বাচ্চারা কাঁপত সেই 'ভূত' দেখে! কলকাতায় এককালে চালু ছিল এইসব আজব খেলা

Ancient Kolkata: হরেকরকমের আশ্চর্য সব 'খেলা'-য় মজে থাকত কলকাত্তাইয়া বাঙালি। সেসব খেলার অস্তিত্ব আজ প্রায় নেই বললেই চলে, এমনকী, 'খেলা' বলতে যে কী ধরনের আজব প্রদর্শনী বোঝাত, আজকের বাঙালি সেই ধারণাও করতে পারবে না।

rudranjan
৩ মিনিট
বাচ্চারা কাঁপত সেই 'ভূত' দেখে! কলকাতায় এককালে চালু ছিল এইসব আজব খেলা

একসময় কলকাতা ছিল সবসময় জমজমাট, কার্নিভালের আবহে মেতে থাকত শহর। নিত্যদিন সেখানে আনন্দ, উৎসব লেগেই থাকত। তারই সঙ্গে হরেকরকমের আশ্চর্য সব 'খেলা'-য় মজে থাকত কলকাত্তাইয়া বাঙালি। সেসব খেলার অস্তিত্ব আজ প্রায় নেই বললেই চলে, এমনকী, 'খেলা' বলতে যে কী ধরনের আজব প্রদর্শনী বোঝাত, আজকের বাঙালি সেই ধারণাও করতে পারবে না। এখনও হয়তো কিছু কিছু এজাতীয় খেলা টিকে, কিন্তু খাস কলকাতার বাঙালির জীবনের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বিশেষ নেই। অথচ এগুলোই একসময় ছিল কলকাতার বাসিন্দাদের অবসরযাপনের সঙ্গী। নানা পালা-পার্বণে এই সমস্ত খেলাকে ঘিরেই চলত বাঙালির আনন্দ উদযাপন।

কাদামাটির গান

সেসময় নবমীর দিন পাঁঠা বা মোষ বলি দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। কোনও কোনও বাড়ির পুজোয় এই নিয়ম আজও মানা হয়। অনেকে আবার ইদানীংকালে পাঁঠা বা মোষের বদলে চালকুমড়ো বলি দেন। যাই হোক, আজ থেকে প্রায় এক শতাব্দী আগে দুর্গাপুজোর শেষ লগ্নে মোষ বলি দিয়ে তার রক্ত কাদার সঙ্গে মিশিয়ে গায়ে মাখতেন অনেকে। তারপর সেই মোষের কাটা মাথা নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘোরা হত। সঙ্গে চলত অশ্লীল গান। সে সময়ে এই গানের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘খেউড় গান’। নানা বয়সের মানুষ নবমীর দিন পাড়ায় পাড়ায় এই গান গেয়ে বেড়াতেন। অনেকে আবার ভুলে যাওয়ার ভয়ে গানের কথা খাতায় লিখে রাখতেন। খেউড় গানের প্রথা দীর্ঘদিন চলেছিল। পরবর্তীকালে কেশব সেন প্রমুখের উদ্যোগে আস্তে আস্তে শহরাঞ্চলে এই প্রথা লোপ পায়।

পুতুলবাজি

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
নস্টালজিয়া না লজ্জা? কলকাতার হাতে টানা রিকশার আড়ালে রয়েছে যে কাহিনি

শহরের বিবেক মানচিত্রে এক ফোঁটা কালির দাগ এই হাতে টানা রিকশা। চুলোয় যাক ঐতিহ্য!

উনিশ শতকে পুতুলবাজির ব্যপক চল ছিল কলকাতায়। পুতুলওয়ালারা প্রথমে একটা বাঁশের পুতুল তৈরি করতেন। তারপর সেই বাঁশের পুতুলকে রং মাখিয়ে সাজাতেন। লম্বা বাঁশের খুঁটি পুঁতে তার গায়ে বিছানার চাদর আটকে ‘ব্যাকড্রপ’ বা ‘পুতুলের ঘর’ তৈরি করা হত। তারপর সেই ঘরের ভেতর তার দিয়ে পুতুলদের বেঁধে তাদের নাচানো হত। পুতুলনাচের সঙ্গে সঙ্গে পুতুলওয়ালারা মুখে তালপাতার টুকরো লাগিয়ে নাকি সুরে কথা বলতেন। লোকে ভাবত বুঝি পুতুলরাই কথা বলছে। এই পুতুলদের ঘরে বিভিন্ন তাকের ওপর পুতুলগুলোকে সাজানো হত। সবচেয়ে ওপরের তাকে বাহদুর শাহ্ জাফরের পোশাক পরিয়ে একটা পুতুলকে রাখা হত। তার ঠিক নিচে বসানো হত বাদশাহের পারিষদদের।

পুতুলবাজির প্রচলন আজও আছে। যদিও তার নাম পালটে গেছে। পুতুল নাচানোর এই খেলাকে মানুষ আজ ‘পাপেট শো’ নামে চেনে। সেসময়ে অনেক বাচ্চাদের বোঝানো হত, বাড়ির পাতকুয়ার ভেতর ভূত থাকে। বাচ্চারা সেই জন্য পাতকুয়ার সামনে যেতে ভয় পেত। একথা মাথায় রেখেই ‘পাতকুয়ার ভূত’ নামে একটা পুতুল তৈরি করা হয়েছিল। বাচ্চারা সেই ‘পাতকুয়ার ভূত’ দেখে ভয়ে কাঁপত।

বাঁশবাজি

পুতুলবাজির সঙ্গে সঙ্গে বাঁশবাজিও ছিল উনিশ শতকের বাঙালির বিনোদনের এক অঙ্গ। বাঁশওয়ালারা সেসময়ে শকুনির পালক আর ঠোঁট বসানো এক ধরনের কাঁথার জামা পরতেন। সেই অদ্ভুতদর্শন জামা পরে তাঁরা বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে লোকের বাড়ির উঠোনে ঘুরে বেড়াতেন। দূর থেকে তাঁদের দেখে বিশাল বড় এক শকুন বলে মনে হত। তবে, শুধু শকুন সেজে উঠোনে ঘুরেই বাঁশওয়ালারা থামতেন না। বাড়ির বাসিন্দাদের কাছ থেকে তাঁরা পয়সা চাইতেন। কেউ পয়সা দিতে না চাইলে তাঁকে পায়ে ঠোক্কর দিতে যেতেন। পয়সা পেলে বাঁশওয়ালারা দুটো লম্বা বাঁশ পুঁতে তার ওপর দড়ি বেঁধে উঠে দাঁড়াতেন। তারপর সেই বাঁশের ওপর ভর দিয়ে অবলীলাক্রমে হাঁটাচলা করতে করতে বলতেন, ‘হায়রে পয়সা, হায়রে পয়সা।’ খানিকক্ষণ এমনভাবে চলার পর তাঁরা একটা কাঠির ওপর থালা ঘুরিয়ে সেটা ওপরে তুলতেন। ক্রমে সেই কাঠির নিচে দশ থেকে পনেরোটা কাঠি যোগ করতেন, কিন্তু থালা একভাবে ঘুরতে থাকত। কখনও আবার নাকের ওপর কাঠি রেখেও তাঁরা থালা ঘোরাতেন।

ঝুমুরওয়ালি

উনিশ শতকে কারও বিয়ে হলে ঝুমুরওয়ালিকে বায়না দেওয়া হত। ঝুমুরওয়ালি একটা গরুর গাড়ির ওপর কাগজের ময়ুরপঙ্খি তৈরি করে তাতে উঠে নাচতেন। তাঁর পিছনে একজন লোক নাচের তালে তালে কাঁসি আর ঢোল বাজাতেন। এই ঝুমুরওয়ালিরা নাচের সঙ্গে সঙ্গে কবিতাও বলতেন। সেই কবিতা ছিল নানা অপভাষা-মিশ্রিত, যেমন, "মাগী মিনসেকে চিৎ করে ফেলে দিয়ে বুকে দিয়েছে পা, আর চোখটা করে জুলুর জুলুর মুখে নেইকো রা।" বিয়ে ছাড়াও বহু মানুষ কারও সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ হলে তাঁদের বাড়ির দরজায় ঝুমুরওয়ালি বসিয়ে দিতেন। ঝুমুরওয়ালিরা তারপর সেই বাড়ির মালিকের নামে তারস্বরে গালাগাল দিতেন।

বাঙালির জীবনে আজ আর এসব খেলা বা প্রদর্শনীর অবসর নেই। ডিজিটাল দুনিয়ায় সে সর্বদাই ব্যস্ত। তবু শহর ছাড়িয়ে কিছুটা গ্রাম-গঞ্জের দিকে গেলে এখনও হয়তো পালা-পার্বণে এই ধরনের খেলা দেখা যাবে।

লিখেছেন
rudranjan
rudranjan
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।