ক্রিশপার জিন এডিটিং পদ্ধতি কীভাবে বাঁচিয়ে দিল শিশুর প্রাণ?

Crispr Gene-editing : যদি চিকিৎসাটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় এবং অনিচ্ছাকৃত মিউটেশন ঘটায়, তাহলে তা রোগীর শরীরে আজীবনের স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। এমনকি পরবর্তী প্রজন্মেও তা স্থানান্তরিত হতে পারে।

inscript
৩ মিনিট
ক্রিশপার জিন এডিটিং পদ্ধতি কীভাবে বাঁচিয়ে দিল শিশুর প্রাণ?

সম্প্রতি, ফিলাডেলফিয়ার চিলড্রেন'স হসপিটালের কেজে মুলডুন নামের এক শিশু চিকিৎসা -ইতিহাসে নতুন এক পর্বের সূচনা করেছে। আসলে, একটি বিরল জেনেটিক রোগ নিয়ে শিশুটির জন্ম হয়েছিল। রোগটি প্রতিদিনের সাধারণ প্রোটিনকেই শরীরের শত্রুতে পরিণত করতে শুরু করেছিল। ফলে, কেজে নামক ওই শিশুটিকে থাকতে হত কঠোর খাদ্যাভ্যাসের মধ্যে। আশঙ্কা ছিল আগত ভবিষ্যতে মস্তিষ্কের বড়ো কোনও ক্ষতি হতে পারে কেজে-র। কিন্তু ২০২৫-এর ফেব্রুয়ারিতে, মাত্র ছয় মাস বয়সে, সে বিশ্বের প্রথম CRISPR-ভিত্তিক থেরাপি গ্রহণ করে—যা বিশেষভাবে তার অনন্য জেনেটিক ত্রুটির জন্য তৈরি করা হয়েছিল। চিলড্রেন'স হসপিটাল অফ ফিলাডেলফিয়া (CHOP) এবং পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পেরেলম্যান স্কুল অফ মেডিসিনের একটি দল মাত্র ছ-মাসের মধ্যে এই যুগান্তকারী চিকিৎসা-পদ্ধতিটি তৈরি করেছে। চিকিৎসকদের এই সাফল্য শুধু কেজে-কে বাঁচায়নি, বরং জিন এডিটিংকে চিকিৎসার জগতে এক নতুন দিশা দেখিয়েছে।

ভাবুন তো, আপনার শরীর যদি একটি বইয়ের মতো হয়, সেই বিরাট বইতে শুধু একটি টাইপিং ভুল—ডিএনএ-র বিশাল কোডে একটি মাত্র অক্ষরের ত্রুটি। কেজে-র ক্ষেত্রে, এই ভুলটি তার CPS1 জিনে প্রভাব ফেলেছিল, যার ফলে তার লিভার প্রোটিন ভাঙার পর উৎপন্ন বিষাক্ত অ্যামোনিয়া প্রক্রিয়াকরণ করতে পারছিল না। এর অভাবে, অ্যামোনিয়া রক্তে বিষের মতো জমা হতে থাকে। যার ফলে বমি, দুর্বলতা এবং এমনকি কোমা পর্যন্ত হতে পারে। কার্বাময়েল ফসফেট সিন্থেটেজ ১ ডেফিসিয়েন্সি নামক এই রোগটি প্রতি তেরো লক্ষ নবজাতকের মধ্যে প্রায় একজনের হয়ে থাকে, যা রোগীরকে আজীবন কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে থাকতে বাধ্য করে।

জিন এডিটিং

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
একটি তারার দু-বার মৃত্যু! বিজ্ঞানীদের পাওয়া নতুন তথ্য কী বলছে?

Death of a Star : সম্প্রতি জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এমন একটি নক্ষত্রের সন্ধান পেয়েছেন যা একবার নয়, দু-বার বিস্ফোরিত হয়েছে, অর্থাৎ একটি নক্ষত্রের দু-বার মৃত্যু!

এই সমস্যার সমাধান-পথ নিয়ে এসেছে CRISPR, যাকে প্রায়শই ডিএনএ নির্ভুলভাবে কাটা এবং ঠিক করার জন্য 'আণবিক কাঁচি' বলা হয়। সিকেল সেলের মতো সাধারণ রোগের জন্য উপলব্ধ চিকিৎসার বিপরীতে, কেজে-র থেরাপিটি ছিল সম্পূর্ণ কাস্টম-বিল্ট বা ব্যক্তিগতভাবে নির্মিত। বিজ্ঞানীরা রাতারাতি তার জিনোম সিকোয়েন্স করে, সেই নির্দিষ্ট মিউটেশনটি সংশোধন করার জন্য একটি বেস-এডিটিং টুল ডিজাইন করেন এবং এটিকে লিপিড ন্যানো পার্টিকেল (ক্ষুদ্র চর্বির কণা)-এর মধ্যে স্থাপন করেন। এই কণাগুলি একটি IV ড্রিপের মাধ্যমে সরাসরি লিভার কোষে জেনেটিক সমাধান পৌঁছে দেয়। এই প্রক্রিয়ায় কোনও বড় অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়নি এবং ফেব্রুয়ারী, মার্চ ও এপ্রিল ২০২৫-এ তিনটি ডোজ নেওয়ার পর কেজে-র মধ্যে কোনও গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও দেখা যায়নি। সে এখন আগের চেয়ে বেশি প্রোটিন সহ্য করতে পারছে, স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠছে এবং বাড়িতে তার শৈশবের সুন্দর আনন্দময় মুহূর্তগুলি উপভোগ করছে।

কেজে-র এই চিকিৎসাপদ্ধতি, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথ দ্বারা সমর্থিত এবং FDA দ্বারা মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে ফাস্ট-ট্র্যাক অনুমোদন পেয়েছে। চিকিৎসকদলের একজন প্রধান ড. রেবেকা আহরেন্স-নিকলাস বলেন,

বছরের পর বছর ধরে অনেকের সহযোগিতার ফলেই এটা সম্ভব হয়েছে। আমরা আশা করি কেজে অনেকের মধ্যে প্রথম হবে।

চিকিৎসকেরা এই চিকিৎসাপদ্ধতিকে গেম-চেঞ্জার হিসাবে দেখছেন, যেখানে 'N-of-1' থেরাপি (একজনের জন্য ডিজাইন করা) লক্ষ লক্ষ মানুষকে বাঁচাতে পারে। CRISPR-এর কম খরচ এবং অভিযোজন ক্ষমতার কারণে বিশেষজ্ঞরা এমন এক ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছেন যেখানে মেটাবলিক ডিসঅর্ডার থেকে শুরু করে ক্যান্সার পর্যন্ত সবকিছুর জন্য কাস্টম সমাধান তৈরি করা সম্ভব হবে, যা চিকিৎসার গড় পরিধিকে অনেক কমিয়ে আনবে।

তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়, যদি চিকিৎসাটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় এবং অনিচ্ছাকৃত মিউটেশন ঘটায়, তাহলে তা রোগীর শরীরে আজীবনের স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। এমনকি পরবর্তী প্রজন্মেও তা স্থানান্তরিত হতে পারে। কেজে-র চিকিৎসাটি ছিল সোম্যাটিক, অর্থাৎ এটি কেবল তার লিভার কোষকে প্রভাবিত করেছে, প্রজনন কোষকে নয়। কিন্তু CRISPR প্রায়শই জার্মলাইন এডিটিং-এর দিকে মোড় নেয়, যেখানে পরিবর্তনগুলি উত্তরাধিকারসূত্রে স্থানান্তরিত হতে পারে, যা 'ডিজাইনার বেবি' এবং ইউজেনিক্স (প্রজনন-শাস্ত্র)-এর মতো ভয়াবহ আশঙ্কা তৈরি করে।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের আগে যে ভুলগুলি এড়ানো জরুরি

Stock Market Psychology: শেয়ারবাজারে একজন বিনিয়োগকারীর সবচেয়ে বড় সমস্যা অনেক সময় সে নিজেই। আজকের তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক বাজারে এই পর্যবেক্ষণের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কারণ এখন সমস্যা তথ্যের অভাব নয়, বরং তথ্যের অতিরিক্ত প্রবাহ।

মহাবিশ্বকে বুঝতে গিয়ে সমাজকে ভুলে যাননি অশোক সেন

পিএইচডির প্রথম প্রায় তিন বছর তাঁর গবেষণায় কোনো কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতিই হয়নি। চারদিকে শুধু স্থবিরতা। বেশিরভাগ শিক্ষার্থী যেখানে এমন পরিস্থিতিতে ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন বা হতাশ হয়ে পড়েন, অশোক সেন তা করেননি।

মেষ নয়, হায়াডিস? ভ্যান গগের ‘স্টারি নাইট’ নিয়ে কী বলছে নতুন গবেষণা?

The Starry Night mystery: এর আগে দীর্ঘকাল ধরে ধারণা করা হতো যে ভ্যান গগের আঁকা ছবিটির উপরের অংশটি মেষ রাশির কোনো তারামণ্ডল। তবে, সায়েন্টিফিক রিপোর্টস জার্নালে প্রকাশিত 'দ্য অ্যাকচুয়াল স্কাই অফ ভ্যান গগস স্টারি নাইট: এ মাল্টিডিসিপ্লিনারি রিঅকনস্ট্রাকশন' নামক গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, ভ্যান গগের ছবির কেন্দ্রীয় পাঁচ তারার বিন্যাস মেষ রাশির সঙ্গে নয়, বরং হায়াডিস নক্ষত্রপুঞ্জের সঙ্গে নিখুঁতভাবে মেলে।

ডার্কওয়েবে SBI-র তথ্য ফাঁস, কতটা সুরক্ষিত আপনার সঞ্চয়? যা জানাচ্ছেন সাইবার বিশেষজ্ঞ

সন্দীপ সেনগুপ্তের পরামর্শ, যাঁদের তথ্য ফাঁস হয়েছে বলে আশঙ্কা রয়েছে, তাঁদের আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। তিনি এমনকি ব্যাঙ্কে রেজিস্টার্ড মোবাইল নম্বর পরিবর্তন এবং নতুন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলার কথাও বলেছেন।

আইনস্টাইনের কাল্পনিক পরীক্ষা এবার বাস্তবে, কোয়ান্টাম জগতের কণা-তরঙ্গ রহস্যের কী হলো?

Einstein Bohr quantum debate: সম্প্রতি ১০০ বছর আগের আইনস্টাইনের সেই কাল্পনিক পরীক্ষাটি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি অব চায়না (USTC)-এর বিখ্যাত কোয়ান্টামবিজ্ঞানী জিয়ান-উই প্যান (Jian-Wei Pan) এবং তাঁর সহকর্মীরা ল্যাবরেটরিতে বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন।

AI-এর যুগে মানুষ কি নিজের বুদ্ধিটাই মেশিনের হাতে তুলে দিচ্ছে?

Artificial Intelligence: ছোটবেলায় অনেকেই ভাবত রোবট এসে মানুষের কায়িক শ্রমের কাজগুলি করে দেবে। মানুষ অবসর পেয়ে গান শুনবে, কবিতা লিখবে কিংবা বারান্দায় বসে কফি খাবে। বাস্তবে দেখা গেল ঠিক তার উল্টো চিত্র। রোবট এখন কবিতা লিখছে, ছবি আঁকছে আর কোড তৈরি করছে। অন্যদিকে মানুষ সকাল থেকে রাত ল্যাপটপের সামনে বসে শিখছে প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং।

মহাকাশে রওনা নাসার টেলিস্কোপের, বদলে দিতে পারে মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি?

NASA’s Roman Space Telescope: নাসার নতুন ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ বদলে দেবে মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি? হাবল ও জেমস ওয়েবের পর কেন প্রয়োজন হলো এই নতুন মহাকাশ-চোখের? ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি, গ্যালাক্সি ও এক্সোপ্ল্যানেট সম্পর্কে কি নতুন তথ্য দেবে রোমান? মহাবিশ্বের প্রসারণের ইতিহাস বুঝতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এই অত্যাধুনিক টেলিস্কোপ?

সৌরপৃষ্ঠ আসলে কেমন? ৩৩ বছর পর মিলল উত্তর

Sun’s surface mystery: সূর্যের পৃষ্ঠকে এতদিন দূর থেকে তুলোর মতো নরম ও শান্ত দেখালেও, তা কি সত্যিই এমন? বিশ্বের বৃহত্তম সৌর টেলিস্কোপ ড্যানিয়েল কে ইনোয়ের তোলা সর্বোচ্চ-রেজোলিউশনের ছবিতে দেখা গেল ছোট ছোট হিংস্র প্লাজমার ঘূর্ণি। ৩৩ বছর আগে করা জোয়ান কার্পেনের সেই ভবিষ্যদ্বাণী কি অবশেষে সত্যি প্রমাণিত হলো? এই আবিষ্কার কি বদলে দেবে সৌরপৃষ্ঠ সম্পর্কে ধারণা?