কোলে মার্কেটের 'কোলে' কারা, সুকিয়া স্ট্রিট, পার্সি বাগানের নেপথ্যে রয়েছে কোন ইতিহাস?

Sukia Street Name History: বহু কলকাতা বিশারদদের মত অনুযায়ী সুকিয়া স্ট্রিট তার নাম এক আর্মেনিয়ান ব্যবসায়ীর নাম থেকে পেয়েছে।

কলকাতাকে হেঁটে দেখতে হয়। ইতিহাসের গায়ে না হাঁটলে সেই গন্ধ মেলে না, যার রেশ ধরে পৌঁছে যাওয়া যায় এক প্রাচীন শহরের প্রাচীনতম শিকড়ে। পুরোনো থেকে বর্তমান কলকাতার প্রতিটি এলাকার নিজস্ব শিকড় রয়েছে, রয়েছে নিজস্ব এক গন্ধ। কলকাতায় সেই কোন কাল থেকেই তো জনসমুদ্রের বিবিধ ঢেউ আছড়ে পরেই তৈরি করেছে বর্তমান শহরকে। সেই জনসমুদ্রের মধ্যে থাকা বহু মানুষকেই আজ বাংলার মানুষ ভুলতে শুরু করেছে। তাদের গল্প বলার জন্যে রয়ে গিয়েছে কলকাতার কিছু সেকেলে রাস্তা।

রুস্তমজি কাওয়াসজি অথবা সেই সময়ের কলকাতার ব্যবসায়ী সমাজে রুস্তমজি বাবু নামে পরিচিত ব্যক্তিটি ছিলেন প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের সমসাময়িক ব্যবসায়ী। জন্মসূত্রে মহারাষ্ট্রের বাসিন্দা হলেও ২০ বছর বয়সে তিনি প্রথম কলকাতায় এসেছিলেন। বিমা থেকে ব্যাংক, ডক থেকে জাহাজ নির্মাণ সর্বত্র ছড়িয়ে ছিল তাঁর ব্যবসা। ১৮২৮ সালের গভর্নমেন্ট গেজেটের প্রকাশিত একটি নথি থেকে জানা যায়, সেই সময়ে তাঁর মোট সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় দুই লক্ষ টাকা ছিল। অর্থ উপার্জন করেই তিনি ক্ষান্ত হননি। শিক্ষাক্ষেত্রে থেকে উইলিয়াম কেরী দ্বারা স্থাপিত কৃষিবিজ্ঞান এবং উদ্যানপালন সংস্থায় তিনি অর্থ সাহায্য করেছিলেন। কলকাতার বিভিন্ন এলাকার রাস্তা, পুকুর নির্মাণের জন্য তাঁর অর্থ সাহায্যের প্রমাণ ডিস্ট্রিক্ট চ্যারিটেবল সোসাইটি অব ক্যালকাটার নথি থেকেই পাওয়া যায়।

আরও পড়ুন- ধর্মতলার নাম ধর্মতলা হলো কেন! মনোহর পুকুরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কোন ইতিহাস?

কলকাতায় ব্যবসা স্থাপন করার পরে তিনি তাঁর স্ত্রীকে কলকাতায় নিয়ে এসেছিলেন। যে সময়ে পশ্চিম প্রদেশের পার্সি সম্প্রদায়ের সম্ভ্রান্ত পরিবারের মহিলারা দাক্ষিণাত্য পার করেননি, সেই সময়ে তাঁর এই পদক্ষেপ ছিল যথেষ্ট সাহসী। ১৮৫২ সালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কলকাতার বেশিরভাগ মানুষ আজ তাঁকে ভুলতে বসলেও কলকাতা তাঁকে কিছু এলাকার নামের মধ্যে দিয়ে মনে রেখেছে। দক্ষিণ কলকাতার বালিগঞ্জ ফাঁড়ি এলাকায় রুস্তমজি স্ট্রিট, কাশীপুরের কাছে রুস্তমজি ঘাট অথবা রাজাবাজারের কাছে থাকা তাঁর বাগান বাড়ির এলাকার নাম পার্সিবাগান লেন পুরোনো কলকাতার রুস্তমজি বাবুর স্মৃতিই বহন করে চলেছে।

মানিকতলার কাছে অবস্থিত সুকিয়া স্ট্রিট কলকাতাবাসীকে মনে করিয়ে দেয়, ইংরেজরা আসার বহু বহু পূর্বেও কলকাতার অস্তিত্ব ছিল। বহু কলকাতা বিশারদদের মত অনুযায়ী সুকিয়া স্ট্রিট তার নাম এক আর্মেনিয়ান ব্যবসায়ীর নাম থেকে পেয়েছে। এই দানবীর ব্যবসায়ীর স্ত্রীর কবর আজও কলকাতার আর্মেনিয়ান চার্চে রয়েছে যেখানে মৃত্যুর বছর হিসাবে ১৬৩০ খ্রিস্টাব্দ উল্লিখিত রয়েছে। জোব চার্ণক পাকাপাকিভাবে ১৬৯০ সাল নাগাদ কলকাতায় বসবাস করতে শুরু করেন। কলকাতার এই রাস্তা আসলে ইংরেজদের কলকাতা আগমনের পূর্বের কথাই মানুষকে বলতে চায়। গঙ্গার তীরে আর্মেনিয়ান ঘাট আসলে সেই সময়ের আর্মেনিয়ান মানুষদের থেকেই নিজের নাম পেয়েছে।

পুরোনো কলকাতায় ব্যবসায়িক স্বার্থে গড়ে উঠেছিল বহু বাজার। সেই সব বাজারের অনেকগুলিই বর্তমানে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে অথবা আকারে অনেকটাই সংকুচিত হয়েছে। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন ফ্র্যাঙ্ক পামার বেলেঘাটার কাছে তৈরি করেছিলেন সেইরকম একটা বাজার। কালক্রমে মানুষের মুখে তার নাম হয়ে যায় পামার বাজার। পুরোনো সেই পামার বাজারের অস্তিত্ব না থাকলেও পামার বাজার নামে একটা এলাকা এবং ছোটো বাজারের রূপ আমরা বর্তমান কলকাতায় বেলেঘাটা যাওয়ার পথে দেখতে পাই।

আরও পড়ুন- নীলদর্পণের সঙ্গে জড়িয়ে কলকাতার রাস্তা! জেমস লং সরণির নামকরণ হয়েছিল কার নামে?

কলকাতায় পাইকারি সবজি বিক্রির অন্যতম বড় বাজারের মধ্যে শিয়ালদহের কোলে মার্কেটের নাম আসতে বাধ্য। বিংশ শতাব্দীতে নফর কোলের ছেলে ভূতনাথ কোলে এই বাজার স্থাপন করেছিলেন। তাদের পদবি আজও এই বাজার বহন করে চলেছে।

মহানগরীর বৈচিত্র্য এবং বাঙালির ইতিহাস বিমুখতার- দুইয়ের অসম যুগলবন্দির ফলে কলকাতার বহু এলাকার নামের সঠিক উৎস সন্ধান অনেকাংশে বেশ কষ্টকর হয়ে ওঠে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে কয়লাঘাট স্ট্রিটের নাম। ১৮ নম্বার স্ট্র্যান্ড্র রোড থেকে বিবাদী বাগের দিকে আসা এই রাস্তাটার সঙ্গে কয়লার কোনও যোগাযোগ নেই। পুরোনো কলকাতায় এই রাস্তা দিয়ে পুরোনো কেল্লার ঘাটে যাওয়া যেত। তাই এই রাস্তার নাম হয়েছিল কেল্লার ঘাটে যাওয়ার রাস্তা। মানুষের মুখে মুখে সেই কেল্লা আসলে কয়লা হয়ে গিয়েছে। বর্তমানে যেমন সেই পুরোনো কেল্লা নেই, ঠিক তেমনই গঙ্গার স্থানও পরিবর্তন হয়েছে। শুধু পুরোনো কলকাতার গঙ্গার ঘাটে যাওয়ার এক রাস্তা তার নামের বিকৃত রূপ নিয়ে রয়ে গিয়েছে। কয়লাঘাট স্ট্রিট সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া গেলেও গরানহাটার নামের উৎস সম্পর্কে রয়েছে শুধুমাত্র মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া গল্প। কথিত আছে, এই এলাকায় গরাণ গাছের খুঁটি বিক্রির হাট ছিল। সেই হাট থেকেই এলাকার নাম হয়েছে গরানহাটা। যদিও এই সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া প্রায় অসম্ভব।


তথ্য ঋণ : ৩০০ বছরের কলকাতা : পটভূমি ও ইতিকথা
হিন্দুস্থান টাইমস, দ্য টেলিগ্রাফ।

More Articles