কোলে মার্কেটের 'কোলে' কারা, সুকিয়া স্ট্রিট, পার্সি বাগানের নেপথ্যে রয়েছে কোন ইতিহাস?

Sukia Street Name History: বহু কলকাতা বিশারদদের মত অনুযায়ী সুকিয়া স্ট্রিট তার নাম এক আর্মেনিয়ান ব্যবসায়ীর নাম থেকে পেয়েছে।

Raktim Dey
৩ মিনিট
কোলে মার্কেটের 'কোলে' কারা, সুকিয়া স্ট্রিট, পার্সি বাগানের নেপথ্যে রয়েছে কোন ইতিহাস?

কলকাতাকে হেঁটে দেখতে হয়। ইতিহাসের গায়ে না হাঁটলে সেই গন্ধ মেলে না, যার রেশ ধরে পৌঁছে যাওয়া যায় এক প্রাচীন শহরের প্রাচীনতম শিকড়ে। পুরোনো থেকে বর্তমান কলকাতার প্রতিটি এলাকার নিজস্ব শিকড় রয়েছে, রয়েছে নিজস্ব এক গন্ধ। কলকাতায় সেই কোন কাল থেকেই তো জনসমুদ্রের বিবিধ ঢেউ আছড়ে পরেই তৈরি করেছে বর্তমান শহরকে। সেই জনসমুদ্রের মধ্যে থাকা বহু মানুষকেই আজ বাংলার মানুষ ভুলতে শুরু করেছে। তাদের গল্প বলার জন্যে রয়ে গিয়েছে কলকাতার কিছু সেকেলে রাস্তা।

রুস্তমজি কাওয়াসজি অথবা সেই সময়ের কলকাতার ব্যবসায়ী সমাজে রুস্তমজি বাবু নামে পরিচিত ব্যক্তিটি ছিলেন প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের সমসাময়িক ব্যবসায়ী। জন্মসূত্রে মহারাষ্ট্রের বাসিন্দা হলেও ২০ বছর বয়সে তিনি প্রথম কলকাতায় এসেছিলেন। বিমা থেকে ব্যাংক, ডক থেকে জাহাজ নির্মাণ সর্বত্র ছড়িয়ে ছিল তাঁর ব্যবসা। ১৮২৮ সালের গভর্নমেন্ট গেজেটের প্রকাশিত একটি নথি থেকে জানা যায়, সেই সময়ে তাঁর মোট সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় দুই লক্ষ টাকা ছিল। অর্থ উপার্জন করেই তিনি ক্ষান্ত হননি। শিক্ষাক্ষেত্রে থেকে উইলিয়াম কেরী দ্বারা স্থাপিত কৃষিবিজ্ঞান এবং উদ্যানপালন সংস্থায় তিনি অর্থ সাহায্য করেছিলেন। কলকাতার বিভিন্ন এলাকার রাস্তা, পুকুর নির্মাণের জন্য তাঁর অর্থ সাহায্যের প্রমাণ ডিস্ট্রিক্ট চ্যারিটেবল সোসাইটি অব ক্যালকাটার নথি থেকেই পাওয়া যায়।

কলকাতায় ব্যবসা স্থাপন করার পরে তিনি তাঁর স্ত্রীকে কলকাতায় নিয়ে এসেছিলেন। যে সময়ে পশ্চিম প্রদেশের পার্সি সম্প্রদায়ের সম্ভ্রান্ত পরিবারের মহিলারা দাক্ষিণাত্য পার করেননি, সেই সময়ে তাঁর এই পদক্ষেপ ছিল যথেষ্ট সাহসী। ১৮৫২ সালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কলকাতার বেশিরভাগ মানুষ আজ তাঁকে ভুলতে বসলেও কলকাতা তাঁকে কিছু এলাকার নামের মধ্যে দিয়ে মনে রেখেছে। দক্ষিণ কলকাতার বালিগঞ্জ ফাঁড়ি এলাকায় রুস্তমজি স্ট্রিট, কাশীপুরের কাছে রুস্তমজি ঘাট অথবা রাজাবাজারের কাছে থাকা তাঁর বাগান বাড়ির এলাকার নাম পার্সিবাগান লেন পুরোনো কলকাতার রুস্তমজি বাবুর স্মৃতিই বহন করে চলেছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ধর্মতলার নাম ধর্মতলা হলো কেন! মনোহর পুকুরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কোন ইতিহাস?

Dharmatala Name History: কালীঘাট যাওয়ার পথে যে জঙ্গলাকীর্ণ পথ পার করতে হতো তার শুরু ছিল এই এলাকা। পুরনো নথি ঘেঁটে একটি এলাকার নাম পাওয়া যায়।

মানিকতলার কাছে অবস্থিত সুকিয়া স্ট্রিট কলকাতাবাসীকে মনে করিয়ে দেয়, ইংরেজরা আসার বহু বহু পূর্বেও কলকাতার অস্তিত্ব ছিল। বহু কলকাতা বিশারদদের মত অনুযায়ী সুকিয়া স্ট্রিট তার নাম এক আর্মেনিয়ান ব্যবসায়ীর নাম থেকে পেয়েছে। এই দানবীর ব্যবসায়ীর স্ত্রীর কবর আজও কলকাতার আর্মেনিয়ান চার্চে রয়েছে যেখানে মৃত্যুর বছর হিসাবে ১৬৩০ খ্রিস্টাব্দ উল্লিখিত রয়েছে। জোব চার্ণক পাকাপাকিভাবে ১৬৯০ সাল নাগাদ কলকাতায় বসবাস করতে শুরু করেন। কলকাতার এই রাস্তা আসলে ইংরেজদের কলকাতা আগমনের পূর্বের কথাই মানুষকে বলতে চায়। গঙ্গার তীরে আর্মেনিয়ান ঘাট আসলে সেই সময়ের আর্মেনিয়ান মানুষদের থেকেই নিজের নাম পেয়েছে।

পুরোনো কলকাতায় ব্যবসায়িক স্বার্থে গড়ে উঠেছিল বহু বাজার। সেই সব বাজারের অনেকগুলিই বর্তমানে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে অথবা আকারে অনেকটাই সংকুচিত হয়েছে। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন ফ্র্যাঙ্ক পামার বেলেঘাটার কাছে তৈরি করেছিলেন সেইরকম একটা বাজার। কালক্রমে মানুষের মুখে তার নাম হয়ে যায় পামার বাজার। পুরোনো সেই পামার বাজারের অস্তিত্ব না থাকলেও পামার বাজার নামে একটা এলাকা এবং ছোটো বাজারের রূপ আমরা বর্তমান কলকাতায় বেলেঘাটা যাওয়ার পথে দেখতে পাই।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
নীলদর্পণের সঙ্গে জড়িয়ে কলকাতার রাস্তা! জেমস লং সরণির নামকরণ হয়েছিল কার নামে?

James Long Sarani History: কলকাতা শহরের একটি রাস্তা, যার নাম জেমস লং সরণি তার সঙ্গে নীলদর্পণের এই যোগাযোগ হয়তো বহু মানুষেরই অজানা।

কলকাতায় পাইকারি সবজি বিক্রির অন্যতম বড় বাজারের মধ্যে শিয়ালদহের কোলে মার্কেটের নাম আসতে বাধ্য। বিংশ শতাব্দীতে নফর কোলের ছেলে ভূতনাথ কোলে এই বাজার স্থাপন করেছিলেন। তাদের পদবি আজও এই বাজার বহন করে চলেছে।

মহানগরীর বৈচিত্র্য এবং বাঙালির ইতিহাস বিমুখতার- দুইয়ের অসম যুগলবন্দির ফলে কলকাতার বহু এলাকার নামের সঠিক উৎস সন্ধান অনেকাংশে বেশ কষ্টকর হয়ে ওঠে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে কয়লাঘাট স্ট্রিটের নাম। ১৮ নম্বার স্ট্র্যান্ড্র রোড থেকে বিবাদী বাগের দিকে আসা এই রাস্তাটার সঙ্গে কয়লার কোনও যোগাযোগ নেই। পুরোনো কলকাতায় এই রাস্তা দিয়ে পুরোনো কেল্লার ঘাটে যাওয়া যেত। তাই এই রাস্তার নাম হয়েছিল কেল্লার ঘাটে যাওয়ার রাস্তা। মানুষের মুখে মুখে সেই কেল্লা আসলে কয়লা হয়ে গিয়েছে। বর্তমানে যেমন সেই পুরোনো কেল্লা নেই, ঠিক তেমনই গঙ্গার স্থানও পরিবর্তন হয়েছে। শুধু পুরোনো কলকাতার গঙ্গার ঘাটে যাওয়ার এক রাস্তা তার নামের বিকৃত রূপ নিয়ে রয়ে গিয়েছে। কয়লাঘাট স্ট্রিট সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া গেলেও গরানহাটার নামের উৎস সম্পর্কে রয়েছে শুধুমাত্র মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া গল্প। কথিত আছে, এই এলাকায় গরাণ গাছের খুঁটি বিক্রির হাট ছিল। সেই হাট থেকেই এলাকার নাম হয়েছে গরানহাটা। যদিও এই সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

তথ্য ঋণ : ৩০০ বছরের কলকাতা : পটভূমি ও ইতিকথা

হিন্দুস্থান টাইমস, দ্য টেলিগ্রাফ।

লিখেছেন
Raktim Dey
Raktim Dey
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।