গোপাল পাঁঠা 'হিন্দু বীর' বা 'বিপ্লবী' কোনোটাই ছিলেন না

Gopal Patha: গোপাল পাঁঠা প্রথমে পাড়ার মস্তান ছিলেন পরবর্তী সময় দাঙ্গায় জড়িয়ে পড়েন। তিনি এবং তার সঙ্গীরা সাত মাইল দূর থেকে কখনও হিন্দু মহাসভার কাছাকাছি ছিলেন না, তারা মূলত ছিলেন দক্ষিণপন্থী।

Supriyo Choudhury
৪ মিনিট
গোপাল পাঁঠা 'হিন্দু বীর' বা 'বিপ্লবী' কোনোটাই ছিলেন না

১৯৪৬-এর দাঙ্গায় হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই একে অপরকে বাঁচিয়ে ছিলেন, যে ইতিহাস 'দ্য বেঙ্গল ফাইলস' কখনও বলবে না। গোপাল পাঁঠা দাঙ্গাবাজ ছিলেন ঠিকই, কিন্তু 'হিন্দু বীর' ছিলেন না। পাড়ার মানুষদের হামলা থেকে বাঁচতে অস্ত্র ধরেছিলেন তিনি। গোপাল পাঁঠা নির্দিষ্ট ভাবে 'মুসলমানদের কাটব' বলেই দাঙ্গা করেননি। তিনি ছিলেন চরম দক্ষিণপন্থী এবং অ্যান্টি কমিউনিস্ট। পরবর্তীতে বামপন্থীদের সঙ্গে এই সব মস্তানরদের ঝামেলা বাধে এবং নকশাল আমলে এদের কফিনে শেষ পেরেকটা পোঁতা হয়। সেই সময়ই এরা মার খেয়ে ঘরে ঢুকে গিয়েছিল। এটাও ইতিহাস।

গোপাল পাঁঠাকে দু-ভাবে দেখে মানুষ। যাঁরা বামপন্থী তাঁরা গোপাল পাঁঠাকে দাঙ্গাবাজ বলেন। অন্যদিকে, আমরা দেখতেই পাচ্ছি বর্তমানে গোপাল পাঁঠাকে 'হিন্দু বীর' এমনকি বিপ্লবীও বানিয়ে ফেলা হচ্ছে। কিন্তু তার চরিত্র আসলে বহুমাত্রিক। একটা মহল থেকে বলা হয়, হিন্দু মহাসভা এবং তার নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কলকাতা শহরকে পাকিস্তানে চলে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন এবং হিন্দুদের রক্ষাকর্তা ছিলেন। কিন্তু সে সময় হিন্দু মহাসভার কলকাতায় তেমন কোনো প্রভাবই ছিল না।

গোপাল পাঁঠা প্রথমে পাড়ার মস্তান ছিলেন পরবর্তী সময় দাঙ্গায় জড়িয়ে পড়েন। তিনি এবং তার সঙ্গীরা সাত মাইল দূর থেকে কখনও হিন্দু মহাসভার কাছাকাছি ছিলেন না, তারা মূলত ছিলেন দক্ষিণপন্থী। তখন পাড়ায় পাড়ায় ছেলেদের বাহুবলী তৈরি করা হত। এঁরা পাড়ায় মাশাল ফুলিয়ে ঘুরতেন। এই সব মস্তানরা মেয়েদের অত্যন্ত সম্মান করত। গোপাল পাঁঠার দলে এও বলা ছিল মহিলাদের কখনই অসম্মান করা যাবে না।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কেউ বলেন ‘হিরো’, কেউ ’রাস্তার গুন্ডা’! আসলে কে এই বিতর্কিত গোপাল পাঁঠা?

Who is Gopal Patha: বউবাজারের মঙ্গলা লেনের বাসিন্দা ছিলেন গোপাল চন্দ্র মুখোপাধ্যায়। পারিবারিক সূত্রে তাঁরা পাঁঠার মাংসের ব্যবসা করতেন।

একটা ইতিহাস বলি। কিছুদিন আগেই অতিবাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এক নেতার মৃত্যু হল, তাঁর নাম আমি উল্লেখ করতে চাই না। তাঁর স্ত্রী, বৌবাজার পাড়ারই মেয়ে ছিলেন। খুব বড় বাড়ির মেয়ে। তাঁরই গল্প। গোপাল পাঁঠারা রকে বসে আড্ডা দিতেন সেই সময়ই তাঁরা কোচিং থেকে পড়ে ফিরতেনা। গোপাল পাঁঠা খোঁজ নিতেন, কেউ তাঁদের বিরক্ত করেছে কিনা? মেয়েরা জবাব দিতেন, 'না'। অতপর গোপাল পাঁঠা বলতেন, 'তাহলে বাড়ি যাও মা'। পাড়ার স্বঘোষিত অভিভাবক ছিলেন তাঁরা।

এরপর যখন ৪৬-এর দাঙ্গা লাগল গোপাল পাঁঠারাও দাঙ্গায় জড়িয়ে পড়লেন। এটা একদম ভুল কথা যে প্রথম দিকে এক তরফা 'হিন্দু জেনসাইড' হয়ে গিয়েছিল। আসল তথ্যটা হল, সে সময় দাঙ্গায় দু-পক্ষেরই প্রচুর মানুষ মারা গিয়েছিলেন। কলকাতার তৎকালীন কংগ্রেস নেতা বিজয় সিং নাহার বলেছিলেন, হিন্দুরাও পাড়ায় পাড়ায় প্রস্তুত ছিলেন। বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ এবং হাসপাতালের রিপোর্ট অনুযায়ী, আহত হয়ে আসা বা নিহতদের মধ্যে প্রথম দিন মুসলমানদের সংখ্যাই বেশি ছিল। এই নিয়ে সম্প্রতি র‍্যাডিক্যাল ইমপ্রেশন থেকে 'ফিরে দেখা ইতিহাস' নামে একটি বইও বেরিয়েছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
গোপাল পাঁঠা : হিন্দুত্বের তাস না কি কলকাতা কাঁপানো মস্তান?

Mastan Gopal Pantha : ১৯৪৬ সালের কুখ্যাত দাঙ্গায় তাঁর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা সবচেয়ে বেশি। মুসলিম নিধনকারী হিসেবে তাঁর একটা ছবি তুলে ধরা হয়।

৪৬-এর দাঙ্গায় গোপালবাবুর নেতৃত্বে আশেপাশের এলাকার প্রচুর বাহুবলীরাও দাঙ্গায় জড়িয়ে পরে ছিল। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ভানু বোস, বুলু, সত্যেন, চিত্ত, জগা বোস, রাম চ্যাটার্জি প্রমুখ। একজন ছিল নেপালি ('চাইনিজ ডন' বলা হত)। প্রচুর পাঞ্জাবি ছেলেপুলেও গোপাল পাঁঠার সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় দল আরও বড় হয়ে যায়। উল্টোদিকে গোপাল পাঁঠাদের বিরুদ্ধেও পাঠান ও বিহারী মুসলমানদের একটা বড় দল ছিল। এঁরা একদিকে এবং আর গোপাল পাঁঠারা আরেকদিকে ছিল।

গোপালের সঙ্গে বিপ্লবী তকমাটা জুড়ে দেওয়ার বিষয়টা আসে ওঁর কাকার থেকে। গোপাল পাঁঠার কাকা ছিলেন অনুকূল চন্দ্র মুখোপাধ্যায়। তিনি রডা কোম্পানির অস্ত্র লুণ্ঠনের অন্যতম নায়ক। ভূপেন্দ্র কিশোর রক্ষিত রায়ের লেখা 'ভারতে সশস্ত্র বিপ্লব' এবং 'সবার অলক্ষ্যে' বইগুলি থেকে জানা যায়, অনুকূল চন্দ্র মুখোপাধ্যায়, সুরেশ চন্দ্র মজুমদার, সুপতি গুহ-র মতো বিপ্লবীরা না থাকলে বিনয়, বাদল, দীনেশ কখনও ঢাকা থেকে কলকাতায় এসে পৌঁছতেই পারতেন না। এঁরাই মূল পরিকল্পনাকারী। রয়টার্স বিল্ডিংয়ে ঢোকার পরিকল্পনাও তাঁদেরই ছিল। গুরুত্বপূর্ণ হল, নিজেদের গোপনে রেখে তাঁরা এমনভাবে কাজ করতেন যে কোনোদিন ধরাই পরেননি। অনুকূলবাবু সে সময় বৌবাজারে একটি পাঁঠার মাংসের দোকান খোলেন। দোকানটিতে সাইন বোডে লেখা থাকত 'বাঙালির পাঁঠার মাংসের দোকান'। দোকানের পেছনে একটা গোপন ঘর ছিল সেখানেই বিপ্লবীদের আশ্রয় দেওয়া হত। বিভিন্ন সভাও সেই ঘরেই হত। সেই দোকানের মালিকানা ছিল অনুকূল চন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের নামে। তাঁর মৃত্যুর পর দোকানের মালিকানা পান গোপালবাবু। এরপরেই ৪৬-এর দাঙ্গা। তার পর থেকেই ধীরে ধীরে গোপাল নামের সঙ্গে 'পাঁঠা' শব্দবন্ধ জুড়ে যায়।

একটা ঘটনার কথা বলি, রাজাবাজার অঞ্চলের ভিক্টোরিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ-এ হিন্দু মেয়েরাই বেশি পড়তেন। মীনা পেশোয়ারি, হাদি খান-সহ আরও অনেকে মিলে পরিকল্পনা করেছিল ওই মেয়েদের তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ এবং খুন করা হবে। এই কলেজের উল্টোদিকে ছিল রাজাবাজার ট্রাম ডিপো। সেখানে ৭০ শতাংশই ছিল মুসলমান শ্রমিক। সে সময় তাঁরা সকলেই বেরিয়ে এসে কলেজ ঘিরে ফেলেন। দু-দিন ধরে দু-পক্ষের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ হয়। ট্রাম ডিপোর ওই সব শ্রমিকরা গুন্ডাদের কলেজে ঢুকতে তো দেনইনি বরং তাঁদের খেদিয়ে দিয়েছিলেন। সেই দৃশ্যের কথা কল্পনা করলে এখনও আমার গায়ে কাঁটা দেয়- পুরনো কলকাতা আর ওই কলেজ চত্বরে রাতের বেলা আগুন জ্বলছে, মুসলমান শ্রমিকরা হিন্দু মেয়েদের বাঁচাচ্ছেন। দু-দিন বাদে এক ব্রিটিশ পুলিস সার্জেন্ট সৈন্যবাহিনী নিয়ে সেখানে আসেন। ওই সার্জেন্ট শ্রমিকদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, কিসনে বাচায়া লারকি লোগোঁকো? কওন খাড়া থা? তার জবাবে শ্রমিকরা ট্রাম কোম্পানির ইউনিয়ন রুমের মাথায় উড়তে থাকা লাল পতাকার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলেছিলেন, 'হাম নাহি সাব, উও লাল ঝাণ্ডা খাড়া থা'। আজ 'দ্য বেঙ্গল ফাইলস' তৈরি করে এই ইতিহাসগুলো ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

(সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখন)

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।