হিন্দু শিব মন্দিরে মেলে জৈন ছোঁয়া, কীভাবে ‘বাঁকুড়া’ নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক্তেশ্বর?

Ektaeswar Temple Bankura : হিন্দু মন্দিরে মিশে যায় ভিন্ন ধর্মের আদল। জৈন ধর্মের ছবিটা মেলে বাংলার একটি শিব মন্দিরে, জানেন কোথায় রয়েছে এমন রহস্য?

Kankana Mukherjee
৩ মিনিট
হিন্দু শিব মন্দিরে মেলে জৈন ছোঁয়া, কীভাবে ‘বাঁকুড়া’ নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক্তেশ্বর?

“শিব ঠাকুরের আপন দেশে, নিয়ম কানুন সর্বনেশে...”, কবিতার ভাষ্য হলেও একথা যথার্থ। মানুষের পাতানো নিয়মের তোয়াক্কা করেন না শিব, তিনি রয়েছেন আপন খেয়ালে। তাই ধর্মের তোয়াক্কা করা তাঁকে মোটেই মানায় না। ফলে সঙ্গত কারণেই হিন্দু মন্দিরে মিশে যায় ভিন্ন ধর্মের আদল। জৈন ধর্মের ছবিটা মেলে বাংলার একটি শিব মন্দিরে, জানেন কোথায় রয়েছে এমন রহস্য?

আধুনিকতায় পাল্লা দিয়ে বহু কিছু বদল হলেও বাংলার ধর্মীয় ভক্তিভাবে বদল হয়নি আজও। ঠিক সেই কারণে আজও মন্দির এবং দেবতা নিয়ে হিন্দুদের মধ্যে একটা ভয়, ভক্তি অথবা আনুগত্যের মিশেলে অন্যরকম ভাব তৈরি হয়। দৈনিক পুজো আচ্চা থেকে শুরু করে তিথি মেনে বিশেষ পুজো সবই চলে নিয়ত। তেত্রিশ কোটি দেব দেবীকে নিয়ে বাঙালির একপ্রকার নাজেহাল অবস্থা। তবে এই এতো দেব দেবীর মধ্যে শিব নিয়ে একটা আলাদা করে প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। মাঘ মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশ তিথিতে পালন করা হয় শিবরাত্রি। শিবের মাথায় জল ঢেলে মনের মতো বর পাওয়ার সাধ পোষণ করেন অনেকেই। এই শিব নিয়ে বাংলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অজস্র নামজাদা মন্দির। আর তার মধ্যে অন্যতম হল বাঁকুড়ার এক্তেশ্বরের শিব মন্দির। এখানেই রয়েছে জৈন আদলের ছোঁয়া।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
'আত্মা' এখনও আসে ফিরে? পর্যটকদের কেন টানে ভৌতিক রহস্যে মোড়া সিকিমের বাবা মন্দির!

Baba Mandir Sikkim: সেনাবাহিনীর অনেকেই নাকি এখনও হরভজনের বিছানার চাদরে ভাঁজ দেখতে পান। তাঁদের বিশ্বাস, হরভজন এখনও আছেন।

শাস্ত্র মতে, ইন্দ্রিয়বৃত্তিই অসুর। এই অসুরই বন্ধনের কারণ। আর এই বন্ধন থেকে মুক্তি অর্থাৎ, মোক্ষলাভের আকাঙ্ক্ষাতেই একেশ্বরের আরাধনা। বাঁকুড়া শহর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে দ্বারকেশ্বর নদের বাম তীরে অবস্থিত পশ্চিমবঙ্গের প্রাচীন মন্দিরগুলির অন্যতম এই শিবমন্দির। এটিই এক্তেশ্বরের মন্দির নামে পরিচিত। ল্যাটেরাইট এবং বেলেপাথর দিয়ে তৈরি সুগঠিত এই মন্দিরের উচ্চতা প্রায় ৪৫ ফিট। রয়েছে মন্দিরের গায়ে খোদাই করা দেব দেবীর অসাধারণ সব মূর্তি। গোটা বাঁকুড়া জেলা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে শতাধিক সব মন্দির, যেমন - মল্লেশ্বর, বহুলাড়াতে সিদ্ধেশ্বর, জয়পুরে গন্ধেশ্বর, ভুবনেশ্বর, পাত্রসায়রে কালঞ্জয় ইত্যাদি। তবে এই সবের মধ্যে এক্তেশ্বরের মন্দির যেন সঙ্গত কারণেই ব্যতিক্রম।

এক্তেশ্বর নামের মধ্যেই একতা শব্দের অভ্যাস মেলে, বাস্তবিকই এই একথার প্রমাণ মেলে এখানে। জৈন স্থাপত্য নিয়ে যাঁরা পড়াশোনা করেছেন তাঁরা অনায়াসে এই মন্দিরের স্থাপত্যের সঙ্গে মিল খুঁজে পাবেন জৈন ধর্মের। মন্দিরের কুণ্ডের মধ্যে যে শিবলিঙ্গটি রয়েছে, সেটি নাকি দেখতে অনেকটা মানুষের পায়ের মতো। জনশ্রুতি রয়েছে, বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজার সঙ্গে ছাতনার সামন্তভূমের রাজার রাজ্য সীমানা নিয়ে বিবাদ হলে, তার মীমাংসা করেন স্বয়ং শিব। দুই সীমানার সংযোগস্থলে একতার প্রতীক হিসেবে এই এক্তেশ্বর মন্দির স্থাপিত হয়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ইন্দিরাকেও ফিরে যেতে হয়েছিল, কেন হিন্দু ছাড়া কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয় না জগন্নাথ মন্দিরে?

Puri Jagannath Temple: ১৯৮৪ সালে, সেবাইতরা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে মন্দিরের ভিতরে প্রবেশের অনুমতি দেননি।

এখানেই শেষ নয়, শোনা যায় বাঁকুড়া জেলার নামের সঙ্গেও জড়িত রয়েছে এই শিবলিঙ্গের প্রসঙ্গ। বিদ্যানিধি মহাশয়ের মতে, এক্তেশ্বর মন্দিরের শায়িত শিবলিঙ্গ নাকি খানিক বাম দিকে চেপে অবস্থান করছে বলেই এই জায়গাটির নাম হয়েছে বাঁকুড়া। মতান্তরে বলা হয়, এই শিবলিঙ্গ নাকি বাঁকা ভাবে অবস্থান করছে বলে এই স্থানের নাম হয়ে থাকতে পারে বাঁকুড়া। আরও একটি মতের উল্লেখ মেলে বিদ্যানিধি মহাশয়ের কথায়। যদিও তার সঙ্গে বাস্তবের মিল পাওয়া যায় না। তবে এক কালে যে এখানে প্রাচীন জলধারার নিদর্শন ছিল তার উল্লেখ্য মেলে পুঁথি পত্র ঘেঁটে। বিদ্যানিধি মহাশয় বলেন, ‘বাম কুণ্ড’ (বাম দিকের ঝর্না জলধারা) শব্দের অপভ্রংশ হয়ে এই ভূমের নাম ‘বাঁকুড়া’ হয়েছে।

আবারও একটা শিবরাত্রি আসন্ন, এর মধ্যেই সেজে উঠেছে বাঁকুড়ার এই মন্দির। প্রতিবছর এই দিনে অসংখ্য মানুষের ঢল নামে এখানে। প্রথা মেনে পুজো হয় এই দিন। অথচ এই শিব নিয়ে পড়ে থাকা রহস্যের হদিশ করেন কজন? তিন প্রহরে জল ঢালা হয় শিবের মাথায়, রাতে ভক্তদের কণ্ঠে উচ্চারিত হয় এক্তেশ্বর নাগমণি মহাদেবের জয়ধ্বনি। আর এই শিবের মধ্যেই প্রকৃতির নিয়মে সযত্নে লালিত হয় একটা প্রাচীন ইতিহাস।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।