বাচ্চারা কাঁপত সেই 'ভূত' দেখে! কলকাতায় চালু ছিল এইসব আজব খেলা

একসময় কলকাতা ছিল সবসময় জমজমাট, কার্নিভালের আবহে মেতে থাকত শহর। নিত্যদিন সেখানে আনন্দ, উৎসব লেগেই থাকত। তারই সঙ্গে হরেকরকমের আশ্চর্য সব 'খেলা'-য় মজে থাকত কলকাত্তাইয়া বাঙালি। সেসব খেলার অস্তিত্ব আজ প্রায় নেই বললেই চলে, এমনকী, 'খেলা' বলতে যে কী ধরনের আজব প্রদর্শনী বোঝাত, আজকের বাঙালি সেই ধারণাও করতে পারবে না। এখনও হয়তো কিছু কিছু এজাতীয় খেলা টিকে, কিন্তু খাস কলকাতার বাঙালির জীবনের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বিশেষ নেই। অথচ এগুলোই একসময় ছিল কলকাতার বাসিন্দাদের অবসরযাপনের সঙ্গী। নানা পালা-পার্বণে এই সমস্ত খেলাকে ঘিরেই চলত বাঙালির আনন্দ উদযাপন।

 

 

কাদামাটির গান

সেসময় নবমীর দিন পাঁঠা বা মোষ বলি দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। কোনও কোনও বাড়ির পুজোয় এই নিয়ম আজও মানা হয়। অনেকে আবার ইদানীংকালে পাঁঠা বা মোষের বদলে চালকুমড়ো বলি দেন। যাই হোক, আজ থেকে প্রায় এক শতাব্দী আগে দুর্গাপুজোর শেষ লগ্নে মোষ বলি দিয়ে তার রক্ত কাদার সঙ্গে মিশিয়ে গায়ে মাখতেন অনেকে। তারপর সেই মোষের কাটা মাথা নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘোরা হত। সঙ্গে চলত অশ্লীল গান। সে সময়ে এই গানের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘খেউড় গান’। নানা বয়সের মানুষ নবমীর দিন পাড়ায় পাড়ায় এই গান গেয়ে বেড়াতেন। অনেকে আবার ভুলে যাওয়ার ভয়ে গানের কথা খাতায় লিখে রাখতেন। খেউড় গানের প্রথা দীর্ঘদিন চলেছিল। পরবর্তীকালে কেশব সেন প্রমুখের উদ্যোগে আস্তে আস্তে শহরাঞ্চলে এই প্রথা লোপ পায়।

 

 

পুতুলবাজি

উনিশ শতকে পুতুলবাজির ব্যপক চল ছিল কলকাতায়। পুতুলওয়ালারা প্রথমে একটা বাঁশের পুতুল তৈরি করতেন। তারপর সেই বাঁশের পুতুলকে রং মাখিয়ে সাজাতেন। লম্বা বাঁশের খুঁটি পুঁতে তার গায়ে বিছানার চাদর আটকে ‘ব্যাকড্রপ’ বা ‘পুতুলের ঘর’ তৈরি করা হত। তারপর সেই ঘরের ভেতর তার দিয়ে পুতুলদের বেঁধে তাদের নাচানো হত। পুতুলনাচের সঙ্গে সঙ্গে পুতুলওয়ালারা মুখে তালপাতার টুকরো লাগিয়ে নাকি সুরে কথা বলতেন। লোকে ভাবত বুঝি পুতুলরাই কথা বলছে। এই পুতুলদের ঘরে বিভিন্ন তাকের ওপর পুতুলগুলোকে সাজানো হত। সবচেয়ে ওপরের তাকে বাহদুর শাহ্ জাফরের পোশাক পরিয়ে একটা পুতুলকে রাখা হত। তার ঠিক নিচে বসানো হত বাদশাহ-র পারিষদদের।

 

 

আরও পড়ুন: নস্টালজিয়া না লজ্জা? কলকাতার হাতে টানা রিকশার আড়ালে রয়েছে যে কাহিনি

 

 

পুতুলবাজির প্রচলন আজও আছে। যদিও তার নাম পালটে গেছে। পুতুল নাচানোর এই খেলাকে মানুষ আজ ‘পাপেট শো’ নামে চেনে। সেসময়ে অনেক বাচ্চাদের বোঝানো হত, বাড়ির পাতকুয়ার ভেতর ভূত থাকে। বাচ্চারা সেই জন্য পাতকুয়ার সামনে যেতে ভয় পেত। একথা মাথায় রেখেই ‘পাতকুয়ার ভূত’ নামে একটা পুতুল তৈরি করা হয়েছিল। বাচ্চারা সেই ‘পাতকুয়ার ভূত’ দেখে ভয়ে কাঁপত।

 


বাঁশবাজি

পুতুলবাজির সঙ্গে সঙ্গে বাঁশবাজিও ছিল উনিশ শতকের বাঙালির বিনোদনের এক অঙ্গ। বাঁশওয়ালারা সেসময়ে শকুনির পালক আর ঠোঁট বসানো এক ধরনের কাঁথার জামা পরতেন। সেই অদ্ভুতদর্শন জামা পরে তাঁরা বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে লোকের বাড়ির উঠোনে ঘুরে বেড়াতেন। দূর থেকে তাঁদের দেখে বিশাল বড় এক শকুন বলে মনে হত। তবে, শুধু শকুন সেজে উঠোনে ঘুরেই বাঁশওয়ালারা থামতেন না। বাড়ির বাসিন্দাদের কাছ থেকে তাঁরা পয়সা চাইতেন। কেউ পয়সা দিতে না চাইলে তাঁকে পায়ে ঠোক্কর দিতে যেতেন। পয়সা পেলে বাঁশওয়ালারা দুটো লম্বা বাঁশ পুঁতে তার ওপর দড়ি বেঁধে উঠে দাঁড়াতেন। তারপর সেই বাঁশের ওপর ভর দিয়ে অবলীলাক্রমে হাঁটাচলা করতে করতে বলতেন, ‘হায়রে পয়সা, হায়রে পয়সা।’ খানিকক্ষণ এমনভাবে চলার পর তাঁরা একটা কাঠির ওপর থালা ঘুরিয়ে সেটা ওপরে তুলতেন। ক্রমে সেই কাঠির নিচে দশ থেকে পনেরোটা কাঠি যোগ করতেন, কিন্তু থালা একভাবে ঘুরতে থাকত। কখনও আবার নাকের ওপর কাঠি রেখেও তাঁরা থালা ঘোরাতেন।

 

 

ঝুমুরওয়ালি


উনিশ শতকে কারও বিয়ে হলে ঝুমুরওয়ালিকে বায়না দেওয়া হত। ঝুমুরওয়ালি একটা গরুর গাড়ির ওপর কাগজের ময়ুরপঙ্খি তৈরি করে তাতে উঠে নাচতেন। তাঁর পিছনে একজন লোক নাচের তালে তালে কাঁসি আর ঢোল বাজাতেন। এই ঝুমুরওয়ালিরা নাচের সঙ্গে সঙ্গে কবিতাও বলতেন। সেই কবিতা ছিল নানা অপভাষা-মিশ্রিত, যেমন, ‘মাগী মিনসেকে চিৎ করে ফেলে দিয়ে বুকে দিয়েছে পা, আর চোখটা করে জুলুর জুলুর মুখে নেইকো রা।’ বিয়ে ছাড়াও বহু মানুষ কারও সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ হলে তাঁদের বাড়ির দরজায় ঝুমুরওয়ালি বসিয়ে দিতেন। ঝুমুরওয়ালিরা তারপর সেই বাড়ির মালিকের নামে তারস্বরে গালাগাল দিতেন।

 


বাঙালির জীবনে আজ আর এসব খেলা বা প্রদর্শনীর অবসর নেই। ডিজিটাল দুনিয়ায় সে সর্বদাই ব্যস্ত। তবু শহর ছাড়িয়ে কিছুটা গ্রাম-গঞ্জের দিকে গেলে এখনও হয়তো পালা-পার্বণে এই ধরনের খেলা দেখা যাবে।

More Articles

;