কোভিডের মতোই সংক্রমিত হচ্ছে মাঙ্কিপক্স? যে কারণে পৃথিবীজুড়ে চিন্তা বাড়ছে বিজ্ঞানীদের

বর্তমানে পৃথিবীর একুশটি দেশে দুশো-র বেশি মানুষ মাঙ্কিপক্সে আক্রান্ত। যেভাবে ছড়াচ্ছে মাঙ্কিপক্স ভাইরাস, তার ধরন যে মোটেই স্বাভাবিক নয়, একথা অনেক আগেই মনে হয়েছিল অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এপিডেমিওলজিস্ট মরিৎজ় ক্রেমারের। রোগটি যখন ইংল্যান্ড, ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ছড়াতে শুরু করেছে সবে, তখনই তার রকম-সকম দেখে ক্রেমার বেশ চিন্তায় পড়েন।

 

মাঙ্কিপক্স মূলত হয় প্রধানত আফ্রিকা মহাদেশের মধ্য এবং পশ্চিমভাগে। কিন্তু যেভাবে তখন মাঙ্কিপক্স আফ্রিকার বাইরেও তিনটি দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল, তা দেখে ক্রেমারের মনে হয়, যত দ্রুত সম্ভব একটি মাঙ্কিপক্স ট্র্যাকার বানানো উচিত। সেই মতো ক্রেমার ও তাঁর সহকর্মী জন ব্রাউনস্টেন একটি মাঙ্কিপক্স ট্র্যাকার বানান। যার সাহায্যে কোন দেশে কতজন মাঙ্কিপক্সে আক্রান্ত, তা জানা যাবে। পাশাপাশি সংক্রমণের ধরনে কোনও অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে তা-ও ধরা পড়বে সেই ট্র্যাকারে।

 

ক্রেমার জানাচ্ছেন, তাঁর খটকা লাগে, যখন তিনি দেখেন বেশ কিছু মাঙ্কিপক্স আক্রান্তর মধ্যে সংক্রমণের ধরন এক দেশ থেকে অন্য দেশে ভ্রমণের ইতিহাসের সঙ্গে মিলছে না। আক্রান্তদের অনেকেই সাম্প্রতিককালে আফ্রিকায় ভ্রমণ করেননি।

 

আরও পড়ুন: যৌন সংসর্গ থেকে সংক্রমণ? মাঙ্কি পক্স নিয়ে নতুন যে তথ্যে তোলপাড় বিশ্ব

 

যদিও মাঙ্কিপক্সের ভাইরাস মূলত ইঁদুরজাতীয় প্রাণী (বা রোডেন্টস), ক্ষুদ্র স্তন্যপায়ী প্রাণী, ও অন্য আক্রান্ত মানুষদের স্পর্শ বা বডি ফ্লুইডের মাধ্যমে ছড়ায়, তবে খুব বিরল কিছু ক্ষেত্রে মুখ ও নাক থেকে নির্গত থুতু, লালা বা কফের ক্ষুদ্র কণার (রেস্পিরেটরি ড্রপলেট) সঙ্গেও ছড়াতে পারে।

 

তাহলে কি রেস্পিরেটরি ড্রপলেটের মাধ্যমেও সাম্প্রতিককালে এর সংক্রমণ ঘটছে? সেই ভয়ও ছিল।

 

মাঙ্কিপক্স ট্র্যাকারে দেখা যাচ্ছে, এযাবৎ যতগুলো দেশে সংক্রমণের ঘটনা চোখে পড়েছে, তাদের সবগুলোর ক্ষেত্রে কিন্তু মাঙ্কিপক্সের উৎসস্থল, অর্থাৎ আফ্রিকার সঙ্গে যোগাযোগের কোনও স্পষ্ট নমুনা নেই। এরকম দেশের নমুনা হিসেবে বলা যায় কানাডা কিংবা অস্ট্রেলিয়ার কথা। কানাডা, এমনকী সুদূর অস্ট্রেলিয়াতেও কী করে মাঙ্কিপক্স পৌঁছল​, সেই নিয়ে কিন্তু বিভিন্ন মহলের বিজ্ঞানীরা এখনও সন্দিহান।

 

সংক্রমণে শুরুর দিকে, কিছু কিছু গবেষক সন্দেহ করেছিলেন, হয়তো মাঙ্কিপক্সের জিনের মিউটেশনের ফলে, ভাইরাসটির নতুন কোনও স্ট্রেন তৈরি হয়েছে, যা আগের তুলনায় বেশি সংক্রামক। কিন্তু সেই আশঙ্কা যে ভিত্তিহীন, তা প্রমাণিত হয়েছে সাম্প্রতিকে এক ব্যক্তির মাঙ্কিপক্স সংক্রমণের পরে।

 

বেলজিয়ামের ইনস্টিটিউট অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিনে মাঙ্কিপক্স-সংক্রামিত এক ব্যক্তি ভর্তি হন। বছর তিরিশের ওই ব্যক্তির শরীর থেকে পাওয়া মাঙ্কিপক্স ভাইরাসের জিনের গঠন জানার জন্য বিজ্ঞানীরা জিন সিকোয়েন্সিং করেন। দেখা যায়, ২০১৮ সালে ছড়িয়ে পড়া মাঙ্কিপক্স ভাইরাসের জিনের সঙ্গে, বর্তমান মাঙ্কিপক্স ভাইরাসের জিনের গঠন মিলে যাচ্ছে।

 

মাঙ্কিপক্স-আক্রান্ত এক পর্তুগিজ় ব্যক্তির শরীর থেকে সংগ্রহ করা ভাইরাসের নমুনার জিন সিকোয়েন্স করে দেখা যায়, সেটির জিনেরও ২০১৮ সালে ছড়িয়ে পড়া মাঙ্কিপক্স ভাইরাসের সঙ্গে মিল আছে।

 

ইয়েল স্কুল অফ পাবলিক হেলথ-এর গবেষক জো ওয়াকারের মতে, যখন বর্তমানে ছড়িয়ে পড়া কোনও ভাইরাসের জিনের সঙ্গে, পূর্বে ছড়িয়ে পড়া সেই ভাইরাসেরই জিনের গঠনের মিল খুঁজে পাওয়া যায়, আমরা নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি যে, ভাইরাসের জিনে কোনও মিউটেশন হয়নি বা সেই ভাইরাসের নতুন কোনও স্ট্রেন তৈরি হয়নি।

 

গবেষকদের ধারণা, আফ্রিকার কিছু অঞ্চল থেকেই সংক্রমণ ছড়িয়েছে। কোভিড অতিমারীর কারণে আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে নানা নিয়ম-নিষেধ ছিল এই দুই বছর। দুই বছর পরে সেই নিষেধাজ্ঞা হ্রাস পেতেই বায়ুপথে ভ্রমণের ঘটনা বেড়েছে। আর তার ফলেই আফ্রিকার বাইরে একাধিক দেশে মাঙ্কিপক্স ছড়িয়েছে।

 

সংক্রমণের আরও একটি কারণ হিসেবে মাঙ্কিপক্সের বিরুদ্ধে আমাদের ক্রমহাসমান রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকেও দেখছেন গবেষকরা। ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া-র গবেষক জেমি লয়েড-স্মিথের মতে, ১৯৮০ সালে স্মল পক্স বা গুটিবসন্ত সম্পূর্ণভাবে নির্মূল হওয়ার পর, পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে গুটিবসন্তের বিরুদ্ধে টিকাকরণ। এই টিকা কেবল গুটিবসন্তের থেকেই আমাদের রক্ষা করে না, এর পাশাপাশি মাঙ্কিপক্সের বিরুদ্ধেও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে। এত বছর ধরে টিকাকরণ বন্ধ থাকার ফলে কেবল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়নি, বেশ কয়েক প্রজন্ম কোনওদিন স্মল পক্সের টিকাই পায়নি। যেহেতু এই টিকা মাঙ্কিপক্সের থেকেও সুরক্ষা দেয়, একেবারেই টিকা না পাওয়ার ফলে তাদের মাঙ্কিপক্সের বিরুদ্ধে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাই গড়ে ওঠেনি।

 

ফলে মাঙ্কিপক্স ভাইরাসের পক্ষেও সহজ হয়েছে আক্রমণ করা। প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, যাঁরা আক্রান্ত হচ্ছেন, তাঁদের জন্ম ১৯৮০ সালের পরে কি না, বা তা না হলেও, তাঁরা পূর্বে মাঙ্কিপক্সের টিকা নিয়েছেন কি না।

 

পাশাপাশি বিভিন্ন মহলের বিজ্ঞানী ও গবেষকরা প্রশ্ন করছেন, মাঙ্কিপক্স যখন আগে থেকেই ছিল, আর যখন আমরা চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে টিকা গ্রহণ করিনি, তাহলে এতদিন পরেই বা ছড়াল কেন এই রোগ? এই ঘটনা তো আগেও ঘটতে পারত! এই প্রশ্নের উত্তর কিন্তু এখনও বিজ্ঞানীদের কাছে নেই।

 

জো ওয়াকার বলছেন, ক্রমহাসমান রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এবং বায়ুপথে ভ্রমণের ঘটনা বৃদ্ধির মতো কেবল দু'টি বিষয় দিয়ে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। তবে তিনি জানাচ্ছেন, হয়তো কোনও ব্যক্তির মাধ্যমে আফ্রিকা থেকে মাঙ্কিপক্সের ভাইরাস বৃহৎ কোনও জনবহুল কেন্দ্রে ছড়িয়ে পড়েছে, সেখান থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বায়ুপথে ভ্রমণের কারণে ছড়িয়ে পড়েছে এই রোগের জীবাণু।

 

এত কিছুর মধ্যে আশার বিষয় হল, মাঙ্কিপক্সের যে স্ট্রেনটি সম্প্রতি বেলজিয়াম ও পর্তুগালে পাওয়া গেছে, সেটি পাওয়া যায় পশ্চিম আফ্রিকায়। এই স্ট্রেনটির কারণে মাত্র এক শতাংশ ক্ষেত্রে আক্রান্তদের মৃত্যু হয় এবং রোগের প্রকোপও কম হয়। অন্যদিকে কঙ্গো বেসিনে যে স্ট্রেনটি পাওয়া যায়, তার ফলে আক্রান্তদের মধ্যে দশ শতাংশেরই মৃত্যু হয়। তার থেকেও বড় কথা, বর্তমানে মাঙ্কিপক্স আক্রান্তদের কারওর মধ্যেই শারীরিক অসুস্থতা প্রকটভাবে দেখা যায়নি।

 

 

More Articles

;