রাধানাথ শিকদার না থাকলে জানা যেত না উচ্চতা, তাও এভারেস্টের নাম এভারেস্ট হলো কেন?

Radhanath Sikdar and Mount Everest: রাধানাথ ত্রিকোণমিতির অঙ্ক কষে মেপেজুপে জানালেন পিক XV-এর উচ্চতা ২৯,০০০ ফুট!

Madhurima Dutta
৪ মিনিট
রাধানাথ শিকদার না থাকলে জানা যেত না উচ্চতা, তাও এভারেস্টের নাম এভারেস্ট হলো কেন?

পাহাড় এক চুম্বকের ডাকনাম, যে চুম্বক শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আকর্ষণ করে চলেছে মানুষকে, কখনও অভিযাত্রী হিসেবে কখনও বা নিছক পর্যটক। যারা খানিক দূর থেকে পাহাড়ের বরফ, পাহাড়ের শূন্যতা, পাহাড়ের মেঘ মাখতে চান, সেই সব মানুষদের জন্য হিমালয় পার্বত্য অঞ্চল এক খনি। ঠিক সেভাবেই, যারা এই দুর্লঙ্ঘ্য পর্বতের ডগায় উঠে দেখতে চান নিজের চারপাশটা, অনেক উচ্চতা থেকে দেখতে চান সমস্তটা, তাঁদেরও খালি হাতে ফেরায় না হিমালয়। বিশ্বের সর্বোচ্চ তো বটেই, একাধিক উচ্চতম শৃঙ্গ রয়েছে হিমালয় পর্বতমালায়। সবচেয়ে উঁচু যে, তার নাম মাউন্ট এভারেস্ট। বাঙালির আদরের কাঞ্চনজঙ্ঘাও রয়েছে ধারে কাছেই। কিন্তু এই এভারেস্টের নাম এভারেস্ট হলো কীভাবে? সেই কোনকালে স্রেফ হিসেব কষে কীভাবে রাধানাথ শিকদার মেপে ফেললেন এর উচ্চতা?

সাল ১৮৬১, দিনটা ২ অক্টোবর। ভারতের গভর্নর জেনারেল এবং ভাইসরয় চার্লস ক্যানিং লর্ড এলগিনকে একটি চিঠি লিখলেন। লিখলেন, লেডি ক্যানিং দার্জিলিং ঘুরতে যাচ্ছেন, রওনা দিয়ে দিয়েছেন। সেখান থেকে লেডি ক্যানিং যাবেন সিকিমে। সিকিম থেকেই দেখবেন বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গটি, যাকে 'দেওডুঙ্গা' বা মাউন্ট এভারেস্ট হিসেবেই ডাকছেন মাপজোপকারীরা।

কীভাবে মাপা হলো এভারেস্ট?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
এভারেস্টজয়ীরাও ভয় পান! পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্বত এটিই...

Mount Annapurna: পৃথিবীতে মোট ১৪টি পর্বত সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮,০০০ মিটার (২৬,২৪৭ ফুট) বেশি উচ্চতায় অবস্থিত

এভারেস্টের মাপ নেওয়ার বিষয়টি মেজর জেনারেল স্যার অ্যান্ড্রু স্কট ওয়ার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়েছিল। তিনি ছিলেন ভারতের সার্ভেয়ার জেনারেল এবং ভারতের গ্রেট ট্রিগনোমেট্রিকাল সার্ভের সুপারিনটেনডেন্ট স্যার জর্জ এভারেস্টের উত্তরসূরি। ১৮১০ সালে এক ভারতীয় সৈনিকের পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ওয়া। ১৮২৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন ক্যাডেট নিযুক্ত হন তিনি। ১৮৩২ সালে তাঁকে গ্রেট ট্রিগনোমেট্রিকাল সার্ভেতে নিয়োগ করা হয়।

১৮০২ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বৈজ্ঞানিকভাবে পুরো ভারতীয় উপমহাদেশের জরিপ করার জন্য ট্রিগনোমেট্রিকাল সার্ভে প্রতিষ্ঠিত করে। প্রাথমিকভাবে কোম্পানি ভেবেছিল ভারতকে মোটামুটি পাঁচ বছরের মধ্যেই মেপে ফেলা যেতে পারে। বাস্তবে তা করতে সময় লেগেছিল ৭০ বছর! ১৮২৩ সাল থেকে সার্ভেটি জর্জ এভারেস্টের তত্ত্বাবধানে হতে থাকে। তিনিই ওয়াকে নিযুক্ত করেন এই কাজে। স্যার এভারেস্টই তখন গণিতবিদের সন্ধানে ব্যস্ত। তখন হিন্দু কলেজে (এখন প্রেসিডেন্সি) অঙ্ক পড়াচ্ছেন অধ্যাপক জন টাইটলার। তিনি এভারেস্টকে জানালেন, তারই এক ছাত্র রয়েছেন। বাঙালি, অঙ্কে তুখোড়। ছাত্রটি রাধানাথ শিকদার। তাঁর বয়স তখন মাত্র ১৯। বয়স কম হলে কী হবে, রাধানাথ ছিলেন প্রথম দুই ভারতীয় ছাত্রের একজন যারা নিউটনের সূত্র পড়ে ফেলেছিলেন। ১৮৩১ সালে গ্রেট ট্রিগনোমেট্রিকাল সার্ভেতে চাকরি করতে ঢুকলেন রাধানাথ। তাঁর পদ হচ্ছে 'কম্পিউটার'। তখনও তো মেশিন কম্পিউটার আবিষ্কার হয়নি। যারা এসব হিসেবের কাজ করতেন তাঁদেরই বলা হতো কম্পিউটার। তা কম্পিউটার রাধানাথ মাইনে পান মাসে ৪০ টাকা! এমন আরও সাতজন কাজ করতেন 'কম্পিউটার' পদে। তবে নজর কাড়লেন রাধানাথ। স্যার এভারেস্টের নির্ভরযোগ্য সহকর্মী হয়ে উঠলেন। ১৮৪৩ সালে যখন এভারেস্ট অবসর নিলেন তখন অ্যান্ডু স্কট ওয়াকেই তিনি তাঁর যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত করে গেলেন।

স্যার জর্জ এভারেস্ট

১৮৩০-এর দশকের শেষের দিকে হিমালয় অঞ্চলে পৌঁছয় এই ট্রিগনোমেট্রিকাল সার্ভের দল। বিদেশিদের নেপাল প্রবেশের অনুমতিই দেওয়া হয়নি, তাই তরাই থেকে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল। ১৮৪৭ সাল নাগাদ ওয়া এবং তাঁর দল দেখলেন 'পিক বি' নামে পরিচিত একটি পর্বত কাঞ্চনজঙ্ঘার চেয়েও বেশ উঁচুতে রয়েছে। এটিকেই বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বত হিসেবে মনে করা হতে থাকে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
এভারেস্টের চেয়ে খাটো, তবু আজও কেন ‘অজেয়’ কৈলাস, রহস্যে মোড়া শিব ঠাকুরের আপন দেশ!

Kailash Mansarovar: এভারেস্টের চেয়েও কম উচ্চতার পর্বত কৈলাসে আজ পর্যন্ত কেউ উঠতে পারেননি। রহস্যজনকভাবে কাজটি অসম্পন্নই রয়ে গেছে।

তবে মুখে বললেই তো হলো না, হিসেব লাগে, প্রমাণ লাগে। গণনা এবং পর্যবেক্ষণ চলতেই থাকে। পিক বি থেকে নাম পালটে রাখা হয় 'পিক XV’। অন্যদিকে, ১৮৫১ সালে পদোন্নতি হলো রাধানাথের। তিনি তখন 'চিফ কম্পিউটার'। কলকাতায় বদলি হলো তাঁর। সেখানে মেটেরিওলজিকাল বিভাগের সুপারিন্টেন্ডেন্ট হলেন রাধানাথ শিকদার। এই সময়েই রাধানাথ দার্জিলিংয়ের বরফে ঢাকা শৃঙ্গগুলির উচ্চতা মাপতে শুরু করেন। ১৮৫২ সাল নাগাদ গণিতবিদ রাধানাথ শিকদার অবশেষে জানালেন সেই 'পিক বি' শৃঙ্গটিই পৃথিবীর সর্বোচ্চ। রাধানাথ ত্রিকোণমিতির অঙ্ক কষে মেপেজুপে জানালেন পিক XV-এর উচ্চতা ২৯,০০০ ফুট! কিন্তু ওয়া তাতে আরও ২ ফুট জুড়ে ২৯,০০২ ফুট করে দিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল রাধানাথের মাপজোপে কিছু না কিছু ভুল তো হবেই। তাছাড়া গোটাগুটি ২৯ হাজার কেমন যেন লাগছে। একটু বাড়িয়েই রাখলে ক্ষতি কী! ১৮৫৬ সালে অবশেষে সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গের মাপ ঘোষণা করা হলো ২৯,০০২ ফুট। পরে, ১৯৫৫ সালে আবার এক ভারতীয় সমীক্ষায় মেপে দেখা যায় এভারেস্টের উচ্চতা ২৯,০২৯ ফুট বা ৮,৮৪৮ মিটার।

রাধানাথ শিকদার

‘মাউন্ট এভারেস্ট’-এর নাম মাউন্ট এভারেস্ট হলো কেন?

ফিরে আসা যাক আবার ১৮৫০-এর দশকে। পাহাড়ের নামকরণের ক্ষেত্রে সাধারণত স্থানীয় নাম বেছে নেওয়াটাই দস্তুর। কিন্তু মাউন্ট এভারেস্টের কোনও স্থানীয় নাম খুঁজে পাননি ওয়া। নেপালে তাঁদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি। ফলে সেখানে গিয়ে নাম খোঁজার কাজটিও করা যায়নি। এসব ঝামেলার মধ্যেই ওয়া বলেন, পর্বতশৃঙ্গটির নাম 'মাউন্ট এভারেস্ট' হতে পারে। ১৮৬৫ সালে রয়্যাল জিওগ্রাফিকাল সোসাইটি এই নামটিকেই মান্যতা দেয়।

তাহলে এতদিন ধরে এভারেস্টের নামই ছিল না কোনও?

এটা ঠিকই যে নির্দিষ্ট একটি স্থানীয় নাম দেওয়া কঠিন ছিল। তবে, ১৮ শতকের মানচিত্রে এর তিব্বতি নাম কমোলংমা (বা চোমোলুঙ্গমা) অনুযায়ীই এর উল্লেখ মেলে। দার্জিলিংয়ে এটিকে দেওডুঙ্গা বলা হত, যার অর্থ পবিত্র পর্বত। নেপালের প্রকৃতিবিদ ব্রায়ান হাউটন হজসন এই নামটি দেন। কিন্তু যার নামে এই এভারেস্টের নাম হলো, সেই স্যার জর্জ এভারেস্ট তো রেগেই যান। যথেষ্ট আপত্তি করেন। তিনি কখনও এই পর্বতটি দেখেনওনি, এই পর্বত আবিষ্কারও করেননি, খামোখা তাঁর নামে কেন ডাকা হবে এত বড় পর্বতশৃঙ্গকে! তিনি আরও জানিয়েছিলেন, হিন্দিতে তাঁর নাম উচ্চারণ করা কঠিন। কিন্তু কী আর করা যাবে, ততদিনে এভারেস্ট নামেই ডাকা হতে শুরু করেছে এই পর্বতশৃঙ্গকে।

অ্যান্ড্রু স্কট ওয়া ১৮৫৬ সালে রয়্যাল জিওগ্রাফিক সোসাইটির স্বর্ণপদক পান এবং ১৮৫৮ সালে রয়্যাল সোসাইটিতে নির্বাচিত হন। ১৮৬১ সালে অবসর গ্রহণ করেন ওয়া। ১৮৭৭ সালে প্রয়াত হন তিনি। রাধানাথ অবশ্য মারা গিয়েছেন তাঁর আগেই, ১৮৭০ সালে।

লিখেছেন
Madhurima Dutta
Madhurima Dutta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।