সেলফি তুলতে গিয়ে সর্বাধিক মৃত্যু ভারতেই, আপনি ‘সেলফিটিস’-এ আক্রান্ত?

Arnab Dutta
৩ মিনিট
সেলফি তুলতে গিয়ে সর্বাধিক মৃত্যু ভারতেই, আপনি ‘সেলফিটিস’-এ আক্রান্ত?

আলেকজান্ডার সেই কবে বলেছিলেন, সত্য সেলুকাস কী বিচিত্র এই দেশ! সত্যই বটে, ভারত আজও বিচিত্র!

বিচিত্র হুজুগে বিপদ মাথায় নিয়ে সেলফি তোলার নিরিখে মৃত্যুর ঘটনায় ভারত পৃথিবীর চারটি দেশের মধ্যে শীর্ষে। বাকি তিনটি দেশের নাম রাশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পাকিস্তান।

সেলফি তোলার হুজুগটা অসুখ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ২০১৪ সালে। অসুখের নাম ‘সেলফিটিস’। অসুখটি চিহ্নিত করেছে আমেরিকান সাইক্রিয়াটিস্ট অ্যাসোসিয়েশন। ‘সেলফিটিস’ এক ধরনের মানসিক ডিসঅর্ডার। সেলফিটিসে আক্রান্ত হলে ঘন ঘন সেলফি তুলতে ইচ্ছা করবে এবং এই রোগে আক্রান্ত মানুষ মোবাইলে দৈনিক তিনটি থেকে আটটি পর্যন্ত সেলফি তুলবেনই। হয়তো তিনি জানেনই না, আসলে কী রোগ দানা বাঁধছে! প্রসঙ্গত, ঘন ঘন সেলফি তোলার এই রোগের নিরাময় সম্ভব কগনিটিভ বিহেভোরিয়াল থেরাপির মাধ্যমে!

ভারতীয় জনগণ সেলফি তুলতে গিয়ে জলে ডুবে, পাহাড় থেকে পড়ে, ট্রেনের ধাক্কায় গত এক দশকের বেশি সময় ধরে মারা গেছে। তথ্য বলছে, ২০১১ সাল থেকে ২০২২ সালের এপ্রিল মাসের গোড়া পর্যন্ত সেলফিজনিত দুর্ঘটনায় কয়েকশো মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সেলফিজনিত দুর্ঘটনাগুলির ফলে ২০১৭ সালে ১০৭ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যা এই সময়সীমাতে সর্বাধিক।

সেলফি তোলার ফলে মৃত্যুর ব্যাপারে নজির সৃষ্টি করেছে পশ্চিমবঙ্গ। গত বছরের নভেম্বরে আলিপুরদুয়ারের মেটেলি চা-বাগানে এক কিশোর ভাল্লুকের সঙ্গে হাসিমুখে সেলফি তুলতে গিয়ে সেই ভাল্লুকের আক্রমণে মারা গিয়েছে। পরে ভাল্লুকটিকেও পিটিয়ে মেরেছে জনতা।

স্মার্টফোনের বদনাম বিশ্বজুড়েই। সেলফিটিসের কারণ হাতের স্মার্টফোনই। এদিকে হু হু করে বিশ্বজুড়েই বাড়ছে স্মার্টফোনের ব্যবহারকারী। আন্তর্জাতিক সমীক্ষা অনুসারে, ২০২৫ সালের ভেতর স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়াবে ৭.৩৩ বিলিয়ন। সেলফি তুলে সঙ্গে সঙ্গে সেই ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড না করা পর্যন্ত শান্তি পান না অনেকেই। ২০৪০ সালের মধ্যে ১.৫ বিলিয়ন ভারতীয় নাগরিক ফেসবুক ব্যবহার করবেন বলে গবেষকদের পূর্বাভাস। সেই ফেসবুকে সেলফি পোস্ট করার হিড়িকও যেন বারো মাসে তেরো পার্বণের মতো!

মেয়েরা নাকি নিজেদের ঘুরেফিরে বারেবারে দেখতে ভালবাসে– এমন একটি প্রচলিত সামাজিক ধারণা রয়েছে। তবে এই ধারণা বোধহয় এবার ভ্রান্ত প্রমাণিত হতে চলেছে। কেননা, গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, বিপজ্জনকভাবে সেলফি তুলতে গিয়ে যাঁরা ডুবে, পাহাড় অথবা উঁচু বাড়ি থেকে পড়ে মারা যাচ্ছেন– তাঁদের অধিকাংশই পুরুষ। রাশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান– এই তিনটি দেশেও ভারতের পাশাপাশি বিপজ্জনকভাবে সেলফি তুলতে গিয়ে পুরুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে মেয়েদের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি সংখ্যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, সেলফি তুলতে গিয়ে ৭২.৫ শতাংশ ক্ষেত্রে পুরুষের মৃত্যু হচ্ছে। বাকি ২৭.৫ শতাংশ ক্ষেত্রে মেয়েদের প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।

ঝুঁকি মাথায় নিয়ে সেলফি তুলতে গিয়ে সারা পৃথিবীর মধ্যে ভারতে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হলেও বিপজ্জনক এলাকাগুলিতে 'নো সেলফি বোর্ড' টাঙানোর ব্যবস্থা নেই। তবে এর ব্যতিক্রমও আছে, গুজরাট সরকার ডাং জেলায় সেলফি তোলা পুরোপুরিভাবে নিষিদ্ধ করেছে। পর্যটকরা সেলফি তুলতে গিয়ে ধরা পড়লে ফৌজদারি অপরাধের মামলা দায়ের করা হবে বলে সতর্ক করেছে পুলিশ।

সারা পৃথিবীতে সেলফিজনিত দুর্ঘটনায় যত সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়, এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হচ্ছে ভারতে। আর মৃতদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠই যুব সম্প্রদায়ের। পৃথিবীর অন্য দেশগুলির মতো ভারতেও ১৬ থেকে ২০ বছরের ছেলেমেয়েদের মধ্যে ঘনঘন সেলফি তোলার প্রবণতা বেশি।

গবেষণায় এও দেখা গিয়েছে, যাঁরা দিনে বারংবার সেলফি তোলেন সোশ্যাল মিডিয়ায় লাগাতার লাইক এবং লাগাতার কমেন্ট পেতে– তাঁরা আদতে উপভোগ করেন সামাজিক স্বীকৃতির ভার্চুয়াল স্বাদ। এঁদের অনেকে বলেছেন, বারবার সেলফি তুললে তাঁদের মানসিক উদ্বেগজনিত চিন্তা বা স্ট্রেস কমে।

তিনটি পর্যায় আছে সেলফিটিসের– বর্ডার লাইন, অ্যাকিউট এবং ক্রনিক পর্যায়। ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড অ্যাডিকশন’–এ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে দেখা যাচ্ছে, যাঁরা দেদার সেলফি তোলাটা জীবনযাপনের অঙ্গ করে তুলেছেন, আসলে তাঁদের ভেতর কোথাও আত্মবিশ্বাসের অভাব রয়েছে। এ-ব্যাপারে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছেন এই পেপারের অন্যতম লেখক গবেষক জি বালাকৃষ্ণণ।

অল্প বয়স্ক ছেলেমেয়েরা ঘন ঘন সেলফি তুললে অভিভাবকদের বিষয়টি সম্পর্কে সজাগ হওয়া উচিত। দরকার হলে কাউন্সেলিং করানো উচিত। তবে কাজটা সহজ নয়। কেননা যদি হঠাৎই কাউকে ঘন ঘন সেলফি তোলার অভ্যাস থেকে জোর করে নিবৃত্ত করা হয়, সেক্ষেত্রে সেই মানুষটির মনে অস্বাভাবিক ধরনের চাঞ্চল্য দেখা দিতে পারে। এছাড়া তার আত্মবিশ্বাসও তলানিতে গিয়ে ঠেকতে পারে। আর নিঃসঙ্গতার জেরে বাড়ে যন্ত্রণা। এই কারণেই দরকার সাইকোলজিস্ট কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে এগোনো।

কিশোরী থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক যে মহিলারা অনবরতই সেলফি তুলছেন– এঁদের মধ্যে বেশিরভাগই আবার নিজেদের শরীরের গঠন নিয়ে বেজায় মানসিক অসন্তুষ্টিতে ভুগছেন। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, সেলফিটিসে আক্রান্ত হওয়ায় নিজের সৌন্দর্য সম্পর্কে এদের ভেতর নানা অবাস্তব ধারণা তৈরি হয়। বিশেষত, ওজন নিয়ে সবসময়ে খুঁতখুঁত করেন এঁরা।

লাগাতার সেলফি না তুলে কবিগুরুর বাণী স্মরণ করুন বরং– ‘তুমি কি কেবলই ছবি, শুধু পটে লিখা...’

লিখেছেন
Arnab Dutta
Arnab Dutta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

চিনির বিকল্প স্টেভিয়া! ঘরের বাগানে রাখা যায় যে ‘মধু পাতা’

Stevia benefits: গাছ থেকে সদ্য তোলা কাঁচা পাতা কিংবা রোদে শুকিয়ে নেওয়া পাতা সরাসরি চা বা যেকোনো পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়। এতে চিনির মতো একই রকম মিষ্টতা পাওয়া যায়। স্টিভিয়ার নির্যাস থেকে তৈরি মিষ্টান্ন ডায়াবেটিস রোগীরা খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে না বললেই চলে।

ফুটপাথের ধারের সেই খাবার যেভাবে হয়ে উঠল কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

Kolkata Street food history: সুতানুটি-গোবিন্দপুর-কলিকাতার শ্রমজীবী মানুষের তৃপ্তির জন্য জন্ম হয়েছিল ফুটপাতের খাবারের। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের 'সংবাদ প্রভাকর' থেকে হুতোম প্যাঁচার নকশা, এফএও সমীক্ষা থেকে এফএসএসএআই আইন হয়ে ২০২৫ সালে রাসেল স্ট্রিটে প্লাস্টিক-মুক্ত ফুড হাবের জন্ম। কলকাতার স্ট্রিট ফুড আজও এই শহরের প্রাণ। এই শহরের অন্যতম ঐতিহ্য।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি কেন আরশোলার মৃত্যুতে দুঃখ পেয়েছিলেন?

Sanae Takaichi cockroach story: ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ। সরকারি বাসভবনে গভীর রাতে একা কাজ করতে গিয়ে তিনি একটি আরশোলা দেখতে পেয়েছিলেন। সচরাচর আরশোলা দেখলে তিনি চিৎকার করে ওঠেন, কিন্তু সেদিন তিনি সেটিকে মারেননি।

স্ট্রেস কি সবসময় খারাপ? কখন স্বাভাবিক চাপ হয়ে ওঠে মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি?

mental stress: একটি ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করতে গিয়ে তারা দেখেছেন, একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ইঁদুরটির মধ্যে স্ট্রেস বাড়ানোর সঙ্গে তার কাজকর্মের মান আরও উন্নত হয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সীমা পার করবার পর পরই তার ফলাফল করার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা ক্রমশ কমতে কমতে শেষে সেটা প্রায় শূন্যতে নেমে গিয়েছে।

নিজের সর্বস্ব দিয়ে হাসপাতাল গড়েছিলেন রাধাগোবিন্দ কর

History of RG Kar Medical College and Hospital: আজ যে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল বারবার খবরের শিরোনামে, তার দীর্ঘ ইতিহাস কী? কে ছিলেন রাধাগোবিন্দ কর, যিনি নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে গরিব মানুষের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল গড়ে তুলেছিলেন? প্লেগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বাংলায় চিকিৎসাবিজ্ঞান চর্চা ও সমাজসেবায় তাঁর অবদান আজ কতটা মনে রাখা হয়েছে?

হিরোশিমা-নাগাসাকির আগুন থেকে বেঁচে যাঁরা, কেমন ছিল তাঁদের পরের জীবন?

Hiroshima, Nagasaki: বিস্ফোরণের বহু বছর পর এমিকোর ঘরে মেয়ে এল, আর তারও পর জন্ম নিল এমিকোর নাতনি কাজুমি কুওয়াহারা। নবজাতক নাতনিকে দেখে চিকিৎসকেরা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, "এই বাচ্চা তিন দিনের বেশি বাঁচবে না।" জিনের ভিতরে লুকিয়ে থাকা কোনো অজানা দুর্বলতা যেন জন্ম থেকেই জাপটে ধরেছিল ছোট কাজুমিকে।

কেন কম ঘুমেও কেউ সুস্থ, কেউ হারাচ্ছেন স্মৃতি? জানালেন গবেষকরা

sleep deprivation and brain health: গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে AQP4 (Aquaporin-4) নামে একটি জিন। এই জিনকে অনেকটা মস্তিষ্কের 'সাফাই কর্মী' বলা যায়। আমরা যখন গভীর ঘুমে থাকি, তখন মস্তিষ্কে শুরু হয় এক বিশেষ পরিষ্কার করার কাজ। সারাদিনে জমে থাকা বর্জ্য এবং আলঝাইমার্স রোগের সঙ্গে যুক্ত ক্ষতিকর প্রোটিন এই সময় ধীরে ধীরে শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। আর সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজে বড় ভূমিকা পালন করে AQP4 জিন।