অধ্যাপনা ছেড়ে ফুটবল! বিশ্বকাপ ফুটবলে অনুপ্রেরণার অনন্য নজির এই রেফারি

Female Referee World Cup 2022: ক্যাথরিন নেসবিট (Kathryn Nesbitt), কাতার বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে জড়িয়ে গিয়েছে এই মহিলার নাম। তিনি রেফারি।

Ramen Das
৩ মিনিট
অধ্যাপনা ছেড়ে ফুটবল! বিশ্বকাপ ফুটবলে অনুপ্রেরণার অনন্য নজির এই রেফারি

বিশ্বকাপে ধুন্ধুমার। কাতারে ফুটবল উৎসব ঘিরে একের পর এক ঘটনার ঘনঘটা বারবার তুলে দিয়েছে প্রশ্ন, বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে বালির দেশের বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করেও। কিন্তু এর মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে একের পর এক ইতিহাসের উপাদান। সেরা হয়ে ওঠার লড়াই থেকে শুরু করে কেচ্ছার দিননামচা, শুধু খেলা নয় বিশ্বকাপ যেন অনুপ্রেরণা, লড়াই, যন্ত্রণা, কান্না, আনন্দের এক আস্ত আধার! ঠিক এমনই এক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে সম্প্রতি প্রকাশ্যে এসেছে ফুটবল বিশ্বকাপের নয়া হিরের কথা। একাধিক লড়াই আর দারিদ্রের ইতিহাস জানতে জানতে এই আকস্মিক ভিন্ন উদাহরণ অবাক করেছে বিশ্বকে।

ক্যাথরিন নেসবিট (Kathryn Nesbitt), কাতার (Qatar World Cup football) বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে জড়িয়ে গিয়েছে এই মহিলার নাম। তিনি রেফারি। একাধিক মহিলা রেফারির অবদানের মধ্যেই বিশ্বফুটবলের এই উৎসবে রয়েছে তিনিও। কখনও মাঠে নেমে সরাসরি, কখনও ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভার হিসেবে দেখা মিলেছে তাঁর। কিন্তু অন্য একাধিকের সঙ্গে দাঁড়িয়ে শুধু পুরুষ ফুটবল দলের প্রতিযোগিতায় মহিলা হিসেবেই তিনি মৌলিক নন, ক্যাথরিন সামগ্রিকভাবে হয়ে উঠেছেন ভিন্ন। কেন? কেন তিনি অনন্য?

কে ক্যাথরিন নেসবিট?

১১ জুলাই, ১৯৮৮। আমেরিকার নিউ ইয়র্কের রকস্টার শহরে জন্ম নেন ৩৪ বছর বয়সী ক্যাথরিন। ছোট থেকেই পড়াশোনায় মেধাবী ছিলেন। প্রথম থেকেই লক্ষ্য ছিল বিজ্ঞানের পথে এগনোর। পড়াশোনা শুরু করেন জোরকদমে। পড়াশোনা তো হল কিন্তু আসল ইচ্ছা! ক্যাথরিন ছোট থেকেই চাইতেন তাঁর এক সকার প্লেয়ার দাদার মতোই খেলোয়াড় হতে।

ক্যাথরিনের খেলায় প্রবেশ

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ফুটবলের ছন্দ নষ্ট করছে অফসাইড! প্রযুক্তির জাঁতাকলে কতটা ক্ষতি হচ্ছে খেলার

World Cup 2022: ভার তাই আলোচিত, চর্চিত, বিস্ময়কর, আবার বিতর্কিতও বটে।

বয়স তখন মাত্র ১৪, ২০০২ সালের জানুয়ারি মাস। অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী মেয়েটিকে দেখা গেল মাঠে। একান্ত ইচ্ছার বশেই ইউএস সকার অ্যাসোসিয়েশনের একটি ম্যাচে লাইন ম্যান হলেন তিনি। মাঠে নামলেন সেই থেকেই। আর ফিরে তাকাতে হয়নি।

তারপর চলতে থাকল পড়াশোনা। একদিকে কলেজ, অন্যদিকে খেলাতেও মন দিলেন ক্যাথরিন। জাতীয় সকার টুর্নামেন্টে কানস বনাম পোর্টল্যান্ডের ম্যাচে ২০১৩ সালের ১৩ এপ্রিল থেকে আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটল তাঁর। ওই ম্যাচে অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি হিসেবে মাঠে নামলেন তিনিও।

পরিচিত পেতে শুরু করলেন ২০১৫ সাল থেকেই। ক্যাথরিন 'মেজর লিগ সকার (MLS)' এর ডিসি ইউনাইটেড বনাম কলম্বাস ম্যাচে নামলেন রেফারির ভূমিকায়। মহিলা হিসেবে ম্যাচ রেফারির রেকর্ড গড়লেন সেখান থেকেই।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
পুরুষদের বিশ্বকাপে ম্যাচ সামলাবেন এই মহিলা, যে ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে গোটা বিশ্ব

FIFA World Cup 2022 : এবারই বিশ্বকাপে মহিলা রেফারিদের আগমন। গ্রুপ পর্যায় ম্যাচেই তৈরি হবে এক অনন্য ইতিহাস...

ফিফা অর্থাৎ বিশ্ব ফুটবল সংস্থার সঙ্গে তাঁর আনুষ্ঠানিক যোগ ঘটল ২০১৬ নাগাদ। অনূর্ধ্ব ১৭ মহিলা বিশ্বকাপে অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি হিসেবে শুরু করলেন কাজ। এরপর ২০১৮ সালে অনূর্ধ্ব ২০ মহিলা বিশ্বকাপেও দেখা গেল তাঁকে। ২০১৯ এর মহিলা বিশ্বকাপে দাপিয়ে বেড়ালেন ক্যাথরিন।

২০২০ সালে ফের মেজর লিগ সকারে তাঁর ভূমিকা রেকর্ড গড়ল। প্রথম মহিলা সহ রেফারি নন, রেফারি হিসেবে ছড়াল তাঁর নাম। ওই বছরই বছরেই মেজর লিগ সকার টুর্নামেন্টের সেরা রেফারি নির্বাচিত হলেন তিনি।

বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল নাম। আর ২০২২। কাতার বিশ্বকাপের দরবারে হাজির হলেন ক্যাথরিন। জার্মানি বনাম কোস্টারিকা থেকে একাধিক ক্ষেত্রে তাঁকে দেখা গিয়েছে। কখনও ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি হিসেবে কখনও মাঠেই প্রয়োজনের মুহূর্ত তৈরি হয়েছে তাঁর জন্য।

অধ্যাপক থেকে রেফারি!

এ তো গেল তাঁর খেলার কেরিয়ার। কিন্তু বাকিটা? একাধিক কথকতা আর প্রশ্নের মধ্যেই উঠে আসে ক্যাথরিনের ত্যাগের কথা। ক্যাথরিন জানিয়েছেন, "আমি ২০১৯-এর মহিলা বিশ্বকাপের রেফারি হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার মাত্র দু'সপ্তাহ আগেও পড়াতাম। অধ্যাপক ছিলাম। রসায়ন চর্চাও ছিল আমার নিত্যসঙ্গী।" বাল্টিমোরের টাইসন বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছিল গবেষণা। সেখানে নিজস্ব একটি ল্যাবও ছিল এই অধ্যাপক-গবেষকের। অর্থাৎ একদিকে খেলার সঙ্গে যুক্ত থেকে একের পর এক সাফল্য অর্জন, অন্যদিকে রসায়নের মতো কঠিন বিষয়ে গবেষণা! এই দুই কাজই চলছিল একসঙ্গে। ক্যাথরিন মূলত মানুষের মস্তিষ্কের নানা রসায়নগত উপাদানের উপরেই গবেষণার কাজ করছিলেন। এর সঙ্গেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক হিসেবেও নিযুক্ত ছিলেন তিনি। পড়ুয়াদের মধ্যে জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি কোনও দিন।

ক্যাথরিন নিউ ইয়র্কের রকস্টারের সেন্ট জনস ফিশার কলেজ থেকে স্নাতক হন। বিষয় ছিল রসায়ন। সেখানে মহিলা ভলিবল দলের সদস্য ছিলেন তিনি। সেখানে ওই দলের হয়ে বিভিন্ন জায়গায় ৪২টি ম্যাচও খেলেন তিনি।

ক্যাথরিন পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি উপাধি লাভ করেন। সেখানেই দলে দীর্ঘকাল ধরে পড়াশোনা। ২০১০ থেকে ২০১৫, প্রায় ৫ বছরের পড়াশোনা জীবন কাটিয়ে তিনি ফের ভর্তি হন মিশিগানের বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানেও চলে গবেষণা। এরপর ২০১৭-র অগাস্ট মাস নাগাদ অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন টাউসন বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানেই টানা দু'বছর অধ্যাপনা করেন ক্যাথরিন। যা ২০১৯ অগাস্ট নাগাদ ছাড়েন শুধুমাত্র ফুটবলের তাগিদে।

তথাকথিত নিশ্চিত পেশা এবং জীবনের একাধিক স্বপ্ন ত্যাগ করে তিনি পাকাপাকি ফেরেন ফুটবলে। তথাকথিত পুরুষতান্ত্রিক বিশ্বের ফুটবল জগতে পদার্পণ ঘটে আর এক মহিলার, যা বর্তমান প্রেক্ষিত এবং কাতারের বিশ্বকাপ আবহে অনন্য তো বটেই, মৌলিক আর অভিনবও, বলছেন অনেকেই।

লিখেছেন
Ramen Das
Ramen Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

নারী টেস্টে এত অনীহা কেন, লর্ডসের ইতিহাসও বদলাবে না সেই ছবি?

Women’s Test Cricket: লর্ডসে ভারতের নারী ক্রিকেট দলের ঐতিহাসিক জয় নারী টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ বদলানোর সুযোগ এনে দিয়েছে? এত সাফল্য ও জনপ্রিয়তার পরও কেন এই ফরম্যাটে নিয়মিত ম্যাচ নেই?

শিব-পরশুরামের যুদ্ধবিদ্যা কালারিপায়াট্টু থেকেই জন্ম কুংফুর!

Kalaripayattu Indian Martial Art: ভারতীয় পৌরাণিক ঐতিহ্যে কালারিপায়াট্টুকে স্রেফ যুদ্ধের কৌশল হিসেবে দেখা হয়নি, বরং এটিকে মানব শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রাণশক্তিকে জাগিয়ে তোলার এক মহান সাধনা বলে মনে করা হয়।

দু'হাজার বছর পুরনো ‘আত্য পাত্যা’: এই খেলাই শিখিয়েছিল যুদ্ধের কৌশল!

Atya Patya Traditional Indian Game: আনুমানিক ১০০ থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত প্রাচীন তামিল সাঙ্গম সাহিত্য ‘নাটতৃণৈ’-তে এই খেলার প্রথম লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায়। অতএব, এই খেলার বয়স প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি। সেখানে বলা আছে, প্রাচীন চোল রাজবংশের সেনারা যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার আগে নিজেদের ক্ষিপ্রতা, দ্রুত দৌড়ানোর ক্ষমতা আর শরীরকে এক নিমেষে বাঁকানোর চপলতা বাড়াতে এই খেলায় মেতে উঠত।

১৬ বছর পর ফের ভারতের পথে ললিত মোদী

Lalit Modi return to India: দীর্ঘ সময় পর দিল্লির আপিল ট্রাইব্যুনাল তাঁর বিরুদ্ধে থাকা আর্থিক অনিয়মের বড় অভিযোগ ও জরিমানা বাতিল করে দেওয়ার পরেই এই আলোচনার সূত্রপাত। সোশ্যাল মিডিয়ায় ললিত মোদী নিজেই স্পষ্ট করেছেন, সমস্ত বড়সড় আইনি জটিলতা কাটার পর ২০২৬ সালের শেষ দিকে অথবা ২০২৭-এর শুরুতেই ফের তিনি ভারতে পা রাখতে চলেছেন।

গোলের আড়ালে ঘৃণার খেলা: ২০২৬ বিশ্বকাপে ট্রাম্প, ফিফা আর ফুটবলের পরাজয়

Trump FIFA World Cup: এই বিশ্বকাপ শুধুই একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; মাঠের লড়াই ছাপিয়ে তা হয়ে উঠেছে ভূ-রাজনীতি, বর্ণবিদ্বেষ এবং বাণিজ্যিক আধিপত্যের এক জটিল ময়দান।

একটা রাজপুত্তুর যার মুকুট হারিয়ে গিয়েছে

Lionel Messi Retirement: তিনটে ফাইনালের বোঝা। একে একে ছেড়ে যায় সহযোদ্ধারা। রক্তাক্ত মাসচেরানো চলে যান, কুন আগুয়েরোর অসুখ... তবু লিও পড়ে থাকে, আমরা পড়ে থাকি আর কিছুদিন। বৃত্ত সম্পূর্ণ করতে প্রয়োজন ছিল একজন স্ক্যালোনির, তিনি সেটুকু সেতু নির্মাণের দায়িত্ব নিলেন। আমরা অপেক্ষা করলাম লুসাইলে। আমরা তো কবেই হেরে গিয়েছিলাম, সৌদি আরব শুধু চিনিয়ে দিয়েছিল আশপাশটা।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: যেভাবে ১৫ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসায় পরিণত হল ফুটবল

FIFA Revenue 2026: 'কুইন্টেট প্রাইভেট ব্যাংক'-এর সাম্প্রতিক একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শেয়ারবাজারের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের অনুঘটক হওয়ার চেয়ে বিশ্বকাপ আসলে একটি শক্তিশালী স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক উদ্দীপক হিসেবেই বেশি কাজ করে। ফিফা, সম্প্রচারকারী সংস্থা, স্পোর্টসওয়্যার ব্র্যান্ড এবং আতিথেয়তা (হসপিটালিটি) ক্ষেত্রগুলি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করলেও, কোম্পানির শেয়ারের দামে সেই ইতিবাচক প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে রাখা বেশ কঠিন।

যখন ইউরোপে নারীরা গৃহবন্দি, তখন অসমে মেয়েরা খেলছিলেন ধোপখেল

Dhop Khel Assam: আহোম রাজাদের রাজপ্রাসাদ থেকে বিহুর মেঠো মাঠ—অসমের মাটিতে একসময় গমগম করত ধোপখেলের আওয়াজ। ফুটবল, কাবাডি আর দূরন্ত নিশানার এই অদ্ভুত রোমাঞ্চকর খেলাটি শুধু পুরুষদের বীরত্ব প্রমাণের লড়াই ছিল না; যখন ইউরোপে নারীদের জীবন ছিল চার দেওয়ালে বন্দি, তখন অসমে মেয়েরাও মাঠে নেমে মেতে উঠতেন ধোপখেলে।