দুই বিশ্বযুদ্ধ থেকে করোনা মহামারি, দেড়শ বছর পেরিয়ে এসেও জনপ্রিয় ব্র্যান্ড ‘হরলিক্স’

Horlicks : ওষুধের দোকানে কাজ করতেন দুই ভাই, ব্যবসায় পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে গিয়ে বানিয়ে ফেললেন বিশ্ববিখ্যাত পানীয়, পড়ুন ইতিহাস

Kankana Mukherjee
৩ মিনিট
দুই বিশ্বযুদ্ধ থেকে করোনা মহামারি, দেড়শ বছর পেরিয়ে এসেও জনপ্রিয় ব্র্যান্ড ‘হরলিক্স’

“বেড়ে ওঠার ডোজ, হরলিক্স রোজ রোজ...!”, বিজ্ঞাপনের এমন বহরে সাড়া না দিয়ে আর উপায় কি! ছোট থেকেই হরলিক্সের গ্লাসে চুমুক দেওয়ার অভ্যাসের সঙ্গে কমবেশি সকলেই পরিচিত। দুধের অরুচি মেটাতে তাতে কয়েক চামচ হরলিক্স পাউডার মিশিয়ে দিতেন মা-ঠাকুমারা। আজ প্রায় দেড় শতক ধরে ঘরে ঘরে ভরসা জুগিয়ে আসছে এই পানীয়। শুধু পানীয় বললে ভুল হবে, আজকের দিনে দাঁড়িয়ে হরলিক্স মানে এক চিরকালীন নস্টালজিয়া। নিছক নাম থেকে বেরিয়ে এসে ব্র্যান্ড হয়ে ওঠার এই জার্নিটা ঠিক কেমন ছিল জানেন?

হালকা বাদামি রঙের পাউডার, গরম জল অথবা দুধে মিশিয়ে পান করার চল শুরু হয় আজ থেকে প্রায় দেড়শো বছর আগে। যদিও এর শুরুটা হয়েছিল খোদ বিদেশের মাটিতে। সময়টা ১৮৭৩ সালের ৫ জুন। আমেরিকায় হরলিক্স আবিষ্কার করেন দুই ভাই। জেমস এবং তার ভাই উইলিয়াম হরলিক। দুজনেই ছিলেন ব্রিটেনের বাসিন্দা। জেমস ছিলেন একজন রসায়নবিদ। তিনি অবশ্য আগে থেকেই কাজ করতেন আমেরিকার একটি শিশুদের ড্রাই বেবি ফুড তৈরির কোম্পানিতে। পরবর্তীতে ১৮৬৯ সালে তাঁর ছোট ভাই উইলিয়ামও চলে আসেন আমেরিকায়। দাদার সঙ্গে একই কোম্পানিতে কাজ করতে শুরু করেন তিনিও।

কেবলমাত্র চাকরিতে তাঁরা থেমে থাকতে চাননি কোনওদিনই। পাশাপাশি কারখানায় রাসায়নিক পদার্থ নিয়ে নাড়া ঘাঁটা করতে করতে নতুন একটি পণ্য তৈরি করার কাজ এগিয়ে রাখেন অনেকটাই। অবশেষে, কয়েক বছর চাকরি করার পর, ১৮৭৩ সালে এক প্রকার মল্টেড মিল্ক ড্রিংক তৈরির নতুন কোম্পানি শুরু করেন দুইভাই। কোম্পানিটির নাম দেন J&W হরলিক্স। আর নতুন আবিষ্কৃত ওই পণ্যটির নাম দেন ডায়স্টয়েড।

যদিও প্রথম অবস্থায় এটি পাউডার জাতীয় খাবার হিসেবে বিক্রি হতে থাকে। তখনও জল অথবা দুধ জাতীয় তরলের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়ার স্বত্বাধিকার হাতে পায়নি এই পণ্য। পেটেন্ট পেতে পেতে লেগে গেল আরও দশটা বছর। ১৮৮৩ সালের ৫ জুন দুই ভাই তাঁদের পণ্যটির তরলের সঙ্গে মিশে যাওয়ার ক্ষমতার জন্য ইউএস পেটেন্ট নং ২৭৮,৯৬৭ হাতে পান। ফলে ডায়স্টয়েড পেটেন্ট প্রাপ্ত প্রথম মল্টেড দুধের পণ্য হয়ে ওঠে।

নিজেদের নামের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে পণ্যের নামটিও পরবর্তীতে বদলে দেন তাঁরা। আর সেই নামেই ঘরে ঘরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এটি। আমেরিকার মাটি থেকে ক্রমেই ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও। ১৯০৮ সালে উইলিয়াম ও জেমস প্রায় ২৮,০০০ পাউন্ড খরচ করে স্লফ, বার্কশায়ারের কাছে তাঁদের প্রথম কারখানা খোলেন। দুই বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে হালফিলের করোনা মহামারি সমস্ত ঝড় ঝাপটা সামলে ক্রমশ ঘরে ঘরে ব্র্যান্ড হয়ে উঠতে শুরু করে হরলিক্স।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
১৩৫ বছর ধরে নেশার জল বেচছে কোকাকোলা? কীভাবে জন্ম নিল এই পানীয়, অবাক করবে যে ইতিহাস

History of Coca-Cola: নেশায় বুঁদ জন হুইস্কিতে সোডা মেশানোর পরিবর্তে কোকা আর কোলা বাদামের মিশ্রণে সোডা মিশিয়ে গ্লাসে চুমুক দেন। ব্যাস প্রথম চুমুকেই একপ্রকার ক্লিন বোল্ড হয়ে যান জন পেম্বারটন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করতে শুরু করে হরলিক্স। ব্রিটিশ পক্ষের সৈন্যরা এই পাউডার জলে মিশিয়ে পান করতে শুরু করেন। এতে একদিকে যেমন দৈহিক ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে অনেকক্ষণ যাবৎ খিদে মেটাতেও সাহায্য করে এই পানীয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের এই সুফলকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েও কাজে লাগানো হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে, হরলিক্স ট্যাবলেটগুলি এবং ক্যান্ডি হিসাবে বিক্রি করা শুরু হয়। আমেরিকান, ব্রিটিশ এবং অন্যান্য সৈন্যরা শক্তিবর্ধক ট্যাবলেট হিসেবে এটি সেবন করতে শুরু করেন।

এরপর ১৯৪৮ সালের লন্ডন অলিম্পিকে হরলিক্সের জনপ্রিয়তা এক নতুন পরিচয় পায়। আয়োজক কমিটি অলিম্পিকে অংশ নেওয়া সব খেলোয়াড়কে হরলিক্স উপহার দেয়। এটি রাতে শোয়ার আগে পানীয় হিসাবে এবং খেলায় নামার সময় পরিবেশন করা হয়েছিল যাতে খেলোয়াড়দের দৈহিক ক্ষমতা এবং একাগ্রতা বৃদ্ধি পায়। হরলিক্সের এই ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার কারণে ১৯৬৯ সালে বিশম গ্রুপ কিনে নেয় একে যা পরে গ্ল্যাক্সোস্মিথলাইন অর্থাৎ জিএসকে গ্রুপ নামে পরিচিত হয়।

যদিও হরলিক্স কখন ভারতে প্রবেশ করেছিল সে সম্পর্কে কোনও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই, তবে ইতিহাস বলছে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর অনেকেই এই পানীয় থেকে উপকার পেয়েছিলেন যাঁরা পরবর্তীতে এদেশে আসেন, তাঁদের হাত ধরেই আসে হরলিক্স, এমনটাই অনুমান করা যায়। এটি ১৯৪০ এবং ১৯৫০ এর দশক নাগাদ পঞ্জাব, বাংলা এবং মাদ্রাজের বেশ কিছু রাজকীয় রাজ্য সহ দেশের অন্যান্য ধনী পরিবারগুলিতেও প্রথম ফ্যামিলি ড্রিঙ্ক হিসাবে গৃহীত হতে শুরু করে।

তারপর সময় অনেকটাই এগিয়েছে। আধুনিক সময়ে হরলিক্সের পাশাপাশি এসেছে আরও বাহারি পানীয়। যদিও হরলিক্সের জনপ্রিয়তা তাতে কমেনি এক রত্তিও। এই বদলে যাওয়া সময়ের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে হরলিক্সও নিজেদেরকে বদলে নিয়েছে অনেকটাই। একের পর এক যুগোপযুগী ধরন এসেছে এই পানীয়ের। বেবি ফুড থেকে শুরু করে মাদার হরলিক্স, বয়স এবং শারীরিক ধরনের সঙ্গে মানানসই ভিন্ন ভিন্ন ধরনের হরলিক্স আজ মেলে বাজারে। প্রতিক্ষেত্রেই তার প্যাকেজিং-এ রয়েছে অভিনবত্ব।

কাচের বোতলে নীল রঙের ঢাকনা, শুরুতে এমন চেহারাই ছিল এই পানীয়ের। পরবর্তীতে এসেছে রঙচঙে বোতল। কাগজের প্যাকেটেও বিক্রি হয় এটি। কাচের বোতল ভেঙে যাওয়ার ভয় ছিল বলে আসে পলিথিনের বোতল। শুধু পাউডার জাতীয় পানীয় নয় পাশাপাশি এই কোম্পানির জনপ্রিয়তার কথা মাথায় রেখে বাজারে আসে একই নামের বিস্কুটও। আজকের দিনে দাঁড়িয়েও একাধিক নিত্যনতুন হেলথ ড্রিংকের ভিড়ে অটুট এই পুরাতন হরলিক্স নামটুকু। শুধু নাম নয় একটা চিরকালীন ভরসা যোগ্য ব্র্যান্ডও বটে।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।