সংস্কৃত থেকে রামায়ণ অনুবাদ করেছিলেন এই মুসলিম মহিলা! কেমন ছিলেন মুঘল যুগের প্রভাবশালী নারীরা?

গুলবদন বেগমের গল্প বলার শক্তিতে আকবর এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে বাবা হুমায়ুনের জীবন ও শাসনকাল নিয়ে বই লেখার দায়িত্ব দিয়েছিলেন গুলবদন বেগমকে।

Aritra Dasgupta
৩ মিনিট
সংস্কৃত থেকে রামায়ণ অনুবাদ করেছিলেন এই মুসলিম মহিলা! কেমন ছিলেন মুঘল যুগের প্রভাবশালী নারীরা?

ভারতীয় ইতিহাসে মুঘল ঘরানা বিভিন্ন কারণেই স্মরণীয়। আকবরের মতো প্রজাদরদি সম্রাট থেকে ঔরঙ্গজেবের গোঁড়ামি সবটাই মুঘল ইতিহাসের এক একটা অধ্যায়। কেবল সম্রাটই নন, মুঘল জমানায় পিছিয়ে ছিলেন না বেগমরাও। নিজেদের বুদ্ধি, শিক্ষায় তাঁরা হয়ে উঠেছিলেন শাসনকার্য চালানোর নেপথ্য চালিকা শক্তি। এমনই কয়েকজন মুঘল সম্রাজ্ঞীকে ফিরে দেখা যাক।

দৌলত বেগম

সম্পর্কে প্রথম মুঘল সম্রাট বাবরের পিতামহী আইসান দৌলত বেগম ছিলেন চাগাতাই খানের পূর্বপুরুষ ইউনুস খানের প্রথম স্ত্রী। ১৪৯৪ সাল থেকে ১৫০৫ সালের মধ্যে দৌলত বেগম ছিলেন নাতির সাম্রাজ্য পরিচালনার মূল উপদেষ্টা। তাঁর সাহসী, আত্মনির্ভর ব্যক্তিত্ব বাবরের চরিত্র নির্মাণে অনেকখানি সাহায্য করেছিল। দৌলত বেগম বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন, একাধিকবার ধরাও পড়েছেন শত্রুর হাতে। কিন্তু তাঁর বিচক্ষণতা ও ক্ষিপ্রতা প্রত্যেকবারই তাঁকে শত্রুর হাত থেকে সযত্নে রক্ষা করেছে।

গুলবদন বেগম

প্রথম মুঘল সম্রাট বাবরের কন্যা ছিলেন গুলবদন বেগম। কিন্তু এটুকুই তাঁর পরিচয় নয়। বিভিন্ন কারণেই লেখাপড়া শেখা হয়ে ওঠেনি সম্রাট আকবরের। কিন্তু তাঁর জানার আগ্রহ ছিল প্রবল। নিজে লিখতে পড়তে না পারলেও গুণীর সমাদর করতেন সম্রাট আকবর। পিসি গুলবদন বেগমের গল্প বলার ভঙ্গি ছিল আকবরের বিশেষ প্রিয়। গুলবদন বেগমের গল্প বলার শক্তিতে আকবর এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে বাবা হুমায়ুনের জীবন ও শাসনকাল নিয়ে বই লেখার দায়িত্ব দিয়েছিলেন গুলবদন বেগমকে। মুঘল আমলের ইতিহাস জানার অন্যতম শ্রেষ্ঠ দলিল ‘হুমায়ুন নামা’ লিখেছিলেন গুলবদন বেগম।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সত্যিই রয়েছে রক্তচোষারা! গলায় কাস্তে বাঁধা মহিলা ‘ভ্যাম্পায়ারের’ কঙ্কাল ঘিরে ঘনাচ্ছে রহস্য

এমনভাবে কাস্তেটি কঙ্কালটির গলার উপর রাখা ছিল যে যদি কেউ ওইভাবে উঠতে যায় নির্ঘাত তাঁর গলা ওই কাস্তেতে কাটবে। এছাড়াও কঙ্কালটির পায়ের বুড়ো আঙুলের সঙ্গে একটি লোহার শেকল বাঁধাও দেখতে পাওয়া যায়।

হামিদা বানু বেগম

মুঘল সম্রাট হুমায়ুনের রানি হামিদা বানু বেগম ছিলেন একজন শিক্ষিত বুদ্ধিমতী মহিলা। সম্রাট আকবরের জমানায় তাঁকে মরিয়ম মাখানি এবং পদশাহ বেগম উপাধি দিয়ে সম্মানিত করা হয়। মেওয়ারের রামায়ণ লেখা হওয়ার বহু আগে ছেলে আকবরের উৎসাহে সংস্কৃত থেকে রামায়ণ অনুবাদ করেছিলেন হামিদা বানু। ফারসি ভাষায় মায়ের অনূদিত রামায়ণ বিভিন্ন দেশে বিলি বণ্টনের দায়িত্ব নিয়েছিলেন স্বয়ং সম্রাট আকবর। শুধু তাই নয়, পুত্র আকবর ও তাঁর ছেলে সেলিমের মধ্যেকার মনোমালিন্য মেটানোর ক্ষেত্রেও ভূমিকা নিয়েছিলেন হামিদা বানু।

মহাম আঙ্গা

মুঘল পরিবারের সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক না থাকলে ও নিজের পরিচালন শক্তি ও বুদ্ধিমত্তার জোরে চিরকাল মুঘল ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন মহাম আঙ্গা। ঐতিহাসিকদের মতে, কিশোর আকবরের বেড়ে ওঠার পিছনে মহাম আঙ্গার ভূমিকা অবিস্মরণীয়। কিশোর আকবরের সঙ্গে তাঁর গুরু বৈরম খানের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন মহাম আঙ্গা। বৈয়ম খানের মৃত্যুর পর তাঁর সমস্ত ক্ষমতার অধিকারী হন আঙ্গা। হয়ে ওঠেন মুঘল আমলের অন্যতম ক্ষমতাশালী নারী।

যোধা বাই

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
৫০০০ গাড়ি চুরি, খুন! তাক লাগাবে ভারতের সবচেয়ে বড় গাড়ি চোরের জীবনযাপন

অভিনব কায়দায় পুলিশকে বোকা বানিয়ে নাকের ডগা দিয়ে গাড়ি চুরি করে পালাতেন অনিল। পুলিশকে নানা কথায় ব্যস্ত রাখতে নিজের স্ত্রীকে সঙ্গে রাখতেন।

মরিয়ম উজ জামানি ছিলেন সম্রাট আকবরের প্রিয়তম পত্নী। ইতিহাস তাঁকেই চেনে যোধা বাই নামে। রাজপুত কন্যা যোধা বাই মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে এমন একজন হিন্দু নারী যিনি ৪৩ বছর ধরে একটানা মুঘল সাম্রাজ্যের সম্রাজ্ঞী ছিলেন। আকবরের দরবারে ছিল তাঁর নিত্য যাতায়াত। শুধু যাতায়াতই নয়, আকবরের দরবারে যে কোনও কাজে নিজের মতামত দেওয়ার ও অংশগ্রহণ করার পূর্ণ স্বাধীনতা ছিল যোধা বাইয়ের। এত বছর আগেও নিজের মনের জোর ও বুদ্ধিমত্তায় জনসমক্ষে ছিল তাঁর অবাধ যাওয়া আসা।

নূর জাহান

মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গিরের ২০ তম এবং প্রিয়তম স্ত্রী ছিলেন বেগম নূর জাহান। আফিম ও মাদকাসক্ত সম্রাট জাহাঙ্গিরের রাজকর্মে তেমন মনোযোগ ছিল না। স্বামীর উদাসীনতা দেখে রাজ দরবারের হাল ধরেছিলেন নূর জাহান। নূর জাহানের সুপারিশেই নূর জাহানের বাবা ও ভাই জাহাঙ্গিরের দরবারে গুরুত্বপূর্ণ পদ লাভ করেন। এই তিনজনই জাহাঙ্গিরের সাম্রাজ্যের যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। স্ত্রীকে জাহাঙ্গির এতটাই ভরসা ও বিশ্বাস করতেন যে তাঁর আমলে সব থেকে বেশি ক্ষমতার অধিকার তিনি দিয়েছিলেন তাঁর আদরের পত্নী নূর জাহানকে।

মুমতাজ বেগম

পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্য তাজমহলের সঙ্গে অক্ষয় হয়ে আছে মুমতাজ বেগমের নাম। ১৬২৮ সালে সিংহাসনে বসে মুমতাজকেই নিজের প্রিয়তম স্ত্রীর মর্যাদা দিয়েছিলেন সম্রাট শাহাজাহান। মুমতাজের অকাল মৃত্যুর আগের তিন বছর তিনিই সম্রাটের কাছ থেকে ‘হজরত’ সম্বোধন লাভ করেন। মুঘল সম্রাটদের প্রত্যেক স্ত্রীই নিয়মিত মাসিক ভাতা পেতেন। রাজকর্মের সমস্ত বিষয় নিয়েই বেগম মুমতাজের সঙ্গে আলোচনা করতেন শাহাজাহান। বিভিন্ন রাজনৈতিক বিষয়ে সম্রাটকে নিয়মিত পরামর্শ দিতেন মুমতাজ বেগম। তিনিই ছিলেন সম্রাটের মুখ্য পরামর্শদাতা।

জাহানারা বেগম

মুঘল ইতিহাসে যে কয়েকজন মহিলার নাম অমর হয়ে আছে তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সম্রাট শাজাহানের কন্যা জাহানারা বেগম। শাহজাহানের শেষ জীবনেও তাঁর সঙ্গে ছিলেন জাহানারা বেগম। পিতার মৃত্যুর পর বোন জাহানারাকে যোগ্য সম্মান দিয়ে রাজ দরবারে ফিরিয়ে এনেছিলেন পরবর্তী মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব। নারী স্বাধীনতার পরিপন্থী ঔরঙ্গজেব বোনের বুদ্ধিমত্তা ও পারদর্শিতাকে কোনোদিনই অসম্মান করার সাহস দেখাননি। সম্রাট শাহাজাহানের শাসনকাল শেষে যে ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিলেন জাহানারা নিজগুণে তাই পুনরুদ্ধার করেছিলেন তিনি।

রোশনারা বেগম

মুঘল সম্রাট শাহাজাহান ও মুমতাজ বেগমের কন্যা ছিলেন রোশনারা বেগম। শাহাজাহানের পর তাঁর তৃতীয় পুত্র ঔরঙ্গজেবকে সিংহাসনে বসানোর ক্ষেত্রে রোশনারা বেগমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। আজীবন অবিবাহিত রোশনারা ছিলেন কবি। পিতার মৃত্যুর পর ঔরঙ্গজেবের শাসনকালে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকেও অনেকখানি নিয়ন্ত্রণ করতেন এই স্বাধীনচেতা, বুদ্ধিমতী মহিলা।

লিখেছেন
Aritra Dasgupta
Aritra Dasgupta
1 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।