এই নারীই ছিলেন দুনিয়ার প্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রামার

Sourish Das
৪ মিনিট
এই নারীই ছিলেন দুনিয়ার প্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রামার

সবাই ছকে বাঁধা জীবন যাপন করবেন, সেটা হয় না। কেউ কেউ এমনও থাকেন যাঁরা ছক ভেঙে নিজের মত করে জীবন যাপন করতে চান, তথাকথিত পুরুষদের বিষয় নিয়ে গবেষণা করতে চান। আজকে সে রকম একজন নারীর কাহিনি শোনাব।

তাঁর নাম আডা লাভলেস। লাভলেস হলেন বিশ্বের সর্বপ্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রামার। এখনকার দিনে একজন শিশুকে জিজ্ঞেস করলেও সে বলবে, কম্পিউটারের জনকের নাম স্যার চার্লস ব্যাবেজ। কিন্তু ব্যাবেজের এই অ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিন তৈরির জন্য আসল মেধা খরচ করেছিলেন আডা লাভলেস। শুধুমাত্র একজন কম্পিউটার প্রোগ্রামার নয়, তিনি জনপ্রিয় রোমান্টিক কবি লর্ড বায়রনের পরিতক্ত কন্যাও বটে। শুধুমাত্র তাঁর পিতা নয়, তাঁকে সমাজও মনে রাখেনি। জন্মের ২০৬ বছর পরেও প্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রামার হিসেবে তিনি কোনও শিরোপা পেলেন না।

কিন্তু তিনি যে অ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিন তৈরি করার জন্য অংক করতেন সেরকম কিন্তু নয়। বরং বলতে গেলে তিনি, অংক কষতে অত্যন্ত ভালবাসতেন। অনেকেই এমন আছেন যারা গণিত বিষয়টিকে অত্যন্ত ভয় করেন, কিন্তু লাভলেস এরকম ছিলেন না। তিনি মাঝেমধ্যেই অংক কষতে কষতে একেবারে বিভোর হয়ে যেতেন। অনেক সময় এমন হয়েছে তিনি অংক কষতে কষতে নিজের ছেলে মেয়েকে স্কুল বাস থেকে নামাতে ভুলে গেছেন। তার যখন মাত্র ১২ বছর বয়স তখন তিনি পাখিদের সাথে আকাশে উড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু, মানুষ কেন উড়তে পারে না, সেই সমস্যাটিকে তিনি অংক কষে বুঝতে চেয়েছিলেন। পাখিদের পর্যবেক্ষণ করে, পালক, কাগজ সিল্কের মতো বিভিন্ন জিনিস ব্যবহার করে এবং সর্বোপরি পাখিরা কেন উড়তে পারে সেই নিয়ে গবেষণা করেছিলেন তিনি।

আডার জন্মের মাত্র ৫ মাসের মধ্যেই তার মা অ্যানাবেল বায়রন তাকে নিয়ে তার পিতা লর্ড বায়রনের থেকে আলাদা হয়ে যান। তার পিতা লর্ড বায়রন তার মা কে বিয়ে করেছিলেন কার্যত বাধ্য হয়ে। বিয়ের পর থেকেই তার অনেক মহিলার সঙ্গে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল। মেয়ের ওপর যাতে তার বাবার কু প্রভাব না পড়ে, তার জন্যই তার মা অ্যানাবেল বায়রন মেয়েকে নিয়ে আলাদা হয়েছিলেন। প্রথম থেকেই লাভলেসের মা তাকে গণিত, বিজ্ঞান এবং যুক্তির মাঝেই বড় করেছিলেন। ছোটবেলা থেকেই আডা লাভলেসের মেশিনের প্রতি একটা আসক্তি ছিল। নিত্য নতুন মেশিন তৈরি করা, সেটার যন্ত্রপাতি খুঁটিয়ে দেখা, ফ্লাইং মেশিন তৈরি করা, বিভিন্ন ধরনের আকার আকৃতি তৈরি করা, সাইন্স ম্যাগাজিন পড়া, এই সমস্ত ছিল তার ছোটবেলার কিছু শখ এর মধ্যে অন্যতম।

১৯ বছর বয়সে তিনি উইলিয়াম কিং নামের একজন আরিস্টোক্রাটকে বিয়ে করেন। তারপরে, ১৮৩৮ সালে যখন উইলিয়াম কিং লাভলেস এলাকার আর্ল হিসেবে নির্বাচিত হন, তারপর থেকে আডার নাম হয়ে যায় লেডি আডা কিং, কাউন্টেস অফ লাভলেস। আদতে তারপর থেকেই আডা পরিচিত হতে শুরু করেন আডা লাভলেস হিসেবে।

তাঁর জীবনের মোড় ঘোরে যখন ১৮৩৩ সালে লাভলেসের মেন্টর, বিজ্ঞানী ম্যারি সোমারভিল তাকে চার্লস ব্যাবেজ এর সঙ্গে পরিচয় করান। ব্যাবেজ ছিলেন গণিতের লুকেসিয়ান অধ্যাপক যিনি নিজের অসাধারণ দার্শনিক দক্ষতা এবং গণিতের উপর অগাধ পান্ডিত্যের জন্য জনপ্রিয় ছিলেন। ব্যাবেজ এর সঙ্গে পরিচিত হয়ে আডা লাভলেস ব্যবজের পরিকল্পনা নিয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু করেন। ব্যাবেজ সেই সময় একটি অত্যন্ত জটিল ইঞ্জিন তৈরি করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন, যার নাম ছিল বিখ্যাত অ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিন। এই ধরনের ইঞ্জিন আগে কখনো তৈরি করা হয়নি, কিন্তু এই ইঞ্জিনটিতে আজকের যুগের কম্পিউটারের সমস্ত উপাদান মজুদ ছিল।

১৮৪২ সালে লাভলেস একটি ছোট আর্টিকেল লিখেছিলেন সেই বিখ্যাত অ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিনের ব্যাপারে। ইতালির গণিতজ্ঞ লুইগী মেনাব্রিয়ার মাধ্যমে তিনি এই আর্টিকেলটি ইংল্যান্ডে প্রকাশ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। সেই আর্টিকেল প্রকাশের সময় চার্লস ব্যাবেজ তাকে ওই আর্টিকেলটির ব্যাপারে বিস্তারিত ভাবে ব্যাখ্যা করতে বলেন। এই আর্টিকেলটিতে কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের ব্যাপারে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা ছিল। সিম্বলের পরিবর্তিত ব্যবহার, সুর তৈরি থেকে শুরু করে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং এর আরো বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা ছিল এই আর্টিকেলে।

যদিও চার্লস ব্যাবেজ এবং তার সহকারীরা এই এনালিটিক্যাল ইঞ্জিন এর সমস্ত প্ল্যানিং আগেই তৈরি করে ফেলেছিলেন, কিন্তু লাভলেসের প্লানিং ছিল আরও সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করা এবং আরও গভীর। এই কারণেই চার্লস ব্যাবেজ নিজেদের প্ল্যান পরিবর্তন করে লাভলেসের প্ল্যান নিয়ে অ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিন তৈরি করেছিলেন। এই কারণেই লাভলেস বিশ্বের সর্বপ্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রামার হিসেবে চিহ্নিত হন। চার্লস ব্যাবেজ নিজেও বারংবার লাভলেসের গণিতের প্রতি অসাধারণ পাণ্ডিত্যের প্রশংসা করেছেন। মেশিনের প্রতি তার ভালোবাসার এবং অ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিন তৈরির জন্য পরিশ্রমের কথা বার বার উল্লেখ করেছেন চার্লস ব্যাবেজ।

মাত্র ৩৬ বছর বয়সে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে এই মহান গণিতজ্ঞের জীবনাবসান হয়। তার মৃত্যুর মাত্র বছর কয়েক আগেই প্রকাশিত হয়েছিল এনালিটিক্যাল ইঞ্জিন তৈরি নিয়ে লেখা সর্বপ্রথম বই 'স্কেচ অফ দা অ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিন'। এই বইতে লাভলেস লিখে গিয়েছিলেন, কিভাবে বিশ্বের সর্বপ্রথম কম্পিউটার ইঞ্জিন তৈরি হয়েছিল এবং কিভাবে তিনি তৈরি করে ফেলেছিলেন বিশ্বের প্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রাম। লাভলেসের তৈরি করা এই এনালিটিক্যাল ইঞ্জিনের প্রোগ্রাম ব্যাবেজ এর সময় খুব একটা কাজে আসেনি। কিন্তু, ১৯৪০ সালে অ্যালেন টিউনিং যখন প্রথমবার আধুনিক কম্পিউটারের একটা ব্লু প্রিন্ট তৈরি করেন, তখন থেকেই বিশ্বের কাছে লাভলেসের কাজের গুরুত্ব প্রকাশিত হতে শুরু করে। লাভলেস হয়তো খুব একটা বেশি দিন বাঁচতে পারেননি। কিন্তু বিজ্ঞানের প্রতি তার আগ্রহ, প্রযুক্তির প্রতি তার অমোঘ আকর্ষণ, এবং দূরদর্শীতার কারণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন প্রযুক্তির ইতিহাসে সবথেকে আধুনিক মহিলাদের মধ্যে একজন।

লিখেছেন
Sourish Das
Sourish Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

AI-এর যুগে মানুষ কি নিজের বুদ্ধিটাই মেশিনের হাতে তুলে দিচ্ছে?

Artificial Intelligence: ছোটবেলায় অনেকেই ভাবত রোবট এসে মানুষের কায়িক শ্রমের কাজগুলি করে দেবে। মানুষ অবসর পেয়ে গান শুনবে, কবিতা লিখবে কিংবা বারান্দায় বসে কফি খাবে। বাস্তবে দেখা গেল ঠিক তার উল্টো চিত্র। রোবট এখন কবিতা লিখছে, ছবি আঁকছে আর কোড তৈরি করছে। অন্যদিকে মানুষ সকাল থেকে রাত ল্যাপটপের সামনে বসে শিখছে প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং।

মহাকাশে রওনা নাসার টেলিস্কোপের, বদলে দিতে পারে মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি?

NASA’s Roman Space Telescope: নাসার নতুন ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ বদলে দেবে মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি? হাবল ও জেমস ওয়েবের পর কেন প্রয়োজন হলো এই নতুন মহাকাশ-চোখের? ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি, গ্যালাক্সি ও এক্সোপ্ল্যানেট সম্পর্কে কি নতুন তথ্য দেবে রোমান? মহাবিশ্বের প্রসারণের ইতিহাস বুঝতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এই অত্যাধুনিক টেলিস্কোপ?

সৌরপৃষ্ঠ আসলে কেমন? ৩৩ বছর পর মিলল উত্তর

Sun’s surface mystery: সূর্যের পৃষ্ঠকে এতদিন দূর থেকে তুলোর মতো নরম ও শান্ত দেখালেও, তা কি সত্যিই এমন? বিশ্বের বৃহত্তম সৌর টেলিস্কোপ ড্যানিয়েল কে ইনোয়ের তোলা সর্বোচ্চ-রেজোলিউশনের ছবিতে দেখা গেল ছোট ছোট হিংস্র প্লাজমার ঘূর্ণি। ৩৩ বছর আগে করা জোয়ান কার্পেনের সেই ভবিষ্যদ্বাণী কি অবশেষে সত্যি প্রমাণিত হলো? এই আবিষ্কার কি বদলে দেবে সৌরপৃষ্ঠ সম্পর্কে ধারণা?

৩ অগাস্ট থেকে বদলে যাচ্ছে শেয়ার বাজারের নিয়ম!

Stock Market India: নতুন ব্যবস্থার অধীনে শেয়ার বাজার বন্ধের সময়কে তিনটি আলাদা অংশে ভাগ করা হয়েছে। তবে নন-এফএন্ডও (Non-F&O) স্টকগুলির ক্ষেত্রে আগের মতোই বিকেল ৩:৩০টা পর্যন্ত স্বাভাবিক লেনদেন চালু থাকবে, এতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। কিন্তু এফএন্ডও স্টকগুলির ক্যাশ মার্কেটে প্রতিদিন একটানা লেনদেন চলবে বিকেল ৩:১৫ মিনিট পর্যন্ত।

আইআইটি-র দুই প্রাক্তনীর বৈদ্যুতিক কৃষিযন্ত্রে একরপ্রতি খরচ মাত্র ৪০ টাকা

Electric Power Tiller: বাজারে যেসব ট্র্যাক্টর পাওয়া যায়, তা হয় বিশাল বড় জমির উপযোগী, না হয় কেনা ও চালানো দুটোই খুব ব্যয়বহুল। ভারতে ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ কৃষকের জমিই ছোট ও খণ্ড-বিখণ্ড, যেখানে বড় যন্ত্র ঢোকানোই সম্ভব নয়। আবার চিন থেকে আমদানি করা ছোট ছোট সস্তা মেশিনগুলিতে যন্ত্রাংশ ও সার্ভিসিংয়ের চূড়ান্ত সমস্যা তৈরি হয়। তাই বিদেশ থেকে আমদানির কথা না ভেবে, আইআইটি বোম্বের দুই প্রাক্তনী ঐশ্বর্য রামকৃষ্ণন ও কেদার গোখলে সিদ্ধান্ত নেন খাঁটি দেশীয় প্রযুক্তিতে ভারতের মাটির উপযোগী সমাধান তৈরি করার।

মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেও উষ্ণ থাকে সোনাম ওয়াংচুকের বাড়ি

Sonam Wangchuk House: সোনম ওয়াংচুক মানেই পাহাড়ঘেরা লাদাখের ছবি, বরফে ঢাকা জীবন আর নতুন এক ভাবনার আলো। পেশায় তিনি একজন প্রকৌশলী, শিক্ষাবিদ এবং উদ্ভাবক। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে তিনি যেন রূপকথার সেই মানুষটি, যিনি পাহাড়ের রুক্ষ জীবনের কঠিন সমস্যাগুলিকে বিজ্ঞানের সহজ ছোঁয়ায় অত্যন্ত সহজ করে তুলেছেন।

মহাকাশে মিলল চিনির সন্ধান, কেন গুরুত্বপূর্ণ এই আবিষ্কার?

natural sugar in space: ছায়াপথের কেন্দ্রের একটি আণবিক মেঘে প্রথমবারের মতো প্রকৃত মনোস্যাকারাইড ‘এরিথ্রুলোজ’-এর সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। এই আবিষ্কার জানাচ্ছে, নক্ষত্র ও গ্রহ তৈরির আগেই মহাকাশে জটিল জৈব অণু তৈরি হতে পারে। ফলে পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি এবং মহাবিশ্বে জীবনের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে গবেষণার আগ্রহ বেড়েছে।

কর্মদক্ষতা মাপল এআই, চাকরি হারালেন কর্মীরা? মেটার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক মামলা

Meta mass layoffs: কর্মীদের ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নেবে? মেটার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায় অভিযোগ, এআই-নির্ভর মূল্যায়নের কারণে মাতৃত্বকালীন ও চিকিৎসাজনিত ছুটিতে থাকা কর্মীরা অন্যায্যভাবে চাকরি হারিয়েছেন।