এ যুগের 'রেভ পার্টি'ও ফেল! জানেন ব্রোঞ্জ যুগে নেশায় কতটা আসক্তি ছিল মানুষের?

Ancient Hallucinogenic Drugs: রঙিন চুলের কয়েকটি গোছা কখনও কখনও কাঠ বা শিং দিয়ে তৈরি ছোট শিশিতে ভরে চুলের মৃত মালিকের মৃতদেহের পাশে রাখা হতো।

inscript
৩ মিনিট
এ যুগের 'রেভ পার্টি'ও ফেল! জানেন ব্রোঞ্জ যুগে নেশায় কতটা আসক্তি ছিল মানুষের?

নেশা তো মানুষের জন্মগত অধিকার! অন্তত এমনটাই মনে করেন নিয়মিত নেশা করা মানুষ। তবে এ সামান্য বিড়ি, সিগারেট, মদের নেশা নয়। এই নেশা আরও বেশ কয়েক ধাপ এগিয়ে। বেশ কয়েক যুগ ধরে নানা ধরনের মাদক, মাদকের ব্যবসা ও চাহিদা দুই-ই বৃদ্ধি পেয়েছে। নানা প্রকারে, নানা আকারে মেলে সেইসব ড্রাগস। তবে কয়েক যুগ বা কয়েক দশক নয়। মানুষ চরম প্রকারের মাদক সেবন করত সেইই ব্রোঞ্জ যুগ থেকেই! যে সে ড্রাগস নয়, রীতিমতো হ্যালুসিনেটিং ড্রাগস! স্পেনের মেনোর্কাতে ব্রোঞ্জ যুগের শামানদের চুলের জীবাশ্মে সাইকোঅ্যাকটিভ অ্যালকালয়েডের চিহ্ন পাওয়া গেছে। একটি কবর গুহার পিছনে এক গোপন কুঠুরিতে লুকানো চুলের নমুনাগুলি বলছে প্রাচীন ইউরোপে হ্যালুসিনোজেনিক ড্রাগের ব্যবহার ছিল। প্রায় ৩,০০০ বছর আগেকার ওই চুলের গুচ্ছগুলিতে অ্যালকালয়েড স্কোপোলামাইন এবং এট্রোপিন পাওয়া গিয়েছে। এই দু'টিই সাংঘাতিক নেশার মাদক।

ব্যালেরিক দ্বীপে অবস্থিত এস কারিটক্স গুহায় ওই চুলের গুচ্ছ এবং তাতে লেগে থাকা মাদক আবিষ্কার করা গিয়েছে। গবেষক এলিসা গুয়েরা-ডোসের ব্যাখ্যা অনুযায়ী এই গুহাটি ১৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ব্যবহার করা হচ্ছিল এবং আরও কিছুকাল পরে গুহাটি কবরস্থানে পরিণত হয়- প্রায় ১৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ। প্রায় ৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত গুহার কিছু অংশ সমাধিস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। এর আগেকার খননকার্য থেকে জানা গেছে, এই ৬০০ বছরের সময়কালে গুহায় কমপক্ষে ২১০ জন ব্যক্তিকে সমাধিস্থ করা হয়েছিল এবং মৃতদের মধ্যে কয়েকজনের চুলে লাল রঙ করা হয়েছিল। রঙিন চুলের কয়েকটি গোছা কখনও কখনও কাঠ বা শিং দিয়ে তৈরি ছোট শিশিতে ভরে চুলের মৃত মালিকের মৃতদেহের পাশে রাখা হতো।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায়, গুয়েরা-ডোসে এবং তাঁর সহকর্মীরা গুহার গভীরে একটি ছোট স্থান যেটি প্রায় ৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে বন্ধই ছিল, সেখান থেকে এই মাদক আবিষ্কার করেছেন। পাথর খনন করে এবং মাটির একটি স্তরের নীচে লুকানো একটি জায়গা থেকে রঙিন চুলের দশটি শিশি এবং সেইসঙ্গে অন্যান্য কাঠের, সিরামিক এবং ব্রোঞ্জের জিনিসপত্র উদ্ধার করেছেন।

আল্ট্রা-হাই-পারফরম্যান্স লিকুইড ক্রোমাটোগ্রাফি এবং হাই-রেজোলিউশন মাস স্পেকট্রোস্কোপি ব্যবহার করে গবেষকরা এই লুকানো চুলের নমুনায় স্কোপোলামাইন, অ্যাট্রোপিন এবং ইফেড্রিনের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন। এতকাল আগে এই প্রথম মানুষের নমুনায় হ্যালুসিনোজেনিক উদ্ভিদের ব্যবহার নথিভুক্ত করা গিয়েছে, জানান গুয়েরা-ডোস। আগে, সাইকোঅ্যাকটিভ বৈশিষ্ট্য সহ অংসখ্য গাছপালা নথিভুক্ত করা হয়েছিল- যার মধ্যে কিছু এই গুহার চেয়েও অনেক পুরনো কিন্তু সেগুলি সবই পরোক্ষ প্রমাণ ছিল৷ ইউরোপ জুড়ে নানা স্থানে খননকালে প্রাচীন পাত্র বা অন্যান্য পাত্রে আফিম পোস্তর অবশিষ্টাংশ এবং অন্যান্য উদ্ভিদের উপাদান মিলেছে আগে। তবে এই গাছগুলির উপস্থিতির মানে এই নয় যে সেগুলিকে ড্রাগ হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু এই গবেষণা দেখাচ্ছে মানুষ আসলে বিভিন্ন গাছপালা থেকে উদ্ভূত এই ওষুধগুলি খেয়েছিল।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
১৩৫ বছর ধরে নেশার জল বেচছে কোকাকোলা? কীভাবে জন্ম নিল এই পানীয়, অবাক করবে যে ইতিহাস

History of Coca-Cola: নেশায় বুঁদ জন হুইস্কিতে সোডা মেশানোর পরিবর্তে কোকা আর কোলা বাদামের মিশ্রণে সোডা মিশিয়ে গ্লাসে চুমুক দেন। ব্যাস প্রথম চুমুকেই একপ্রকার ক্লিন বোল্ড হয়ে যান জন পেম্বারটন।

স্কোপোলামাইন এবং এট্রোপাইন কুখ্যাত ডাটুরা বিভাগের গাছপালা। গবেষকদের মতে, এই অ্যালকালয়েডগুলির চরম মানসিক বিভ্রান্তি, শক্তিশালী এবং বাস্তবসম্মত হ্যালুসিনেশন, বিভ্রান্তি, অতীন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা এবং ত্বকের পরিবর্তনের অনুভূতি তৈরি করার ক্ষমতা রয়েছে। মানে এই নেশা করে মনে হতে পারে দেহে যেন পশম বা পালক গজাচ্ছে। চুলের মধ্যে পাওয়া অ্যালকালয়েডগুলি এত্তাই বিষাক্ত যে সেগুলির ব্যবহার এবং প্রয়োগ ঘটাতে অত্যন্ত বিশেষ জ্ঞানের প্রয়োজন আছে। এই জ্ঞান শামানদের ছিল।

এই অনুমানের উপর ভিত্তি করেই গুয়েরা-ডোস বলছেন, সম্ভবত লুকানো শিশিতে থাকা চুলগুলি ব্রোঞ্জ যুগের শামানদেরই ছিল। এই লাল চুলের নমুনার শিশিগুলিকে বৃত্ত দিয়ে সাজানো হয়েছিল, যা চোখের প্রতীক হতে পারে এবং তাই হ্যালুসিনোজেনিক উদ্ভিদ খাওয়া শামানদের 'অভ্যন্তরীণ দৃষ্টি'-র প্রতীকও হতে পারে।

কেন এই লাল চুলগুলি ইচ্ছাকৃতভাবে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল সেই রহস্যের সমাধানও করেছেন গবেষকরা। গুয়েরা-ডোস বলছেন, কিছু কিছু প্রমাণ রয়েছে যে প্রায় ৩,০০০ বছর আগে মেনোর্কার মানুষরা 'সামাজিক অস্থিতিশীলতা' টের পেয়েছিল। তাই প্রাচীন ঐতিহ্য পরিত্যাগ করতে অনিচ্ছুক, সম্প্রদায়ের কিছু নির্দিষ্ট মানুষ গুহায় শামানদের নিজস্ব আচার-অনুষ্ঠানের কিছু অংশ লুকিয়ে রেখেছিল এই আশায় যে, সামাজিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হতে পারে ভবিষ্যতে। তাই সেই রীতি আচারের অংশ হিসেবেই চুলগুলিও রয়ে গিয়েছিল মাটির গভীরে।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।