধেই!

 

মুকুল রায়কে তৃণমূলে ফেরানোর সময় তৃণমূল নেত্রী বলেছিলেন, গদ্দারদের ফেরাবেন না। মুকুল রায়কে ক্লিনচিট দিয়ে তিনি বলেছিলেন, ভোটের সময়ে তিনি প্রত্যক্ষ বিরোধিতা করে গদ্দারি করেননি। একথা কি অর্জুন সিংয়ের ক্ষেত্রে খাটে! মাত্র দু'-মাস আগে আসানসোলে দাঁড়িয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে অর্জুন সিংয়ের মন্তব্য ছিল, মমতা পশ্চিমবঙ্গকে পাকিস্তানে পরিণত করার ষড়যন্ত্র করছেন। মুসলিম সমাজের প্রতি সমদৃষ্টির কথা বলে তৃণমূল। আর সেই সমদৃষ্টিকে কটাক্ষ করতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে 'খালা', 'ফুপু', 'বেগম' ইত্যাদি সম্বোধন করেন বিজেপির দলনেতা। সেই সুরে সুর মিলিয়েই এই পাকিস্তান উবাচ। এটা গদ্দারি নয়? মাত্র দু'মাসের মধ্যে এহেন ব্যক্তিকে নিজের ছাতায় নিয়ে আসা গদ্দারি বা কথার খেলাপ নয়? যে মানুষ ভোট দেয়, সেই মানুষকে স্মৃতিহীন মাংসপিণ্ড ভাবাটা গদ্দারি নয়? একজন রাজনীতি-সচেতন মানুষ কেন ভুলে যাবে, এই অর্জুন সিং এনআরসি-র পক্ষে গলা ফাটিয়েছে! এই এনআরসি-র বিরোধিতা করতেই তো বাঙালি সমাজের একাংশ অর্জুনদের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিল। গদ্দারটা তাহলে কে?

 

২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে ভাটপাড়া-নৈহাটি সমবায় ব্যাংকের থেকে ২০ কোটি টাকার একটি অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ ওঠে। সেখানে ভাটপাড়া পুরসভার ঠিকাদার, তৎকালীন ব্যাঙ্ক সিইও এবং অর্জুন সিংয়ের নাম জড়ায়। এরপর থেকে সিআই়ডি একাধিকবার হানা দিয়েছে অর্জুন সিংয়ের ডেরায়। ঠিক যেমন করে আজকাল সিবিআই হানাদারি চালায়, সেই মডেলেই। অর্জুন তৃণমূলে ফেরার পর কি সিআইডি চাপ কমাবে? যদি কমায়, তাহলে সিবিআই-এর চাপ নিয়ে কোন যুক্তিতে মুখ খুলবেন তৃণমূলের নেতারা?

 

তৃণমূল সম্পর্কে চালু টিপ্পনী, একটাই পোস্ট, বাকি সব ল‍্যাম্পপোস্ট। অর্জুনকে ফিরিয়ে তৃণমূল নেত্রী এই কথাটির সারবত্তা প্রমাণ করলেন। কারণ ভোট মেটার পর থেকেই আবার যখন উল্টো স্রোত, দলের বহু নেতাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অনুরোধ করেছিলেন, যাঁরা দলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন, তাঁদের না ফেরাতে। তারপরেও কেন মমতা এঁদের ফেরান! উত্তরটা দু'-রকমভাবে দেওয়া যায়, একটা তাৎক্ষণিক, একটা দীর্ঘমেয়াদি। তাৎক্ষণিকতায় ভাবলে কাল যারা আস্ফালন করেছিল, তাদের দলে নিয়ে এসে মমতা নৈতিক জয়ের শ্লাঘা অনুভব করেন, রাজীব, সব্যসাচীরা তাঁর বড় উদাহরণ। অন্যভাবে যদি ভাবি, সামনে পঞ্চায়েত। ভোটের আগে থেকেই যে অশান্তির আগুনে পুড়ছে বাংলা, তার কেন্দ্রবিন্দু বহু সময়েই অর্জুনের বারাকপুর-ভাটপাড়া সংলগ্ন এলাকাগুলি। অর্জুন দলে এলে অশান্তির আশু সম্ভাবনা নিকেশ হবে। অন্যদিকে প্রমাণ হবে, আসল বাহুবলী কে। মমতার মতো অ্যাম্বিশাস রাজনৈতিক নেতারা স্রেফ জিতেই খুশি হন না। বিরোধীশূন্য অবস্থায় সুদেমূলে বাড়তে চান। তৃণমূলের এখন যা শক্তি, তাতে পঞ্চায়েতে বিনা বাধায় বড় মার্জিনে জিততে পারে তৃণমূল। কিন্তু বিরোধীশূন্যভাবে জিততে, হিন্দি বেল্টে দখলদারি বজায় রাখতে অর্জুনরা অপরিহার্য, জানেন মমতা। ভ্যাটিকানে পোপ থাকতে ঈশ্বরের মাহাত্ম্য-প্রচারকরা খ্রিস্টনামগানের জন্য অন্য কোনও পরমাত্মার আশ্রয়ে যাবেনই বা কেন! অর্জুনকে ডেকে নেওয়া কি শুভেন্দুকেও সমর্পণের বার্তা দেওয়া?

 

এখন থেকেই একটু একটু করে ২০২৪ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে তৃণমূল। সেখানেও চাই ৪২-এ ৪২। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কৃতজ্ঞ অর্জুন তাঁর বলয়ে নিশ্চয়ই গাণ্ডীব তুলে নেবেন। সাধারণ মানুষ কী করবে সেদিন! বীভৎস 'খেলা'-র মধ্যে পরিত্রাণহীন দাঁড়িয়ে অবিরত কাঁদবে ব্যবহৃত হওয়ার দুঃখে? না কি 'গদ্দার' শব্দটি নাড়াচাড়া করতে করতে অপেক্ষা করবে গ্রামপতনের শব্দের?

More Articles

;