ঠাকুরবাড়ির সিদ্ধি, অলিগলির বাঁদুরে রঙ! কেমন ছিল পুরনো কলকাতার দোল?

Old Kolkata Dol Utsab: যাকে আমরা আজ বলি বাদুরে রং; সোনালি, রুপোলি বর্ণে ছোট ছোট শিশিতে বিক্রি হওয়া সেই গাঢ় বাঁদুরে রঙের আর এক নাম ম্যাজেন্ডার।

Sampriti Chakraborty
৩ মিনিট
ঠাকুরবাড়ির সিদ্ধি, অলিগলির বাঁদুরে রঙ! কেমন ছিল পুরনো কলকাতার দোল?

আজ দোল পূর্ণিমা। রাস্তার দোকান কালো-সাদা মুখোশ, পিচকারি আর সুগন্ধি আবিরে পরিপূর্ণ। স্কুল-কলেজে বেশ কিছুদিন যাবৎ রং মাখামাখির পালা চলছে, এমন রঙিন দিনে আমরা ফিরে যাব পুরনো কলকাতার বসন্ত উৎসবে। পথচলতি সাধারণ মানুষ ঠিক কীভাবে দোল উদযাপন করত পুরনো কলকাতায়? উচ্চবিত্তের উৎসব আদৌ কি আলাদা ছিল তার থেকে?

উনিশ শতকের কলকাতায় দোল ছিল অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ। হিন্দু গৃহের শুভ উৎসব, মঙ্গল কামনা এবং তারই সঙ্গে শাক্ত-বৈষ্ণব নির্বিশেষে এই বিশেষ দিনটি উদযাপন করা হতো। হতে পারে মত পার্থক্য, সাকার-নিরাকার বা কালী-কৃষ্ণে তফাৎ, কিন্তু উৎসবের আনন্দ সবার; তাই দোলপূর্ণিমার রাতে লোক ডেকে মণ্ডা- মিঠাই খাওয়ানোর রেওয়াজ ছিল অটুট। ফুটকড়াই বা ছোলা-চিনি মিশ্রিত ছোট ছোট গোলাকার মিষ্টি কোচরে নিয়ে ঘুরে বেড়াত কমবয়সি ছেলেমেয়ের দল। এই ফুটকড়াই এখনও কলকাতার বাগবাজারে দোলের আগে বিক্রি হয়। খুব ছোট মিষ্টি, রসে টইটুম্বুর নয়, তাই অতি সহজে রাস্তায় ঘুরে ঘুরে খাওয়া যায় আর সঙ্গে থাকে সাদা মুড়কি ও মঠ। আবির মেখে এইসব সুখাদ্য ঝোলায় নিয়ে সারা পাড়ায় আনন্দ ভাগ করে নেওয়া যেত। দোলের তত্ত্বে মিষ্টি পাঠানোর রীতি ছিল এ-বাড়ি থেকে ও-বাড়ি! কুমকুম আর শোলার নুটির ভেতর আবির পুরে ছুঁড়ে মারত সেকালের খুদের দল।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
উৎসবের নামে কতদিন চলবে নিগ্রহ — রংখেলার সিনেমা ও বাস্তব

Holi Celebration: এখন হোলিতে বক্স, ডিজে অপরিহার্য। এবং পুরনো থেকে নতুন সমস্ত গানই সেখানে চলে।

চাঁচর উৎসব পালন হতো আগের রাতে। প্রথমে আবির নিয়ে সুষ্ঠুভাবে খেলা চললেও তারপর আসত ম্যাজেন্ডার। বিশ শতকেই সম্ভবত এর আবির্ভাব। যাকে আমরা আজ বলি বাঁদুরে রং; সোনালি, রুপোলি বর্ণে ছোট ছোট শিশিতে বিক্রি হওয়া সেই গাঢ় বাঁদুরে রঙের আর এক নাম ম্যাজেন্ডার। শুধু রং কেন! কাদাজল, মাটির ডেলা সব নিয়েই চলত দোল খেলা। এ যেন এক সাময়িক বিরতি, রোজকার একঘেয়েমি কাটানোর স্বতস্ফূর্ত চেষ্টা। যদিও এই সবই অতি সাধারণ, নিম্নবিত্তদের দোল উদযাপন। বড়লোকি বৈঠকখানায় নিশ্চয়ই বাঁদুরে রং মাখানো হবে না! কেমন ছিল জোড়াসাঁকোর হোলিখেলা?

অবনীন্দ্রনাথের ভাষায় ঠাকুরবাড়ির দেউড়িতে হতো লোক সমাগম, বিশাল পাত্রে সিদ্ধি গোলা আর প্রকাণ্ড ঢোল বাজিয়ে উৎসব শুরু হতো। জোড়াসাঁকোর দারোয়ান ছিলেন মনোহর সিং, সাদা দাড়ি, লম্বা চওড়া গড়ন; দোলের দিন তাকে নির্দ্বিধায় রং মাখানো যেত। সিংজির সাদা দাড়ি রক্তিম হলে, ওই বিশেষ দিনে আপত্তির কোনও অবকাশ থাকত না। ছোটরা টিনের পিচকারি কিনে এনে, তাতে লাল জল ভরে বয়স্কদের গায়ে দিতে কুণ্ঠা বোধ করত না, ওইদিন সব বকা- ঝকা মাফ। অন্য বনেদি বাড়ির অন্দরে ঢুকে ঠাকুরবাড়ির শিশুরা বড়দের পায়ে আবির আর সমবয়সীদের মাথায় রং মাখিয়ে আসত।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
জামা ছিঁড়ে খালি গায়ে রঙ খেলার কাছে হাজার গোলে হেরে যায় তিন আঙুলের আবিরের দোল

Holi 2023: এই কয়েকদিন আগেও দোলের শেষে সবার জামা একসঙ্গে ছিঁড়ে পরপর বেঁধে রাস্তায় উঁচু তারে ঝুলিয়ে খালি গায়ে বাড়ি ফিরতাম!

অবনীন্দ্রনাথ জানাচ্ছেন, তাঁদের বৈঠকখানায় কীভাবে বাড়ির প্রবীণরা দোল উদযাপন করতেন। পাতলা কাপড়ের আবরণ থেকে দেখা যেত লাল আবিরের কিয়দংশ, ফুলের গন্ধে চারিদিক মাতোয়ারা, তারই মধ্যে অতিথিরা বসতেন তানপুরা নিয়ে। গোলাপ জলের পিচকারি আর গড়গড়া থাকত তাদের আপ্যায়নে। একবার দোল উপলক্ষ্যে আসেন এক নাচিয়ে, অবনীন্দ্রনাথের ভাষায় সে এক ' অদ্ভুত নৃত্য'। ঘরের মেঝেতে রাখা আলোর ডুম, আর সেটিকেই প্রদক্ষিণ করে শুরু হলো নাচ। তার পায়ের তলায় আবির দিয়ে তৈরি আলপনার পদ্ম, শিল্পী পায়ের আঙুল দিয়ে আরও খানিকটা আঁকলেন সেই ফুল, সকলে মুগ্ধ এবং বাকরুদ্ধ। জোড়াসাঁকোর ভৃত্যমহলেও চলতো দোল খেলা, বেহারা বাজাতেন ঢোল, রাজপুত দারোয়ানরা তাদের প্রদেশ থেকে নিয়ে আসতেন নৃত্যশিল্পী, অবনীন্দ্রনাথের ভাষায় "বেশ ভদ্র রকমের নাচ (হতো) …… আমরাও দেখতুম"।

অনেকে আবার নিজেরাই মেয়ে সেজে অঙ্গভঙ্গি করতেন। দোলে চলত উড়িয়াদের লাঠিখেলা, এটিও এক প্রকার নাচ। সিদ্ধি খেয়ে সকলে প্রায় দিশাহারা; ফুল, গান-নাচ, বাদ্যযন্ত্রে চারদিক উৎসবমুখর। ছোটবেলা থেকেই অবনীন্দ্রনাথের মনে ধরেছিল এই পরিচারকদের দোল খেলা। বিলাস-বহুলতায় তার বাবামশাইয়ের রঙ খেলা কৃত্রিম প্রতিপন্ন হতো। সেই আয়োজনে কোথায় যেন একটা ঘাটতি ছিল। তিনি লিখছেন, "দেখলেই মনে হতো হোলি খেলা এদেরই (ভৃত্যদের), শখের খেলা নয়…… কৃত্রিম কিছু নেই"।

আসলে শ্রেণিবিভাজন, দোল বা যে কোনও উৎসবকেই আলাদা করে দেয়। বড়লোকদের দামি গোলাপ, আতর বা গড়গড়ার নাগাল পেতেন না অতি সাধারণ মানুষটি। আবার ম্যাজেন্ডার বা কাদামাটি মেখে পথে পথে লোকারণ্যের থেকে দূরেই থাকতে পছন্দ করতো উচ্চবিত্তের দল। যেমন আজও হয় আর কী! হাল ফ্যাশনে বড় বড় মেট্রোপলিটান ক্লাবে সেলিব্রিটি পারফরম্যান্স, দামি ভোজ আবার অপরদিকে কলকাতারই কোনও রেলের ধারের বস্তিতে রং মাখামাখির পর মাংস-ভাত ফিস্ট। সহাবস্থানে বেঁচে থাকে বাংলার উৎসব।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।